Desk

Published:
2022-06-25 13:40:22 BdST

পদ্মা সেতু নিয়ে চিকিৎসকদের মর্মছোঁয়া কিছু লেখা:"সেদিন নারী হয়ে জন্ম নেয়াকে নিজের সবচেয়ে বড়ো অসহায়ত্ব মনে হচ্ছিল!"


ছবিটি এঁকেছেন চিত্রশিল্পী Mamun Hossain

 

ডেস্ক
_______________________

স্বপ্নের পদ্মা সেতু । বাংলাদেশকে এক সুতোয় বাঁধলো পদ্মা সেতু। অসংখ্য মানুষের ভালবাসা এই পদ্মা সেতু ।
ডা. সুস্মিতা জাফর লিখেছেন অসাধারণ লেখা অনন্য আবেগে ।
তিনি লিখেছেন সবিস্তারে ।
"
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ, পদ্মা সেতু এবং আমি...
ঘটনাঃ১
রাত সাড়ে আটটা। বরাবরের মতোই দৌলতদিয়া ঘাটে বিশাল জ্যাম। সেই জ্যামের হাত থেকে মুক্তির জন্য 'আনন্দ' বাস ড্রাইভার বাস ঘুরিয়ে এ ঘাট থেকে ওই ঘাটের রুট পাল্টাচ্ছিলেন বার বার। কিন্তু বিধি বাম। কোনো ঘাটে যেয়েই জ্যাম থেকে নিস্তার মিলছিল না। টানা তিন ঘন্টা জ্যামে বসে থাকার পর আমি আর পারলাম না। যেভাবেই হোক প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হবে! ফেরী ঘাট কাছে থাকলেও কথা ছিল, কোনো একটা ফেরীতে উঠে কাজ সারা যেত। কিন্তু এখন এই মাঝ ঘাটে এই রাতের বেলা পাবলিক টয়লেট কোথায় পাব? ফেরী কত দূর... কখন আসবে, কেউ জানে না। হায় হায়, এখন কী হবে!
সেদিন নারী হয়ে জন্ম নেয়াকে নিজের সবচেয়ে বড়ো অসহায়ত্ব মনে হচ্ছিল! কই বাসের কোনো পুরুষকে তো একবারও ভাবতে হলো না, এই অবস্থায় তার কী করতে হবে? তারা বাস থেকে নামছে, হালকা হয়ে ফিরে আসছে। রীতিমতো কান্না পাচ্ছিল আমার। অবশেষে কয়েকজন সহপাঠীর সহায়তায় ঘাট সংলগ্ন এক বাড়িতে যেয়ে তাদের ঘুম ভাঙিয়ে, তবেই রক্ষা!
ঘটনাঃ ২
মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহ, ২০০৯। ফিজিওলজি থার্ড টার্ম পরীক্ষায় ফেল করে মহিদুর স্যারের কাছে এক সপ্তাহ সময় পেলাম, ফার্স্ট এবং থার্ড টার্ম দুটো পরীক্ষা একইদিনে ক্লিয়ার করার জন্য। এই এক সপ্তাহ পর যদি আমি দুটো টার্মেই পাশ না করতে পারি, তাহলে MBBS First Professional exam এ এটেন্ড করার যোগ্য বলে বিবেচিত হব না। রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছিল ওই সাতটা দিন আমার জন্য। খেয়ে, না খেয়ে, ঘুমিয়ে, না ঘুমিয়ে ফিজিওলজি বই পড়ে শেষ করলাম।
সাতদিন পর সকাল থেকেই চলছিল তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। পরীক্ষায় যখন দুদ্দাড় উত্তর দিলাম, তখন স্যার অবাক হয়ে বললেন, "এটা কীভাবে সম্ভব?"
সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে আমি আর এক মুহূর্ত মেডিকেল কলেজে দাঁড়ালাম না। প্রফে বসতে পারার খুশি আর প্রচন্ড স্ট্রেসের পরে মুক্তির আনন্দে মামুনের সাথে ঢাকার বাসে চেপে চলে এলাম ঘাটে। ঘাটে জ্যাম নেই, কী মজা! নাহ, মজা বেশিক্ষণ সইল না কপালে যখন শুনলাম, বৈরী আবহাওয়ায় সমস্ত লঞ্চ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে আজকের মতো!
মামুন ফরিদপুর ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিলো। কিন্তু আমার মন মানলো না। এক মাস পর ফার্স্ট প্রফ, তাই কাঁধের ব্যাগে আর হাতে এনাটমি বই নিয়ে ঘাড় ত্যাড়া আমি শক্ত হয়ে একদম নদীর পাড়ে এসে ঘাটে ফেরী লাগার স্টিলের স্টেজে দাঁড়িয়ে; চুপচাপ বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলাম! প্রমত্ত পদ্মার ঢেঊ আঘাত হানছিল ঠিক আমাদের পায়ের নিচের স্টেজটাতে!
আমি নড়লাম না, সরলামও না! লঞ্চ বন্ধ হয়েছে, ফেরী তো হয়নি! আমি বাস ছাড়া ফেরীতেই ঢাকা যাব!
অবশেষে আমার জেদের কাছে হার মেনে ওই প্রথম গাড়ি কিংবা বাস ছাড়াই আমরা পদ্মা পাড়ি দিলাম ফেরীতে। মাঝ নদীতে ঢেউয়ের ধাক্কায় ফেরী একবার এই কাত হয় তো আরেকবার ওই কাত! খরস্রোতা পদ্মায় ফেরী সবচেয়ে নিরাপদ বাহন---- এটাই জানতাম৷ ফেরীর এমন ঝাঁকুনি বা দুলুনি-- এর আগে কোনোদিনও টের পাইনি। জীবনটা হাতে করে সেদিন দুপুরে নদী পার হয়েছিলাম আমরা।
ঘটনাঃ৩
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ এ ভর্তি হওয়ার পর, বাসা থেকে পই পই করে বারণ করে দেওয়া হতো যেন লঞ্চের বাসে টিকেট না কাটি। প্রথম প্রথম ফেরীতে এলেও বছর দুয়েক পর এই ফেরী ঘাটের জ্যাম আর সহ্য হচ্ছিল না। ঢাকায় ফেরার পথে তাই আব্বু-আম্মুকে না জানিয়েই লঞ্চের বাসে রওনা হতাম। এমনই একদিন মাঝ নদীতে লঞ্চ আসতেই টের পেলাম, ঠিক আমাদের মাথার উপর থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। হুট করেই এক একটা ঢেউ যেন প্রকাণ্ড হয়ে ধরা দিল চোখের সামনে! মানুষজন হাউমাউ করে দোয়া পড়তে শুরু করল। ছিটে ছিটে পানি এসে শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছিল যাত্রীদের৷ পাশে তাকিয়ে দেখি আতংকিত দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে মামুন।
"লঞ্চ কি ডুবে যাচ্ছে?"
আমার উৎকন্ঠিত চোখের দিকে তাকিয়ে কাষ্ঠ হেসে মামুন বলে উঠল, "কই না তো! লঞ্চে তো আমি নিয়মিত যাই। এরকম প্রায়ই হয়। ব্যাপার না!"
কিন্তু ওর কথায় তেমন জোর খুঁজে পেলাম না। ভেতরে ভেতরে ঠিকই বুঝতে পারছিলাম, পদ্মা নদীতে ডুবেই বুঝি এ যাত্রায় জীবন শেষ করতে হবে! ওই সময় বড়ো বড়ো ঝাপ্টা এসে লঞ্চের ডেক প্রায় অর্ধেক ডুবিয়ে দিলো! এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, যে আমি টিউবগুলোর সামনে যেয়ে ওগুলো ধরে টানাটানি শুরু করে দিলাম! মনে মনে কানে ধরলাম, এবার বেঁচে ফিরলে এই পদ্মার বুকে আর লঞ্চে কখনো চাপব না!
জানি না, সেদিন কীভাবে আমরা পাটুরিয়া ঘাটে এসে পৌঁছেছিলাম৷ তবে এটুকু জানি, এখনো বেঁচে আছি; তানাহলে তো আজ এই পোস্ট লিখতেই পারতাম না।
ছবিটি এঁকেছেন চিত্রশিল্পী Mamun Hossain ভাই।
আজকে ২৫ জুন, ২০২২.... বাংলাদেশের আশ্চর্যজনক সৃষ্টির উদবোধন হতে যাচ্ছে.... পৃথিবীর অষ্টমাশ্চর্য বললেও হয়তো কম বলা হয়ে যাবে! কয়েক বছর আগে যা ছিল অবাস্তব,,,, যা ছিল অসম্ভব..... যা ছিল কল্পনারও বাইরে.... সেটাকেই বাস্তব এবং সম্ভব করে তোলা হয়েছে! ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ, সাক্ষী হতে যাচ্ছি আমিও! যতবার পদ্মা সেতুর ছবিটি দেখছি, ততবার কত না বলা ঘটনার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে.... চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে....হৃদপিন্ডের মাঝে একটা চিন চিন ব্যথা করে উঠছে!
#sushmita_zafar
Faridpur Medical College 2007-08
NIPSOM 2017-18


"
রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা গুলজার হোসেন উজ্জ্বল লিখেছেন, "

প্রমত্তা পদ্মার বুকে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের ঐতিহাসিক ও শুভ মুহূর্তে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সাথে দেশের শান্তিকামী জনগণ একই সুত্রে জড়িয়ে গেলো।
এই স্বর্ণালী অধ্যায়কে স্মরণীয় করে রাখার অভিপ্রায়ে জেমস অফ নজরুল এর শিল্পীবৃন্দ- দেশের প্রথিতযশা শিল্পী ও নবীনদের নিয়ে শত শিল্পীর একটি মিউজিক ভিডিও "এই আমাদের বাংলাদেশ"।
অসাম্প্রদায়িকতার কবি, জাতীয় কবি, কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর গানে দিয়েছেন আমাদের সংস্কৃতিতে পূর্ণতা, যা সবার থেকে আলাদা।
দেশের তরুণ প্রজন্মকে তার ঐতিহ্য আর ইতিহাস এর সাথে যুক্ত থাকার মন্ত্রে নিবেদন করছি এই দেশাত্মবোধক গান দুটি।

 


নজরুল সংগীত
"এই আমাদের বাংলাদেশ "
রচিত ১৯২৭।
"দুর্গম গিরি কান্তার মরু"
রচিত ১৯২৬ ।
পরিবেশনায়-
জেমস অফ নজরুল
পরিচালনা ও পরিকল্পনা - সাদিয়া আফরিন মল্লিক
সঙ্গীতায়োজনে - ইবরার টিপু
নৃত্য পরিচালনা - ওয়ার্দা রিহাব
 

Youtube: https://www.youtube.com/watch?v=7JyHJG3N8VU


২.মানুষ বিয়ে হবার পর এক্স কে মিস করে। দালান বাড়ির মালিক হলে মিস করে সাবেক আমলের মাটির ঘরের নিকানো বারান্দা আর সাদামাটা বৈঠকঘর। পদ্মা সেতু হয়ে গেলে মিস করে ফেরি থেকে দেখা প্রমত্তা পদ্মার রূপ। উন্নয়ন হলে মিস করে পেছনের ফেলে আসা শান্ত, সাধারণ জীবন।
তাই উন্নয়ন নিয়ে বিরক্ত হয় যারা আমি তাদের উন্নয়ন বিরোধি বলিনা। তারাও এই মানবসমাজের বৈচিত্রময়তার অংশ। প্যারাডক্সিক্যাল বিউটি।"

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়