Ameen Qudir

Published:
2019-10-11 13:56:45 BdST

"এক ফোনে বিরিয়ানি আসে, কিন্তু ডাক্তার আসেন না" :আনন্দ বাজারের লেখার জবাব দিলেন ডা. সিদ্ধার্থ


 

ডা. সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

__________________________________________-

 

নির্ভরযোগ্য বিজ্ঞাপনী পরিসংখ্যানানুসারে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গদেশের এক নম্বর সংবাদপত্রে - যে কাগজের প্রকাশক গোষ্ঠী আবার তামাম বঙ্গসংস্কৃতির ঠিকাদার - একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জনৈকা অন্তরা চৌধুরী হাহুতাশ করেছেন - "অগ্নীশ্বররা কোথায় গেলেন? এক ফোনে বিরিয়ানি আসে, কিন্তু ডাক্তার আসেন না"।

চিকিৎসকসমাজ ভারী ব্যথিত। আমি অবশ্য অবাক হইনি। কেননা রুচিশীল, উচ্চশিক্ষিত, সংস্কৃতিমনস্ক বঙ্গসমাজে ডাক্তার শব্দটি বস্তুবাচক - এবং, শব্দটি সাধারণত বাক্যে ডাক্তারটা বা ডাক্তারগুলো হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। কথকের সামাজিক অবস্থানের সাথে সাথে ডাক্তার শব্দের সাথে ব্যবহৃত সবচেয়ে জনপ্রিয় আনুষঙ্গিক কয়েকটি বিশেষণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় - শালা, হারামি, শুয়োরের বাচ্চা বা খানকির ছেলে। তা, এই সমাজে বসে, কোনো লেখাতেই, আচমকা ডাক্তারের সম্মানহানি হয়েছে বলে বিশ্বাস করা কিঞ্চিৎ মুশকিলের - সম্মান না থাকলে তার হানি-র প্রশ্ন আসে কোত্থেকে।

কাজেই, ওয়েটার বিল লাও-এর ভঙ্গীতে অগ্নীশ্বর গেলে কোথায় বলার মধ্যে আলাদা করে অসম্মান খুঁজবেন না, প্লীজ। বরং, এই যে এক ফোনেই বিরিয়ানি চলে এলো, কিন্তু ডাক্তার এলো না - এখন আমার চোঁয়া ঢেঁকুর সামলাবো কী করে, এই অসহায় আকুতিটা বুঝতে চেষ্টা করা যাক।

ডাক্তারবাবুরা বুঝতে চাইছেন না, অন্তরাদেবী যেমন করে চিকিৎসকদের সম্মান জানিয়েছেন, তেমন করে অনেকদিন কেউই জানান নি। বিশ্বাস হল না? বেশ, তাহলে গুছিয়ে বলছি - পরে যেন লেখা লম্বা হয়ে গেল বলে দুষবেন না।

তাঁর বক্তব্যের অস্যার্থ - কাজেকম্মে নিজেদের কেরিয়ার গোছাতে আজকালকার ছেলেমেয়েরা - যাকে ভারী বাংলায় পরবর্তী প্রজন্ম বলা হয় আর কি - তাঁরা বিদেশবিভুঁইয়ে থাকেন। বয়স্ক বাবা-মা অসহায় - তাঁদের দেখভালের জন্যে কেউ নেই। এমতাবস্থায় সমকালীন বাজারী অর্থনীতির মায়াজাল ছিঁড়ে বিবেকের বাতি জ্বালিয়ে এগিয়ে আসতে হবে চিকিৎসকদের। হ্যাঁ, অন্তরাদেবী জানেন ও মানেন, ডাক্তারদের সারাদিন অনেক রোগীর চাপ সামলাতে হয় - তবু, এই ধরুন রাত্তির দুটোর সময় ডাক পাঠানো সত্ত্বেও তিনি আসবেন না কেন??

আচ্ছা, কখনও ভেবে দেখেছেন, আর্জেন্টিনা হেরে গেলেই লোকজন মেসিকে গালিগালাজ করে কেন? টিমে তো আরো দশটা প্লেয়ার ছিল?? পারত না কি তারা সবাই মিলে দলকে জেতাতে??? তবু, গালিগালাজ পেয়ে থাকেন মেসি-ই, কেননা সমর্থকরা জানেন, হ্যাঁ, পারলে মেসি-ই পারেন, বা পারতেন, ভরাডুবি থেকে দলকে টেনে তুলতে। ডি মারিয়া বা আগুয়েরো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ - কিন্তু, তাঁরা কেউ মেসি নন।

অন্তরাদেবীর লেখাখানা থেকে পরিষ্কার, তিনি অর্বাচীন সমর্থকের দৃষ্টিতে পুরো বিষয়টি দেখেন। তাঁর প্রত্যাশা, সমাজের বাকি সব্বাই কেরিয়ার ও আখের গোছাবেন - কিন্তু, খাটাখাটুনি করে জয়েন্টে চান্স পেল যে ছাত্রটি ঠিক একইরকম কেরিয়ার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে, সে মেডিকেল পড়তে পড়তে আচমকা সামাজিক দায়বদ্ধতার পরাকাষ্ঠা হয়ে উঠবে!!! পুরো দেশ নাকি হই হই করে সুপারপাওয়ার আর ডিজিটাল ইন্ডিয়া হয়ে উঠবে - আর শুধু ডাক্তাররাই থাকবেন পঞ্চাশ বছরের পুরোনো বাংলা সিনেমার নায়কের সেন্টিমেন্টাল অবস্থানের প্রতিভূ হয়ে!!!

সম্ভবত অজান্তেই অন্তরাদেবী চিকিৎসকদের প্রত্যাশা ও সম্মানের এক শিখরে বসিয়েছেন - যেখানে বাকি পুরো সমাজ আত্মকেন্দ্রিক বা ধান্দাবাজ বা স্থূল অর্থে প্রফেশনাল হয়ে গেলেও - এক এবং একমাত্র চিকিৎসকই থাকবেন অতীত সামাজিক দায়বদ্ধতা ও স্বার্থহীন মানবিকতার প্রতিরূপ হয়ে - যাঁরা নিজস্ব স্বাচ্ছন্দ্যের তোয়াক্কা না করে দায়ভদ্ধ হবেন বৃহত্তর সমাজের প্রতি।

সমস্যা হল, বাণিজ্যিক সিনেমার স্ক্রিপ্টের মতোই, এমন আশা অবাস্তব - অবান্তরও বটে। চলতি আর্থসামাজিক কাঠামো এবং বাজারচলতি সামাজিক বাস্তবতা থেকে উঠে আসা কিছু তরুণ - একটি বিশেষ পেশায় যুক্ত আছে বলেই - আচমকা দায়বদ্ধ হয়ে উঠবেন, এই আশাটাই হাস্যকর।

চিকিৎসকরা স্বার্থচিন্তাহীন পরার্থপর হওয়ার ঠেকা নিয়ে বসে নেই - দেবতা হওয়ার বাড়তি কোনো দায় তাঁদের নেই। মুশকিল এটাই, চিকিৎসকরা চাইছেন না দেবতা হতে - তাঁদের প্রত্যাশা সামান্যই - তাঁরা চাইছেন শুধুমাত্র সুষ্ঠুভাবে নিজের পেশার দায়িত্বটুকু সামলাতে - দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে সামলাতে - সমাজের কাছে তাঁরা চাইছেন, সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ, যেখানে চাপমুক্ত ও আতঙ্কহীন হয়ে দায়িত্বটুকু পালন করতে পারেন।

কিন্তু, অন্তরাদেবীরাও ছাড়বেন না - তাঁরা ডাক্তারকে দেবতা না বানিয়ে স্বস্তি পাচ্ছেন না। ডাক্তার যেটুকু চাইছেন, তাঁরা দিতে চাইছেন আরো অনেক অনেএএক বেশী - সমস্যা এই, ডাক্তার যেটুকু চাইছেন, সেইটুকু যাতে পেতে পারেন, এই বিষয়ে অন্তরাদেবীরা নীরব।

আপাতদৃষ্টিতে অন্তরাদেবী বা অন্তরাদেবীদের এমত অর্বাচীন লেখাপত্তর যাঁরা ছাপেন - তাঁদের অন্তঃসারশূন্য ও বোধশক্তিরহিত বলে মনে হতে পারে, কিন্তু একটি বৃহৎ বাজারী পত্রিকার স্ট্র‍্যাটেজিকে লঘু করে দেখবেন না - এ এক বিশেষ চিন্তাপদ্ধতির ফসল। যে চিন্তাপদ্ধতিতে দায় নেওয়া নেই, দায়বদ্ধ হওয়া নেই, সমস্যার গভীরে যাওয়া নেই - রয়েছে শুধু দীর্ঘশ্বাস, অতীতচারী হাহুতাশ - রয়েছে নিজেকে দায়মুক্ত করে অপরকে দায়িত্ববান হওয়ার উদ্দেশে ভাষণ।

অন্তরাদেবী সমস্যার গভীরে যাবেন না কখনোই। তিনি খতিয়ে দেখবেন না, বয়স্ক মানুষের জন্যে হোমকেয়ারের ব্যবস্থা যেসব দেশে রয়েছে, সেইসব দেশে সেই হোমকেয়ারের দায়িত্ব নেন কাঁরা - ব্যক্তিচিকিৎসক, নাকি সরকার এনজিও মিলেমিশে? সেসব দেশে স্বাস্থ্যখাতে সরকার ঠিক কেমন ব্যয় করে থাকেন? আমাদের দেশে সরকার যেপথে হাঁটছেন, তার পরিণতি ঠিক কেমন হতে পারে?

অন্তরাদেবীরা এসব নিয়ে ভাবেন না, ভাবার মতো চিন্তাশক্তি বা পঠনের গভীরতা তাঁদের নেই - আচমকা ভেবে ফেলতে পারলেও, নিশ্চিত বলতে পারি, স্বাস্থ্য-চিকিৎসায় সরকারের দায়বদ্ধতা বাড়ানোর দাবী নিয়ে তেমন লেখা এমন করে গুরুত্ব সহকারে ছাপবেন না বাজারী পত্রিকা।

অন্তরাদেবীরা খতিয়ে ভাবতে চাইবেন না, কার্ডিওথোরাসিক সার্জারি, পেডিয়াট্রিক সার্জারির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পোস্টগ্রাজুয়েট আসনে ছাত্র ভর্তি হচ্ছেন না বিগত কয়েক বছর ধরেই - কেননা, ডাক্তারিবাবুরা ঝুঁকিবহুল বিষয় নির্বাচন করতে সাহস পাচ্ছেন না - এমতাবস্থায়, বাড়িতে গিয়ে রোগী দেখতে কেউ রাজি হবেন কেন? চিকিৎসকরা ভগবান নন - তাঁদেরও ঘরসংসার পরিবারপরিজন আছেন - তাঁরা পুলিশ বা সেনাবাহিনীর চাকরির মানসিকতা বা প্রস্তুতি নিয়ে আসেন নি - নেহাত বিপাকে না পড়লে, পেটের দায়ে শারীরিকভাবে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তাঁরা খামোখা নিতে যাবেন কেন? আর, সত্যি বলতে কি, ঝুঁকি নেওয়ার দায় তাঁদের এখুনি নেই। যে রাজ্যে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগের পরীক্ষায় আবেদন করেন পিএইচডি (যদিও আবশ্যক যোগ্যতামান ক্লাস এইট পাস), যে রাজ্যে প্রাথমিক শিক্ষক হওয়ার পরীক্ষা আবেদনকারীর ভিড়ের ঠেলায় ভেস্তে যায় - সেই রাজ্যেই সরকার হাজার চেয়েও ডাক্তার পান না। না, সে কোনো গর্ব না আনন্দের বিষয় নয় - সরকারি পরিষেবা বিপর্যস্ত হোক, এমনটা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না - কিন্তু, পরিকাঠামোহীন নিরাপত্তাহীন ব্যবস্থায় ঢালতরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দার হয়ে বলির পাঁঠা হতে চিকিৎসকরা রাজি নন - তাঁদের জন্যে অনেক নিরাপদে ও শান্তিতে আয় করার সুযোগ রয়েছে। এই অবস্থায় হোম ভিজিটের হ্যাপা চিকিৎসকরা সামলাতে যাবেন কোন দুঃখে?

আবারও বলি, সমস্যাগুলো অন্তরাদেবী জানেন না, এমনটা হয়ত নয়। কিন্তু, মূল সমস্যার দিকে তাঁরা আঙুল তুলবেন না। কখনই তুলবেন না - কেননা, তাঁরা জানেন, আঙুল তুলতে চাইলে সে লেখা ছাপা হবে না।

অতএব, সরকারবাহাদুর যখন স্বাস্থ্যকে ক্রয়যোগ্য পণ্য করে তুললেন, এঁরা নীরব থাকেন। স্বাস্থ্য যখন বেসরকারি মুনাফা আদায়ের ক্ষেত্রে পরিণত হয়, এনাদের নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটে না। সরকার যখন এমনকি মেডিকেল শিক্ষাকেও বেসরকারি হাতে তুলে দেন, এঁরা তখন সেসব দেখতে পান না।

তারপর, কোনো এক আবছায়া বৃষ্টির বিকেলে এনারা হঠাৎ যেন ঘুম থেকে ওঠেন - সেদিনের সোনাঝরা সন্ধ্যা গানের ধাঁচে আধপোয়া দীর্ঘস্বাস ফেলেন - সেই নস্ট্যালজিয়ার সাথে মিশিয়ে নেন পুরাতন ভৃত্যের স্টাইলে কিঞ্চিৎ বাড়তি নস্ট্যালজিয়া - হাঁক পাড়েন, ওহে অগ্নীশ্বর, গেলে কোথায় - এত হাঁকডাকের পরে ক্লান্ত হয়ে পড়েন - কাজের মেয়েটি দেশজ শিল্পজাত চপ-পকোড়া সহযোগে মুড়ি-চা দিয়ে গেলে একটু ধাতস্থ হন। এসব গুরুদায়িত্ব পালনের ঘণ্টাখানেক বাদে, আবার ভাবতে বসেন - বেশী চিন্তা বা বেশী তেলেভাজা - গ্যাসের কারণ ঠিক কী, বুঝে উঠতে পারেন না।

অন্তরাদেবীর সুগভীর চিন্তনের ফসলটির লিঙ্ক দেওয়া রইল নীচে -
ডা. সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়
সুলেখক । কবি।
Diabetes & Endocrinology Consultant
M.D. at University of Madras । প্রাক্তন :
Calcutta National Medical College and Madras Medical College (MMC

আনন্দবাজার
অগ্নীশ্বররা কোথায় গেলেন? এক ফোনে বিরিয়ানি আসে, কিন্তু ডাক্তার আসেন না
অন্তরা চৌধুরী

এমন কিছু পরিস্থিতি মানুষের জীবনে আসে, যখন চাইলেও সময়ে ডাক্তার পাওয়া যায় না।
ষাটের দশক বা সত্তরের দশকের বাংলা ছবিতে একটা দৃশ্য প্রায়ই দেখা যেত। বাড়ির কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তৎক্ষণাৎ ডাক্তারবাবুকে খবর দেওয়া হলে তিনি কিছু ক্ষণের মধ্যে এসে রোগীকে দেখে যেতেন। সঙ্গে থাকত মাঝারি সাইজের একটি ভারী ব্যাগ। তাতে থাকত প্রয়োজনীয় ওষুধপাতি, ইঞ্জেকশন। ব্যাগে প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকলে তিনি খসখস করে ওষুধ লিখে দিতেন। তেমন গুরুতর অবস্থা বুঝলে তিনি রোগীকে হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দিতেন। চলে যাওয়ার সময় বাড়ির কেউ তাঁর ব্যাগ বহন করে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন। সিরিয়াস কিছু বুঝলে ডাক্তারবাবু রোগীর সামনে না বলে সেই ব্যক্তিকেই বলে যেতেন।

নব্বইয়ের দশকের সিনেমাতেও এই চিত্রের হেরফের হয়নি। তখন ছিল ‘ফ্যামিলি ফিজ়িসিয়ান’। পরিবারের যে কোনও বিপদে আপদে তিনিই একমাত্র সহায়। কিন্তু হালফিলের বাংলা ছবিতে সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না। সাহিত্য বা চলচ্চিত্র, দুটোই তো সমাজের দর্পণ। সমাজ বদলালে শিল্প সাহিত্যে তার প্রভাব তো পড়বেই।

এই চরম সমস্যার সম্মুখীন আমরা কম বেশি সকলেই। কেরিয়ারের স্বার্থে বা কর্মসূত্রে অধিকাংশ বাড়ির ছেলেমেয়েই হয় বিদেশে বা অন্য কোনও দূর শহরে পাড়ি দেয়। বাড়িতে পড়ে থাকেন বৃদ্ধ বাবা-মা। কখনও ছেলেমেয়েরা তাঁদের নিয়ে যেতে চায় না, আবার কখনও তাঁরা নিজেরাই শিকড় ছেড়ে যেতে চান না। বেঁচে থাকেন একে অন্যের সাহচর্যে। একান্নবর্তী পরিবার এখন রূপকথার মতো। খুব কম বাড়িতেই গুটিকয়েক লোকজন থাকে। মফস্সলে যেন ঘরে ঘরে বৃদ্ধাশ্রম। একশো ত্রিশ কোটির ভারতবর্ষ যে কত নির্জন, ভিড়ে ঠাসা মেট্রোপলিটন শহরের বাইরে না গেলে বোঝা যায় না।

হঠাৎ করে যদি কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন আর এক জন কী করবেন, কাকে ডাকবেন, খুঁজে পান না। স্মার্ট ফোন আমাদের জীবনযাত্রাকে অনেকটা স্মার্ট করলেও পুরনো দিনের বাবা-মায়েরা এখনও ততটা দড় হয়ে উঠতে পারেননি। নেট অন করে গুগল থেকে অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবাতে ফোন করে অ্যাম্বুল্যান্স ডাকবেন; আমাদের সনাতন ভারতবর্ষ এখনও অতটা স্মার্ট নয়। ছেলেমেয়ের কাছে ধাতানি খেয়ে নাম্বার দেখে বা নাম্বার টিপে কোনও রকমে ফোন করতে হয়তো তাঁরা শিখেছেন। সেই সঙ্কটজনক মুহূর্তে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ফোন করেন পরিচিত ডাক্তারবাবুকেই। কারণ সেই মুহূর্তে তিনিই একমাত্র আশা ও ভরসা। সেই ডাক্তারবাবু যদিও বা হাজার ব্যস্ততার মাঝে ফোন রিসিভ করেন; সব শোনার পর কী অবলীলায় বলে দেন, ‘পেশেন্টকে বাড়িতে বা নার্সিংহোমে নিয়ে আসুন।’ কিন্তু বলার সময় তিনি একবারও উল্টো দিকের ছবিটা দেখার চেষ্টা করেন না। যে মানুষটি নিতান্ত অসহায় ও নিরুপায় হয়ে সেই ডাক্তারবাবুকে একবার বাড়িতে আসার জন্য কাতর আবেদন জানাচ্ছেন, তাঁর মানসিকতা বিবেচনা করার প্রয়োজন মনে করেন না। ভাবেন না যে নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি থাকলে অবশ্যই নিয়ে যাওয়া হত। আর যে পেশেন্ট নিজে যেতে সক্ষম, তিনি তো অনায়াসেই ওপিডিতে গিয়ে দেখিয়ে আসতে পারেন। তার জন্য ডাক্তারবাবুকে বাড়িতে ডাকার কী প্রয়োজন! যে অসুস্থ মানুষটি যন্ত্রণায় ছটফট করছেন অথবা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন, তাঁকে কী ভাবে ওই অবস্থায় টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া যায়! মানুষ তো বলে কয়ে অসুস্থ হয় না। হঠাৎ করেই হয়। আমাদের সমাজে যেখানে আধ ঘণ্টার মধ্যে পিৎজ়া ডেলিভারি হয়, দশ মিনিটের মধ্যে সুইগি বা জোম্যাটোর বাইক বিরিয়ানি নিয়ে হাজির হয়ে যায়, সেখানে আধ ঘণ্টার মধ্যে অ্যাম্বুল্যান্স-ডাক্তার পাওয়া যায় না।


মানছি ডাক্তারবাবুদেরও সারা দিনে প্রচুর পেশেন্ট দেখতে হয়। ওপিডিতে লম্বা লাইন। তাঁরাও অমানুষিক পরিশ্রম করে মানুষকে সুস্থ করে তোলেন। তার পর আর তাঁদের পক্ষে পেশেন্টের বাড়িতে যাওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু মানবিকতার খাতিরে অল্প কিছু ডাক্তারও যদি আমাদের সমাজে থাকেন, যাঁরা চরম বিপদের দিনে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবেন, তা হলে সাধারণ মানুষ একটু ভরসা পায়। মনে জোর পায়। বিপদের দিনে মনে হবে আর কেউ না থাক, অন্তত এক জন ডাক্তারবাবু আছেন যাঁকে রাত্রি দুটোর সময় খবর দিলেও তিনি আসবেন। এটা হয়তো নিছকই কষ্টকল্পনা।

আজও আমাদের সমাজে ঈশ্বরের পরের স্থান দেওয়া হয় ডাক্তারকে। মরণাপন্ন রোগীকে যখন এক জন ডাক্তার সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে দেন, তখন রোগীর পরিবারের কাছে তিনি যেন ঈশ্বরপ্রেরিত দূত হয়ে দেখা দেন। কিন্তু এমন কিছু পরিস্থিতি মানুষের জীবনে আসে, যখন চাইলেও সময়ে ডাক্তার পাওয়া যায় না। এমনকি বাড়তি টাকার বিনিময়েও না।

কিছু রোগ আছে, যেগুলোতে রাতারাতি নার্সিংহোমে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। হয়তো কারও শুগার হঠাৎ করে কমে গিয়েছে। কারও প্রেশার হঠাৎ বেড়ে গিয়েছে। বুকের ব্যথা মনে হলেও হয়তো আসলে সেটা গ্যাসের ব্যথা। একটা ছোট্ট ওষুধেই ঠিক হয়ে যেতে পারে। কিন্তু রোগীর পক্ষে তো বোঝা সম্ভব নয়, অসুখটা কী পর্যায়ের। অনেক সময় রোগী বা তাঁর পরিবার অহেতুক আতঙ্কে ভোগেন। ভাবেন হয়তো বড় কিছু ঘটে গেল। তাই, ঝুঁকি না নিয়ে বাধ্য হয়ে নার্সিংহোমে নিয়ে যান। আর সেখানে গিয়ে পড়লে আর দেখতে হচ্ছে না। মামুলি জিনিসটাকে শুরুতেই ভয় দেখিয়ে বিরাট কাণ্ড বাধিয়ে ফেলা হবে। টেস্টের পর টেস্ট চলতেই থাকে। অকারণে বিলের অঙ্ক বেড়ে চলে। আর মেডিক্লেম থাকলে তো কথাই নেই। অথচ ডাক্তারবাবুর সামান্য চিকিৎসায় যে রোগী ভাল হয়ে উঠতে পারত, তাকে অকারণে অনেকগুলো টাকা গচ্চা দিতে হয়। মুনাফা লোটে নার্সিংহোমগুলো।


বিধানচন্দ্র রায়ের মতো কিংবদন্তি ডাক্তারও সারা দিন রোগী দেখার পর হঠাৎ কল এলে যেতে পিছপা হতেন না। তারাশঙ্করের ‘আরোগ্য নিকেতন’, বা বনফুলের ‘অগ্নীশ্বর’ পড়লেও সেই ছবি দেখতে পাওয়া যায়। তারও আগে ছিল কবিরাজ। সব গ্রামেই এক জন নামজাদা কবিরাজ থাকতেন। জড়িবুটি দিয়েই তিনি মানুষকে সুস্থ করে তুলতেন। তাকেও যে কোনও সময় পাওয়া যেত। হোমিয়োপ্যাথিতেও একই ছবি। কিংবদন্তি ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার কোথায় না ছুটে গিয়েছেন। বেশ কয়েক বছর আগে পর্যন্তও দিন হোক বা রাত, ডাক্তারকে বাড়িতে ডাকলে পাওয়া যেত। আসতে একটু দেরি হলেও মুখের ওপর ‘না’ বলতেন না। ভরসা করা যেত যে তিনি আসবেনই। কিন্তু এখন আর সে দিন নেই। পোস্টমডার্ন যুগে বাস করে মোবাইলের একটি মাত্র ক্লিকে আমরা বাড়িতে বসেই পেয়ে যাই জীবনযাপনের অত্যাধুনিক উপকরণ। হিরের থেকে জিরে সবই পাই। এমনকি প্রেসক্রিপশন আপলোড করলে অনলাইনে ওষুধও বাড়িতে হাজির হয়ে যায়। শহরের বিভিন্ন দেওয়ালে নার্স বা আয়া সেন্টারের বিজ্ঞাপনও চোখে পড়ে। কিন্তু কোনও ক্লিকেই জীবনদায়ী ডাক্তার পাই না। এখন তো সব কিছুতেই অ্যাপ হয়। এমন কোনও অ্যাপ হয় কি, যেখানে দরকারের সময় ডাক্তার পাওয়া যাবে! দেশ এত উন্নত যে চাঁদেও বিক্রম পৌঁছে গেল। কিন্তু প্রদীপের নীচেই যে গাঢ় অন্ধকার।

অথচ সমাধানের রাস্তা কিন্তু সহজেই বার করা যায়। মানছি, ওপিডি ছেড়ে ডাক্তারের পক্ষে রোগীর বাড়ি যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু প্রাইভেট কল নেবেন, এমন ডাক্তারদের নথিভুক্ত করা যেতেই পারে। যেমন কোনও বড় রেস্তরাঁয় বসেও খাওয়া যায়, আবার সুইগি–জোম্যাটো মারফত অর্ডারও করা যায়। হয়তো সেই ডেলিভারি দেওয়ার জন্য আলাদা লোকের ব্যবস্থা আছে। যিনি শুধু অনলাইন অর্ডার প্যাকিং ও ডেলিভারির ব্যাপারটাই দেখবেন। কোথাও কোথাও অনলাইন ডেলিভারির আলাদা কাউন্টারই করা হয়েছে। রেস্তরাঁগুলি যদি পারে, নার্সিংহোমগুলিই বা পারবে না কেন?‌ তারাও তো ডাক্তারদের একটা আলাদা প্যানেল তৈরি করতে পারে। যাঁরা শুধু বিপন্ন মানুষের বাড়িতে গিয়েই চিকিৎসা করবেন। রোটেশন করে সিনিয়র ডাক্তারদেরও পাঠানো যেতে পারে। ছোট শহরের নার্সিংহোমগুলিও এমন দু’এক জন ডাক্তারকে এই কাজে ব্যবহার করতেই পারে। একটা বিপদের দিকও আছে। নার্সিংহোম থেকে ডাক্তার গেলে তাঁর ওপর নার্সিংহোমের একটা চাপ থাকতেই পারে। তিনিও হয়তো প্রয়োজন না থাকলেও ভর্তি হওয়ার নিদান দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে, অন্য কোনও সংস্থাও এগিয়ে আসতে পারে। কয়েক জন ডাক্তার নিজেদের উদ্যোগেও এ রকম একটা সংস্থা চালু করতে পারেন। সরকারি উদ্যোগেও বিভিন্ন শহরে পরীক্ষামূলক ভাবে এই পরিষেবা শুরু করা যেতে পারে।

একটা ফোনে দশ মিনিটের মধ্যে যদি গাড়ি বা বিরিয়ানি চলে আসে, তা হলে এক জন চিকিৎসককে পাওয়া যাবে না কেন?‌ এত প্রযুক্তির জয়জয়কার, এত ডিজিটালের আস্ফালন, অথচ চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে পরিষেবা ছয়ের দশকে পাওয়া যেত, তা এখন পাওয়া যাবে না কেন?‌ জেলা সদর, ছোট শহরে এই পরিষেবা ছড়িয়ে দেওয়া যাবে না কেন?‌

জানতে ইচ্ছে করে জীবনের দাম না তাঁদের ইগো বা সময়ের দাম— কোনটা বড় এখনকার ডাক্তারদের কাছে!

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়