SAHA ANTOR

Published:
2020-10-12 22:46:59 BdST

সোনার হরিণ'আজিরন: মাথার চুলের গোড়া থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত এমন জায়গা নাই যেখানে তার অসুখ নাই'


 


 

ডাঃ সুকুমার সুর রায়


____________________________

 

( একবিংশ - পর্ব) / আজিরন খাতুন  

আজিরন খাতুনের বয়স বত্রিশ বছর।
বাবা মায়ের সাথে ডাক্তারের কাছে এসেছেন।
সাথে তার মেয়েও এসেছে। মেয়েটির বয়স পনের বছরের মত হবে। ওর নাম আসিয়া।
আসিয়া সামনের বছর এসএসসি পরীক্ষা দিবে। আসিয়া খুবই সপ্রতিভ একটি মেয়ে। সে ভালো ছাত্রী। এইচ টি ইমাম গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের ক্লাশ টেনের ছাত্রি আসিয়া ।
পড়াশুনায় বেশ ভালো। দুই একটি লেখাপড়ার বিষয় জিজ্ঞেস করাতে সে ভালো উত্তর দিতে পেরেছে।
এই মেয়েটিই তার মা সম্পর্কে বড় বেশি উদ্বিঘ্ন।
সেই ডাক্তারকে বার বার বলছিল - " স্যার, আম্মাক ভালো কইর‍্যা দ্যাখেন। আম্মা ম্যালাদিন হইলো অসুস্থ , ম্যালা ডাক্তারের ওষুধ খাওয়ানো হইছে, কিছুতেই কিছু হইত্যাছে না। "
চঞ্চলা আসিয়াকে জিজ্ঞাসা করা হলো - কোথায় কোথায়, কোন্ কোন্, ডাক্তার দেখানো হয়েছে? সেই সমস্ত কাগজপত্র দেখাও।
আসিয়া লজ্জিত হয়ে বলে উঠল - " এ আল্লা! সেগুল্যান তো আনা হয় নাই।
তোমাদের সাথে নানা নানি এসেছেন, বাবা কই?
-- আসিয়া এমন ভাবে বলে উঠলো! যেন আমার না জানাটা একটা অপরাধ!
সে বলল -- " এ আল্লা! জানেন না!? আমার আব্বা তো মালয়েশিয়া থাকে! "
একথা শুনে আমার মস্তিষ্কের কোষে কোষে বার কয়েক শব্দগুলি ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো।
-- " আমার আব্বাতো মালয়েশিয়া থাকে!" "আমার আব্বাতো মালয়েশিয়া থাকে!!"
আসিয়ার আব্বা সোলেমান পনেরো বছর হল মালয়েশিয়া থাকে।!
এরপর আজিরনের দিকে মনোযোগ দিতে হল।
তার রোগের ইতিহাস নেওয়ার চেষ্টা করা হল। কিন্তু আজিরন কিছুতেই মুখ খুলতে চাইছে না। হতে পারে গ্রামীণ সমাজের রক্ষণশীলতার স্বাভাবিক লজ্জা। হতে পারে আজিরনের বুকের ভিতরে জমে থাকা কষ্ট পাথরের মত চেপে বসে থাকায় তা সহজে গলে গলে মুখ দিয়ে বের হতে চাইছে না!।
অনেকটা সময় নিয়ে ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসাবাদ করায় আস্তে আস্তে আজিরনের মুখ খুললো।
আজিরন তার অসুখের যত বর্ননা দিল তাতে ডাক্তারের খেই হারিয়ে ফেলার যোগাড় হল।
মাথার চুলের গোড়া থেকে শুরু করে পায়ের নখ পর্যন্ত এমন কোন জায়গা নাই যেখানে তার অসুখ নাই।!
তার মাথার ব্যাথা, ঘাড়ে ব্যাথা, বুকে ব্যাথা, পেটের ব্যাথা, পায়ে ব্যাথা। বুক ধড়ফড় করে, অস্থির লাগে, মাথা দিয়ে, কান দিয়ে, গরম আগুনের মত ধাপা বের হয়, ঘাড় টেঁসে আসে, পেট কামড়ায়, বুক জ্বালাপোড়া করে, ঘুম হয় না, বালিশে মাথা রাখলে মাথা ঝিম ঝিম করে, কারো কথা সহ্য হয় না, কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে না, রাগ হয়, খাবারে অরুচি, ঘন ঘন প্রস্রাব হয়, পায়ের পাতা আগুনের মত জ্বলে, কোন কিছু ভালো লাগে না, মরে যেতে ইচ্ছা করে, আরো অনেক সমস্যা।
রোগের ইতিহাস লিখতে লিখতে ডাক্তারের প্রেস্ক্রিপশন প্যাডের পাতা শেষ হয়ে যাবার উপক্রম হল কিন্তু আজিরনের রোগের ইতিহাস যেন শেষ হতে চায় না।
সামান্য কিছু রুটিন পরীক্ষা করতে দেওয়া হল।
স্বাভাবিক ভাবেই পরীক্ষা নিরীক্ষায় কোন সমস্যা ধরা পড়ল না।
রিপোর্ট দেখা শেষ করা মাত্রই চঞ্চলা আসিয়া উদ্বেগের সাথে জিজ্ঞাসা করল -- " স্যার কি ধরা পইরছ্যে? "
আমি বললাম-" কিছুই ধরা পড়ে নাই । "
আসিয়া বড়ই হতাশ ভঙ্গিতে বলে উঠল - " এর আগেও কুন ডাক্তারের কাছে কিচ্ছু ধরা পড়ে নাই! "
একটা প্রেস্ক্রিপশন লিখে আসিয়ার হাতে দিয়ে কিছু বলার শুরুতেই আসিয়া আবারো হতাশ ভঙ্গিতে বলে উঠল --"কোন রোগতো ধরা পড়ে নাই, তাইলে কিসের ওষুদ দিল্যান?"
তখন আসিয়াকে, আসিয়ার মাকে, আসিয়ার নানা নানিকে, বেশ কিছুক্ষন কাউন্সেলিং করে বিদায় করতে হল।
ডাক্তারদের আবার এত লম্বা ইতিহাস, এত লম্বা কাউন্সেলিং করার সময় কোথায়?!
রোগির লম্বা সিরিয়াল আছে না!?
আসিয়াদেরকে যা বললাম, তা আসিয়ারা স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে চাইল না।
আমাদের সমাজও সহজে মেনে নিতে চায় না।
এ কারনে চিকিৎসা শুরু করতেও অনেক দেরি হয়ে যায়।
আসিয়াদেরকে যা বলা হল সতেরো কোটি মানুষের তা জানা দরকার আছে।
মানুষের শরীরেই শুধু রোগ হয় না, তার মনেও রোগ হয়। এর সংখ্যা একেবারে কম নয়, মোট রোগীর তিরিশ পার্সেন্ট কমপক্ষে।
আজিরনের রোগের নাম- ''মেজর ডিপ্রেসিভ ইলনেস।''
তীব্র মাত্রার বিষন্নতা রোগ। এটি এক ধরনের মানসিক রোগ।
আজিরনের যখন বিয়ে হয়েছিল তখন তার বয়স ছিল পনেরো বছর। বছরখানেক স্বামী সোলেমানের সাথে ঘর করেছিল। তারপর আসিয়ার জন্মের কিছুদিন পরেই সোলেমান মালয়েশিয়া চলে গেছে।
ইতিমধ্যে কেটে গেছে পনেরোটি বছর।
এর মাঝে সোলেমান দুই এক মাসের জন্য যে দেশে আসে নাই তা নয়, তবে তা মনে রাখার মত নয়।
পনেরটি বছর যাবত আজিরন স্বামীর বিচ্ছেদ বেদনায় ভুগছে। শশুড়- শাশুড়ি যে খুব ভালো বেসেছে তাও নয়, তাই যদি বাসতো নিশ্চয়ই তাদের কেউ ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসতো, তারা কেউ আসে নাই।, এসেছে নিজের বাবা মা। দেবর ননদ ভাল চোখে দেখে তাও বলা যাবে না।
স্বামীর বিচ্ছেদ, শশুড় শাশুড়ির গঞ্জনা, দেবর ননদের নিরব অত্যাচারের কষ্ট বছরের পর বছর ধরে আজিরনের বুকের ভিতরে জমতে জমতে ভারি পাথরের মত চেপে বসে গেছে!
সেই অপ্রকাশ্য জমে যাওয়া কষ্ট কোন পথ না পেয়ে শরীরের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ফুঁড়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে বের হয়ে আসতে চাইছে।
সতেরো কোটি মানুষের দেশের এক কোটিরও বেশি 'সোলেমান' স্ত্রী পুত্র পরিবার ছেড়ে বিদেশের মাটিতে অবস্থান করছে।
কঠোর পরিশ্রম করে ঘামে ভেজা ময়লা টাকা পাঠাচ্ছে দেশে। সেই ময়লা টাকায় আমাদের ফরেন রিজার্ভ বাড়ছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে । সেই সাথে সমান তালে বাড়ছে লাখো আজিরনের বুকের পাথরচাপা কষ্ট!!
(----- চলবে-------)

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়