Desk

Published:
2022-09-25 09:20:41 BdST

বিশ্ব রেটিনা দিবস ২০২২ ও প্রাসঙ্গিক কথকতা



ডা. তারিক রেজা আলী

মহাসচিব, বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতি ও
বাংলাদেশ ভিট্রিও-রেটিনা সোসাইটি
সহযোগী অধ্যাপক (ভিট্রিও-রেটিনা),
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
___________________

রেটিনা কি?
রেটিনা হলো চোখের একেবারে ভিতরের
একটি পাতলা পর্দা যার উপর আলো পড়লে
আমরা দেখতে পাই। এটি একটি অত্যন্ত
সংবেদনশীল পর্দা। আমাদের ব্রেইন বা
মস্তিস্কের বাইরের অংশ হলো রেটিনা।
আলোক রশ্মি চোখের বিভিন্ন অংশ
যেমন কর্নিয়া, লেন্স ভেদ করে রেটিনার
উপর পড়ে। এরপর এই আলোক রশ্মি থেকে
রেটিনা তৈরী করে রঙ, বিভিন্ন বস্তুর রূপ
বা প্রতিবিম্ব । পরবর্তীতে রেটিনা
থেকে একটি নার্ভ হয়ে এই রূপ
প্রেরিত হয় আমাদের মস্তিস্কের একটি বিশেষ অংশে। তখন আমরা দেখতে পাই।

রেটিনার রোগসমূহ কি?


রেটিনা যেমন সংবেদনশীল ঠিক সেরকম স্পর্শকাতর। নানা রকম শারীরিক রোগ ও চোখের সমস্যায়
রেটিনা আক্রান্ত হয়। ফলে একজন ব্যক্তি একেবারেই অন্ধ হয়ে যেতে পারে। রেটিনা একটি অত্যন্ত
পাতলা পর্দা, তারপরেও এটি দশটি পরতে বা স্তরে তৈরি। বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন রোগ হতে পারে।

বিশ্ব রেটিনা দিবস কি?


রেটিনার রোগ সমূহ সম্বন্ধে জনসচেতনতা তৈরী করতে প্রতিবৎসর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার
বিশ্ব রেটিনা দিবস হিসাবে পালিত হয়। এটি যে সারা পৃথিবীতে খুবই জনপ্রিয় হয়েছে তা
বলা যাবে না। আমাদের দেশে কখনও এই দিবস পালিত হয় নি। অথচ দেশে রেটিনার রোগ বেড়েই

চলেছে। বাংলাদেশ ভিট্রিও-রেটিনা সোসাইটি দেশের মানুষকে রেটিনার রোগ সম্পর্কে
সচেতন করতে এই দিবসকে বেছে নিয়েছে।
রেটিনার অসংখ্য রোগ হতে পারে। তবে এই বৎসর আমরা মূলত: চারটি রোগ সম্বন্ধে
জনসচেতনতা তৈরী করতে চাই।

১। ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথী:


ডায়াবেটিস আমাদের দেশে এখন মহামারীরূপে আর্বিভূত হয়েছে। এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া
যাবে না যেখানে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী নেই। আমাদের শরীরে ইনসুলিন নামক এক
হরমোন আছে যা রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে। গ্লুকোজ হলো আমাদের শরীরের অত্যন্ত
প্রয়োজনীয় খাবার যার মাধ্যমে সকল কোষ শক্তি অর্জন করে। কোন কারনে ইনসুলিন ¯^ল্পতা হলে
বা ইনসুলিন কাজ না করতে পারলে রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজ বেড়ে যায় যা কোষে প্রবেশ করতে
পারে না। অতিরিক্ত গ্লুকোজ নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবহৃত হওয়ার চেষ্ট করে যা শরীরের জন্য ভাল ফল
বয়ে আনে না । বরঞ্চ রক্তনালী ও ¯œায়ুতন্ত্রেও স্থায়ী সমস্যা তৈরী করে। শরীরের সমস্ত অঙ্গকেই আক্রান্ত
করে ডায়াবেটিস। যেমন হার্ট, কিডনি, লিভার এবং চোখ। ডায়াবেটিস একটি সারা
জীবনের রোগ যা কখনো ভালো হয় না, নিয়ন্ত্রণে রাখাই একমাত্র চিকিৎসা।
ডায়াবেটিস চোখের সকল অংশেরই ক্ষতি করে, সবচেয়ে বেশি করে রেটিনার। এর ফলে রোগী অন্ধও
হয়ে যেতে পারে। এক সমীক্ষায় দেখা যায় অন্ধত্বের সামগ্রিক কারণের মধ্যে ডায়াবেটিক
রেটিনোপ্যাথীর জন্য অন্ধত্ব বরণ করে শতকরা ১২.৫ ভাগ


কি হয় ডায়াবেটিসে?

 


ডায়াবেটিস চোখের ছোট ছোট রক্তনালীর ক্ষতি করে। ফলে রক্তক্ষরণ হয়। রক্তনালী থেকে চর্বি জাতীয়
জিনিস অর্থাৎ কোলোস্টেরল ও লিপিড বের হয়ে আসে। একই সাথে রেটিনার বিভিন্ন স্তরে
জমা হয় তরল পদার্থ। সবকিছু মিলে রোগী ধীরে ধীরে কম দেখতে শুরু করে। কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে
কম দেখা এক ভয়ংকর সমস্যা। তিনি পড়তে পারেন না, কম্পিউটারে দেখতে পারেন না এমন কি
লিখতেও পারবেন না। একপর্যায়ে রেটিনায় রক্তক্ষরণ হয় এবং রেটিনা ছিঁড়েও যেতে পারে।
সার্বিক চিকিৎসা না হলে এই রোগী ধীরে ধীরে অন্ধত্ব বরণ করে। ডায়াবেটিস পুরোপুরি
নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দীর্ঘ দিনের ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগী এই একই সমস্যায় ভুগতে পারেন।
এক সমীক্ষায় দেখা যায় ১৫ বৎসর বা আরো অধিককাল ধরে যারা ডায়াবেটিসে ভুগছে তাদের
ভিতরে প্রায় ২% মানুষ অন্ধ হয়ে যায় এবং আরো ১০% এর দৃষ্টিশক্তির গুরুতর অবনতি ঘটে।

২। উচ্চ রক্তচাপ জনিত রেটিনার রোগ:
উচ্চ রক্তচাপ একইরকম সর্বব্যাপী রোগ যাতে আক্রান্ত অসংখ্য মানুষ। ডায়াবেটিস যাদের আছে
তাদের উচ্চ রক্তচাপ থাকা খুবই ¯^াভাবিক ঘটনা। এই রোগে চোখের রেটিনার নানা রকম সমস্যা
হতে পারে, সবচেয়ে বেশী হয় রক্তনালী ছিঁড়ে যাওয়া বা রেটিনাল ভেইন অক্লুশন। এটা অনেকটা
ব্রেইনের রক্তনালী ছিঁড়ে যাওয়া বা স্ট্রোকের মত রোগ। সঠিক চিকিৎসা না হলে এখান থেকেও
অন্ধত্ব হতে পারে।

৩। বয়স জনিত ম্যাকুলার ক্ষয় বা এজ রিলেটেড ম্যাকুলার ডিজেনারেশন:


ম্যাকুলা হলো রেটিনার ৫.৫ মিলিমিটার একটি জায়গা যা সবচেয়ে বেশী সংবেদনশীল। মূলত:
এই ম্যাকুলার মাধ্যমেই আমরা কোন বস্তুকে স্পস্ট দেখি, রঙ চিনি। বয়সের কারণে এই ম্যাকুলার
কোষ সমূহ ক্ষয় হতে থাকে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমাদের দেশেও মানুষ এখন
দীর্ঘ জীবন পাচ্ছে। তাই সত্তোরোর্ধ মানুষের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বাড়ছে। এই রোগে
মানুষ একেবারে অন্ধ হয় না, তবে পড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তিনি যেদিকে তাকান সেখানেই
দেখতে পান ছায়া, পরিস্কার দেখা যায় না। এই বয়সে মানুষ হয়ে যায় নিঃসঙ্গ। তিনি পড়তে চান,
পারেন না । প্রিয়জন যেমন ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনীর মুখটা পরিস্কার দেখতে পান না। এটা
খুবই কষ্টকর এক জীবন। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে এই রোগের প্রকোপ কমানো
সম্ভব।

 


রেটিনায় রক্তক্ষরণ ও লিপিড
জমা

ডায়াবেটিসের জটিলতায় রেটিনা ছিঁড়ে
যাওয়া

সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেইন
অক্লুশন

ব্রাঞ্চ রেটিনাল ভেইন অক্লুশন

৪ । রেটিনোপ্যাথী অব প্রিম্যাচিউরিটি বা অপরিণত শিশুর রেটিনার রোগ:
এটি অপেক্ষাকৃত নতুন সমস্যা আমাদের দেশে। একটি শিশু যদি ৩৫ সপ্তাহের আগে জন্মগ্রহণ
করে বা তার ওজন ২০০০ গ্রামের কম হয় তাহলে এই রোগ হতে পারে। বর্তমানে দেশে অপরিণত
শিশুদের যত্ন নেওয়ার বিশেষ ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট সমূহের সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি
পেয়েছে। ফলে ২৪ সপ্তাহে জন্ম নেওয়া শিশুও বেঁেচ থাকছে, বড় হচ্ছে। এদের এই রোগে আক্রান্ত
হওয়ার সম্ভাবনা অনেক রেশি। বাংলাদেশে প্রতিবৎসর প্রায় ৩০ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে। এদের
মধ্যে প্রায় ৪ লাখ শিশু অপরিণত।

ড্রাই বা শুষ্ক ওয়েট বা রক্তক্ষরণ

বয়স জনিত ম্যাকুলার রোগে দৃষ্টির মাঝে ঝাপসা দেখা ও সরল
রেখা আঁকা-বাঁকা দেখা

কি হয় এই রোগে?
অপরিণত শিশুর রেটিনা স্বাভাবিক ভাবেই অপরিণত থাকে। শতকরা ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে সেই রেটিনা
ধীরে ধীরে পরিপূর্ণতা পায়। ৩০ ভাগ ক্ষেত্রে দেখা দেয় নানা রকম সমস্যা। রক্তনালীগুলো
অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে রেটিনা ছিঁড়ে যায়। শিশু অন্ধ হয়ে যায়। অথচ এই
শিশু যদি মায়ের গর্ভে আর কিছু দিন থাকতো, তাহলে সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক শিশু হিসাবে
জন্মগ্রহণ করতো। শতকরা এই ৩০ ভাগ শিশুকে খুজে বের করতে তাই দরকার চক্ষু বিশেষজ্ঞ দ্বারা
পরীক্ষা (স্ক্রিনিং)। সঠিক সময়ে যদি ধরা পড়ে এই রোগ, চিকিৎসা আছে। লেজার করা হয়,
চোখের ভিতর ইনজেকশনও দেয়া হয়। ফলে শিশুর দৃষ্টি রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু প্রয়োজন সঠিক সময়ে

রোগ নির্ণয়। এটা একেবারেই সময়ের সাথে
যুদ্ধ। দেরী হয়ে গেলে রেটিনা ছিঁড়ে যায়, তখন অপারেশন করেও ভাল দৃষ্টি প্রদান করা সম্ভব হয় না

অপরিণত রেটিনা অপরিণত রেটিনা ছিঁড়ে

যাওয়ার পর

লেজার করে অপরিণত রেটিনা ছিঁড়ে যাওয়া
থেকে রক্ষা করা যায়

স্ক্রিনিং এর সময় হলো:

যদি শিশুর জন্ম হয় ৩৫ সপ্তাহ বা তার পূর্বে, ওজন যদি হয় ২০০০ গ্রাম বা তার কম সেই শিশুকে
দেখতে হবে ৩০ দিন বয়সে।
যদি শিশুর জন্ম হয় ২৮ সপ্তাহ বা তার পূর্বে, ওজন যদি হয় ১২৫০ গ্রাম বা তার কম সেই শিশুকে
দেখতে হবে ২০ দিন বয়সে।
বিশ্ব রেটিনা দিবস এই প্রথমবার আমাদের দেশে পালিত হচ্ছে। যে চারটি রোগ সমন্ধে আমরা
এবার জনসচেতনতা তৈরীর প্রয়াস পেয়েছি, আগামী বৎসর তা নিশ্চয়ই পূর্ণতা পাবে, কলেবর
বৃদ্ধি পাবে। শেষ করার পূর্বে তাই শেষ অনুরোধ:
১। যদি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বছরে
একবার রেটিনা পরীক্ষা করবেন।
২। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে, একই সাথে বছরে একবার রেটিনা পরীক্ষা করতে
হবে।
৩। বয়স ৬০ এর উপরে হলে ম্যাকুলা সম্বন্ধে পরীক্ষা করাতে হবে বছরে একবার।
৪। অপরিণত শিশু জন্মগ্রহণ করলে অবশ্যই সঠিক সময়ে চোখ পরীক্ষা করাতে হবে।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়