DR. SUKUMAR ROY

Published:
2020-06-23 08:31:57 BdST

কাঁঠাল:ডিজির ড্রাইভার একটি ও সিভিল সার্জন আরেকটি ব্যাগ ধরে আছেন: যা ভাবছেন , ঠিক উল্টো কাহিনি


 


ডা.সুকুমার রায়
সুলেখক: জীবনের সত্য লেখেন যিনি
____________________

রিক্সাওয়ালা দুক্কা মিয়াঁ পড়িমরি করে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় রিক্সা চালিয়ে নিচ্ছে! দুক্কা মিয়াঁ কেমন করে যেন বুঝে ফেলেছে যে, আমি নিশ্চয়ই কোন বিপদে পড়েছি। দ্রুত অফিসে পৌছালে আমি বিপদ থেকে কিছুটা হলেও হয়তো পরিত্রান পেতে পারি।

আসল ঘটনাটি খুলে বলা যাক। মেডিকেল অফিসার হিসাবে আমার চাকুরী জীবনের এটি চতুর্থ কর্মস্থল এবং একদম নিজের এলাকা।
চাকুরীর বয়সও ৬ বছর হয়ে গেছে।
ঘটনার সময়কাল ১৯৯০ সালের জুন মাস।

সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে হাইওয়ের পাশে পাচিলা বাজারে আমার ছোট্ট প্রাইভেট চেম্বারে বসেছি। ২/১টি রোগি দেখে সকাল ৯টা বাজতেই দুক্কা মিয়াঁর
রিক্সায় উঠেছি।
দুক্কা আমার প্রতিদিনের বাঁধা রিক্সাওয়ালা।
গত কয়েক মাস যাবত সে আমাকে অফিসে পৌছে দেয় আবার নিয়ে আসে।

৫ মিনিটের মাথায় খেয়াল করলাম দুইটি জিপগাড়ি আমার রিক্সার পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে পুর্বদিক হতে পশ্চিম দিকে চলে গেল।
প্রথম গাড়িটি ঝকঝকে সাদা অফিসিয়াল জিপগাড়ি।
দ্বিতীয় গাড়িটিও অফিসিয়াল গাড়ি, তবে অনেক পুরানো, নীল রঙের লক্কড় মার্কা গাড়ি। হাইওয়েতে কত রকমের গাড়িইতো ছুটে চলে তাতে আমার কিবা এসে যায়! তবে হ্যাঁ, যে গাড়ির সাথে আমার চাকুরী বাকুরী রক্ষার সম্পর্ক, তাতে তো কিছু এসে যায় বইকি। এই নীল রঙের গাড়িটি চালাচ্ছে যে ড্রাইভার সে অতি পরিচিত রবিউল ড্রাইভার। আর এই লক্কড় মার্কা নীল গাড়িটি হচ্ছে আমাদের জেলার সিভিল সার্জন ডাঃ মোহাম্মদ ইসহাক আলি স্যারের গাড়ি।
এখন কথা হল সিভিল সার্জনের গাড়িতে সিভিল সার্জন নাই কেন!
তবে কি সামনের সাদা গাড়িতে রয়েছেন?
তাহলে সাদা গাড়িটি কার?
তখন মনে হল নিশ্চয়ই সাদা গাড়িটি কোন উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের!
তা তারা যাচ্ছেন কোথায়!?
আমার অফিস যেদিকে সেদিকেই যাচ্ছে গাড়ি!

তবে এখান থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ রোডের মোড় থেকে রাস্তা দুই ভাগ হয়ে দুই দিকে গেছে।
যদি দক্ষিন দিকে যায় তা হলে আমার কোন চিন্তা নাই। আর যদি উত্তর দিকে গিয়ে হাটিকুমরুল বাস স্ট্যান্ড থেকে পশ্চিম দিকের রাস্তায় যায় তাহলে আমার চিন্তার কারন আছে। কারন পশ্চিম দিকে সলংগা ইউনিয়ন সাব সেন্টার হল আমার অফিস।

অফিসিয়াল গাড়ির বিষয়টি উচ্চারন করতেই আমার মনের এই দুঃশ্চিন্তার কথা রিক্সাওয়ালা দুক্কা মিয়াঁ বুঝে ফেলেছে।
দুক্কা মিয়াঁ উল্কার গতিতে রিক্সা ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে।
যতই উল্কার বেগে ছুটুক গাড়ির গতির সাথেতো রিক্সা পেড়ে উঠবেনা।
সেই সময় আমাদের এই হাইওয়েটি এখনকার মত ঢাকার হাইওয়ে হয়ে ওঠে নাই। গাড়ি ঘোড়াও খুব কম। তাই অনেকদূর থেকেও গাড়িগুলির গতিবিধি লক্ষ্য করা যায়।
গাড়িগুলি কোথায় যেতে পারে সে বিষয়ে একটি ধারনা মনে মনে তৈরি হয়েছে।
দুইদিন আগে চৌবিলা গ্রামের উপর দিয়ে এক প্রলয়ঙ্করী ঘুর্নিঝড় বয়ে গেছে। তাতে বেশ কিছু মানুষ মারা গেছে।
সেই গ্রামে প্রেসিডেন্ট হোসেন মুহাম্মদ এরশাদ ইতিমধ্যে হেলিকপ্টারে উড়ে এসে দেখে গেছেন।
এই গাড়ি গুলির লক্ষ্য যে সেই গ্রাম, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই।
বিপদের কথা হল, সেই ঘুর্নিঝড় বিদ্ধস্ত গ্রামের অবস্থান আমার অফিস থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দক্ষিনে। আরো বিপদের কথা হল সেই গ্রামে যেতে হলে আমার অফিসের পাশ দিয়েই যেতে হবে।!

দূর থেকেই দেখা গেল দুইটি গাড়ির বহর দক্ষিন দিকে না গিয়ে উত্তর দিকে টার্ন নিল।
আমার ধুকপুকানি বেড়ে গেল।
রিক্সা ধোপাকান্দি গ্রাম বরাবর পৌছাতেই দুই পাড়ার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল গাড়িবহর পশ্চিম দিকের সলংগার রাস্তা ধরেছে!
আমার ধুকপুকানি আরো বেড়ে গেল!

মনে হতে লাগলো ৬ বছরের চাকুরী জীবনে কোন রকম অফিস টাইম হেরফের হয় নাই।
আজ এমন দিনে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ এলো, যেদিন আমার আধাঘণ্টা লেট হয়েছে।
যাত্রার আগে দুইটি রোগি দেখতে আধা ঘন্টার মত সময় ব্যয় হয়েছে জন্য, নিজের ঠোঁট কামড়াতে ইচ্ছা হল।
এখন চিন্তা হল আমার পিয়ন সাখাওয়াত অফিস খুলেছে কিনা?
পাগলা টাইপের ফার্মাসিস্ট মদন বাবু উপস্থিত হয়েছে কিনা?
সিভিল সার্জন স্যারের পরিকল্পনা থাকতে পারে আমার অফিসে পৌছে, আমাকে সাথে নিয়ে ঘুর্নিদুর্গত এলাকায় যাবে!
অফিসের ওরাও যদি অনুপস্থিত থাকে এবং কর্তৃপক্ষ যদি অফিস তালাবন্ধ পায় তাহলে কপালে দুঃখ আছে।

কি আর করা! ভবিতব্যের উপর সব ছেড়ে দিয়ে দুক্কাকে বললাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাও।

অফিসে পৌছে দেখলাম অফিস খোলা। সাখাওয়াত উপস্থিত আছে।
কেউ এসেছিল কিনা জিজ্ঞাসা করায় বলল - " না স্যার। "
যাক্ বাবা বাঁচা গেল!।

হাঁটতে হাটতে মোড়ের দোকানে গিয়ে জিজ্ঞাসা করায় জানালো দুইটি গাড়ি চৌবিলা গ্রামের দিকে গেছে।

অফিসে ফিরে মনোযোগ দিয়ে রোগি দেখতে শুরু করলাম। । সাখাওয়াত কে বলে রেখেছি কোন গাড়ি আসে কিনা খেয়াল রাখতে।

বারোটা বাজার পর হাঁটতে হাঁটতে আবার মোড়ের কাছে গিয়ে দেখি দুইটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
কাছে গিয়ে ড্রাইভার রবিউলকে জিজ্ঞাসা করতেই জানালো - " ঢাকা থেকে গতরাতে স্বাস্থ্য মহাপরিচালক প্রফেসর এ, টি, সিদ্দিকী স্যার এসে সার্কিট হাউজে ছিলেন। সকালে সিভিল সার্জন স্যারকে সাথে নিয়ে চৌবিলা গ্রামে ভিজিটে গিয়েছিলেন।"
বললাম - এখন কোথায়?
ও বলল -"হাটের মধ্যে সবজি কিনতে ঢুকেছে।"

দ্রুত সবজি বাজারে গিয়ে দেখি ডিজি স্যার পাগলের মত টাটকা সবজি কিনছেন এবং স্যারের ড্রাইভার একটি ব্যাগ এবং আমাদের সি, এস, স্যার অসহায়ের মত আরেকটি ব্যাগ ধরে আছেন।
আমি গিয়ে লম্বা করে একটি সালাম দিতেই সি,এস স্যার পরিচয় করিয়ে দিলেন -- " স্যার, স্যার, আমাদের এখানকার 'মেডিকেল অফিসার,' স্যার। "

আমি আমার অফিসে বসার জন্য স্যারকে বিনীত অনুরোধ করলাম। তিনি প্রত্যাখান করে বললেন - "সময় নাই, ঢাকায় ফিরতে হবে। "

কি একটি সব্জির দাম সিএস স্যার দিতে চাইলে ডিজি স্যার কড়া ধমক দিয়ে বলে উঠলেন - " তেল মারবেন না। "
সিএস স্যারের অসহায়ত্ব দেখে মনে মনে বেশ মজা পেলাম। তার হাত থেকে ব্যাগটি নিয়ে তাকে একটু লাঘব করার চেষ্টা করলাম।

অবশেষে হাটের বাইরে এসে গাড়ির কাছে পৌছাতেই একজন লোককে মাথায় করে মাঝারি সাইজের একটি পাঁকা কাঁঠাল নিয়ে হাটের দিকে যেতে দেখা গেল।
ডিজি স্যার আমাকে উদ্দেশ্যে করে বললেন - " "এম, ও, সাহেব তোমার এলাকা, কাঁঠাল কিনে দাওতো"।
আমি মহা সমারোহে দামাদামি করে পঁচিশ টাকা ঠিক করলাম, স্যারকে জানালাম " স্যার, পঁচিশ টাকা। "

স্যার মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করা শুরু করতেই আমি ভয়ে ভয়ে ভদ্রতাসূচক বললাম - " স্যার আমার এলাকা। " স্যার রা' রা' করে থামিয়ে দিয়ে, কাঁঠালের দাম দিয়ে, আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে গাড়িতে উঠে গেলেন।

কোথা থেকে রিক্সাওয়ালা দুক্কা মিয়াঁ হাজির হয়ে বলল - " স্যার এত্ত বড় অফিসার! কাঁঠালের দামডো আফনে দিব্যার পাইরত্যান!!।। "
__________________________


ডা.সুকুমার রায় : প্রাক্তন সহকারী পরিচালক , ডিজি হেল্থ , ঢাকা

_________INFORMATION________________

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়