Ameen Qudir

Published:
2019-09-12 10:12:54 BdST

অরলান্ডোর চিঠি : স্মৃতিভ্রংশ


ডা. বি এম আতিকুজ্জামান
প্রবাসী প্রথিতযশ চিকিৎসক

_________________________

 

ভিক্টর যখন কথা শুরু করে, তা চলতেই থাকে। অনেকটা লক্ষহীন ভাবে। মিশেল তখন স্নেহ ভরা কণ্ঠে ভিক্টরকে থামতে বলে।

 

আজকাল কোনো প্রশ্নের সরাসরি উত্তর ভিক্টর দেয় না। এই যেমন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, গত সাত দিন ঘুম কেমন হয়েছে? ভিক্টর বললো , ‘ঘুম তো খুব দরকার। ঘুমালে ভালো লাগে। ছোটবেলায় মা আদর করে ঘুম পড়িয়ে দিতেন। ‘ তখন মিশেল বললো , ডাক্তার, ওর ঘুম ভালো হচ্ছে।

 

ভিক্টর আর মিশেল কে আমি গত পনেরো বছর ধরে চিনি। ভিক্টরের বয়স এখন আশি ছুঁই ছুঁই। মিশেলের পঁয়ষট্টি। মিশেল কিছুদিন আগে তাঁর চাকরি থেকে অবসরে চলে গিয়েছে। ভিক্টর অবসরে গিয়েছে বছর দশেক আগে।

 

অসম বয়সী এ দম্পতি আমার খুব প্রিয়। ভিক্টর কৃষ্ণাঙ্গ। জর্জিয়ার এক ফার্মে তাঁর জম্ন। বাবা ছিলো একজন দাস। অল্প লেখাপড়া করে সেনাবাহিনীতে নাম লেখালো সে। ভিক্টর ভিয়েতনামের যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে কানেটিকাটের একটি ছোট্ট শহরের এক কারখানাতে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ শুরু করলো। সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন সময়ে সে লেখাপড়া করে একজন প্রকৌশলী হয়ে যায়। একদিন সেই শহরের একটি পাবে তাঁর সাথে পরিচয় হয় মিশেলের সাথে।

 

মিশেল শেতাঙ্গ। নিউ ইয়র্ক এর আলবেনি শহরে তাঁর জন্ম। সৎ বাবার লোলুপ দৃষ্টি থেকে বাঁচবার জন্য বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের ছোট এক শহরে পাবে কাজ নিয়েছিল সে। ভিক্টর তাঁকে স্কুলে যাবার জন্য উৎসাহিত করতো। অবশেষে রাজি হয়ে গেলো সে। ততদিনে মন দেয়া নেয়া শুরু হয়েছে তাঁদের। কলেজ শেষ করার পরপরই মিশেল তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলো। নতুন জীবন শুরু হলো এ যুগলের।

 

মিশেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে অধ্যাপনা শুরু করলো। তাদের একমাত্র সন্তান গ্রেগ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা শেষ করে সেখানেই অধ্যাপনা শুরু করলো। সুখী এ দম্পতি অরল্যান্ডোতে এসেছে দু দশক আগে।

 

বই পড়তে আর ভ্রমনে তাঁদের মহা উৎসাহ। গত এক বছর হলো ভিক্টরের স্মৃতি শক্তি লোপ পাচ্ছে। কিন্তু সে একজন বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে সেটা লুকোবার চেষ্টা করছে। সব ভুলে যাওয়া প্রশ্ন গুলো সে ‘ গল্পকরণ ‘ করে ফেলে। সে মানতে রাজী নয় যে তাঁর স্মৃতিভ্রংশ রোগ হয়েছে।

 

আমি একজন প্রিয় বুদ্ধিমান মানুষের স্মৃতিভ্রংশ দেখছি। ভিক্টর আস্তে আস্তে অনেক কিছু ভুলে যাবে। অনেক আপন জনকে চিনতে পারবে না। ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে যায়।

 

প্রতিদিন ভোরে বাসা থেকে কাজে আসার পথে আমার বাবার সাথে কথা হয়। তিনিও ভুলে যাচ্ছেন অনেক কিছু। তা থেকে হতাশা জন্ম নিচ্ছে তার আর আশেপাশের সবার। স্মৃতিভংশের ওষুধ শুরু করেছেন তিনি। সে ওষুধ সহ্য করতে কষ্ট হচ্ছে তাঁর।

 

কাজ শেষে সূর্যাস্তে বাড়ি ফিরছি। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। আস্তে আস্তে আমিও স্মৃতিভ্রংশের দিকে যাবো হয়তো একদিন।হঠাৎ করে আজকের সূর্যাস্তটা আরো গভীরভাবে উপভোগ করতে ইচ্ছে হচ্ছে।

_______________________________

ডা. বি এম আতিকুজ্জামান। সুলেখক। প্রবাসী প্রথিতযশ চিকিৎসক

আপনার মতামত দিন:


প্রেসক্রিপশন এর জনপ্রিয়