Ameen Qudir

Published:
2019-09-27 11:41:38 BdST

সকল ডাক্তারই থেরাপিস্ট, কিন্তু সকল থেরাপিস্ট ডাক্তার না


 

 

ডা. আব্দুন নূর তূষার
মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, বিতার্কিক,
প্রাক্তনী , ঢাকা মেডিকেল কলেজ________________

সকল ক্ষারই ক্ষারক, কিন্তু সকল ক্ষারক ক্ষার না। তেমনি সকল ডাক্তারই থেরাপিস্ট, কিন্তু সকল থেরাপিস্ট ডাক্তার না। ডাক্তার বা চিকিৎসক হলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি মানব শরীরের সকল বিষয় সম্পর্কে পড়াশোনা করেন ও হাতে কলমে প্রশিক্ষণ নেন। যেমন- ফিজিওলজি, এনাটমি, পাবলিক হেলথ, প্যাথলজি, ফরেনসিক মেডিসিন, বায়োকেমিস্ট্রি, ফার্মাকোলজী, মাইক্রোবায়োলজি, হিস্টোলজি, মেডিসিন, সার্জারী, গাইনোকলজি ও অবষ্টেস্ট্রিক্স। তাকে আলাদা করে আবার সাইকিয়াট্রি, কার্ডিওলজি, নেফ্রলজি, ইউরোলজি, অর্থোপেডিকস ইত্যাদি ক্লাস ও টিউটোরিয়াল করতে হয়, যাতে এসব বিষয়েও তার দক্ষতা হয়।
সে ক্যাজ্যুয়ালটি বা ইমারজেন্সি, ক্রিটিকাল কেয়ার বিভাগে, নিউরোলজি এবং নিউরোসার্জারীতেও কাজ করে পড়াকালীন সময়ে, এসব বিষয়েও তাকে জানতে হয়। টানা ৫ বছর এসব বিষয়ে জেনে, হাজারের অধিক আইটেম, কার্ড, টার্ম, টিউটোরিয়াল, ওয়ার্ডে কেস দেখা ব্লক পরীক্ষা দিয়ে পরিশেষে বছর ঘুরে ঘুরে প্রফেশনাল পরীক্ষা দিয়ে সকল বিষয়ে ৬০% নম্বর পেয়ে পাশ করতে হয়।
সর্বশেষ তাকে প্রশিক্ষণমূলক দায়িত্ব বা ইন্টার্নশিপ করতে হয় ১ বছর। তারপর সে বিএমডিসি থেকে ডাক্তার হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সে সকল থেরাপী জানে এর অর্থ হলো, সকল ধরনের চিকিৎসা জানে। তারপরেও তাকে আবার ৫ থেকে ৮ বছর পড়াশোনা করে বিষয়ভিত্তিক স্পেশালিস্ট হতে হয়। তার মানে ডাক্তার সকল রোগের থেরাপি দিতে পারে।
থেরাপিস্ট হলো, কোন বিশেষ বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে কিছু রোগের বিশেষায়িত সেবা বা চিকিৎসা দেয়ার জন্য পড়াশোনা করা ও চিকিৎসা দেয়া। যেমন- আকুপাংচার। যেমন- ফিজিও থেরাপী। ব্যথা, পেশীর দুর্বলতা, নানারকম রোগের বা দুর্ঘটনার পরে পক্ষাঘাত বা অঙ্গের ক্ষতি হলে পুণর্বাসনমূলক চিকিৎসা তারা দেন।
তারা আপনার ব্রেন টিউমারের চিকিৎসা দেন না, কিন্তু টিউমার সার্জারীর পরে হাত পা দুর্বল হলে আপনাকে বিশেষ ব্যায়াম শেখাতে পারেন। তাদের তত্ত্বাবধানে আপনার অপারেশন পরবর্তী সেরে ওঠার বিশেষ সময়টি কাটবে। স্পাইনাল ডিস্ক প্রোল্যাপ্স হলে তিনি আপনাকে ব্যাথার ওষুধ দিতে পারবেন এবং আপনার ব্যায়াম ঠিক করে দেবেন। খেলতে গিয়ে আঘাত পেলে বা কোন বিশেষ মাংসপেশীকে সবল করার জন্য তিনি আপনাকে পরামর্শ দেবেন। তিনি কিন্তু আপনার রোগের চিকিৎসা করেন না, ব্যাথার উপশম এর কাজটি করেন মাত্র। আপনার পেশী ও হাড়ের শক্তি ফিরিয়ে আনার জন্য সাহায্য করেন। তিনি যাবতীয় ব্যাথার ঔষধ, ব্যায়াম, ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিনও লিখতে পারেন কিন্তু তিনি ব্যাথাযুক্ত স্থানে ইঞ্জেকশন দিতে পারেন না, তিনি স্পাইনাল ডিস্কে সার্জারী করতে পারবেন না।
চিকিৎসা হলো রোগের উপশম বা রিলিফ এবং রিহ্যাবিলিটেশন হলো পূণর্বাসন করা যা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।
তিনি আপনার হার্ট ফেইলিউরের চিকিৎসা দিতে পারবেন না, তিনি আপনার কিডনীর ক্রিয়েটিনিন বেশী হলে ওষুধ দিতে পারবেন না, তিনি আপনাকে চোখের ড্রপ বা নাকের ড্রপ লিখতেও পারবেন না কারন তিনি থেরাপিস্ট। তিনি এমআরআই রিপোর্ট করতে পারেন না, কারণ তিনি রেডিওলজিস্ট না কিন্তু তিনি এমআরআই রিপোর্ট দেখে ব্যথার জায়গায় থেরাপি ঠিক করতে পারেন। যেমন- সাইকোথেরাপী বা কাউন্সেলিং। তারা মানসিক রোগীকে নানা রকম ভাবে সাহায্য করেন। তারা পরামর্শ দেন, কথা বলেন, বিহেভিয়ার পরিবর্তনে সাহায্য করেন নানা রকম টেকনিকে। এটা ডাক্তারও পারেন কিন্তু তার চেয়ে ভালো পারেন সাইকোথেরাপিস্টরা। কিন্তু তারা সিজোফ্রেনিয়াতে বা আলঝাইমারস হলে ওষুধ লিখতে পারেন না।
এজন্যই থেরাপিস্টরা ডাক্তার না। তবে আমাদের দেশে, ভারত পাকিস্তানে, সকল থেরাপিস্ট নিজেদের ডাক্তার ভাবতে ভালোবাসেন। নিজেদের ডাক্তার অব ফিজিওথেরাপি বলেন। নাম লিখতে চান ডাক্তার অমুক (পিটি) এই ভাবে। পিটিতো তাদের ডিগ্রী না, ডিগ্রী হলো বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি। এমএসসি ইন ফিজিওথেরাপি।
পড়লেন কেবল ফিজিওথেরাপী আর নাম এর আগে লিখলেন ডাক্তার, প্রেসক্রিপশন দিতে শুরু করলেন ডাক্তারদের মতো সকল রোগে। গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে টিভিতে নিজের ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন করলেন, উচ্চ রক্তচাপের বড়ি লিখলেন, এটা অনেকেই করেন বা করতে চান।
কেউ কেউ কোর্টের রায় দেখান। কোর্ট এমবিবিএস ও বিডিএস ছাড়া আর কাউকে ডাক্তার লেখার অনুমতি দেয় নাই। কোর্ট বলেছে বিএমডিসি আইনের বিষয়ে তাদের আপত্তির মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত কাউকে যেন পুলিশি হয়রানী করা না হয়। কোর্ট আইনের ধারাটি স্থগিতও করে নাই কেবলমাত্র ৬ মাস হয়রানী করতে না করেছিল। তারা বারবার এটার সময় বাড়িয়ে নেন এবং প্রচার করতে থাকেন যে, কোর্টের রায় আছে।
এই লেখার সময়কাল পর্যন্ত এই বিষয়ে কোর্টের কোন রায় নাই।
যে আইনের অধীনে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে আপনি কাজ করছেন সেটাকেই বিরোধীতা করা মানে হলো আপনার নিজের রেজিস্ট্রেশনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা। আপনি সেই আইন মেনেছেন বলেই তো দ্বিতীয় শ্রেনীর মেডিকেল প্র্যাকটিশনার হিসেবে আপনি নিজেকে নিবন্ধিত করেছেন। এখন বলছেন আপনি থাকবেন দ্বিতীয় শ্রেনীতেই কিন্তু নামের আগে ডাক্তার লিখবেন। অথচ বিএমডিসির রুল বলে, এমবিবিএস ও বিডিএস ছাড়া কেউ নামের আগে ডাক্তার লিখতে পারবেন না।
তাহলে থেরাপিস্টদের বক্তব্য অনুযায়ী এই আইন ইনভ্যালিড যদি হয়, তাহলে তাদের রেজিস্ট্রেশন অবৈধ হয়ে যায়। আই অ্যাগ্রি বলে সফ্টওয়্যার ইন্সটল করার পরে কি সেটাকে মানি না বলা যায়?
তাদের জন্য আবার বলি সকল ক্ষারই ক্ষারকের মতো সকল চিকিৎসকই থেরাপিস্ট সকল ক্ষারক ক্ষার নয় মানে সকল থেরাপিস্টরা চিকিৎসক নয়।

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়