Ameen Qudir

Published:
2019-07-01 10:32:34 BdST

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং সচেতন দেশবাসীর কাছে সবিনয় নিবেদন


 

ডা. মোঃ শাব্বির হোসেন খান
সভাপতি
মৌলভীবাজার বিএমএ

___________________________

 

সম্প্রতি প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলী আদেশ পাওয়া দুজন সুপার-স্পেশিয়ালিষ্ট চিকিৎসক এদেশের চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে দুটো খোলাচিঠি লিখেছেন ।
এদের দু'জনকেই ক্রিকেটার মাশরাফী সম্পর্কে দেয়া একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে মন্তব্য করার অভিযোগে প্রথম কারন দর্শানোর নোটিশ দেয় মন্ত্রণালয়। তারা যথাসময়ে সেই নোটিশের জবাব দেন। সেই নোটিশ এবং জবাব সম্পর্কে কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়েই ওই দুজন সুপার-স্পেশিয়ালিষ্ট চিকিৎসককে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলী করে দিয়েছে মন্ত্রণালয়; তাও এমন সব হাসপাতালে, যেখানে তাদের বিষয়ের কোন বিভাগ নেই, নেই জনসাধারণকে তাদের মেধা কাজে লাগিয়ে সেবা দেয়ার সুযোগ। যেখানে কারো মেধা এবং জ্ঞান কাজে লাগানোর কোন সুযোগই নেই, সেখানে তাদেরকে বদলী করা মানে হচ্ছে, জেনেশুনে তাদের সেবা প্রাপ্তির সুযোগ থেকে দেশবাসীকে বঞ্চিত করা। এটা যারা করলো, তারা কি একটা দুর্নীতি করেনি? আমি তো মনে করি, এটাও একটা দুর্নীতি। দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যেখানে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক
দায়িত্ব, সেখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এমন পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে করে মানুষ সেই সেবা থেকে বঞ্চিত হয়।স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি সংবিধান রক্ষা করছে? আমার প্রশ্ন রয়ে গেল!
মেধা কাজে লাগাবার সুযোগবিহীন হাসপাতালে বদলীর কারনে হয়তোবা তারা নিরবে, অভিমান করে বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের সরকারী চাকরী ছেড়ে দিয়ে কোন প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে কিংবা কোন কর্পোরেট হাসপাতালে যোগ দেবে, যেখানে দেশের দরিদ্র রোগীরা চিকিৎসার জন্য যেতে পারবে না।
আর সরকারী মেডিকেল কলেজের ষ্টুডেন্টরা ( ওইসব সুপার-স্পেশালাইজড বিভাগ ওয়ালা সরকারী মেডিকেল কলেজে প্রতি ব্যাচে ছাত্রসংখ্যা বেশীরভাগ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের চেয়ে বেশী) এবং সেগুলোতে পোষ্ট গ্র‍্যাজুয়েশনে অধ্যয়নরত চিকিৎসকরাও ওই দুই শিক্ষকের শিক্ষা থেকে হবে বঞ্চিত।

একজন সুপার-স্পেশিয়ালিষ্ট চিকিৎসক হতে হলে ৬ বছরের মেডিক্যাল গ্র‍্যাজুয়েশন শিক্ষার পরে আরো ১২-১৫ বছরের পোষ্টগ্র‍্যাজুয়েশন শিক্ষা সহ বিশাল অংকের আর্থিক ব্যায় এবং দৈহিক, মানসিক এবং পারিবারিক ঝামেলার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয় একজন চিকিৎসককে, যেটা অন্য কোন ডিসিপ্লিনেই করা লাগে না।

সরকারী চাকরীতে এই দুজন সুপার-স্পেশিয়ালিষ্ট এর বিকল্প আবার কবে তৈরি হবে, কেউ বলতে পারেন কি?

আসি চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ( যেটা একটা পোষ্ট গ্র‍্যাজুয়েশন ইন্সটিটিউটও বটে) থেকে রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ( যেখানে একটা পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সবগুলো বিভাগই এখনো পর্যন্ত ভালভাবে চালু করা হয়নি, পোষ্ট গ্র‍্যাজুয়েশন কোর্স দূরে থাক) বদলী করা পেডিয়াট্রিক হেমাটো-অংকোলজিষ্ট ( শিশুদের ব্লাড ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ) অধ্যাপক ডা. এ কে এম রেজাউল করিমের বিষয়ে। এই বিষয়ে বাংলাদেশের সরকারী হাসপাতালগুলোতে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে কর্মরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন হাতে গোনা ১০-১২ জন, তাদের মধ্যে অধ্যাপক আছেন মাত্র ৩ জন। সারাদেশে হাতে গোনা মাত্র ৪ টি হাসপাতালের ১ টি হচ্ছে চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, যেখানে পেডিয়াট্রিক হেমাটো- অংকোলজি অর্থাৎ, শিশুদের ব্লাড-ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য আলাদা বিশেষ বিভাগ আছে। উল্লেখ্য, দেশের ৮ টি পুরাতন সরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পেডিয়াট্রিক-অংকোলজি বিভাগ থাকলেও চিকিৎসা দেয়া হয় শুধুমাত্র ঢাকা মেঃ কঃ হাসপাতাল ও চট্রগ্রাম মেঃ কঃ হাসপাতালে, বাকী ৬ টিতে বিভাগ নাম কা ওয়াস্তে, সেগুলোতে কোন চিকিৎসা দেয়া হয় না। এই দুই মেঃকঃহাসপাতাল ছাড়া শিশুদের ব্লাড ক্যান্সারের চিকিৎসা দেয়া হয় বিএসএমএমইউ ( সাবেক পিজি হাসপাতাল) এবং জাতীয় ক্যান্সার গবেষনা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে।

বাংলাদেশের "শিশু ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যাবস্থাপনা জাতীয় গাইড লাইন" এর ২০১৮ এর হিসাব অনুযায়ী দেশে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ২ লাখের ওপরে এবং প্রতিবছর ১৫০০০ নতুন শিশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ২০১৭ সালে জাতীয় ক্যান্সার গবেষনা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী শিশু ক্যান্সার রোগীদের ৩৩% ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত। সেই হিসাবে দেশে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যা এই মূহুর্তে ৭৫,০০০ এর কম হবে না। "শিশু ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যাবস্থাপনা জাতীয় গাইড লাইন" এর হিসাব অনুযায়ী ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত এসব শিশুর মাত্র ১০ শতাংশ (৭৫০০ জন)চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ পায়, বাকী ৯০% ( প্রায় ৬৭,৫০০ জন) থাকে চিকিৎসার বাইরে। এর কারন আর কিছুই নয়, চিকিৎসা দানকারী হাসপাতাল ও যোগ্য চিকিৎসকের অপ্রতুলতা।
ঢাকার বাইরে দেশের একমাত্র হাসপাতাল ছিল চট্রগ্রাম মেঃকঃ হাসপাতাল, যেখানে বকাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ ছিল। সেখানকার একমাত্র অধ্যাপককে বদলী করায় সেই সুযোগটাও কি অস্তমিত করে দিল না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়?


 

বদলীকৃত দুই চিকিৎসকের মনের অব্যক্ত ব্যাথার মর্মস্পশী খোলাচিঠি দুটো নীচে দেয়া হ'লঃ-
--------------------

১.
প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ,
আমার অনাকাংখিত বদলী নিয়ে কিছু লিখার ইচ্ছা একেবারেই ছিল না।

বদলী হবে আমি জানতাম, কারন ক্রিকেটার মাশরাফি ইস্যুতে যে ৬ জনকে শোকজ করা হয়েছে তাদের দু জনকে একমাস আগেই দূর্গম স্থানে বদলী করা হয়েছে।

দুজন সহযোগী অধ্যাপকের বদলীর বিষয়টি জানার পর বিএমএ মহাসচিব, স্বাচিপ সভাপতি ও মহাসচিবের সাথে সাক্ষাত করে আমরা বদলী বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করি। তারা কি করেছেন জানি না, তবে মন্ত্রনালয়ের ওয়েবসাইটে গতকাল বদলির আদেশ পেলাম।

সরকারী চাকরীতে বদলী স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু যে পরিস্থিতিতে আমার বদলি হয়েছে তা স্বাভাবিক নয়। বর্তমান বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিসে হাজার বিশেক চিকিৎসক কর্মরত আছেন, তাদের মধ্যে পেডিয়াট্রিক হোমটোলজি ও অনকোলজি বিষয়ে মাত্র ৩ জন অধ্যাপক চাকুরীরত আছেন। আমি চট্টগ্রাম মেডিকেল এ যোগ দেবার পর পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগ সত্যিকার কার্যক্রম শুরু করে। চট্টগ্রাম এলাকার শত শত শিশু ক্যান্সার ও রক্তরোগাক্রান্ত শিশু সরকারী হাসপাতালে সেবা পাচ্ছে। শিশু ক্যান্সার আক্রান্তদের ঢাকা বা বিদেশগামীতা অনেকাংশেই হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে শতাধিক শিশু ক্যান্সার রোগী আমার অধীনে চিকিৎসাধীন আছে। এমতাবস্থায় আমার বদলী এই শিশুদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।

বদলির আদেশ পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই আমি কোন নেতার কাছে যাই নি। কিন্তু কিছু অনলাইন এবং প্রিন্ট মিডিয়া যেভাবে খবরের শিরোনাম করে ফলাও ভাবে প্রচার করছে তাতে কিছু লেখা প্রয়োজন মনে করলাম।

চিকিৎসা আমার পেশা এবং নেশা। আমার জীবনের সিংহভাগ সময়ই গেছে এই পেশায় উৎকর্ষ সাধনের চেষ্টায়। তাই চিকিৎসকদের জন্য আমার আমৃত্যু ভালবাসা থাকবে। কেউ চিকিৎসক সমাজকে অন্যায় আক্রমন করলে স্বাভাবিকভাবেই আমার মন ভারাক্রান্ত হবে এবং নিজের সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করব।

প্রিয় চিকিৎসক ভাই বোনেরা, আমি কোন সরকার বা রাস্ট্রবিরোধী কাজ করি নি, কোন দূর্ণীতি করিনি, কোন সন্ত্রাসীকাজে লিপ্ত হই নি। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমি সাংসদ মাশরাফি ভার্সেস নড়াইলের চিকিৎসকদের ইস্যুতে অন্য এক চিকিৎসকের পোস্টে একটি কমেন্ট করেছি। আমাকে শোকজ করা হয়েছে, যার উত্তর আমি দিয়েছি। চাকুরীবিধি অনুযায়ী আমি কোন শাস্তিযোগ্য অপরাধ করিনি।

তারপর ও কেন এই বদলী তার বিচারের ভার সময়ের উপর দিলাম।

- অধ্যাপক রেজাউল করিম
অধ্যাপক, পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজী এন্ড অনকোলজী
---------------------
২.
ফেসবুকে মাশরাফি সম্পর্কিত লেখার শাস্তি স্বরূপ প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি হবার আগ পর্যন্ত আমি ছিলাম আমার subject এর পোষ্ট গ্রাজুয়েশন কোর্সের কোর্স কো-অর্ডিনেটর ও সুপারভাইজার। রেসিডেন্টদের সাথে রাউন্ড, ক্লাশ, ব্রংকোসকপি, morning session এসব করেই আমার সময় চলে যেতো।
তরুনদের মাঝে থেকে নিজের মধ্যেই যেন তারুন্য ভর করতো। সব সময়ই মনে হতো আমিতো শিক্ষকতার পদে আছি। সারা সপ্তাহেই যদি প্র‍্যাক্টিসে মত্ত থাকি তবে ছাত্রদের দেয়ার জন্য কিছু শিখবো কখন? বিশেষ করে ব্যাপারটা যখন পোষ্ট গ্রাজুয়েশন কোর্সের। আমি তাই যেদিন কোর্স কো-অর্ডিনেটর নিযুক্ত হলাম সেদিন থেকেই সপ্তাহে ৬ দিনের পরিবর্তে ৩ দিন করে চেম্বার করতে থাকি( ডায়াগনষ্টিক সেন্টারটির প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও)। ছাত্রদের সাথে knowledge এর gradient মেইনটেইন করার জন্য ছাত্রের চেয়ে শিক্ষকের বেশী পড়াশুনা করা উচিত- এটা আমার যৌক্তিক বিশ্বাস।

ঢাকায় যেহেতু আমার কোন শিকড় নেই, আমার কোন বাচ্চাও ঢাকার স্কুলে পড়েনা -আমি দূরে কোথাও চলে যেতে বাধ্য হচ্ছি এ নিয়ে তেমন দুঃখবোধও নেই। শুধু দুঃখ হচ্ছে এ রেসিডেন্টদের সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত হব। তাদের নিয়ে আর রাউন্ডে দেয়া হবেনা, তাদের ক্লাশ পরীক্ষায় আমার কোন সংশ্লেষ থাকবেনা, নতুন কোন ব্যাচের সাথে আমার আর কোন সম্পর্ক গড়ে উঠবেনা- এ সব চিন্তায় শুধু বুকের কোনে এক হিমস্রোত বয়ে যায়। Pulmonology র যে সব কাজকর্ম এদেশ সেদেশ ঘূরে শিখে এসেছিলাম তা ও আর করে দেখানোর সূযোগ হবেনা সেটাও হতাশার।

রাষ্ট্র আমাদের উপর শোধ নিতে গিয়ে নিজেই ঠকছে না তো?

"যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে//
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।"

-
বদলি হওয়া আরেকজন চিকিৎসক
এফসিপিএস (মেডিসিন), এমডি (পালমোনোলজি)
-------------------
ভাল থাকবেন, বাংলাদেশের রোগীরা। এদেশ নয়, বিদেশই হোক আপনাদের চিকিৎসার ঠিকানা!

-
-ডা. মোঃ শাব্বির হোসেন খান
সভাপতি
মৌলভীবাজার বিএমএ।

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়