Ameen Qudir

Published:
2020-01-04 11:21:22 BdST

একজন ডাক্তার ও প্রশাসন কর্মকর্তার কঠিন জীবনযুদ্ধ ও তা জয়ের সত্য কাহিনি


 

ডা-আশিক তায়েব
________________________

(এই লিখাটা শুধু তাদের জন্যই যারা নিজেকে বড় কিছু ভাবে। অন্যকে তাচ্ছিল্য করে। আমি ৩৩ তম বিসিএস এডমিনিস্ট্রেশন(প্রশাসন) ক্যাডারের সদস্য। মেধা তালিকায় ৯৮ তম। ৩৩ তম বিসিএসে মোট বিসিএস এডমিনিস্ট্রেশন ক্যাডার ৩০০ জন ছিলেন গেজেটেড।)

৪ জানুয়ারি, ২০২০ তারিখ থেকে ৪০ তম বিসিএস পরীক্ষার লিখিত পরীক্ষা শুরু। পরিচিত কয়জনকে দেখলাম কি বিশাল আয়োজনে পড়াশোনা করছে। ফিরে গেলাম অজান্তেই ২০১১ সালের দিকে। তারিখ খেয়াল নেই। ফর্ম ফিলাপ করলাম। জমা দিলাম। আমার নিজের কিডনিতে স্ট্যান্টিং করা অবস্থায়। এর মধ্যে আম্মাও কিডনি রোগে আক্রান্ত। তার ডায়ালাইসিস শুরু হয়েছে। আমার কিডনির স্ট্যান্টিং নিয়ে ক্লিনিকে জব করা সম্ভব হচ্ছিল না। আর ওদিকে আম্মার প্রতি ডায়ালাইসিসে লাগে চার হাজার। মাসে বায়ান্ন হাজার৷ আব্বার পক্ষে অনেক বেশি লোড। ছেলে আমি একা। সাথে চারপাশে মধ্যবিত্ত চিন্তাধারা 'এমবিবিএস পাশ করলেই পকেট ভর্তি টাকা'। অথচ নিজের চলার মত অবস্থাও নেই।বাসা থেকে টাকা নেওয়ার সুযোগ নাই। এরপর শুরু পুরোদমে চেম্বার। ২ বছর ট্রেনিং (বিএসএমএমইউ এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে, যথাক্রমে কার্ডিওলজি-গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি এবং মেডিসিন) করা নিয়ে দিনের ভিতর কয়েক জায়গায় দৌড়াতাম। বাসায় বাজার টা, আম্মার কিছু ঔষধ হয়ে যাচ্ছিল। পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশন ডিগ্রি করতে যে সময় সুযোগ অর্থ লাগে তার কিছুই পাওয়ার সুযোগ নেই। টাকার পিছনে ছুটে ভুলেও গেছিলাম বিসিএসের কথা।আর বিসিএস পরীক্ষার্থী কারো সাথে যোগাযোগ ও ছিল না। প্রিলির ডেট ঘোষনার পরেও পড়ার সুযোগ হচ্ছিল না। একদিন চেম্বারে না গেলে নিজে চলার অবস্থা থাকে না। যা পাই নিজের খরচ রেখে পুরোটা বাসায় দিয়ে দেই।
চেম্বারে বই খুলা একদিকে অন্যদিকে রোগি দেখা। বিকেলে আম্মার ডায়ালাইসিস চলার সময় অধিকাংশ দিন থাকা লাগত। আম্মার প্রেসার কমে যেত। ব্লাড দেওয়া লাগত। অধিকাংশ সময় ব্লাড ডোনার ম্যানেজ করতে হত আমাকেই। জাহাঙ্গীরনগর ভার্সিটি গিয়েও ডোনার আনতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। নিরবিচ্ছিন্ন পড়ার সুযোগ কখনোই পেতাম না।কিন্তু হয়ত আম্মার দোয়াতেই যা পড়তাম তা একবারেই মনে থাকত। এরকম একবার পড়ে পড়া মনে থাকা আমার আগেও হয়নি। পরেও না।
প্রিলির পড়া পড়েছিলাম সিস্টেমিক ভাবে। সেই সিস্টেম অন্যদিন বলব।
প্রিলি দিয়ে আসলাম।আম্মার অবস্থা খারাপ হতে থাকল। ৩/৪ মাস পরপরই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লাগে। সাথে ডায়ালাইসিস। অনেক বেশি খরচ। বোনেরাও কন্ট্রিবিউট শুরু করেছিল আগে থেকেই। আব্বা জমি বিক্রি শুরু করলেন। আমি চেম্বারে দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় খবর পেলাম প্রিলির রেজাল্ট হয়েছে। নিজের রোল পেলাম রেজাল্টশীটে। বাসায় আম্মাকে জানালাম। শুধু বললেন তিনি- শেষ পর্যন্ত যেতে হবে। আর কারো কোন ভাবান্তর নেই। কথিত 'অনুপ্রেরণা' কি তা জীবনেও জানতে পারি নি আমার মায়ের কিছু নির্দেশ ছাড়া।

লিখিত পরীক্ষার সময় খুবই কস্টে গিয়েছে আমার। টাকার জন্য একই সাথে ক্লিনিকে জব রাতে-সকালে চেম্বার করতে হয়েছে। সারারাত ডিউটি করে সকালে শরীর চলত না। তাও চেম্বার, চেম্বার শেষে আম্মার ডায়ালাইসিস সেন্টারে যাওয়া, এরপর বাসায় খেয়ে না খেয়ে ফ্রেশ হয়েই আবার যেতাম ক্লিনিকে।

(২) এর ভিতর মাঝে মাঝেই কাজের ছুটা বুয়া থাকত না। এমন দিন ও গেছে, আম্মা ডায়ালাইসিসে গেছেন, বোন গেছে সাথে, আমি বাসায় এসে যখন জানছি, বুয়া আসে নাই, আম্মার এসে খেতে দেরি হবে, নিজের হাতে রান্না করেছি। কাজের বুয়া খুজেছি এলাকায় পরিচিত ভাবিদের বাসায় গিয়ে, সেই বাসায় আসছে কিনা। বোনেদের সংসার আছে। এক বোন শুধু আম্মার পাশে থাকত। আব্বাও বয়স্ক। বাকি সব কিছু দেখা লাগত। আর ডাক্তার পরিচয়ের জন্যই আম্মার ডায়ালাইসিস চলাকালিন অন্য কোথাও থাকলেও মোবাইল হাতে থাকত। এমনকি ২/৩ রাত ক্রমাগত নাইট ডিউটি করে বাসায় ফিরছি দুপুরে। ডায়ালাইসিসে গিয়ে আম্মার প্রেসার কমে গেছে। কিংবা ডায়ালাইসিসে ব্লাড ট্রান্সফিউশনের সময় পুরো ব্লাড ক্লট হয়ে গেছে, বোন ভয় পেয়ে আমাকে ফোন দিয়েছে, ডিউটি ডাক্তারকে না জানিয়ে। কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে, রিক্সায় ঘুমাতে ঘুমাতে ডায়ালাইসিস সেণ্টারে পৌছেছি।
২০১২ এর মাঝামাঝি বিসিএস পরীক্ষার লিখিত এর তারিখ দিল। অক্টোবর মাসে পরীক্ষা। আমার দৈনন্দিন জীবনের সাথে যুক্ত হল লিখিত গাইড গুলা।
যাদের বাসায় ডায়ালাইসিসের রোগি আছে, তারা জানে দিন যায় আর এই রোগির পিছনে খরচ বাড়ে। জমি বেঁচতে বেঁচতে আব্বা অর্ধেক নিয়ে আসল। আমিও বুঝলাম 'রক্ত পানি করা টাকা ' কি। ক্লিনিকের চাকুরি ছাড়লাম রীটেনের একমাস আগে। চেম্বার বন্ধ করলাম পরীক্ষার ১ দিন আগে। আল্লাহ আল্লাহ করছিলাম। পরীক্ষা পিছানোর জন্য৷ যদিও সব সাব্জেক্ট আমি শেষ করেছি একবার করে তাও সন্তুষ্ট ছিলাম না।
আল্লাহর অশেষ রহমতে পরীক্ষার আগের দিন জানলাম কি এক কারনে যেন পরীক্ষা পিছিয়েছে।
ঐদিনের মত আনন্দ আমি জীবনে তৃতীয় এবং শেষবার পেয়েছিলাম।
পরদিন থেকে আবার ব্যস্ত। গত কয়েকদিনের ঘাটতি পোসাতে হবে।
আল্লাহর কি মর্জি, ঐ সময় অযাচিত কিছু খরচ যদি আম্মার সেবায় ব্যায় করতাম, সেই পরিমান টাকাই উঠে আসত সেদিন। হয়ত আম্মার জন্য মুড়ি কিনব, মুড়ি কিনে আসছি, কোন ফার্মেসি থেকে ফোন আসল, রোগি আছে৷। মুড়ির ৬০ টাকা৷ আর রিক্সাভাড়া ২০+২০ =৪০ মোট ১০০ টাকাই ভিজিট পেতাম। এরকম আরো বহুবার হয়েছে।

(৩) এইভাবেই কাটছিল আমার দিন রাত্রিগুলো। আম্মা এর ভিতর হাসপাতালে ভর্তি হলেন দুইবার।
নতুন তারিখে রীটেন শুরু হল। গণভবন স্কুলে সীট। দুইবেলা করে পরীক্ষা। প্রথম পরীক্ষার দিন সকালে দেখলাম নাস্তা খাওয়ার কিছুই নাই। আম্মা সারাজীবন রান্নাঘরেই দিন কাটাতেন। ইন্টার্ণী শেষ করে ঢাকায় আসার পরপর যখন দেখলাম তার কিডনিরোগ খারাপের দিকে যাচ্ছে (২০০৯ সাল) তখন আমি চিল্লাচিল্লি করে রান্নাঘরে যাওয়া বন্ধ করিয়েছি৷ ছুটা বুয়াও আমি ঠিক করেছিলাম। পরীক্ষার আগের দিন বাসার কাউকে বলি নাই কাল আমার রীটেন। মনে হচ্ছিল, আম্মার কানে গেলে আম্মা সকালে উঠে রান্না ঘরে দৌড়াবেন। কারন বুয়া আসে সকাল ৯ টার পরে। আর আমার পরীক্ষা শুরু সকাল ১০ টায়। সকালের পড়া টুকু হবে না। তারচে না খেয়ে যাওয়াই ভাল। স্পষ্ট মনে আছে, ৬.৪৫ এ ওভেনে পানি গরম করে চা বানিয়ে টোস্ট দিয়ে খেতে খেতে পড়ছিলাম সেই শীতের ভোরে। দুইবেলা পরীক্ষা। দুপুরে খাওয়া বাইরে থেকে খেতেই হবে৷ চা টোস্ট খেয়ে পরীক্ষা হলে গেলাম৷ চারিদিকে দেখি প্রতি পরীক্ষার্থীর পাশে একজন করে গার্ডিয়ান৷ কেউ পরীক্ষার্থীকে বাতাস করছে কেউ পানির ফ্লাক্স হাতে দাঁড়িয়ে আছে পরীক্ষার্থীর পাশে। আমি পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছিলাম। কারন ক্লাস ওয়ান থেকে স্কুল কলেজে প্রতি পরীক্ষার সময় আম্মা থাকতেন আমার পাশে আর এইরকম গার্ডিয়ানদের মতনই করতেন। চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খেয়ে ঢুকলাম পরীক্ষা হলে। রীটেন দিলাম। মাঝখানের ব্রেকে দেখলাম সবাই বড় বড় বাটি বের করে হুম হুম করে খাচ্ছে আর পড়তেছে। সামনে বিরিয়ানিও বিক্রি করছে৷ ৬০ টাকা করে৷ সেই সময় ৬০ টাকা এখনকার ২০০ টাকার সমান। আর খাওয়ার রুচিও ছিল না৷ চা কেক আর কিছু খেয়ে ঢুকলাম৷ পরীক্ষা দিলাম। বের হয়ে দেখি রিক্সা নাই। হাটতে হাটতে কলেজগেটের সামনে গিয়ে রিক্সায় উঠলাম। হাতপা থরথর করে কাপছিল। বাসায় এসে শুনি বুয়া আসে নাই। আম্মা ডায়ালাইসিসে গেছেন। তাড়াতাড়ি ভাত রেধে ডিম ভাজি করে ডাল গরম করে হাত মুখ ধুয়ে চা বানায় নিয়ে ঘরে এসে বই খুলছি এই সময় আম্মার ডাক শুনে বেরিয়ে আসলাম। সেদিন ডায়ালাইসিসে সম্ভবত হেপারিন বেশি দিয়েছিল। আম্মার নাক মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। তাড়াতাড়ি বোনেদের খবর দিয়ে এম্বুলেন্স ডেকে তাকে হাসপাতালে পাঠালাম৷ ঘড়িতে সময় তখন রাত ১১ টা। কাল দ্বিতীয় দিনের দুই পেপার পরীক্ষা৷ প্রচন্ড হতাশা ক্লান্তি নিয়ে ঝরঝর করে কেঁদেছিলাম আমি।
২য়, ৩ য় দিন পরীক্ষা এভাই গেল। সাথে যুক্ত হল পড়ার মাঝখানে ১০০ বার আমার বোনেদের ফোন দেওয়া। আসলে আম্মার কন্ডিশন এতই ক্রিটিকাল ছিল, তারা ভয় পেত। ডাক্তারদের সিদ্ধান্তগুলোও আমাকে মিনিটে মিনিটে জানাত। পরীক্ষার কথা কাউকে জানাতাম না। এজন্য কেউ জানত ও না।
এত খারাপ কন্ডিশনে কেউ বিসিএস দেয় নাই নিশ্চিত। অভাব থাকতে পারে। কিন্তু মানসিক অস্থিরতা+ হঠাৎ অর্থসংকট নিয়ে কয়জন পরীক্ষা দেয়? আর ক্রমাগত খাটুনিতে আমার শরীরে ক্লান্তিও ভর কর‍ছিল খুব বেশি।

না পড়ে কেউ বিসিএসের দুই ধাপ পার হয় না। কেউ একবার পড়ে। কেউ ১০ বার এক পড়া পড়ে। গভঃ ল্যাবের ছাত্র+বাংলায় লিখালিখি+,টুকটাক ছবি আঁকার কারনে রীটেনের প্রতিটা খাতাই হয়েছিল আমার সন্তুষ্টির কারন। এগুলো বেসিক। কেউ শিখাতে পারে না। মোট ১১০০ নাম্বার ( বোথ ক্যাডার) এর পরীক্ষা দিয়েছি। বলাই বাহুল্য টেক্নিকাল ক্যাডার যতই ভাল এক্সাম হয়, সেটা টেকনিকাল ক্যাডারেই যোগ হয়। জেনারেল ক্যাডারে এই নাম্বার যোগ হয় না।

প্রতিটা এক্সামেই লুজ শীট নিয়েছি। বাংলা বিষয়ের খাতায় কমপক্ষে ৪ টা শীট লেগেছে (প্রতি পৃষ্ঠায় ১৬-১৮ লাইন)। বাংলা ২য় পত্রে লুজ শীট লেগেছিল ১১ টা। রীটেন শেষ করার দিন বাসায় আম্মাকে নিয়ে আসা হয়। আবার একটা ক্লিনিকে জয়েন করি ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ থেকে। আগের দুইটা ক্লিনিকের মোট বেতনের একটু কম এই খানের বেতন। এবং এই ক্লিনিকে চাকুরি নিয়েই আম্মার দিকে খেয়াল রাখায় ঘাটতি পরে। এটাই বড় বিপদ হবে আগে বুঝি নি। এখানের নাইট ডিউটি লম্বা সময়ের। এবং বেশ কড়া নিয়ম কানুন।

(৪) আমি যখন ডিউটি করতাম সেই সময়ে কিছু আত্মীয় নামের কুলাংগার আম্মার কানের কাছে চিকিৎসার খরচ, খাওয়ার খরচ নিয়ে খোটা দিত। যেন খরচ টা তারা দিচ্ছে। আমার কাছেও এই কথাগুলো কেউ জানায় নি। আমি জানলে তাদের অবস্থা সুবিধার হবে না বুঝেই আব্বা আমাকে কিছু জানাতেন না। ক্রমাগত ভাবে আম্মা বিষন্ন হয়ে উঠছিলেন। যে খেয়ে না খেয়ে ঢাকায় নিজে তিনতলা বাড়ি বানিয়েছে তার কানের কাছে এরকম খোটা দিলে কে ভাল থাকবে? কিডনি রোগিদের আরেক টা অভ্যাস থাকে লুকিয়ে লুকিয়ে পানি খায়। আমার নাইট ডিউটির সময়, সে খালি বাসায় খাওয়ার রুমে গিয়ে এক জগ পানি খেয়ে বসে থাকত। ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ ভোরে তার বুকে ব্যাথা উঠল। ভোর তিনটায়। দৌড়াদৌড়ি করে তাড়াতাড়ি এম্বুলেন্স ডেকে রওয়ানা দিলাম। সরকারি ছুটি থাকায় এবং ভোর তিনটায় ল্যাব এইডে ডাক্তার নাই। কিডনি রোগ ইন্সটিটিউট এ নেওয়ার জন্য এম্বুলেন্স ছুটালাম। পান্থপথের কাছে আম্মা হাত আকড়ে ধরে নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিলেন। স্কয়ার হাসপাতালে গাড়ি ঘুরালাম। স্কয়ারের ইমার্জেন্সি থেকে আইসিইউ। সেই ভর্তি। খরচ বেড়ে হল প্রতিদিন ৬০+ হাজার৷ সেই সময়ে নিলাম টিউশনি। মিরপুর ১০ এ। ইংলিশ মিডিয়াম। বাসায় আসাও প্রায় বন্ধ। দুই তিনদিন পরপর বাসায় আসতাম। এরভিতর হাসপাতালে হাজিরা, ব্লাড ডোনার ম্যানেজ, অন্য স্পেশালিষ্ট দের সাথে যোগাযোগ করে চিকিৎসা সঠিক করার আপ্রাণ চেষ্টায় স্কয়ারের ডাক্তারের সাথে তর্কাতর্কি করা চলছিল। এর ভিতর রীটেনের রেজাল্ট দিল। ভাইভায় বোথ ক্যাডারে কল পেয়েছি। কিসের এক্সাম। কোন সুযোগই দেখছিলাম না। এর ভিতর এক ফ্রেন্ডের সাথে বিএসএমএমইউ এর এন্ডোক্রাইন এ ডিপ্লোমা পরীক্ষার দেওয়ার জন্য ফর্ম ফিলাপ করলাম। মার্চে পরীক্ষা। একদম শুণ্য প্রিপারেশনে পরীক্ষা দিতে গেলাম। পরীক্ষা হলে ঢুকার আগ মুহুর্তে স্কয়ার থেকে ফোন। সেই বিষয়ে স্কয়ারের স্পেশালিষ্ট এর সাথে কথা বলার কথা ছিল বাসার যে কারো। কিছুটা বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে পরীক্ষা না দিয়েই ফিরলাম স্কয়ার হাসপাতালে।
বিসিএসের কোন প্রিপারেশন নিতে পারি না। মাথায় ভাইভার 'ভা' ও নাই। ওভার লোডেড হয়ে ক্লান্ত হয়ে রিক্সায় ঘুমাতে ঘুমাতে এক ক্লিনিক থেকে চেম্বারে যাই৷ চেম্বারে লাল চোখ নিয়ে রোগির দিকে তাকাই। রোগি ভয় পায়। সেই লাল চোখ নিয়ে যাই মিরপুরে টিউশনিতে। বাসে ঘুমাই আধা ঘন্টা। যা পাই তা সেজ বোনের বাসায় দিয়ে আসি।

সিসিডি(বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে একটা সার্টিফিকেট কোর্স) ভর্তি হচ্ছে সেই ক্লিনিকের সহকর্মিরা। ২১০০০ টাকা লাগবে। হাতে এক টাকাও নাই। একজনের থেকে ধার করে নিয়েছিলাম। (যদিও আম্মা মারা যাওয়ার অল্প কিছু দিনের ভিতরেই সুদসহ ২৫ হাজার ফেরত দিয়েছি)। ভর্তি হলাম। এটা আসলে চেম্বারের জন্যই দরকার ছিল। এজন্যই। আর ক্লাস শুরু হবে সম্ভবত সেপ্টেম্বর থেকে। আর আমার ভাইভার ডেট ২৬ অগাস্ট জেনেই এখানে ভর্তির তাড়না ছিল।
মে মাসে আম্মাকে বাসায় আনা হয়৷ অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে আনি আম্মার জন্য। মোহাম্মাদপুর বশিলা থেকে। কোন আত্নীয়র কাছে এক্টা গাড়ি ধার ও পাই নি৷ ভ্যানে করে যেতে হয়েছিল সেই সিলিন্ডার কিনতে। বাসার গ্রাউন্ডফ্লোরে আর্টিফিশিয়াল বেড, পালসঅক্সিটোমিটার , ইত্যাদি দিয়ে হাসপাতাল তৈরি করা হল। আম্মার নাকে নল দেওয়া। একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে এর মধ্যে। সেই নল সে খুলে ফেলত। আমার হাসপাতালে ডিউটির সময় ও এম্বুলেন্স করে নিয়ে আসছিল নিজে নল পড়িয়ে দিছি।
একদিকে আম্মা অন্যদিকে অসহায় অবস্থা ভেবে হুহু করে কেদেছি কত রাত।বিসিএস ভাইভার জন্য কি পড়তে হবে তাও জানি না। জুলাইয়ের শেষের দিকে নীল খেত থেকে ভাইভার কিছু (শফিকের বই সম্ভবত) বই কিনেছিলাম। ৩১ তারিখ আবার আম্মাকে হাস্পাতালে ভর্তি করা হয়। এবং ৬ অগাস্ট আমাদের ছেড়ে চলে যান আম্মা। শবে ক্বদরের রাতে। ১০ তারিখ রোজার ইদ৷ ১২ তারিখ কুলখানি। ১৩ তারিখ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত ভাইভার জন্য পড়েছি। মা হারিয়ে মায়ের একমাত্র ছেলে কি এক্সাম প্রিপারেশন নিবে? কোর্ট প্যান্ট টাই ভাইভার শার্ট কিছু রেডি ছিল না। এক ফ্রেন্ডের থেকে টাই ধার করেছি৷
মানুষ ভাইভা নিয়ে খুবই সিরিয়াস থাকে৷ অনেকেই হোমড়াচোমরা খুজে দেখা করে৷ আমার সেই সুযোগটাও হয় নাই।কিছু প্রিপারেশন থাকলে দেখা করা যায়৷ যার প্রিপারেশন নাই সে কোন মুখে ব্যাকাপ চাবে? যদি নিজের দোষে না টিকে তাহলে আর পরের বার প্রিপারেশন নিলেও লবিং পাওয়া যাবে না নিশ্চিত। আর রীটেন খুব ভাল হয়েছিল বলেই আত্নবিশ্বাস ছিল ভাইভায় টিকব। কারন ৩৩ বিসিএসে ৫৬০০ ডাক্তার নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল জেনারেল না হলে ও টেকনিক্যাল ক্যাডারে হবে জানতাম। এর নাম আত্মবিশ্বাস - যেটার অভাব ইদানিং বেশি অনুভব করছি।

পুণশ্চঃ যে ছেলে টা জাহাঙ্গীর নগর ভার্সিটির বন্ধন থেকে বারবার রক্ত যোগাড় করে দিত এবং আম্মার ডায়ালাইসিসের শুরুতে এবং আম্মা মারা যাওয়ার সময় শেষ রক্ত দান করেছিল সে ৩৭ তম বিসিএস প্রশাসন (এডমিন) এ যোগদান করেছে । Mesbah Uddin Shobuj অশেষ কৃতজ্ঞতা ভাই। আমার রক্তের ভাই তুমি। আমার সেই ক্রিটিকাল সময় টুকু যারা সত্যি অনুভব করেছিল তাদের অনেকের মধ্যে আছেন,ডাঃ রাহাত, Md Hasan, Jinat Ara Moni আপু, রানা, আর সেই ব্যক্তি যিনি প্রতি মুহুর্তে আমাকে দুঃসময় পার করার জন্য সাহস দিয়ে গেছেন (সঙ্গত কারনেই তার নাম প্রকাশ করা যাবে না), আম্মার কুলখানির সময় ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দুয়া পড়ে সাহায্য করেছিল লিজা-লিজার আম্মা-শ্রাবনী-অর্পি (ফেসবুকে দুয়া পড়ার জন্য সাহায্য চেয়ে প্রেরিত ম্যাসেজে যে কয়জন তাৎক্ষণিক রেসপন্স করেছেন)।

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়