ডাক্তার প্রতিদিন

Published:
2020-05-20 12:12:32 BdST

কোভিড-১৯: ‘মাত্র ২০ টাকায় করোনা ভাইরাসের ঔষধ’, কিছু প্রশ্ন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা


 


ডা. মো. মারুফ হক খান
এমবিবিএস, এমপিএইচ, এমএসসি, পিএইচডি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
____________________

“বাংলাদেশে গবেষকরা ৬০ জন করোনা রোগীর উপর টেস্ট করে দেখেছেন- ইভারমেকটিন সিঙ্গেল ডোজের সাথে ডক্সিসাইক্লিন খেলে রোগীর মাত্র ৩ দিনে ৫০% উপসর্গ হ্রাস পায়, এবং ৪ দিন পুরোপুরি ভাইরাস মুক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশী চিকিৎসক ডা. তারেক আলম এ সম্পর্কে বলেন, ‘এটি আমাদের কাছে রীতিমতো বিস্ময়কর লেগেছে।” - খবরটি দেখে আমিও বিস্মিত হয়েছিলাম পরে যা হতাশায় পরিণত হয়েছে।

খবরটি অনেকের জন্য খুবই আশাব্যন্জক কিন্তু একজন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে এটি আমার জন্য খুবই হতাশাজনক একটি খবর। এই সংবাদটি আবারো প্রমাণ করে গবেষণা নিয়ে দেশের কিছু সম্মানিত চিকিৎসকগণের সম্যক ধারণা নেই; সেই সাথে এই খবরটি নিয়ে গণমাধ্যমের অতি উৎসাহী প্রচারণা গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, চিকিৎসার জন্য যে কোন ঔষধের কার্যকারিতা দেখার জন্য ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল’ করে তার ফলাফল দেখতে হয়। যেহেতু ‘মানুষ’-এর মধ্যে ঔষধের কার্যকারিতা দেখার বিষয় রয়েছে এবং গবেষণায় ব্যবহৃত ঔষধের ব্যবহারে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির যেকোন ক্ষতি এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও থাকতে পারে তাই ‘ইথিকেল সনদের’ উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় । সেই সাথে যেকোন গবেষণার জন্য কিছু নিয়ম বিশ্বব্যাপী অনুসরণ করতে হয়। বাংলাদেশে এরূপ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ (বিএমআরসি) হতে ইথিক্যাল সনদ নিতে হয়।

‘মাত্র ২০ টাকায় করোনা ভাইরাসের ঔষধ’ বিষয়ক গবেষণাটি নিয়ে নিচের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো রয়ে গিয়েছে!

* গবেষণাটি সম্পাদনারপূর্বে বিএমআরসি হতে কোন ইথিক্যাল সনদ নিয়েছিলেন কিনা? যদি ইথিক্যাল সনদ বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোন অনুমোদন ছাড়া ৬০ জন রোগীর উপর ঔষধ সমূহ প্রয়োগ করে গবেষণাটি করে থাকেন তবে মেডিক্যাল এবং গবেষণার ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন ।

* গবেষকদল এখনো প্রাকাশ করেননি, গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের কোন পদ্ধতিতে নিবন্ধন করেছেন এবং কোন কোন বিষয়ের উপর গুরুত্ব নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের নির্বাচন (সিলেকশন ক্রায়টেরিয়া) করেছেন?

* গবেষণাটিতে কয়টি গ্রুপের উপর পরিচালিত হয়েছিল?

* গবেষণাটিতে কন্ট্রোল গ্রুপ সহ অন্যান্য গ্রুপে কারা ছিলেন এবং তাদের উপর কি ধরণের ঔষধ বা প্ল্যাসেবো, কি মাত্রায় প্রয়োগ করা হয়েছিল?

* গবেষণার ধরণ কি ছিলো? যদি রেন্ডোমাইজড কন্ট্রোল ষ্টাডি হয়ে থাকে তাহলে কি পদ্ধতি রেন্ডোমাইজেশন করা হয়েছিল?

* পরিচালিত গবেষণাটিতে ঔষধ প্রয়োগের পদ্ধতি কি ছিল? গবেষণা কর্মটিতে Unblinded or open label, Single blind or single-masked, Double blind or double-masked বা Triple blind এর মধ্যে কোনটি অনুসরণ করা হয়েছিলো?

* গবেষণাটি কতদিনব্যাপী পরিচালিত হয়েছিল?

* গবেষণাটিতে “ইভারমেকটিনের সিঙ্গল ডোজের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক ডক্সিসাইক্লিন প্রয়োগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মাত্র তিন দিনে ৫০ শতাংশ লক্ষণ কমে যায় আর চার দিনে করোনাভাইরাস টেস্টের রেজাল্ট নেগেটিভ আসে” কিন্তু অন্যান্য গ্রুপের (আদৌ যদি থাকে) ফলাফল কি ছিল? প্রাপ্ত ফলাফল এর গ্রহণযোগ্যতা কিভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে (P-value কত পাওয়া গিয়েছে)?

* গবেষণাটিতে ব্যবহৃত ঔষধ প্রয়োগে হৃদরোগ, কিডনী রোগ সহ অনান্য রোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে কি ফলাফল পাওয়া গিয়েছে?

গবেষণাটি নিয়ে এরকম আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসীত বিষয় রয়েছে যা সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। এমনও হতে পারে কোন প্রকার ঔষধ প্রয়োগ ছাড়া, বা ভিন্ন ঔষধে, বা একই ঔষধ ভিন্ন মাত্রায় প্রয়োগে একই বা এরচেয়েও ভালো গ্রহণযোগ্য ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া একটি বেসরকারী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে এতো কম সময়ে ৬০ জন কোভিড-১৯ ডায়াগনোস্ট রোগী কোথায় পেলেন, আবার চারদিন পর পুনরায় পরীক্ষা কোথায় করালেন সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। ইভারমেক্টিন নিয়ে বিভিন্ন দেশে গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। ঔষধটির কার্যকরীতা প্রমাণিত হতেও পারে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণা ব্যতিত তথ্যের কোন মূল্য নেই! হয়তো উক্ত গবেষণায় উনারা রোগীকে কোন ঔষধ না দিলেও সুস্থ্য হতো যেহেতু কোভিড-১৯ অনেকাংশে কোন চিকিৎসা ছাড়াই ভালো হয়ে যায়।

আবেগ, অজ্ঞতা বা প্রচারণা দিয়ে বিজ্ঞান পরিচালিত হয় না। চিকিৎসাবিজ্ঞান জীবন মান উন্নয়ন করতে এবং জীবন বাঁচাতে কাজ করে। এখানে কোন ধরণের গাফলতি বা গোঁজামিল দেওয়ার সুযোগ নেই। একই সাথে মূলধারার গণমাধ্যমসূহকে চিকিৎসা বিষয়ক গবেষণা সম্বন্ধে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আরো দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

##

AD.. 

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়