Ameen Qudir

Published:
2018-07-15 21:14:46 BdST

বিশ্বকাপ ফুটবলে ক্রোয়েশিয়া বনাম বাংলাদেশ


 


মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ
_______________________________


লেখাটির শিরোনাম দেখে মনে হতে পারে বাংলাদেশ ফুটবলে বিশ্বকাপ পর্যায়ে খেলছে ।আসন্ন খেলাটি হবে বাংলাদেশের সাথে এবারের ফাইনালিস্ট ক্রোয়েশিয়ার ।এটি একটি স্বপ্নের শিরোনাম ।অন্তত দুই দশক ধরে বাংলাদেশের ফুটবল অস্তিত্বের লড়াইয়ে খুড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিফা র‍্যাংকিং –এ তলানীতে এসে পৌঁছেছে । ফুটবলে অন্তত বাংলাদেশের আর কোন আশা নেই –এই আশংকা যখন প্রায় বদ্ধমূল তখন বাংলাদেশ ফুটবলে বিশ্বকাপ পর্যায়ে খেলবে এমন স্বপ্ন দেখাও যেন ‘পাপ ‘এর পর্যায়ে চলে যায় ।

২। বছরটি ১৯৯৩ সাল । মাত্র ২৫ বছরের ব্যবধান ।ফিফা র‍্যাংকিং –এ বাংলাদেশ ছিল ১১৯ তম স্থানে আর ক্রোয়েশিয়া ছিল মাত্র তিনটি দেশ আগে ১১৬ তম স্থানে ।রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি ‘ গল্পে ফটিক যখন জলযানে প্রথম কলকাতা যাচ্ছিল তখন সে দেখল জাহাজীরা পানির গভীরতা মাপবার সময় সুর করে বলছে ‘ এক বাউ মেলে না, দো বাউ মেলে না ,এ এ না ----‘ সেই ক্রোয়েশিয়া আজ যখন বিশ্বকাপ জিতবার স্বপ্ন দেখছে তখন আমাদের দেশের ফুটবলের স্তর মাপবার আর কোন বাউই যেন মিলছে না ।

৩। ক্রোয়েশিয়ার এই সাফল্য কি আলাদিনের আশ্চর্য কোন প্রদীপ সহসায় তাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে ? প্রকৃত কারণ হুবহু আমাদের না জানা থাকলেও অনেক সমীকরণই আমরা সাদা চোখে বিশ্লেষণ করতে পারি ।সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা ছিল এই দলের ।বৃহত্তর যুগোস্লাভিয়া ভেঙ্গে সদ্য সবাধীন ক্রোয়েশিয়া ফুটবলে তাদের সম্ভাবনা বিবেচনা করেছিল সেদিনের বাস্তবতার নিরিখেই ।তখনকার ‘আণ্ডার ডগ ‘ ক্রোয়েশিয়া হতাশায় না ভুগে ,’ব্লেমগেম’ করে নিজের খারাপ অবস্থানের জন্য নীতি নির্ধারকরা একে অন্যকে দোষারোপ না করে বুকের ভিতর একটি আগুনই জ্বালিয়ে ছিল সেটি হল নিজের দেশের প্রতি ভালবাসা ,নিজের দেশের প্রতি সন্মানবোধ । ইচ্ছাশক্তি ছিল আসমানজোড়া ।‘ট্যালেন্ট হান্ট’ করে সারা দেশে চিরুনি অপারেশন চালিয়ে সম্ভাবনাময় মেধাবী খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করেছিল । ব্যক্তিগতভাবে কারো প্রিয়পাত্র নয় ,বরং দক্ষ -পরিশ্রমী দলের জন্য লাগসই কোচ নিয়োগ দিয়েছিল ।ভীতি-নিষেধ ,রাজনীতি ,আমলাতন্ত্র ,প্রশাসনের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রেখেছিল কোচকে ।টিম ক্যাপ্টেন নির্বাচনও করেছিল মেধা আর নেতৃত্ব দেয়ার গুণাবলী সম্বলিত খেলোয়াড়কে ।ক্যাপ্টেনও তাঁর অধিনায়কত্ব করেছিল ব্যক্তিগত পছন্দ –অপছন্দ অথবা মামা-চাচার প্রভাবকে উপেক্ষা করেই ।কোন ভাল খেলোয়াড়কে প্রতিহিংসার কারণে তুচ্ছ অভিযোগকে ফুলিয়ে –ফাপিয়ে সাইড লাইনে পাঠিয়ে দেয়া হয় নি । অযোগ্য কোন খেলোয়াড় ‘রাজইচ্ছায়’ দলে সুযোগ পায় নি । নিয়মিত অনুশীলন হয়েছে ।বিদেশের মাটিতে খেলতে যাবার সময় খেলোয়াড়ের চেয়ে আমলা দিয়ে দল ভারী করে নি । বিশেষ কোন খেলোয়াড়কে নক্ষত্র বানাতে যেয়ে ‘টোটাল ফুটবলের ‘ অকাল মৃত্যু ঘটায় নি ।দেশের অর্থনৈতিক ক্ষমতা অনুযায়ী উঁচুমানের বাজেট নির্ধারণ করেছিল ।শুধু সরকারের দিকে না তাকিয়ে পাশাপাশি স্পন্সর খুঁজে বের করে খেলোয়াড়দের ‘ইনসেনটিভ ‘ দিয়েছিল ।নিজদল জিতলে আনন্দে খেলোয়াড়দেরকে রাতারাতি তারকা বানিয়ে অত্যাধিক প্রত্যাশার স্নায়ুর চাপে দলকে ‘কনফিউজড’ করে দেয় নি ।আবার পরাজয়ের সাথে সাথে সমালোচনার তুবড়ি ছুটিয়ে নিজদলকে নাঙ্গা করে খেলোয়াড়দের নৈতিক মনবল ধূলায় মিশিয়ে দেয় নি ।খেলোয়াড়ি ফর্ম চূড়ান্তে থাকতে আগামি দিনের মন্ত্রী –মিনিস্টার বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে খেলোয়াড়দের মতিবিভ্রম করে নি ।খেলোয়াড়রা তাদের ব্যক্তিজীবনের কোন অপছন্দের সহকর্মীকে খেলার মাঠে নিজের নাক কেটে হলেও সেমসাইড করে তার ক্যারিয়ারকে ধ্বংস করে দেয় নি । রাতারাতি বিশ্বকাপ ঘরে তুলবার স্বপ্নে বিভোর না হয়ে ছোট ছোট সাফল্যকে পূঁজি করে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এতদূর এসেছে ।তাদের খেলার মোহনভঙ্গী রাষ্ট্রের প্রেসিডেণ্টকে প্রটোকল না নিয়ে সাধারণ গ্যালারীতে বসে নিজ দেশের জার্সি পরে দলকে ক্রমাগত উৎসাহ দেয়ার ঝর্নাধারায় ধুইয়ে দিয়েছে ।

৪। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ক্রোয়েশিয়ার অনেক গুণ বেশি ।আশির দশকেও ঢাকা স্টেডিয়ামে ওয়ান্ডারার্স ,ব্রাদার্স ইউনিয়নের মত সেকেন্ড লাইনের মত দলের পাশাপাশি মোহামেডান বা আবাহনীর মত টপ ফেভারিট টিম ঢাকা স্টেডিয়ামকে আনন্দ নগরী বানিয়েছিল ।সালাউদ্দিন ,আসলাম ,চুন্নু,মুন্না ,অমলেশসহ অসংখ্য খেলোয়াড়েরা খাপখোলা তরবারির মত ঝলসে উঠেছিল । সেইসব সাফল্যকে শুধু ইতিহাসের পাতায় না পাঠিয়ে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেদের সীমাবদ্ধতাগুলিকে চিহ্নিত করে নতুন আলোর হাতছানিতে আবার পথচলা শুরু করা যায় না ?

৫।কোন প্রত্যাশাই অমূলক নয় । দুইযুগ আগেও বাংলাদেশের ক্রিকেটও আণ্ডার ডগ ছিল । প্রতিবেশী ভারত বা পাকিস্থানের বিজয়ে কিছুটা নিজদেশের বিজয়ের স্বাদ নিতে হত ।এই দুই যুগে সেই ক্রিকেট প্রতিবেশী ভারত বা পাকিস্থানকে অসংখ্যবার হারিয়েছে ।ওয়েস্ট ইন্ডিজ ,নিউজিল্যান্ড ,অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের এমন কোন ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ নেই যাকে এককালের রুগ্ন বাংলাদেশ ক্রিকেট দল অন্তত একবার করে হারায় নি ।সেই বিবেচনায় ক্রিকেটে বাংলাদেশ বিশ্বকে জয় করেছে । কোটি কোটি বাংলাদেশীর মত আমিও স্বপ্ন দেখি আগামী দিনগুলিতে বাংলাদেশের ফুটবল দল ক্রিকেটের ন্যায় শূন্য থেকে শুরু করে ক্রোয়েশিয়ার মত ফাইনালিস্ট না হোক অন্তত সন্মানজনক একটি অবস্থানে চলে আসে ।
____________________________

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ,
উপ অধিনায়ক ,আর্মড ফোর্সেস ফুড এন্ড ড্রাগস ল্যাবরটরী

আপনার মতামত দিন:


খেলা এর জনপ্রিয়