Ameen Qudir

Published:
2019-10-17 11:44:05 BdST

নিজের সন্তান হত্যা বা ফিলিসাইড নিজের সন্তান কতলের বিশ্ব কাঁপানো নৃশংস কাহিনি: যে ভাবে পিতার বিচার ও রায় হয়


 

ডা. সাঈদ এনাম
সাইকিয়াট্রিস্ট
___________________________

ইন্টারেস্টিং এক ফিলিসাইড কেইস নিয়ে কাজ করেছিলাম বেশ আগে। মহামান্য আদালত থেকে পাঠানো হয়েছিলো মানসিক অবস্থা সম্পর্কে যাচাই। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো, সে নিজ সন্তান কে গলা কেটে হত্যা করেছে।

ইতিহাস নিয়ে জানা গেলো, একদিন লোকটি তার ফুটফুটে দু'সন্তান কে চকলেট দেবার কথা বলে ঘুরতে নিয়ে যায় জংগলে। সারাদিন ঘুরাঘুরির পর এক নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে তাদের হত্যা করে।

ছোট ছেলেকে মারার পর বড় মেয়ের চোখ বাঁধে। হাত দুটো বেঁধে হত্যার পূর্বে মেয়ে জিগ্যেস করছিলো, 'আব্বু, ও আমার আব্বু.. তুমি আমাদের মারছো কেনো গো..?'। সে তখন বলেছিলো, 'তোদের মুক্ত করে দিতে'।

তার বৃদ্ধা মা'কে জিগ্যেস করলাম, 'চিকিৎসা করিয়েছিলেন কখনো ? '। বৃদ্ধা মা বললেন, 'বাবা, আমরা তো আর অতশত বুঝিনা। সময় সময় ভালো, খারাপ। মাঝেমধ্যে খুব উল্টোপালটা করতো, আবার ঠিক হয়ে যেতো। তাছাড়া বাচ্চা গুলো ছিলো তার কলিজার টুকরা.. '।

লোকটির ডায়াগনোসিস হয় বাইপোলার মুড ডিসওর্ডার।

বাইপোলার মুড ডিসওর্ডার কি?

নামেই বুঝা যাচ্ছে এদের আচরণ বাই বা দু'রকম। অর্থাৎ ভালো এবং খারাপ। সহজ কথায় রোগী আচরণ কখনো ভালো কখনো বা খারাপ। খারাপ বলতে খুবই খারাপ। বছরে কয়েকবার, ভালো এবং খারাপ (ম্যানিক ও হাইপোম্যানিক) মুহূর্ত গুলো পালাক্রমে দেখা দিয়ে থাকে।

আরেকটি ফিলিসাইড নিয়ে আলোচনা করে শেষ করি।

আগস্ট ২০১৪ সালে সাউথ ক্যারোলিনায় রাস্তার পাশে কয়েকটি পলিথিন প্যাকেটের ভিতর পাঁচটি শিশুর ক্ষত বিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। মুলত টহল পুলিশ পঁচে যাওয়া দুর্গন্ধের সুত্র ধরেই তা খুজে পান।

সাথে সাথে আলোড়ন পড়ে যায়। কিছু দুরেই বাড়ি থেকে আটক করা হয় তাদের বাবা টিম জোন্স কে। তিনি পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, অতি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আকাশচুম্বী বেতন। স্মার্ট সুদর্শন ব্যক্তি।

মৃত শিশুদের বয়স ১ থেকে ৮ বছর। টিম জোন্স এর স্ত্রী কে বাসায় পাওয়া যায়নি। আসলে পাওয়া যায়নি বললে ভুল হবে। সর্ব শেষ সন্তান জন্মের পর বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুন এক ছেলের প্রেমে পড়ে গৃহত্যাগী হন।

দীর্ঘদিন কোর্টে ট্রায়াল এর পর টিম জোন্স দোষী সাব্যস্ত হন। তিনি নিজে একে একে সব সন্তানদের হত্যা করে টুকরো টুকরো করে পলিথিন ব্যাগে ভরে বাহিরে ফেলে আসেন।

টিম জোন্স এর আইনজীবী প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন তিনি ঘোরতর মানসিক রোগী যা কেউই জানতেন না। তাছাড়া তার মা ও ঘোরতর মানসিক রোগ স্কিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত। হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি প্রচন্ড এলকোহল পান করেছিলেন। ড্রাগ ও নিয়েছিলেন। তাছাড়া স্ত্রী'র বিষয়ে পারিবারিক ভাবে তিনি ছিলেন চরম হতাশাগ্রস্ত।

প্রায় ১২ জন সাইকিয়াট্রিস্ট ট্রায়ালে ছিলেন। এতে প্রমাণিত হয়, তিনি সম্পুর্ণ ঠান্ডা মাথায় সন্তানদের হত্যা করেন। জুন ২০১৯ সালে তার ফাঁসি রায় হয়।

ট্রায়ালে টিম এর স্ত্রী সবসময় ছিলেন কান্না জড়িত। হাউমাউ করে কান্না ছাড়া তিনি কিছুই বলতে পারতেন না। ফাঁসির রায়ে সর্বশেষ শুধু একটি বাক্য বলেন, "আমার সন্তানের হন্তারকের মৃত্যু দন্ড চাইনা, কারন সে আমার সন্তানদের তাকে প্রচন্ড ভালোবাসার একজন"।

 

ফিলিসাইড কেনো?

নিজ সন্তান কে হত্যা করাকে সাইকিয়াট্রি'র ভাষায় বলে ফিলিসাইড। আমাদের দেশে কদাচিৎ শোনা গেলেও ইউরোপ আমেরিকায় তা প্রায়ই শোনা যায়। নানা কারনে ফিলিসাইড সংঘটিত হয়।

ফিলিসাইডে হন্তারক দের নিয়ে অনেক গবেষণা সাইকিয়াট্রিস্টরা করছেন। সাধারণত শতকরা চল্লিশ ভাগ ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের দেখা গিয়েছে কোন না কোন মানসিক রোগে আক্রান্ত। এরমধ্যে মুড ডিসওর্ডার, স্কিজোফ্রেনিয়া, সাবসটেন্স এবিউজ উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া হিংসা, কলহ, শিশুদের ভবিষ্যৎ পরিনতি খারাপ ভাবা, শত্রুতা, অবিশ্বাস ইত্যাদি কারনেও ফিলিসাইড হতে পারে।

আসুন, মানসিক রোগ গুলো নিয়ে সচেতন হই। মানসিক রোগ লজ্জার নয়। কেবল বস্তা পরে হাটে-বাজারে চলা ফেরা করলেই মানসিক রোগী নয়। অনেক ধরন আছে। আমাদের পরিবারে, সমাজে চারপাশে অনেকেই আছেন যারা কোন না কোন ভাবে মানসিক রোগী।

'লোকে কি বলবে', 'মান যাবে, জাত যাবে' এরকম হীনমন্যতা আর লজ্জার ভয়ে আমরা মানসিক রোগ প্রকাশ করিনা, সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাই না। ফলে পরিনতি হয়ে যায় কখনো কখনো ভয়াবহ।

ডা. সাঈদ এনাম
ডি এম সি,কে-৫২
সাইকিয়াট্রিস্ট

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়