Ameen Qudir

Published:
2019-05-20 11:30:13 BdST

মানসিক হাসপাতালের ৫৪ জন আবাসিক‌ নিশ্চিত করলেন গনতান্ত্রিক ভোটাধিকার


 

মানসিক হাসপাতালের সুস্থ হয়ে ওঠা আবাসিকদের জন্য এ বছরই প্রথম ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে । বহরমপুর মানসিক হাসপাতালের ৬৫ জন সুস্থ আবাসিকও এ বছর ভোট দিয়েছেন।

 

ডেস্ক / সংবাদ সংস্থা/ ইটিভি বাংলা কলকাতা
_________________________
অনন্য এক নজির।
একটি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বা বিশাল দেশে কিভাবে ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হয় তার নজির স্থাপন করলেন কলকাতা পাভলভ মেন্টাল হাসপাতালের ৫৪ জন আবাসিক‌ ।
হাসপাতালের ওয়ার্ডেই তাঁদের মতামত গুরুত্ব পায় না । তবে, দেশে সরকার গড়ার জন্য তাঁরা মতামত দিলেন । তাঁরা, কলকাতা পাভলভ মেন্টাল হাসপাতালের ৫৪ জন আবাসিক‌ । না, আবাসিক হলেও তাঁদের কাউকেই এখন সেই অর্থে আর রোগী বলা যাবে না । কারণ, তাঁরা সকলেই সুস্থ । কিন্তু খাতায়-কলমে তাঁরা এখনও "মানসিক রোগী" । রবিবার সকালে এই হাসপাতালের কাছে উত্তর কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রের একটি বুথে তাঁরা ভোট দিলেন ।

বুথে গেলেন নতুন পোশাক পরে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া বাসে চেপে ।মানসিক হাসপাতালের এমন সুস্থ হয়ে ওঠা আবাসিকদের জন্য এ বছরই প্রথম ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে । বহরমপুর মানসিক হাসপাতালের ৬৫ জন সুস্থ আবাসিকও এ বছর ভোট দিয়েছেন। পাভলভ-এর যে ৫৪ জন এবার ভোট দিলেন, তাঁদের মধ্যে ৩১ জন পুরুষ এবং ২৩ জন মহিলা । তাঁরা সবাই সুস্থ, কিন্তু লোকলজ্জা, আর্থিক বা অন্যান্য কারণে তাঁদের আর বাড়ি ফিরিয়ে নেয়নি পরিজনরা । তাই সুস্থ হয়ে ওঠার পরেও বাধ্য হয়ে হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে । যাঁরা সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তাঁদের জীবিকার সংস্থানের জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কাজ করছে ।গোটা বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন পাভলভ-এর সুপার গণেশ প্রসাদ ? তিনি বলেন, "বৃত্ত সম্পূর্ণ নয়, শুরু হল মাত্র। ওদের অধিকারগুলি অর্জনের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হল এই ভোটাধিকারের মাধ্যমে ।"


এরপর ? সুপার বলেন, "পরবর্তীতে বিধানসভা ভোটে যাতে এই ৫৪ জনের পাশাপাশি আরও অন্তত ২০০ জন ভোটাধিকার পেতে পারেন, তার চেষ্টা করব ।"যে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি পাভলভের সুস্থ আবাসিকদের জন্য কাজ করছে, তার সিনিয়র প্রজেক্ট ম্যানেজার শুক্লা দাস বড়ুয়া বলেন, "ভোট দিয়ে সবে মতামত দিতে ওরা শুরু করলেন । যেখানে এই সব মানুষের মতামতের দাম হাসপাতালের ওয়ার্ডের ভিতরেও থাকে না, তাঁরা আজ দেশে সরকার গড়ার জন্য মতামত দিলেন । এটা অনেক বড় ব্যাপার। এটা অ্যাচিভমেন্ট ।"তবে পাভলভের আবাসিকদের কাছে গতকালের ভোটদান প্রক্রিয়াটা পুরোপুরি মসৃণ ছিল না । মে মাসের গরমে তাঁদের প্রায় ২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। কেন ?

কারণ EVM খারাপ হয়ে গিয়েছিল । শুক্লা দাস বলেন, "EVM খারাপ হওয়ায় ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকেই চিৎকার-চেঁচামেচি করছিলেন । অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিলেন । অথচ পাভলভের ওই আবাসিকরা সেই সময়টায় একবারের জন্যও মেজাজ হারাননি বা অধৈর্য্য হয়ে ওঠেননি । তবে তাঁরা কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিলেন । প্রশ্ন করছিলেন, শেষ পর্যন্ত ভোটটা দিতে পারবেন কি না । " আগামী দিনে কলকাতার লুম্বিনী পার্ক মেন্টাল হাসপাতাল এবং পুরুলিয়া মেন্টাল হাসপাতালের সুস্থ আবাসিকরাও যাতে ভোটাধিকার পান, তার জন্য চেষ্টা চলবে বলে শুক্লা দাস জানান।যাঁরা অটিস্টিক ডিজ়র্ডারে আক্রান্ত তাঁরাও যাতে ভোট দেওয়ার অধিকার পান, তার জন্য নির্বাচন কমিশন এ বার উদ্যোগ নিয়েছিল । তার জেরে বেলেঘাটার একটি বেসরকারি স্কুলের ২২ জন অটিজ়ম স্পেকট্রাম ডিজ়র্ডার (ASD)-এ আক্রান্ত পড়ুয়া এবার ভোট দিতে পারলেন । তবে সহজে এই সাফল্য আসেনি । স্কুলের ডিরেক্টর মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "খুব সহজে এই ভোটাধিকার মেলেনি । এটা দীর্ঘদিনের চেষ্টার ফল ।"


এ নিয়ে কলাম লেখককরাও নানাভাবে মতামত জানাচ্ছেন ।

কলকাতার জনপ্রিয় পত্রিকায় প্রকাশিত লেখায়
পিয়ালী দে বিশ্বাস অনন্য কলমে লিখেছেন,
তাঁরা মানসিক রোগী ছিলেন। এই অপরাধে সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরেও বাড়ির লোকেরা ফিরিয়ে নিয়ে যাননি। অথচ ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে যখন আপাত সুস্থ রাও মেজাজ হারাচ্ছেন– সেই সময় অনেক বেশি ধৈর্যের সঙ্গে স্থির বিশ্বাস নিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ভোট দিলেন পাভলভের ৫০ সুস্থ আবাসিক।
এন্টালির বামনপাড়া বুথ। রবিবার ওই বুথে ইভিএম মেশিন বিকল হয়ে সকাল ১০টা নাগাদ ভোটগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৪৫ মিনিট বন্ধ ছিল ভোটগ্রহণ। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনায় ভ্যাপসা গরমে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার জন্য ভোট দিতে আসা সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিচ্ছিল। সিআরপিএফ জাওয়ানরা নানারকমভাবে বুঝিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ততক্ষণে লাইনে দাঁড়ানো উত্তেজিত ভোটারদের কেউ কেউ বুথের পোলিং অফিসারদের উদ্দেশ্যে নানান কটূক্তি ছুড়ে দেওয়া শুরু করেছেন। মহিলাদের মধ্যে অনেকেই বাড়িতে কী কী কাজ রেখে এসেছেন– তার খতিয়ান দিয়ে নিজেদের সমস্যার কথা একে-অন্যকে জানাচ্ছেন। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেও ওঁরা শান্ত। ৪০ ডিগ্রি গরম– রোদে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েও ওঁরা আপাত সুস্থ মানুষদের মতো বিচলিত নন।

ওঁরা কারা? ওঁরা হলেন পাভলভের ৫০ জন আবাসিক। যাঁরা এতদিন মনোরোগী ছিলেন। সুস্থ হওয়ার পরেও অসহি¡ুŒতা দেখাবে এই ভয়েû বাড়ির লোকেরা এঁদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়নি। তাই সুস্থ হওয়ার পরেও এঁদের প্রত্যেকেরই ঠিকানা ১৮ নম্বর গোবরা রোড– অর্থাৎ পাভলভ হাসপাতাল। এনাদের মধ্যে কেউ বা সদ্য অষ্টাদশী– কেউ বা ষাটের কোঠায় দাঁড়িয়ে। সাবলম্বী হয়ে কেউ কাজ করেন হাসপাতালের ক্যান্টিনে– কেউ বা জামাকাপড়ের সাফাইখানা ‘ধোবি ঘরে’। দীর্ঘদিন ধরেই পাভলভের মানসিক রোগীদের নিয়ে কাজ করছেন বিশিষ্ট মনোবিদ রbাবলী রায়। এ দিন তিনি দুঃখ করে বলেন– ‘সমাজের চোখে অস্বাভাবিক এই মানুষগুলোই পরিস্থিতির চাপে পড়েও এ দিন স্বাভাবিক মানুষদের চেয়ে বেশি ধৈর্য দেখিয়েছেন। অথচ এই মানুষদেরই ‘ভায়োলেন’ তকমা নিয়ে বাঁচতে হয়।
প্রসঙ্গত– ভোট দেওয়াটা মানসিকভাবে সুস্থ মানুষদের অধিকারের পর্যায়ে পড়ে। তাই এই বঞ্চিতরা যেন নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে– তা নিশ্চিত করতে ‘অঞ্জলি’ নামে একটি সংস্থা ২০১৮-তে নির্বাচন কমিশনের দফতরে যোগাযোগ করে। নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে প্রতিনিধিরা এঁদের সঙ্গে কথা বলে ও সুস্থতার শংসাপত্র দেখে এ বছর মার্চে পাভলভের এই ৫০ জন আবাসিকের হাতে ভোটার আই কার্ড তুলে দিয়েছিলেন।

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়