Ameen Qudir

Published:
2019-08-07 20:51:31 BdST

হার্ট এটাক, হার্ট ব্লক ও হার্ট ফেইলর: বাঁচতে আমাদের করনীয়


 

 


ডা. মো. সাঈদ এনাম


_________________________

দিব্যি সুস্থ সবল মানুষের হঠাৎ মৃত্যু হলে পড়লে সবাই একটু চমকে উঠেন। কি ব্যাপার, এইমাত্র তার সাথে রাস্থায় দেখা হলো কিংবা এই মাত্র দুজনে মর্নিং ওয়াক করে আসছিলাম, গল্প করছিলাম হঠাৎ কি হতে কি হয়ে গেলো। চোখের সামনেই আমার বন্ধু বা সহকর্মী না ফেরার দেশে চলে গেলেন। এম্বুলেন্স বা ডাক্তার আনতে আনতে সব শেষ।

এরকম মৃত্যুর সাথে সবাই আমরা কমবেশি পরিচিত। একে বলা হয় "সাডেন ডেথ সিন্ড্রোম"।

সাডেন ডেথ সিন্ড্রোম এর অনেক কারন থাকে যেমন নিউরোলজিক্যাল, কার্ডিয়াক, মেটাবলিক তবে মোটাদাগে কারন ধরা হয় "কার্ডিয়াক এরেস্ট" বা "হার্ট এটাক" ।

হার্ট এটাক, হার্ট ব্লক (কার্ডিয়াক এরেস্ট) ও হার্ট ফেইলর এক নয়?

হার্ট এটাকঃ
কর্মক্ষম থাকার জন্যে দেহের প্রতিটি অংগে রক্ত সরবরাহ প্রয়োজন। হার্ট দেহের প্রতিটি অংগে রক্ত সরবরাহ করে। এমন কি হার্ট কে নিজেকেও রক্ত সরাহ করতে হয়। কোন কারনে হার্ট নিজেকে রক্ত সরবরাহ করতে না পারলে তাকে বলে হার্ট এটাক। সাধারণত হার্টে রক্ত দেয়ার জন্যে ধমনী গুলো ছিড়ে গিয়ে অথবা বন্ধ হয়ে গেলে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়।

হার্ট ব্লকঃ
প্রতিনিয়ত হার্ট এ ইলেক্ট্রিসিটি উৎপাদন হচ্ছে, এবং ইলেক্ট্রিসিটির মাধ্যমে হার্ট বা হৃৎপিণ্ড সচল থেকে সারা দেহে রক্ত সরবরাহ করে। হৃৎপিণ্ডের এই ইলেক্ট্রিক বা বিদ্যুৎ উৎপাদন এর জন্যে তার চারটি স্থানে রয়েছে মার্বেল আকৃতির চারটি অত্যাধুনিক জেনারেটর। এই জেনারেটর গুলোর মাধ্যমে উৎপাদিত শক্তির মাধ্যমে হৃৎপিণ্ড সচল থাকে। কোন কারনে এই জেনারেটর গুলো বন্ধ হয়ে গেলে বা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারলে সেই অবস্থাকে বলে কার্ডিয়াক এরেস্ট বা হার্ট ব্লক।

হার্ট ফেইলরঃ

হৃৎপিণ্ড যদি কোন কারনে পর্যাপ্ত পরিমানে রক্ত পাম্প বা সরবরাহ করতে না পারে সেই অবস্থাকে বলে হার্ট ফেইলর।

মায়ের গর্ভে ৪ সপ্তাহ বয়সে হঠাৎ হৃৎপিণ্ডের জেনারেটর গুলো তৈরি হয় এবং চালু হয়। সেই যে চালু হয় তা লাব-ডাব ছন্দ নিয়ে নাচতে থাকে মৃত্যু পর্যন্ত। এটি মহান আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীনের মানব দেহের স্থাপিত এক অপুর্ব নিদর্শন৷ বুকের বামপাশে হাত রাখলে যার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়।

হার্টের কাজঃ

৬০ সেকেন্ডে আমাদের হার্ট গড়ে ৭০ বার সংকোচন প্রসারণ করে এবং প্রতিবার সে প্রায় ৭০-৮০ মি লি রক্ত দেহে সরবরাহ করে। সে হিসেবে একটি হার্ট, প্রতিদিন আনুমানিক ১ লক্ষবার সংকোচন প্রসারন করে এবং এর মধ্যমে প্রায় ৭,২০০ লিটার রক্ত সারা দেহের জন্যে পাম্প করে। এই রক্ত সারাদেহের প্রায় ৬০ হাজার মাইল রক্তনালিকা পথ ভ্রমণ করে দেহের প্রতিটি কোষকে সজীব রাখে।

সুতরাং দেখা যায় সারাজীবনে আড়াইশো গ্রাম ওজনের একটি মাংসের চাকা (হার্ট) কোন রুপ বিশ্রাম ছাড়াই আনুমানিক আড়াই বিলিয়ন বার সংকোচন প্রসারন করে এবং এর মাধ্যমে প্রায় ১'৫ মিলিয়ন ব্যারেল রক্ত পাম্প করে।

কি পরিমান শক্তির প্রয়োজন?

আমাদের সারাদেহে রক্ত চালিত করতে হার্টে যে পরিমান এনার্জি উৎপন্ন হয় সে পরিমান শক্তি দিয়ে একটি ট্রাক (সাধারণ পরিবহন তিন টন) অনায়াসে গটগট করে একবার চাঁদ কে পরিভ্রমণ করে আসতে পারে..!

কয়েক সেকেন্ডের জন্য হার্টের জেনারেটর গুলো বন্ধ হলে অথবা অস্বাভাবিক রকমের ইলেক্ট্রিসিটি উৎপাদন করে রিদমহীন বা ছন্দহীন ভাবে হার্ট বিট করলে তাকে এরিদমিয়া বলে। এতে রোগী নিমিষেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান, পালস থাকেনা, রেসপিরেশন বন্ধ হয়ে যায়। এর নাম সাডেন কার্ডিয়াক এরেস্ট।

সাডেন কার্ডিয়াক এরেস্ট হলে কি করবেন?

সাডেন কার্ডিয়াক এরেস্ট হলে প্রথম কাজ হলো রোগীর মস্তিষ্ক সহ সারা দেহে রক্ত প্রবাহ নিরবিচ্ছিন্ন রাখা। দেহের মধ্যে ব্রেইনের কোষ সবচেয়ে বেশি সংবেদশীল এবং অল্প কয়েক সেকেন্ডের রক্ত চলাচল বন্ধে এদের পারমানেন্টলি ডেথ হয়। যে পদ্ধতিতে রক্ত সঞ্চালন পুনরায় সচল করা হয় তার নাম "সি. পি. আর" ( CPR) বা কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন দিয়ে

যথাযথ সি. পি. আর (কার্ডিওপালমোনারি রেসাসিটেশন) অথবা ডি.সি শক (ডিফিব্রিলেশন এন্ড কার্ডিওভার্সন) এর মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডকে পুনরায় ছন্দময় সংকোচন ও প্রসারনে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে প্রায় ৯০ শতাংশ কার্ডিয়াক এরেস্ট হওয়া রোগী কে বাচানো সম্ভব। প্রশিক্ষণ থাকলে যে কেউই এই সি. পি. আর (CPR) দিতে পারেন। উন্নত বিশ্বে প্রাথমিক স্কুলেই সি.পি.আর সম্পর্কে সম্যক ধারনা দেওয়া হয়।

কার্ডিয়াক এরেস্ট এর ঝুঁকি কাদের বেশী?

এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, যাদের নিকটাত্মীয় কারো ইতিপূর্বে কার্ডিয়াক এরেস্ট হবার ইতিহাস আছে তারা বলা যায় ঝুঁকিতে আছেন। এছাড়া যারা ধুমপান, এলকোহল, মাদকাসক্তি,হাই ব্লাডপ্রেশার, হাই কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, ওবেসিটি বা স্থুলতা ও অনিয়ন্ত্রিত লাইফস্টাইল ইত্যাদিতে অভ্যস্ত তাদের বেশি হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

হার্টের কিছু রোগেও অনেক সময় কার্ডিয়াক এরেস্ট হয় যেমন, করোনারি আর্টারি ডিসিজ, মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন,কার্ডিওমায়োপ্যাথি,ভালভ্যুলার হার্ট ডিসিজ,কনজেনিটাল (জন্মগত) হার্ট ডিসিজ,ইলেক্ট্রিক্যাল প্রবলেম ইন হার্ট(লং কিউ টি) ইত্যাদি।

হঠাৎ হার্ট এটাক এড়াতে করনীয় কি?

প্রথম কাজ যাঁরা হার্টের কোন ধরনের অশুখে ভুগছেন তাদের একটা কাজ করতে হবে সেটা হলো হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের দেয়া ঔষধ নিয়মিত সেবন করা এবং পরামর্শ মেনে চলা। নির্দিষ্ট বিরতিতে হার্টের চেক আপ করানো। আর যাঁরা মাঝেমধ্যে বুকে ব্যাথা অনুভব করেন তাদের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া।

অকস্মাৎ হৃদরোগের জঠিলতা এড়াতে হার্টের এর সুরক্ষায় সচেতন থাকতে হবে । ধুমপান, এলকোহল -মদপান, মাদক সেবন ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনাচার এড়িয়ে চলি।
____________________________

ডা. মো. সাঈদ এনাম

সাইকিয়াট্রিস্ট

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়