Dr. Azad Hasan

Published:
2022-04-23 09:57:09 BdST

ক্যাডার সার্ভিসে বৈষম্য এবং ব্রেইন ড্রেন


ডা. আজাদ হাসান

 



ডা. আজাদ হাসান
_________________

আমরা এতদিন আমাদের দেশ হতে বিদেশে মেধাবী ছাত্রদের বিদেশগামীতার মধ্য দিয়ে "ব্রেইন ড্রেন" লক্ষ্য করেছি কিন্তু আন্তঃ ক্যাডার বৈষম্যের কারণে যে আমাদের দেশের সব চেয়ে মেধাবী ছাত্রদের জন্য নির্ধারিত টেকনিক্যাল ক্যাডার অর্থাৎ চিকিৎসকদের জন্য নির্ধারিত "স্বাস্থ্য ক্যাডার", আর প্রকৌশলীদের জন্য বিভিন্ন "ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যাডার" ছেড়ে নতুন প্রজন্মের ডায়নামিক সদ্য পাশ করা চিকিৎসক এবং প্রকৌশলীরা এখন "প্রশাসনিক ক্যাডারের" দিকে ঝুকছেন। এটা আন্তঃক্যাডার বৈষম্যের প্রতি নীরব প্রতিবাদ। আর এর ফলশ্রুতিতে দেশ হারাচ্ছে প্রতিভাবান ও প্রতিশ্রুতিশীল নবীন চিকিৎসক এবং প্রকৌশলী। আর এভাবেই বিদেশগামীতার পরে টেকনিক্যাল ক্যাডার হতে নিঃশব্দে চলেছে দ্বিতীয় পর্যারের "ব্রেন ড্রেইন"।

প্রত্যাশা আর প্রাপ্তি এর মাঝে দূরত্ব যত বেশী হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাঝেও হাতাশা ততটাই বেশী হবে। অর্থাৎ প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মাঝে দূরত্ব ব্যক্তিগত ভাবে মানুষের হতাশার সাথে সমানুপাতিক।

সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গিয়েছে স্বাস্থ্য ক্যাডারের তুলনায় অন্য ক্যাডারের প্রভাব, প্রতিপত্তি, আর্থিক সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা সব কিছুই বেশী। পক্ষান্তরে, স্বাস্থ্য খাতে দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে তরুণ চিকিৎসকরা সমাজে আগের মতো সম্মান পাচ্ছেন না, বরং দিবা-নিশি কর্মস্থলে সার্ভিস দিয়েও নানান নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে ছোট বেলা হতে যে আদর্শ এবং নীতিবোধ ধারণ করে চিকিৎসা পেশার ব্রত নিয়ে যাত্রা করেছিলেন তা দ্বিধাগ্রস্ত হয়। উপযুক্ত মূল্যায়নের অভাবে তাই আবার তাদেরকে ভাবতে হচ্ছে। জীবনকে নতুন ভাবে সাজাতে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে।

ছোট বেলা থেকেই প্রতিটি মানুষের স্বপ্ন থাকে বড় হয়ে সে চিকিৎসক কিংবা ইঞ্জিনীয়ার হবে। এসব পেশাকে তখন একদিকে সম্মানী পেশা এবং সেই সাথে অর্থনৈতি -ক ভাবে নিরাপদ পেশা হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হতো। আর সেই লক্ষ্যকে বুকে ধারণ করে প্রতিটি স্টুডেন্ট তার স্কুল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে কঠিন এবং কঠোর নিয়ম মেনে পড়াশুনা, অধ্যাবসায় এবং অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে তিলে তিলে গড়ে তুলেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা যখন হেসে খেলে গল্প আর আড্ডার মধ্য দিয়ে ইউনিভার্সিটির জীবনকে উপভোগ করে। ঠিক তখন একজন মেডিক্যা -ল স্টুডেন্টকে তাঁর লেসন্ শিক্ষার জন্য, আইটেম পরী -ক্ষার জন্য, কার্ড ফাইনাল, ওয়ার্ড ফাইনাল, প্রফেশনাল এক্জাম, রিটেন, ভাইবা, বেড সাইড প্রাকটিক্যাল এক্জাম এগুলোর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হয় এবং এই সব বৈতরণী সাফল্যের সাথে নির্দিষ্ট স্কোর (যা ভার্সিটির গড় পাশ নম্বরের চেয়ে প্রায় ডাবল) অর্জন সাপেক্ষে অর্জন করতে হয়।

আর তাই কর্ম জীবনে এই পরিশ্রমের বিনিময়ে অর্জিত সার্টিফিকেট এবং অভিজ্ঞতার আলোকে সমাজ এবং দেশের কাছে প্রতিদান হিসেবে প্রাপ্তির প্রত্যাশাও বেশী।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাস্তব ক্ষেত্রে চিকিৎসক - দের জন্য কর্ম পরিবেশ, কর্মস্থলের নিরাপত্তা, অর্থনৈতি - ক এবং সামাজিক নিরাপত্তার ভীষণ অভাব পরিলক্ষি -ত হচ্ছে। যা বর্তমান প্রজন্মের তরুন চিকিৎসক সমাজ -কে দারুন ভাবে আশাহত করছে। আর এরই ফলশ্রুতি -তে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক সংখ্যক চিকিৎসক স্বাস্থ্য ক্যাডারের পরিবর্তে ক্যাডার পরিবর্তন করে প্রশাসন ক্যাডারের দিকে ঝুঁকছেন। এভাবে যদি চিকিৎসকরা ক্যাডার পরিবর্তন করতে থাকেন তা হলে স্বাস্থ্য ক্যাডার মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। তাই এ ক্ষেত্রে বিরাজমান অব্যব- স্থাপনা, সমস্যা, প্রতিবন্ধকতা সমূহ আশু চিহ্নিত করতঃ সমস্যা সমুহের আশু সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। চিকিৎসা পেশাকে চিকিৎসকদের কাছে আকর্ষণীয় করতে স্বাস্থ্য খাতে দ্রুত সংস্কার করতে হবে।

যারা মেধাবী তারাই আমাদের দেশে সাধারণত মেডি - ক্যাল কলেজ কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া - শুনা করে থাকেন। সবার প্রত্যাশা থাকে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী কমপ্লিট করে একটি সৎ এবং সম্ভাবনাময় সেক্টর -এ জয়েন করার এবং দেশের উন্নয়নে আন্তরিকতার সাথে কাজ করার।

কিন্তু বাস্তবতা হলো~
কর্মক্ষেত্রে সুষ্ঠু কর্ম পরিবেশের অভাব।
কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত পদোন্নতি না পাওয়া,
পদোন্নতিতে দীর্ঘ সূত্রিতার কারণ সমসাময়িক অন্য ক্যাডারের সহকর্মীদের থেকে পিছিয়ে পড়া।
উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে ক্যাডার সার্ভিসে জয়েনকৃত জুনিয়র ইউএনও এবং ডিসি (ডেপুটি কমিশনার) এর সমন্বয় সভায় ঠুটোঁ জগন্নাথ হিসেবে হাজিরা দিতে হয়।
কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকরা অনিরাপদ এবং অরক্ষিত।
কৃত্যপেশা ভিত্তিক মন্ত্রণালয়ের দাবী চিকিৎসকরা অনেক আগের থেকে দাবী করে আসলেও সেই দাবীটি আজো আলোর মুখ দেখে নাই।

প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির পার্থক্য যখন একজন মেধাবী, উদ্যোমী এবং কর্ম চাঞ্চল্যে ভরপুর একজন তরুণকে আশাহত করে, সে যখন সামনে আশা জাগানিয়া কোন পথ দেখতে পায় না, তখন তাঁর মাঝে হতাশা জন্ম নেয়। আর এই হতাশা থেকে টেকনিক্যাল ক্যাডার ছেড়ে প্রশা - সনের দিকে ঝুকছে প্রতিভাবান, উচ্চাভিলাষী প্রতুশ্রু - তিশীল নতুন প্রজন্মের তরুণ চিকিৎসকরা।

যারা স্বাস্থ্য ক্যাডার ছেড়ে অন্য ক্যাডারে যাচ্ছেন তাঁরা কেন যাচ্ছেন তার কারণ অনুসন্ধান করুন, সমস্যার সমাধানের উপায় খুঁজে দেখুন এবং সমাধানের পথ খুঁজে বের করুন। নচেৎ এদেশের স্বাস্থ্যসেবা একদিন অপেক্ষাকৃত কম মেধাহীন যারা তাদের দখলে চলে যাবে। আর আমার আপনার মতো যাদের বাংলাদেশের বাহিরে যেয়ে চিকিৎসা করার সামর্থ্য নেই তাদেরকে ঐ সব "মধ্যম মেধার ট্যালেন্ট"দের হাতে নিজেদের চিকিৎ - সার ভার সপে দিতে হবে।

সুতরাং সময় থাকতে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান কল্পে এখানে আমি কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করছিঃ
কৃত্য পেশা ভিত্তিক মন্ত্রণালয় চালুর ব্যবস্থা করতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসনিক পদে অচিকিৎসকদের এন্ট্রি বা পদায়ন বন্ধ করতে হবে।
এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর এবং তদূর্ধ পদে লেটারাল এন্ট্রি অনতি বিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
চিকিৎসকদের পদ আপগ্রেডেশন করতে হবে।
নিয়মিত প্রমোশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
দলীয় বিবেচনায় নয় বরং যোগ্যতার মাপকাঠিতে একজন চিকিৎসককে মূল্যায়ন করতে হবে।
৩০ টি মন্ত্রণালয়ে এডিশনাল সেক্রেটারী, সেক্রেটারী এবং সিনিয়ার সেক্রেটারীর পদগুলোতে ৯০ জন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন বিভাগের আরো অন্ততঃ ৩০ জন সচিব পদ মর্যাদার কর্মকর্তা ১ম গ্রেডের পদ হিসেবে থাকলেও স্বাস্থ্য ক্যাডারে একমাত্র ডিজি এবং সম্প্রতি ডিজি মেডিক্যাল এডুকেশন এর পদ দু'টি কেবল মাত্র গ্রেড-১ পোস্ট।
এই অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসররা যদি গ্রেড -১ হতে পারেন, তাহলে মেডিক্যাল কলেজের পোস্ট-গ্রাজুয়েট কোর্সে পাঠদানে সক্ষম শিক্ষকদেরও বেতন স্কেল গ্রেড-১ হওয়া উচিৎ। এবং সেই অনুযারী সবার পদ আপগ্রেডেশন করতে হবে।
চিকিৎসকদের জন্য কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য স্বতন্ত্র " হাসপাতাল নিরাপত্তা পুলিশ" ইউনিট নিয়োগ দিতে হবে।
বেসরকারি ক্লিনিকের মান নিয়ন্ত্রণে,অবৈধ ফার্মেসী নিয়ন্ত্রণে, ভূয়া চিকিৎসক নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রশা - সনকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

৫ম গ্রেড হতে এর উপরের পদের চিকিৎসকদেরকে প্রশাসনিক ক্যাডারের ন্যায় ভেহিক্যালস সুবিধা অর্থাৎ "কার লোন" এবং "ড্রাইভারসহ" "কার মেইনটেইনেন্স এলাউন্সের" সুবিধা দিতে হবে।
মেডিক্যাল ম্যালপ্রাকটিস / প্রফেশনাল মিসকন্ডাক্ট এবং ক্রিমিনাল অফেন্স এই দুইয়ের মাঝে পার্থক্য সুনির্দিষ্ট ভাবে সঙ্গাইত করতে হবে।
মেডিকো-লিগ্যাল কেস সমূহ মেডিক্যাল জুরি বোর্ডের মাধ্যমে নিস্পত্তি করতে হবে।

ডা. আজাদ হাসান
SOMC -21

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়