SAHA ANTAR

Published:
2022-01-13 13:05:15 BdST

হেলথ সার্ভিসের মূল দুই ভিত্তি বাংলাদেশে অনুপস্থিত: জেনারেল প্রাকটিস ও ইমার্জেন্সী মেডিসিনবাংলাদেশে ‘জেনারেল প্রাকটিস’ নামে কোন স্পেশালিটি নেই: স্পেশালিস্টরা চেম্বারে ৮০ ভাগ সাধারণ রোগীই দেখছেন


 

ডা. তারিক অনি
অস্ট্রেলিয়া থেকে

স্বাস্থ্যকথন:
____________________

আজকের লিখাটা স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা নিয়ে। আমি বিশেষজ্ঞ কেউ নই, কিন্তু এটা প্রমাণিত যে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটার উপরে আমাদের ডাক্তারদের ই ভরসা নেই, সাধারণ মানুষের কথা নাহয় বাদ ই দিলাম। আমি খুবই ছোটখাটো একজন ডাক্তার, জ্ঞান সীমিত, এখন ও শিখছি প্রতিনিয়ত। অস্ট্রেলিয়ায় পাচ বছর কাজ করার আগে আমি বাংলাদেশেও সাড়ে পাচ বছর প্রাকটিস করি। আমার এই স্বল্প ক্যারিয়ারে তার আলোকে আজকের লিখা।

দেখুন, আমি বিশ্বাস করি একটা দেশের স্বাস্হ্যব্যবস্থা দাড়িয়ে থাকে প্রধাণ দু’টো ভিত্তির উপর:

১। জেনারেল প্রাকটিস: যেখানে জনগণ তাদের ফ্যামিলি ডাক্তারের কাছে সবরকম দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে যাবে। 
২। ইমার্জেন্সী সার্ভিস: জনগণ বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে যাবে।

বাংলাদেশে ‘জেনারেল প্রাকটিস’ নামে কোন স্পেশালিটি নেই। স্পেশালিস্টরা তাদের চেম্বারে ৮০ ভাগ সাধারণ রোগী দেখছেন। এতে ক্ষতি দুটো:
১। রোগী সঠিক সেবা পাচ্ছেনা। স্পেশালিস্টের পক্ষে জেনারেল সার্ভিস দেওয়া সম্ভব না। কারণ এটা তার ট্রেনিং না।
২। ৮০ ভাগ সময় জেনারেল প্রাকটিস করতে করতে আমাদের স্পেশালিস্টদের ধার/ পারদর্শীতা কমে যাচ্ছে, তারা দিন দিন ভোঁতা হয়ে যাচ্ছেন। একটু কমপ্লিকিটেড কেস হলেই স্পেশালিস্ট অপিনিয়নের জন্য রোগীকে পার্শ্ববর্তী দেশে ছুটতে হচ্ছে। দেশে আর সেটা ম্যানেজ করা যাচ্ছে না। দেশে যার ই একটু সক্ষমতা আছে সেই বিদেশে ট্রীটমেন্ট করতে ছুটছেন। এইক্ষেত্রে অবশ্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী-রাস্ট্রপতি সবচেয়ে এগিয়ে। তারা কফ থুতু ও সিঙ্গাপুরে পরীক্ষা করান। সে আরেক আলোচনা, আজ তোলা থাকুক।

এবার আসি জরুরী সেবায়। বাংলাদেশে ‘ইমার্জেন্সী মেডিসিন’ সাবজেক্ট টাই নেই। বিসিপিএস/বিএসএমএমইউ বাংলাদেশে বিভিন্নরকম পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিকেল কোর্স চালায়, এ-বি-সি-ডি ডিগ্রী প্রদান করে অথচ প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় অর্ধশতক পেরিয়ে গেলেও ‘ইমার্জেন্সী মেডিসিন’ ডিসিপ্লিন চালু করেনি। অথচ দেশের সব হাসপাতালেই ‘জরুরী বিভাগ’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ‘ইমার্জেন্সী ডিপার্টমেন্ট’ চালু আছে।

আমরা কোনরকম ফরমাল এডুকেশন ছাড়া, পেশাগত ট্রেনিং ছাড়া কিভাবে ইমার্জেন্সী ম্যানেজ করছি ? যে সাবজেক্ট আমি জানি ই না, কোনদিন পড়িনি, বইগুলোর নাম জানিনা, সেই সাবজেক্টের রোগী ইমার্জেন্সী বুকে ব্যথা নিয়ে যখন হাসপাতালে আসে আমরা তখন কিভাবে সেবা দিচ্ছি? এটা এক আশ্চর্য প্রশ্ন! একারণে দেশে সব পয়জনিং রোগী গণহারে স্টমাক ওয়াশ পাচ্ছে, সেপটিক রোগীর ম্যানেজমেন্ট ভয়ংকর, ট্রমা ম্যানেজমেন্ট তো বাদ ই দিলাম!

স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তিটুকু স্থাপন না করে আমরা চিন্তা করি বুর্জ খলিফার মত উচ্চ দালান বানিয়ে ইউরোপ আমেরিকার সাথে প্রেস্টিজ ইস্যুতে টক্কর দিতে! আমরা প্ল্যান করি বোন-ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করবো, লিভার ডায়ালাইসিস ইউনিট করবো, মায়ের পেটের ভিতর বাচ্চার অপারেশন করে ফেলব, এসব হাতিঘোড়া প্ল্যান করি। হাতিঘোড়া নাহয় করলাম, কিন্তু এরপর রোগীটার সারাজীবন ফলোআপ করার জিপি কই ? রোগীটার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেলে রাত দুটায় ইমার্জন্সী স্পেশালিস্ট ই বা কই ? একারণে দেশের সাধারণ চিত্র হল রাত দুটোয় মরনাপন্ন রোগী নিয়ে ‘ওমুক স্যার’ কে খুঁজ ‘তমুক স্যার’ ফোন দাও, এম্বুলেন্সে করে রোগী নিয়ে ঢাকা শহর চষে বেড়াও কোথায় একটু জরুরী সেবাটুকু মেলে, অন্তত প্রাণ টা তো বাচে। হাতে স্যালাইন নিয়ে রোগী চোখ বন্ধ করে এম্বুলেন্সের স্ট্রেচারে পড়ে থাকে, রোগীর লোক দুচোখে সর্ষেফুল আর তারাবাতি দেখে!

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যনীতি হর্তা-কর্তাগণ যে এসব দৈনন্দিন নাটক-সিনেমার কাহিনী জানেন না তা কিন্তু না। আমাদের অধ্যাপকদের নামের পাশে বাহারী বিলাতি- আমেরিকান ডিগ্রী, ব্যাংকক সিংগাপুরে ট্রেনিং। তারা বিদেশ করে এসেছেন। স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কি নেই সেটা তারা খুব ভালো অবগত। নীতিনির্ধারকরা বিদেশ এ ট্রেনিং করে এসেছেন, সার্টিফিকেট নিয়ে এসেছেন। বিজ্ঞজনেরা এসব নিয়ে অনেক গোল টেবিল, লম্বা টেবিল করেছেন, বিদেশি বাবুদের সাথে মিটিং ও জ্যুস-স্যান্ডউইচ ও খেয়ে এসেছেন কিন্তু সাবজেক্ট দুটো আর খুলেননি।

হতাশাকথন শেষ করি গতকাল এর একটি ছোট্ট কথোপকথন দিয়ে। বাংলাদেশ থেকে আমার শ্রদ্ধেয় এক স্যার (যিনি পূর্ণ অধ্যাপক হয়ে রিটায়ার করেছেন) এর সাথে ফোনে কথা হচ্ছিল। স্যার তার ছেলেকে অস্ট্রেলিয়া পাঠাবেন। এখানেই ডাক্তারী পড়াবেন। কথায় কথায় স্যার কে বললাম, “স্যার, আপনারা যে স্বাস্হ্য ব্যবস্থার ব্যাসিকগুলো ঠিক করছেন না, আপনি যখন শেষ বয়সে অসুস্থ হবেন, আমরা আপনার ছাত্ররাই কিন্তু আপনাকে সঠিক সেবা টা করতে পারবো না, কারণ আপনি আমাদের তৈরি করেন নি। আমাদের ইমার্জেন্সী ট্রেনিং দরকার ছিল, সেটা আমাদের দেননি। আপনি আপনার ছাত্রের হাতেই মারা যাবেন।”

স্যার চুপ হয়ে গেলেন, শুধু বললেন, “তারিক, তোমার কথা সত্যি। চল্লিশ বছর ডাক্তারী করে আমি জানি রাত দুটোয় বুকে ব্যথা উঠলে এই জেলা শহরের হাসপাতালের জরুরী বিভাগে আমি যেতে পারবো, একটা ইসিজি হয়তো হবে, কিন্তু এরপরের চিকিতসা টা অন্ধকার ….!! “

পুনশ্চ: বাংলাদেশে ‘জেনারেল প্রাকটিস’ কে স্বীকৃতি না দেওয়া এবং ‘ইমার্জেন্সী মেডিসিন’ ডিসিপ্লিন চালু না হওয়ার পিছনে একমাত্র কারণ বাংলাদেশের একশ্রেণির অধ্যাপকদের ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি। তারা চান না এই দুটো ডিসিপ্লিন তৈরি হয়ে তার চেম্বারের রোগী আশংকাজনক হারে কমে যাক। সবাইকে শুভরাত্রি। #

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়