ডা কামরুন লুনা

Published:
2022-07-25 12:18:48 BdST

বিদ্যুৎ এবং বাংলাদেশ : একজন চিকিৎসকের বিশ্লেষণ


ডা সুরেশ তুলসান, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ


ডা সুরেশ তুলসান
_______________________

বিদ্যুৎ নিয়ে অনেকেই দেখি অনেক কথা বলেন। বিদ্যুতের উৎপাদন, ঘাটতি, জলবিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুচালিত টারবাইনের বিদ্যুৎ কোন কিছু নিয়েই বাঙালী কথা বলতে ছাড়ে না।
"যেজন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি আশু গৃহে তার দেখিবে না নিশিতে প্রদীপ ভাতি "- স্কুলে গিয়েছেন অথচ এই কটি ছত্র পড়েননি এমন বাঙালী মনে হয় না হাতে প্রদীপ নিয়ে তন্ন তন্ন করে খুজলে একজনও পাওয়া যাবে, তা সে স্কুলের গন্ডি পার করতে পারুক বা না পারুক। আজকাল অবশ্য স্কুলের গন্ডি পেরোতে পারে না এমন ঘটনা খুবই বিরল, কেননা স্কুলের গন্ডি পেরোতে এখন আর তেমন পড়াশোনা লাগে না।
এই বাঙালীরাই যখন বিদ্যুতের অপচয় করে তখন মনে হয় - " স্কুলে পড়ে কিতা লাভ, যদি যা পড়ে তা না শেখে "।
উদাহরণ দেই কিছু।
১. নিজের বাড়িতে বেডরুম থেকে বাথরুমে যাওয়ার সময় বেডরুমের বাত্তি পাংখা নিভিয়ে বাথরুমের বাত্তি জ্বালান এবং বাথরুম থেকে বেডরুমে যাওয়ার সময় বাথরুমের বাত্তি নিভেয়ে বেডরুমের বাত্তি পাংখা জ্বালানো মানুটাও অফিস থেকে কাজ শেষে বের হওয়ার লাইটের সুইচ বন্ধ করেন না।
২. অনেক সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বড় বর করিডরে দিনের বেলায় শুধুমাত্র ছায়া দূর করে ঝকঝকে আলো ঝলমলে রাখার জন্যই অসংখ্য বৈদ্যুতিক ফ্যান বাতি জ্বালিয়ে রাখেন।
৩. অফিসের আসার সাথে সাথেই যেন কর্তা বাবুদের পরাণ ঠান্ডা হয়, সেজন্য উনারা অফিসে সেই দিন আসবেন কিনা বা কখন আসবেন তার ঠিক নেই অথচ অফিস সময়ের পুরোটাই তাদের অফিসে এবং এসি, ফ্যান, বাতি চালু রাখা হয়।
কর্তা বাবুরা দুচার ঘন্টার জন্য অফিসের বাইরে গেলে সেই সময়েও এগুলো একইভাবে চলতেই থাকে।
বড় বড় অফিসের বড় বড় হলরুম, কনফারেন্স রুমে কাজ থাক বা না থাক এসি, ফ্যান, লাইট কিন্তু ঠিকঠাক মতোই তাদের কাজ করতে থাকে।
৪. অনেকদিন এমনও হয় অফিস ছুটির পরে অফিসে কেউ নেই, অফিস তালাবদ্ধ অথচ অফিসের ফ্যান,লাইট,এসি সবকিছুই সগৌরবে চলতে থাকা সারাদিন - সারারাত। এতে অবশ্য একটা সুবিধা আছে পরের দিন কষ্ট করে সুইচ অন করা লাগে না। ঠিক যেভাবে রান্নার গ্যাসের চুলা জ্বলে একটা ম্যাচের কাঠি বাঁচানোর জন্য।
৫. গত পরশুদিন কোন এক অফিসে পরিচালকের রুমে বসে ছিলাম। সেখানে বসেই দেখা যাচ্ছে সহকারী পরিচালকের ফাঁকা রুমে লাইট,ফ্যান, এসি চলমান এবং সহকারী পরিচালক তখন পরিচালকের রুমে। অনেকটা ঠোঁটকাটা স্বভাব নিয়েই সহকারী পরিচালকের উদ্দেশ্যে বললাম আপনার খালি রুমে এই সবকিছুই চলছে, এজন্যই আজ আমাদের এই অবস্থা। তিনি অপ্রস্তুত এবং অসন্তোষের সাথে পিয়নদের উদ্দেশ্যে করে বললেন এগুলো তো ওদের কাজ।
হয়তো উনার কথাই ঠিক। এগুলো হয়তো পিয়নদেরই কাজ।
আমি সার্ভিস রুল ভালো জানি না তাই, আমি অফিসে আমার রুমের সকল বৈদ্যুতিক সুইচ রুমে ঢোকার সময় নিজের হাতে অন করি আর বের হওয়ার সময় নিজের হাতেই অফ করি।
৬. প্রয়োজনের অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যাবহার যেন একটা ফ্যাশানে পরিনত হয়েছে। আজ একটা নিউজে দেখলাম, সরকারি অফিসে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর রুমে ২৭ টা বাত্তি জ্বলে - ভাবা যায় !! বিনা প্রয়োজনে এসি বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত এসির কথা নাহয় বাদই থাক।
৭. কয়েকদিন আগে একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলাম ব্যাক্তিগত কাজে। বের হওয়ার সময় দেখতে পেলাম প্রায় প্রত্যেকটি খালি ক্লাসরুমে এবং একটি বেশ বড়সড় গ্যালারিতে প্রায় সবগুলোই (সংখ্যায় অনেক) ফ্যান,লাইট জ্বলছে ( এসি ছিলো না)। অধ্যক্ষ যেহেতু আমার পরিচিত তাই বের হতে হতে উনাকে ফোনে বিষয়টা জানালার, উনি মুখে বললেন দেখছি কিন্তু গলার স্বরে মনে হলো যেন বলতে চাইছে তোর বাবা এখানে আঙুল দেয়ার দরকারটা কি ? তুই তোর কাজ কর।
দুইদিন পর বিনা প্রয়োজনে (শুধু এটুকুই দেখার জন্য) গিয়েছিলাম সেথায়, দেখি অবস্থা তথবৈচ।
৮. অনেকেই দেখি ব্যাটারিচালিত রিক্সা বা অটোরিকশায় বিদ্যুতের অপচয়ের বিষয়ে কথা বলতে চেষ্টা করেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই বিদ্যুতের ব্যাবহার আর অপচয় কিন্তু এক জিনিস না। ভেবে দেখুন প্রতিটি শহরের আনাচেকানাচে যদি এই পরিমান জ্বালানি তেল চালিত ছোট যানবাহনের ব্যাবহার হতো তাহলে কি পরিমান পরিবেশের দূষণ হতো তা একবার ভেবে দেখুন। আর ব্যাটারি চালিত যানবাহনের কারণে যে পরিমান কর্মসংস্থান হয়েছে সেজন্য পাড়া-মহল্লার ছোটখাটো চুরি ছিনতাই এখন অনেক কম।
৯. কয়েকবছর আগে স্ব পরিবারে ঢাকায় গিয়েছিলাম একটা কাজে। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে একটা দামি শপিংমলে ঘুরতে গিয়ে দেখলাম একটা কম্বলের দোকানে বেশ কিছু কাষ্টমার। সপরিবারে দামি দামি কম্বল উলটে-পালটে দেখছেন। কম্বলের রঙ,ডিজাইন, সিঙ্গেল/ডাবল প্লাই - ইত্যাদি। আমার সহধর্মিণী বলে উঠলো ঢাকার এই ৪০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ডাবল লেয়ার এতো মোটা কম্বল দিয়ে এরা করবে কি। ছেলেটা বললো বললো,"মনে হয় কাউকে গিফট করবে"।
মেয়েটা বললো,"গিফট না কচু করবে, এটা আজকালকার ঢাকার বড়লোকদের ফ্যাশন। এরা প্রচন্ড গরমের মধ্যেও ম্যাক্সিমাম ঠান্ডায় এসি চালাবে আর শীত কালের মত করে মোটা কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাবে"।
মনে হল মেয়েটার কথাই ঠিক, মনে পড়ে গেল অনেক আগের মানে ১৯৮৪ সালে আমার এক ধনী আত্নীয়ের বাড়িতে গরমের দিনে এক রাত ছিলাম। এসির চরম ঠান্ডা আর ইয়া মোটা নরম তুলতুলে বিদেশি কম্বল, মজাই আলাদা। তখনকার দিনে অবশ্য এধরনের কম্বল এতটা সহজলভ্য ছিলোনা।
১০. পূজা, ঈদ, জাতীয় দিবস সমূহ, বানিজ্য মেলা, পূজার বাজার, ঈদের বাজার, বিয়ে, খাতনা সহ বিভিন্ন ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে বিদ্যুতের কতটা প্রয়োজনীয় ব্যবহার আর কতটা অপ্রয়োজনীয় অপচয় সেটা বিচার করার সময় মনে হয় এসেছে।
১১. এখন আসি হাল আমলের কথায়। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিদ্যুৎ যখন সারা বিশ্ব তথা আমাদের দেশেরও একটা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন বিভিন্ন চ্যানেলে দেখতে পাচ্ছি, এক অফিস থেকে আরেক অফিসে খোঁজ নেয়া এবং বিদ্যুতের অপচয় গোচরে আসলেই চ্যানেলে তুলে ধরা সহ সংশ্লিষ্টদের ক্যামেরার সামনেই এবিষয়ে প্রশ্ন করে অপ্রস্তুত করা হচ্ছে। এগুলো নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন একটাই এতদিন কোথায় ছিলেন ??.
১২. সবশেষে একটা কথা বলতে চাই শুধুমাত্র আর্থিক সংকটের আশংকা করলেই যে বিদ্যুতের বিষয়ে মিতব্যয়ী হলে হবে একথা কবে কে বলেছে ?
আরও একটা কথা মনে রাখা দরকার বিদ্যুতের অপচয় মানে শুধু অর্থের অপচয়ই না। বিদ্যুতের অপচয়ের সাথে জড়িত আছে জীবাশ্ম জ্বালানীর অপচয়, পরিবেশ দূষণ ( বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, আলোদূষণ) বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রের পানির স্ততের উচ্চতা বৃদ্ধি, বনভূমি উজাড়, নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে ভূতাত্ত্বিক আমূল ক্ষতিসাধন। এসি ফ্রীজ থেকে নির্গত সিএফসি যেভাবে বায়ুমন্ডলের ওজন স্তরের ক্ষতিসাধন করে, তাতে দিন দিন তেজস্ক্রিয়তার শিকার হচ্ছি আমরাই।
সবশেষে আসি পারমাণবিক বিদ্যুৎ, এবিষয়ে আমার জ্ঞান খুবই সীমিত। তবে যতবার কোন কাজে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশ দিয়ে গিয়েছি, আমার কিন্তু চেরেনোবিল দুর্ঘটনার কথা মনে পড়েছে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা আমার শংকা যে সত্য সত্যই অমুলক হয়।
আলোদূষনের কথা একটু আলাদা করে অবশ্যই ভাবা উচিত কারণ,
আলোর কারণে যে পরিবেশ দূষণ
হতে পারে এটা আমরা সচরাচর ভাবতেই চাইনা।
রাত্রিকালে মানুষের বাড়িঘরের বাইরে আলোদূষনের কারণে আজ অনেক নিশাচর পশু, পাখি এবং কীটপতঙ্গ হয় বিলুপ্ত বা বিলুপ্তির পথে।
সুতরাং বিদ্যুৎ ব্যাবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সবসময়ই এই চিন্তাটা মাথায় রাখতে হবে যে এই ধরিত্রীর যে পরিমান ক্ষত আমারা প্রতিদিন করি, প্রতিদিনের সেই ক্ষত প্রতিদিন সারানোর ক্ষমতা এই ধরিত্রীর আছে কিনা।
ডা সুরেশ তুলসান।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়