Ameen Qudir

Published:
2020-03-03 10:53:34 BdST

ডাক্তার জীবনের সুখ-দুঃখডাক্তাররা ফিনিক্স পাখির মতো, তাকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার নতুন করে জেগে উঠতে হয়


ডা.হিমেল ঘোষ
_____________________________


ডাক্তাররা ফিনিক্স পাখির মতো, তাকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার নতুন করে জেগে উঠতে হয়।একটা পরীক্ষা দিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই, আবার নতুন করে শুরু করতে হয়।সেই এসএসসি পরীক্ষা থেকেই যার শুরু।এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার কয়েকদিনের মধ্যেই আবার শুরু হয় এইচএসসি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি।দৌড়,দৌড় আর দৌড়।চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই দরজায় এসে কড়া নাড়ে এইচএসসি পরীক্ষা।কোনমতে পড়িমড়ি করে এইচএসসি পরীক্ষা শেষে শুরু হয় আসল জীবনযুদ্ধ।ক্যারিয়ার গঠনের যুদ্ধ।মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধ।১টি আসনের বিপরীতে প্রায় ৪০-৫০ জনের সাথে লড়াই করে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগটা মেলে। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার আগে অনেকেই বলে-এই পরীক্ষাটা একটু কষ্ট করে দাও,এরপর শান্তি আর শান্তি। যারা এই কথা বলে-তাদের মাঝে মাঝে খুব দেখতে ইচ্ছে করে, তাদের যদি দেখানো যেত -পরীক্ষা কাকে বলে এবং কত প্রকার ও কিকি!!মেডিকেল জীবনের প্রথম দিন থেকে শুরু হয় এনাটমি-ফিজিওলজি-বায়োকেমিস্ট্রির আইটেম নামক পরীক্ষার উৎপাত।পাশাপাশি হোস্টেল জীবনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার লড়াই তো আছেই,সেই সঙ্গে চলে ক্যান্টিনের নানারকম বিস্বাদ খাবার খেয়ে ক্ষুধা নিবারণের লড়াই।কিছু দিন যেতে না যেতেই শুরু হয় কার্ড ফাইনাল নামের পরীক্ষা।কয়েকটা এরকম কার্ড ফাইনাল পরীক্ষা শেষে হুড়মুড় করে এসে পড়ে টার্ম ফাইনাল পরীক্ষা।পরীক্ষা আর পরীক্ষা।কতরকম পরীক্ষা যে আছে!এরকম আইটেম-কার্ড-টার্ম ফাইনাল পরীক্ষা শেষে একসময় এসে পড়ে প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষা নামক ভয়াবহ এক পরীক্ষা।দীর্ঘ ২-৩ মাস ধরে চলা এ পরীক্ষায় লিখিত,ব্যবহারিক ও ভাইভাতে আলাদা আলাদাভাবে পাস করে তবেই উত্তীর্ণ হতে হয়।পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তো হয়েই গেল-তখন তৃতীয় বর্ষ এর পড়ালেখার জন্য দৌড় শুরু।আর উত্তীর্ণ না হতে পারলে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার ঘানি টানতে টানতে তৃতীয় বর্ষের পড়ালেখাও চালিয়ে যেতে হয়।যেন গোদের উপর বিষফোঁড়া।তৃতীয় বর্ষ থেকে আবার শুরু হয় হাসপাতালের ওয়ার্ড প্লেসমেন্ট।তৃতীয় বর্ষের কমিউনিটি মেডিসিন-ফরেনসিক মেডিসিনের পাশাপাশি ক্লিনিকাল বিষয়ে শুরু হয় হাতে খড়ি।ক্লাস-ওয়ার্ডে ৭৫% উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি চলতে থাকে পরীক্ষা।সেই আইটেম-কার্ড-টার্ম ফাইনাল-প্রফেশনাল পরীক্ষার চক্কর। এবারো লিখিত-ব্যবহারিক-ভাইভা দিয়ে দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর শুরু হয় প্যাথোলজি-ফার্মাকোলজি-মাইক্রোবায়োলজির ত্রিমুখী আক্রমণ।সাথে সাথে ওয়ার্ড প্লেসমেন্ট ও ওয়ার্ড ফাইনাল পরীক্ষা তো আছেই।সাথে যোগ হয় এসেসমেন্ট পরীক্ষার চাপ।আবারো আগের মত আইটেম-কার্ড-টার্ম-তৃতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষা।আবারো সেই চাপ।তৃতীয় পেশাগত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই কিন্তু শেষ না। পঞ্চম বর্ষে এসে পুরোদমে শুরু হয় মেডিসিন-সার্জারি-গাইনীর পড়াশোনা।ওয়ার্ড ফাইনাল-ব্লক ফাইনাল-এসেসমেন্ট পরীক্ষা শেষ করে অনুমতি মেলে শেষ প্রফেশনাল পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ।আবারো ২-৩ মাস ধরে পরীক্ষা।তবে হ্যাঁ।শেষ এই প্রফেশনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই নামের পূর্বে সেই আরাধ্য ডাক্তার শব্দটি যোগ করা যাবে।এতদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রম যেন আশার ফুলে রূপ নিল।এরপর শুরু হয় ইন্টার্নশীপ।১ বছর যাবৎ বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে প্লেসমেন্ট নিয়ে ডিউটি করে ইন্টার্নশীপ সার্টিফিকেট নিয়ে তবেই মিলে বৈধভাবে রোগী দেখার সুযোগ-সেই আরাধ্য বিএমডিসি সার্টিফিকেট।কিন্তু পাশাপাশি শুরু হয় ক্যারিয়ার গঠনের এক অনিশ্চিত জীবন।একদিকে যেমন বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নাহলে নিদেনপক্ষে বিভিন্ন ক্লিনিক ডিউটি বা চেম্বার প্রাকটিস, অন্যদিকে চলে স্নাতকোত্তর পরীক্ষার প্রস্তুতি ও ট্রেইনিং।এফসিপিএস-এমসিপিএস-এমডি-এমএস-ডিপ্লোমা ডিগ্রি নেওয়ার দৌড়। যেন একটি "Never ending race against time". তবে এত কষ্ট করে এমবিবিএস ও অন্যান্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর যখন রোগী চিকিৎসকের সেবায়,চিকিৎসকের চিকিৎসায় সেরে ওঠেন-তখনই চিকিৎসক জীবন সার্থক বলে মনে হয়।রোগী সুস্থ হয়ে যখন চিকিৎসকের জন্য দুহাত তুলে দোয়া করেন-চিকিৎসক জীবনের পূর্ণতা পায় তখনই।জীবনের হাজারো দুঃখ,চড়াই-উতরাই পেড়িয়ে এই দিনটির জন্যই হয়তো একজন চিকিৎসক প্রাণভরে অপেক্ষা করেন-আর এত সব কষ্টের মাঝেও চিকিৎসক খুঁজে পান তার জীবনের সুখ।


ডা.হিমেল ঘোষ
এমবিবিএস(ঢাকা মেডিকেল কলেজ),বিসিএস(স্বাস্থ্য),
মেডিকেল অফিসার,
উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ডুমুরিয়া, খুলনা।

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়