SAHA ANTAR

Published:
2022-10-11 10:58:22 BdST

বিরল ক্যানসারকে হারিয়ে হুইলচেয়ারে বসেই এমডি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ডা শৌভিক


মায়ের সঙ্গে নবীন মেধাবী চিকিৎসক শৌভিক

 

ক্ষীরোদ ভট্টাচার্য:
একদিন ঠিকই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হতে পারবই। এ বিশ্বাস
নবীন ডাক্তার শৌভিক বিশ্বাসের।
শৌভিকের ‘হজকিন লিম্ফোমা’কে হারানোর কাহিনি বলতে ঘটনাক্রম অনুযায়ী বলতে হবে।
ঘটনা ১: মাঝরাতের নীরবতাকে খানখান করে এক যুবক চিৎকার করছে। আমি মরতে চাই! এই যন্ত্রণা আর সহ‌্য করতে পারছি না। প্রায় এক বছরের বেশি সময় এমন যন্ত্রণা সহ‌্য করেছে সেই যুবক।
ঘটনা ২: চেন্নাইয়ের এক বেসরকারি হাসপাতালে ২০১৬ ডিসেম্বরে মেরুদণ্ডের ডি সিক্স অস্ত্রোপচার হয়। ফের যন্ত্রণা। একসময়ে সম্পূর্ণ শয‌্যাশায়ী।
ঘটনা ৩: ২০১৭ সালে বেঙ্গালুরুর এক হাসপাতালে পরীক্ষা করে যুবককে জানানো হল তাঁর ব্লাড ক‌্যানসার। রোগের নাম ‘হজকিন লিম্ফোমা’। সব শুনে ইন্টার্ন চিকিৎসক সেই যুবক ডিউটি চিকিৎসককে বলেছিলেন, ‘‘ধন‌্যবাদ। এবার অন্তত চেনা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়তে পারব।’’


এভাবে আরজি কর মেডিক‌্যাল কলেজের ইন্টার্ন শৌভিক বিশ্বাসের জীবন থেকে তিনটে বছর চলে গিয়েছে ঠিকই। কিন্তু ‘হজকিন লিম্ফোমা’ (Hodgkin Lymphoma) নামক বিশেষ ধরনের ব্লাড ক‌্যানসার হেরে গিয়েছে তাঁর অদম‌্য লড়াকু মেজাজের কাছে।

হুইল চেয়ার ছাড়া অচল বছর পঁচিশের শৌভিক বিশ্বাস। বাঁ পায়ের সঙ্গে ঝুলে থাকে ক‌্যাথিটার ব‌্যাগ। প্রস্রাব-পায়খানার বেগ সামাল দিতে পারেন না। কিন্তু উত্তর ২৪ পরগনার হৃদয়পুর থেকে রোজ সকাল ন’টায় নিয়ম করে গাড়ি করে হাসপাতালের আউটডোরে হাজির হন। সঙ্গে মা কৃষ্ণা বিশ্বাস। নিয়ম করে রোগী দেখা, ঠাট্টা মজা করে সহপাঠী ইন্টার্নদের সঙ্গে। দুপুর দু’টো পর্যন্ত আউটডোর করে ফের বাড়ি। আবার পরের দিনের প্রস্তুতি।


শৌভিকের কথায়, ‘‘২০১৬ সালের মাঝামাঝি তখন সেকেন্ড ইয়ার প্র‌্যাক্টিকালের পরীক্ষা চলছে। হঠাৎ বুকের বাঁদিকে ব‌্যথা শুরু হল। অসহনীয় যন্ত্রণা। ক্রমশ পা অসাড় হতে লাগল। আর লেখাপড়া করতে পারিনি। দিনে যতটা ব‌্যথা হত। রাতে যেন যন্ত্রণা আরও বাড়ত। দু’দিকে তীক্ষ্মধার ছুরি দিয়ে পিছনে বারবার আঘাত করলে যেমন যন্ত্রণা হয়, ঠিক তেমন অবস্থা হত। যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত‌্যা করতে ইচ্ছে করত। কিন্তু সেই ক্ষমতাও ছিল না।”

শৌভিকের বাবা রাজ‌্য সরকারের পদস্থ আধিকারিক। সন্তানের এমন ভয়াবহ অবস্থা দেখে চেন্নাই নিয়ে যান। সেখানে মেরুদণ্ডের ডি সিক্স অস্ত্রোপোচারও হয়। কিন্তু যন্ত্রণার উপশম হল কোথায়? উলটে ওজন কমতে শুরু করল। খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। অন্তত ৩০ কেজি ওজন কমে যায়। কার্যত কঙ্কালসার পোড়া কয়লার মতো অবয়ব নিয়ে জীবন্মৃত শৌভিক বিছানায় পড়ে থাকত।

মা কৃষ্ণাদেবী বলেন, ‘‘একটা সময় ওকে পাশ ফিরিয়ে দিতে হত। ২০১৭ সালের মে মাস নাগাদ রোগ ধরা পড়ল। বেঙ্গালুরুর একটি বিখ‌্যাত হাসপাতালে ছেলে ভরতি ছিল। সেখানেই এক চিকিৎসক ওকে জানান, এক লক্ষ ব্লাড ক‌্যানসার রোগীর মধ্যে শতকরা ২.৬ জনের এই ধরনের মারণ রোগ দেখা যায়। ’’ শত্রু যখন চিহ্নিত তা হলে অস্ত্রও পাওয়া গেল। কেমোথেরাপির জন‌্য ওষুধ আনা হত ইজরায়েল থেকে। কিন্তু এমনই দু’টি কেমো কাজই করল না। তবে এতটা লড়াইয়ের পর শেষ দেখার জন‌্য তৈরি হয়েছিলেন এই তরুণ হবু চিকিৎসক, তাঁর বাবা-মা ও বন্ধুরা।

কলকাতায় ফিরে ‘টাটা ক‌্যান্সার রির্সাচ সেন্টার’-এ ফের কেমোথেরাপি শুরু হল। শৌভিকের কথায়, ‘‘আমার আগে ছ’জনকে এই কেমো দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে চারজনই মারা যান। তাই ছ’টি কেমো সম্পূর্ণ। শুয়ে আছি। হঠাৎ এক সিনিয়র ডাক্তারবাবু হাজির। সঙ্গে অন্তত একদল সহকারী। তাঁরা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলেন। শুনলাম তাঁরা বলছেন, একটা মিরাকল হয়ে গিয়েছে। আমি জিতে গিয়েছি। হজকিন লিম্ফোমার চিহ্ন নেই আমার শরীরে।’’

কৃষ্ণাদেবীর কথায়, ‘‘বেশ মনে আছে কথা বলার সময় ডাক্তারবাবুদের চোখ জলে ভরে গিয়েছিল।’’এখন রোজ নিয়ম করে ফিজিওথেরাপি করতে হয় শৌভিককে। ছবি আঁকা হবি। বাড়ি ফিরে এমডি প্রবেশিকার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘এখনই ঘুরে ঘুরে রোগী দেখতে পারছি না। তবে একদিন ঠিক পারব।’’

সৌজন্যে সংবাদ প্রতিদিন

 

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়