ডেস্ক

Published:
2023-01-19 13:44:26 BdST

ক্রাইম পেট্রল বাংলাদেশঅপারেশন মনোয়ারা হসপিটাল


 

লিখেছেন কাজী ওয়াজেদ আলী
পুলিশ কর্মকর্তা
_________________

২০০৪-২০০৫ সনের দিকের ঘটনা। ২/১ দিন পরপরই বনশ্রীর বিভিন্ন নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের কেয়ারটেকারের পায়ে গুলি করে মেরাদিয়া এলাকার ভয়ংকর এক সন্ত্রাসী (!) চাঁদা চাচ্ছে। এই সন্ত্রাসী একজন পেশাদার খুনি। তার বিরুদ্ধে ঢাকা শহরের বিভিন্ন থানায় একাধিক হত্যা মামলা রয়েছে। সে এতটা দুর্ধর্ষ যে তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তথ্যদাতা বা সোর্স হিসেবেও কেউ কাজ করতে ভয় পায়।

এমন ভয়ংকর একজন সন্ত্রাসীকে ধরার জন্য তৎকালীন খিলগাঁও থানার ওসি এবং ডিসি সাহেব সকল সাব-ইন্সপেক্টরের মধ্যে থেকে ব্যক্তিগতভাবে আমাকে ডেকে নিয়ে দায়িত্ব দিলেন।

দিনরাত হন্যে হয়ে খুঁজি।‌ কিন্তু কোথাও পাই না ঐ সন্ত্রাসীকে। কিন্তু সে তার অপকর্মগুলো ঠিকই করে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অভিযান চালিয়েও ধরতে ব্যর্থ হচ্ছি। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সবাই বিরক্ত এবং বিব্রত। খুনখারাবি সহ তার অপকর্ম দিন দিন বেড়েই চলেছে। সেই সাথে ঊর্ধ্বতনদের চাপও দিন দিন বাড়তেই থাকলো।

হঠাৎ একদিন খবর আসলো ওই সন্ত্রাসী তার এক আত্মীয়কে দেখতে সিদ্ধেশ্বরী মনোয়ারা হসপিটালে যাবে। অন্যান্য বারের মতো ভাবলাম এই তথ্যটা সঠিক না ও হতে পারে। তাই খুব ভালো প্রস্তুতি ছাড়া শুধুমাত্র একজন কনস্টেবল নিয়ে গেলাম মনোয়ারা হসপিটালে। আর ভুলটা ওখানেই হতে বসেছিল।

গায়ে ফতুয়া, পরনে জিন্সের প্যান্ট, কোমরের ভিতরে একপাশে পিস্তল এবং অন্যপাশে ওয়াকিটকি নিয়ে সিভিলে অভিযান। বিকালের দিকে রোগীর স্বজনদের মত মুখ ভার করে একপাশে বসে আছি হসপিটালের সামনের ফাঁকা জায়গায়। লোকজন আসে যায় আর আর আড় চোখে দেখি।

ওই সন্ত্রাসীকে আমি আগে কখনো দেখিনি। কিন্তু ওর চেহারার বর্ণনা শুনেছি। আনমনা বসে থাকলেও সজাগ দৃষ্টি ছিল সব দিকে। সঙ্গের কনস্টেবলের সাথে আই কন্টাক্ট ছিল। হঠাৎ দেখলাম একটা ভ্যাসপায় দুইজনে হসপিটালের লবিতে থামলো। প্রায় এক মিনিট স্টার্ট করে রাখার পর ভিতর থেকে দ্রুত বেগে অত্যন্ত সুঠামদেহী একজনকে নামতে দেখলাম। ভদ্রলোক এসেই ভ্যাসপার দুজনের মাঝে বসে পড়ল। আগে থেকে টার্গেটের দৈহিক এবং চেহারার বর্ণনার সাথে মাঝের ব্যক্তিটার চেহারা অনেকটা মিলে গেল।

দেখলাম ওরা তিনজন। এই অভিযানের ব্যাপারে নিজেই কিছুটা সন্ধিহান থাকায় মাত্র একজনকে সাথে নিয়ে আসায় মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে ভাবলাম এমন সুযোগ আর কখনো আসবে না। তাই দুজনকে নিয়েই তিনজনকে মোকাবেলার করার মত দুঃসাহস দেখালাম।

ইশারায় কনস্টেবল কে সিগন্যাল দিয়েই খুব দ্রুত বেগে ভ্যাসপার সামনে গিয়ে প্রথমেই এক লাথি মেরে ভেসপাটাকে ফেলে দিলাম। সাথে সাথে ভ্যাসপাটা পড়ে গিয়ে চালকের পা নিচে আটকে গেল। পিছনে বসা ব্যক্তিটি পড়েই দৌড়ে পালিয়ে গেল। ওটার দিকে চান্স না নিয়ে কোমর থেকে পিস্তল বের করে মাঝের টার্গেটের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে দিলাম। চিৎকার করে বললাম, "চারিদিকে পুলিশের লোক আছে, এক ইঞ্চি নড়লেই কিন্তু খুলি উড়ে যাবে"।‌ কুঁকড়ে গিয়ে দুজন হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে গেল।

খুব দ্রুতই ভিন্ন একটা নাম বলে তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলাম। বললাম 'তুই অমুক না'? যেহেতু তার নাম সেটা না তাই সে খুব আস্থার সাথে বলল 'না স্যার'। বললাম 'মিথ্যা বলবি না, তুই তো অমুক'। এবারও সে আস্থার সাথে বলল 'না স্যার'। প্রায় ২০ সেকেন্ড ধরে বলাবলির মধ্যেই সাথের কনস্টেবল এক হাতে ওর কোমর চেপে ধরে খুব দ্রুত অন্য হাত দিয়ে তার হাতে হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে দিল। হয়তো নিজের এলাকার বাইরে হসপিটালে রোগী দেখতে যাওয়ার ওই সময় সে নিরস্ত্র ছিল। যেহেতু সে ওই এলাকার লোক না তাই সে ভেবেছিল ওই এলাকার পুলিশ হয়তো তাকে ধরবেনা বা চিনবে না, তাই সে অনেকটা রিলাক্স ছিল।

এবার সে নিজেই নিজের আসল নাম প্রকাশ করল এবং মিথ্যাভাবে বলল, সে বাড্ডা এলাকায় একটি মসজিদে ইমামতি করে। আমি যে ওই নামের লোককেই খুঁজছি তখনও সে বুঝতে পারেনি। নামটা কমন পড়ায় এবং টার্গেটকে পাওয়া নিশ্চিত হওয়ায় খুব উত্তেজিত হয়ে গেলাম। এবার বললাম, বাসায় মিলাদ দিব, তাই একজন ইমামকে খুঁজতেছি, চলো। ইতোমধ্যে ওয়াকিটকিতে রমনা থানার সহযোগিতা চাওয়ায় টহল গাড়ি চলে আসলো।

ও গ্রেপ্তার হওয়ার খবর মুহুর্তে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এলাকাবাসী হাফ ছেড়ে বাঁচলো।‌ ঊর্ধ্বতন অফিসাররা থানায় এসে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলো। অনেক লোকজন ওকে দেখতে থানায় আসলো। রাতে ওর আস্তানায় অস্ত্র উদ্ধারের অভিযান চালানো হলো, উদ্ধার হল আগ্নেয়াস্ত্র। কালের বিবর্তনে ইতোমধ্যে আমি বিভিন্ন জায়গায় বদলি হয়েছি।

পায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দীর্ঘদিন জেলে ছিল ও। কিন্তু কয়লা ধুলে ময়লা যায় না। জেল থেকে বেরিয়েই নাকি আবার পুরাতন ব্যবসায় নেমে পড়েছিল শুনেছিলাম। এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষের হাতে ও নির্মমভাবে খুন হয়েছে শুনেছি।‌ আরো জানতে পারলাম, সে যেমন অনেক পরিবারকে পুরুষশূন্য করেছিল, সৃষ্টিকর্তার খেয়ালে তার পরিবারও নাকি এখন প্রায় পুরুষ শূন্য হয়ে গেছে।

আজ মনোয়ার হাসপাতালে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ ঘটনাটি মনে পড়লো।‌ এমন ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে অনেকবারই নেতৃত্ব দিয়েছি। আজকের এ পর্যন্ত আসার পথগুলো আমার মোটেও মসৃণ ছিল না।‌ দিনগুলো যে মোটেও ভুলে যাবার নয়!

________

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়