ডেস্ক

Published:
2022-09-07 19:00:04 BdST

'৪০০ কোটি ডলার বাইরে চলে যায়': স্বাস্থ্য খাতের লজ্জা অস্বস্তি উদ্বেগ সমাধানে কিছু কথা


অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেল

 

 

অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেল

___________________

এদেশের রোগীদের ব্যাপক সংখ্যায় বিদেশ গমনের বিষয় নিয়ে পত্র পত্রিকায় প্রায়ই সংবাদ- মন্তব্য প্রকাশিত হয়। এরকম কথা প্রায়ই শোনা যায় যে, সামর্থ্য
থাকলেই রোগীরা চিকিৎসা নিতে দেশ ফেলে বিদেশে যায় । আমাদের দেশে চিকিৎসা মান সম্পন্ন নয়, চিকিৎসকদের আচরন প্রত্যাশিত পর্যায়ের নয়, ভুল ডায়াগনোসিস, বিদেশের চিকিৎসা দেশের চাইতে বেশি ব্যয়বহুল নয়। আলোচনার প্রসঙ্গ আর অভিযোগগুলোর ধরণ মোটাদাগে এরকমই।

আর বিষয়টির তাৎপর্য আর গভীরতা উপলব্ধি করে
আমি
একজন শিক্ষক,
প্রশিক্ষক,
বিশেষজ্ঞ হিসেবে এবং
সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করার সূত্রে
প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকে
এ বিষয়ে কিছু বলার সুযোগ নিতে চাই।
শুধুমাত্র চিকিৎসকদের প্রতি আস্থাহীনতা কিংবা তাদের অদক্ষতা অথবা রোগ নির্ণয়ে সময়ক্ষেপণ, এগুলোকেই যদি আমরা এই
প্রবণতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলি তাহলে
বিষয়টির গভীরতা অনেকটাই ম্লান হয়ে যাবে।
আসলে সমস্যার গভীরতা
তার চাইতেও অনেক বেশি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য নিয়ে কোন সংশয় নেই, ভারতের হাসপাতালগুলোর ৪০-৪৫% রোগীই বাংলাদেশের, বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার বাইরে চলে যায় এ বাবদ, এই পরিসংখ্যান যতটা সত্যি, ততটাই উদ্বেগ- অস্বস্তি আর লজ্জার।
আর এর সমাধানে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বা মন্ত্রণালয়ের কাছে কোনো অলৌকিক চিকিৎসা কিংবা জাদুকরী ব্যবস্থা আছে যেটা দিয়ে এটার রাতারাতি সমাধান করে ফেলা যাবে সেটা ভাবাটা সংগত হবে না।
আমাদের দেশের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থায় স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের অব্যবস্থাপনা দূরীকরণে
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের করণীয়
নির্ধারণের অনভিজ্ঞতা
, রোগী বান্ধব হবার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গি,
চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বস্তরে
সর্বগ্রাসী রাজনীতিকরণ,
সুবিধাবাদী গোষ্ঠী চিন্তা, রোগীর সংখ্যা আর
প্রয়োজনের তুলনায় দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা,
সকল বিশেষায়িত বিষয়ে দেশের অগ্রাধিকার,
গুরুত্ব ও সত্যিকার প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি করবার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কর্ম পরিকল্পনার অভাব।
আমাদের কর্ম পরিমণ্ডলে বিদ্যমান রোগ এবং সে রোগের চিকিৎসায় যথাযথ এবং লাগসই ব্যবস্থাপনা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণার ক্ষেত্রে নিদারুণ অনীহা এবং অব্যবস্থাপনা,
একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিদ্যমান
একাধিক ডিগ্রী সমন্বয়
সাধনের ব্যর্থতা, তাছাড়া
বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের একটি বিশ্বব্যাপী স্বাভাবিক প্রবণতা,
নীতি ও নৈতিক অবক্ষয় যা চিকিৎসক এবং সেবা গ্রহীতা উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য।
সঠিক রোগ নির্ণয় জন্য অত্যাধুনিক মানসম্পন্ন বিপুলসংখ্যক ল্যাবরেটরি এবং ডায়াগনস্টিক সুবিধার অপ্রতুলতা।
শুধুমাত্র দক্ষ চিকিৎসক নয় একটি দক্ষ হাসপাতাল ব্যবস্থাপক বিশেষজ্ঞ দলও তৈরি করা যে প্রয়োজন এই উপলব্ধির অভাব। বিশ্বব্যাপী নিয়ত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সাথে পরিচিত আর প্রশিক্ষিত হবার সূযোগের সীমাবদ্ধতা। এসব বিষয় বাদ রেখে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া দুরূহ হবে।
আরো প্রয়োজন
সংবাদমাধ্যম ও সুশীল সমাজের ইতিবাচক সহযোগিতা, যারা চিকিৎসকদের দীপ্তিমান সফলতার কথা সবার সামনে আনতে পারেন, পারেন নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনে সহায়তা করতে।
আমরা কয়জন জানি প্রসূতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার এর অবদানের কথা?
যারা সামান্য আবিষ্কার
প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণে
মৃত্যুপথযাত্রী লক্ষ লক্ষ মায়ের জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে সারা বিশ্ব ব্যাপি।
আমরা কি জানি স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত অধ্যাপক কামরুল ইসলামের কথা?
যিনি স্বল্পতম মূল্যে সহস্রাধিক কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করেছেন সফলতার সাথে।
আমরা কি নিশ্চিত যে আমরা কোন অসম তুলনা করছি না?
বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের সাথে বিদেশের কর্পোরেট হাসপাতালের সেবার মান তুলনা করা সম্ভবত ঠিক হবে না।
প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদও অপারেশন পরবর্তী জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেছেন আমেরিকাতে,
অস্ত্রোপচারের জটিলতায় সিঙ্গাপুরের নামী হাসপাতালেও মৃত্যুবরণ করেছেন একাধিক জন,
ভারতের কথা তো বাদই দিলাম।
শুধুমাত্র বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামো নির্মাণ করে চিকিৎসা প্রার্থীদের বিদেশ গমনের প্রবণতা কমানো যাবে না।
আর এই স্বল্প পরিসরে
মাত্র কয়েক ছত্র লিখে
এত বড় সমস্যার গভীরতাকে গুরুত্বহীন করতে চাই না। সবার আগ্রহ থাকলে আগামীতে এটা নিয়ে বিশদ বলা যাবে। আজ শুধু বিশেষায়িত সেবার বিষয়ে কয়েকটি কথা আর কিছু সমাধান না হওয়া প্রশ্ন রেখে শেষ করতে চাই। জানা ভালো, আমদের দেশে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে ল্যাপারস্কপি সার্জারীর ব্যাপক প্রসার ঘটেছে সত্যি কিন্তু দেশে সরকারিভাবে এবিষয়ে কোন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা সনদ প্রদানের ব্যবস্থা নেই, তারা প্রশিক্ষিত হয়েছন নিজ চেষ্টা, আগ্রহ আর দায়িত্বে। দেশের মেডিক্যাল ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অনেক স্নাতকোত্তর কোর্স রয়েছে যার অনেকগুলো চলছে প্রয়োজনীয় শিক্ষক ছাড়াই। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিদ্যায় রয়েছেন সর্বোচ্চ সংখক বিশেষজ্ঞ যাদের রয়েছে কমপক্ষে চার ধরনের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আর এঁরাই সবচেয়ে বেশি পদোন্নতি বঞ্চিত। দেশের কোন হাসপাতালে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের ব্যবস্থা নেই। দেশে দুই তিনটি হাসপাতাল ছাড়া কোথাও নিয়মিত কিডনী ট্রান্সপ্লান্ট হয় না। সতের- আঠারো কোটি মানুষের দেশে ক্যানসার চিকিৎসায় অপরিহার্য রেডিওথেরাপি সেন্টার নেই দশটির বেশি সরকারি বেসরকারি সব হাসপাতাল মিলিয়ে, দেশে রোবোটিক সার্জারী হওয়া দূরে থাক বাংলাদেশের অধিকাংশ চিকিৎসক রোবট দেখেনই নি। দেশের কোন হাসপাতালে জেনেটিক বা বায়োমলিকুলার ল্যাব নেই। সাধারণের বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট হয় একটি মাত্র জায়গায়। তালিকা লম্বা করতে চাই না। দেশে হাতে গোনা হাসপাতালে রয়েছে আইসিইউ সুবিধা। জেলা হাসপাতাল দূরে থাকুক সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও নেই হার্টে রিং

পরানোর ব্যবস্থা, কিডনি ডায়ালাইসিসের কোন সুবিধা নেই জেলা হাসপাতালে। বিগত করোনা কালে হাজার হাজার ভেন্টিলেটর কেনা হয়েছে, স্থাপিত হয়েছে অগনিত অক্সিজেন প্লান্ট, সেগুলোর কি অবস্থা এখন, কজন মানুষ সেবা পেয়েছে ওগুলো দিয়ে? কতজন আইসিইউ বা ক্রিটিকাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ তৈরী করেছি আমরা গত করোনাকালে। আল্লাহ না করুন তেমন দূর্যোগ আবার এলে ঐ ভেন্টিলেটরগুলো ব্যবহার করার লোক পাওয়া যাবে তো? অথচ দেশে প্রতিবছর প্রায় দশ হাজার নবীন চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে। জনমনে একটা প্রতিষ্ঠিত ধারনা হোল আমরা যন্ত্রপাতি কিনতে যতটা আগ্রহী,সেবা বা প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে ততটা নই।

কয়েকটি প্রশ্ন রেখে এই পর্ব শেষ করি। দেশের প্রায় দেড়শ মেডিকেল কলেজগুলোয় এনাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, প্যাথলজি, ফার্মাকলজি পড়ানোর পর্যাপ্ত শিক্ষক আছেন কি? না থাকলে কেন নেই আর স্নাতক পর্যায়ে দূর্বলতা রেখে আমরা মান সম্পন্ন পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ তৈরী করে ফলবো বিষয়টি কি এত সহজ?
আশাবাদী হতে চাই, বিগত করোনা কালে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞায় গরীব ধনী কেউই তো বিদেশে যেতে পারেন নি চিকিৎসার জন্য, তখন কি দেশে মড়ক লেগেছিল? তাদের চিকিৎসা তো এদেশের চিকিৎসকরাই দিয়েছেন।

তবে এটা অস্বীকার করার সূযোগ নেই যে, বর্তমানে চিকিৎসকদের আচরণ , নৈতিকতা, সততা ইত্যাদি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে। মহান পেশা বিবেচনায় চিকিৎসকদের কাছে মানুষের বাড়তি প্রত্যাশা থাকতেই পারে আর চিকিৎসকরা সমাজে বিচ্ছিন্ন কেউ নন, শুধু মাত্র এই যুক্তিতে অনৈতিকতার গড্ডালিকায় গা ভাসাবেন সেটাও যুক্তি হতে পারে না। চিকিৎসক নিজেও একজন রোগীর সন্তান আবার একজন রোগীও চিকিৎসকেরই বাবা মা, ফলে পরস্পরের আস্থা আর বিশ্বাসের জায়গার ক্ষত আমাদেরই নিরাময় করতে হবে।

মাঝে মাঝেই সোসাল মিডিয়ার দৌলতে বিদেশে বাংলাদেশী চিকিৎসকদের মিলনমেলার খবর পাই । অনেকেই তাঁদের সংখ্যা দেখে আপ্লূত হন আমি হতে পারি না। ভাবি এই বাংলাদেশী চিকিৎসকরা প্রথম বিশ্বের মানুষের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে দক্ষতায় অথচ দেশে সুবিধা বন্চিত মানুষ, এমনকি তাদের প্রিয়জনেরাও এই সুবিধা বন্চিত। এর কারনগুলো কি কখনো জানতে চেয়েছি আমরা? হয়তো এটাই পৃথিবীর নিয়ম এমন সাদামাটা উত্তরে আমি তৃপ্ত হতে চাই না।
আর নিয়মটা তখনই আমার দেশের জন্য চিকিৎসা বান্ধব হবে যখন আমরা সমস্যার গভীরতা বুঝবো আর সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবো সময় ক্ষেপণ না করে। আমার মত সাধারণ কেউ একজন তো শুধু একথাগুলো বলতেই পারে আর প্রত্যয়ী হয়ে জানাতে পারে সেই পরিবর্তন যদি সূচিত হয় তবে সে পথযাত্রায় নিজেকে সামিল করবো সর্বস্ব দিয়ে।

_________________________
অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেল
অধ্যাপক (সার্জারী), টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ, বগুড়া
প্রাক্তন অধ্যক্ষ
শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, বগুড়া এবং দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ, দিনাজপুর; এবং
সাবেক সভাপতি, সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশ।

 

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়