SAHA ANTAR

Published:
2021-11-30 12:02:26 BdST

বন্ধুত্বকথনআজকের কাহিনী দুজন বন্ধু, তাদের বন্ধুত্ব এবং বন্ধুত্বের লজ্জা নিয়ে


লেখক

 

ডা. তারিক অনি
————————

আজকের কাহিনী দুজন বন্ধু, তাদের বন্ধুত্ব এবং বন্ধুত্বের লজ্জা নিয়ে। ফ্রেন্ডলিস্টে থাকার কারণে তাকে হাইড করে এই লেখা পোস্ট করতে হচ্ছে। বন্ধুকে অপ্রস্তুত করে লাভ নেই। গল্পের খাতিরে ধরে নেই তার নাম মুহিব। চলুন মুহিবের গল্পে প্রবেশ করি।

পাঁচ বছর আগে আমি যখন অস্ট্রেলিয়া আসি তখন আমার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। হাজার দশেক ডলার, ২০ কেজি বইখাতা ভর্তি একটা ৩৩ কেজি ওজনের স্যুটকেস এবং বসুন্ধরা সিটি থেকে কেনা নতুন একজোড়া স্যুট-কোট-জুতা পরে জানুয়ারী মাসের চমৎকার এক শীতের সকালে আমি মেলবোর্নে অবতীর্ণ হই। মেলবোর্নে আমার লতায়-পাতায় ও কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। স্বাধীনচেতা স্বভাবের হওয়ার কারণে যে শহরে আত্মীয় আছে, সেই শহরেই যাইনি। মেলবোর্ন শহরে একমাত্র পরিচিতজন বলতে মেডিকেল কলেজের সিনিয়র - সমরদা আর স্কুলের এক বন্ধু আলীম।

সমরদা সুত্রে কিছু বাঙালী পরিবারের সাথে পরিচয়। শহরের এক ডর্মে একা থাকি, পরীক্ষার ক্লাশ করি, নিজের মত মাসকাবারী ট্রাম-বাসের ফ্রী কার্ড দিয়ে মেলবোর্ন শহরের অলি গলি ঘুরে বেড়াই, অজানা অচেনা সব বাঙালী পরিবারের বাসায় খুব পরিচিতজনদের মত যেয়ে দাওয়াত খেয়ে আসি, দাওয়াত শেষে ভাই-ভাবীরা খাবার প্যাকেট করে দেন, আমি হাসিমুখে বিনাসংকোচে সেই প্যাকেট হাতে করে নিয়ে চলে আসি আর শহর দেখি। দোকান দোকানে ঘুরি, ঝলমলে শপিং মল মেলবোর্ন সেন্ট্রাল দেখি, রিবক-নাইকের চমৎকার সব জুতা দেখি কিন্তু কিছুই কিনি না। একে পকেটে হিসেব করা টাকা, তার উপর সদ্য বাংলাদেশ থেকে আসায় সবকিছুর দাম ই ৬৫ দিয়ে গুণ করি, এরপর যা অংক দাড়ায়, আমি আর কিছুই কিনতে পারিনা !

এরকম এক অবস্থায় গল্পে মুহিবের প্রবেশ। আমি অস্ট্রেলিয়া এসেছি জেনে মুহিব সিডনী থেকে মেলবোর্ন উড়ে এসে আমার সাথে দেখা করতে এলো। আমার এই বাল্যবন্ধুটি পড়াশোনায় ব্যাকবেন্চার, অস্ট্রেলিয়াতে স্ট্রাগল করে থীতু না হতেই তার জীবন থেকে দশটি বছর নেই। লজ্জায় লজ্জায় আমাকে জানালো সে সিডনী শহরে উবার চালায়। এটাই তার জব। তবে সেই লজ্জা আমাদেরট বন্ধুত্বের গাঢ়ত্ব আর প্রাণখোলা আড্ডাবাজিতে তেমন কোন প্রভাব ফেললো না।

দুই বন্ধু জম্পেশ গল্প করলাম। ইন্টারনেটে সার্চ করে মেলবোর্ন শহরের সস্তা বিরিয়ানীর দোকান খুজে বের করে খেলাম। মুহিব আমাকে মহা উৎসাহে অস্ট্রেলিয়ার কোথায় সস্তায় ভালো জিনিস পাওয়া যায়, কোন দোকানে কখন সেল দেয়, কোন কোন সুন্দর দেখার মতো জায়গা আছে এসব রীতিমতো ক্লাস নিয়ে বলতে থাকলো। কিভাবে মাঝে মাঝে মাত্র ৫০ ডলারে প্লেনের টিকেট পাওয়া যায় এবং এসব দিকে নজর রাখা উচিত এসব ও আমাকে শিখিয়ে গেল। তার কাছে আমি শিখলাম পকেটে পয়সা না থাকলেও শহরে বেশ কয়টা ট্যুরিস্ট বাস চক্কর দেয়, তাতে ঝামেলা ছাড়াই ফ্রী চড়া যায়, ছোটখাটো লিফ্ট ও নেওয়া যায়!

সারাদিন ঘুরাঘুরি শেষে যাবার সময় মুহিব আমাকে অনেকটা চোরের মত টেবিলের নীচ দিয়ে ঘুষ দেওয়ার মত করে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে বললো, “এটা রাখ।” খামের ভিতর ৫০ ডলারের নোটে মোট ১০০০ ডলার।

আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই মুহিব অপ্রস্তুত হয়ে বললো, “তোর তো ভিজিট ভিসা। ট্যাক্সি চালানোর ও সুযোগ নাই। তুই তো অস্ট্রেলিয়ায় না খেয়ে মরবি। আপাতত এটা খরচ কর আর টাকা লাগলে আমাকে বলিস। আমার অবস্থা বেশি ভালো না, কিন্তু দুই-চার হাজার ডলার ব্যাপার না মামা! “ বলতে বলতে মুহিব যাওয়ার আগে আলিঙ্গন করলো।

আমি তাকে বোঝাতেই পারলাম না যে আমার টাকা লাগবে না। সে নাছোড়বান্দা। অস্ট্রেলিয়ার নিজের কঠিন জীবন সংগ্রাম থেকে মুহিবের বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে, প্রবাস জীবনে টাকার কষ্টই সবচেয়ে বড় কষ্ট, তাই সে আমাকে কিছুটা হলেও আরাম দিতে চায়। আমি বহু বুঝিয়ে তাকে নিবৃত্ত করলাম। প্রতিনিয়ত যোগাযোগ থাকবে, প্রয়োজনে তাকে জানাবো, তার বাতলে দেওয়া প্লেনের সস্তা টিকেট কেটেই সিডনী ঘুরতে আসবো এসব বলে তাকে প্লেনে তুলে বিদায় দিলাম।

যথারীতি মুহিবের সাথে আমার কোন যোগাযোগ থাকলো না। আমি আমার বন্ধুকে বেমালুম ভুলে গেলাম। পরীক্ষা পাশ করেই জীবন এবং জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। যোগাযোগ কমে গেল। প্রথম দু’একটা ঈদে ফোন দিলাম, তারপর সেটা কমন ‘ঈদ মোবারক’ ক্ষুদে বার্তায় পৌছালো, এবং সবশেষ ঈদে সেটাও করলাম না। জীবনের ব্যস্ততায় অন্যান্য প্রায়োরিটির ভীড়ে আমার উবার চালানো বন্ধুটি ফেসবুকের এক কোনায় পড়ে রীতিমতো হারিয়েই গেল। আমি ততদিনে ভালো চাকুরী পেয়ে এদেশে কেতাদুরস্ত ডাক্তারবাবু বনে গেছি, নিজের দামী গাড়ি চালাই। অন্য শহরে গেলে উবারের প্যাসেন্জার হই, ভালো রেস্টুরেন্ট থেকে উবার ইটস এ খাবার খাই। সস্তা কেএফসি আর সাবওয়ে দেখলে বমিভাব করে নাক সিটকাই। বিদেশি ডাক্তার বন্ধুদের সাথে তাদের গাড়ির মডেল আর ভ্যাকেশন ট্যুর নিয়ে আলোচনা করি। হাই-ক্লাস মেইনটেইন করা কেতাদুরস্ত ডাক্তারবাবু আমি, কোথাকার কোন সিডনী শহরের এক গরীব উবার চালক বন্ধুকে মনে রাখার সময় কই !

সব ভালোই চলছিলো, কিনেতু হঠাৎ করেই আবার মুহিব উদয় হল। আরেক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারলাম মুহিবের সংকট। সিডনী তে করোনা আউটব্রেকে অনেক পার্ট টাইম ক্যাজুয়াল জব ছাঁটাই এর সাথে সাথে মুহিবেরও স্টেবল কোন চাকরী নেই। তার স্ত্রীর ও চাকরি নেই। তার উপর তাদের একটা বাচ্চা আছে। সরকারী বেনিফিট যে টাকা দেয় সেই টাকা দিয়ে সিডনী শহরে বাঁচা কষ্ট। আমার বন্ধু তার লোন এ কেনা বাড়ি বিক্রির কথা ও ভাবছে, কারণ সে লোন টানতে পারছে না। আমাকে সস্তায় উড়োজাহাজের টিকিট কেটে আকাশে উড়তে শেখানো বন্ধুটি নিজের জীবনের রানওয়েতেই খোড়াতে খোড়াতে ছুটছে। সমস্যা হল, এধরণের ছেলেগুলো জঘণ্য রকমের অভিমানী, হয়তো ছুটতে ছুটতে একসময় থেমে যাবে কিংবা হোঁচট খেয়ে পড়েই যাবে, কিন্তু মুখে একটা বিশ্রীরকম মেকী হাসি ধরে রেখে বলবে ‘ভালো আছি’, যেটা শুনলে নিজের গালেই চড় মাড়তে ইচ্ছা করবে।

মন টা খারাপ হল। মুহিব কে ফোন দিলাম। প্রথম রিং এই মুহিব ফোন ধরলো। সব রকম কথা হল। মেলবোর্ন-সিডনী নিয়ে সে রসিকতা করারও চেষ্টা করলো। আমি দশবার ঘুরেফিরে নানাভাবে জিজ্ঞেস করলেও সে তার সমস্যার কথা বললো না। তার সব কথা সিডনীর আবহাওয়া, কুইন্সল্যান্ডের ধানক্ষেত-আখক্ষেত আর গ্রেট ব্যারিয়ার রীফের স্কুবা ডাইভিং এ সীমাবদ্ধ। আমি ধৈর্য হারিয়ে বাজেভাবে গালি দিলাম !

মুহিব মিন মিন স্বরে জানালো তার অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে সে বন্ধুমহল থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। আমার খবর সে রাখে, মাঝে মাঝেই আমার পোস্ট ও দেখে ফেসবুকে। কিন্তু আমাকে নক করতে তার কেমন জানি সংকোচ লেগেছে। ভালো অবস্থানে থাকা বন্ধুদের হঠাৎ ফোন করে সাহায্যর কথা বললে তারা কি না কি ভেবে বসে। ছোটবেলার বন্ধু, যার সাথে মারামারি করে একটা আট আনার আইসক্রীম কামড়ে দুইভাগ করে খেয়েছি, সে আজ ফোন করতেও লজ্জা পাচ্ছে! মাত্র কয় বছর আগে যে আমার পকেটে হাজার ডলারের খাম গুঁজে দিচ্ছিল আজ তার আমাকেই সংকোচ হচ্ছে। জীবন নাটকের উত্থানপতনের গল্প আসলেই আমাদের নানাভাবে চমকে দেয়, বাস্তবের নাটককে হার মানায়।

দোষটা মুহিবদের না। দোষ টা আমার মত সদ্য জাতে ওঠা বিদেশী ডাক্তারবাবু বন্ধুদের। আমিই আমার বন্ধুকে কাছে রাখতে পারিনি। জীবনের প্রয়োজনে আমরা সবসময় ই কাজের মানুষটিকে ফোন দেই। আমাদের ফোন লিস্টে স্থান পায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। ফোনের ডায়াললিস্টের প্রথম দশটা নম্বর ই থাকে অফিসের বস কিংবা কলিগ এর। জীবনের সিঁড়ি দিয়ে আমরা উপরে উঠে চলি, ঈদের দিন সকালে খ্রীষ্টান বসকেও শুভেচ্ছা বার্তা পাঠাতে ভুলিনা, কিন্তু গরীব বন্ধুগুলোকে কেন যেন আর মনে করে ফোন করা হয়ে ওঠে না। মস্তিষ্ক ও কেমন করে যেন ভুলিয়ে দেয় তাদের। মাঝে মাঝে হৃদযন্ত্র ভিতর থেকে তাদের কথা বলে ওঠে, কিন্তু হাত টা আর শেষপর্যন্ত কেন যেন ফোনের কাছে আগায় না, এ এক অদ্ভুত সংকোচ !

পৃথিবী তার অক্ষের উপর ২৪ ঘন্টায় একবার প্রদক্ষিণ করে আর মুহিবদের মূল্য দশ পয়সা করে কমে। সুর্যের চারিদিকে পৃথিবী একপাক ঘুরে আসতে একটি বছর সময় পার হয়, মুহিবরা মূল্যহীন হয়ে পড়ে। বছরখানেকের ব্যবধানে বন্ধুত্ব হারিয়ে যায় মহাকালের গর্ভে।
এই লেখাটির নির্দিষ্ট কোন শেষ নেই। বন্ধুত্বের বিষাদকথনের কোন শেষ থাকেও না। ছোটবেলার অভিমানী বন্ধু হলে তো আরও না। পাঁচবছর আগে আমি যেমন ডলারের খামটি নেইনি, তেমনি মুহিব ও ‘প্রয়োজনে জানাবো’ বলে কিছুতেই আমার কাছ থেকে ডলার নেয়নি। দুই বন্ধুর মধ্যে অভিমানী আত্মমর্যাদার এক ছোট্ট গল্প রচিত হয়ে গেল, সেটা বোধকরি কারও চোখ এড়ালো না।

আমি আমার জীবনে ছুটে চলি, মুহিব তার জীবনে। আজ রবিবার। আমি আমার গাড়ির ইন্জিনে স্টার্ট দেই, বাইরে যাবো, কোন এক কফিশপে কফি খাবো। মুহিব ও হয়তো তাই। জীবন সমান্তরালে বয়ে চলে। সূত্র বলে এটাই সত্য। আমাকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে আপাতত দামী গাড়ির ইগনিশন বাটনে চাপ দিয়ে কফি খাওয়ার জন্য বের হতে, আমি তাই করছি। মুহিবের স্ক্রীপ্টে সৃষ্টিকর্তা আপাতত দূর্দশা লিখেছেন, তাকে হিসেব করে কফিতে চিনি ঢালতে হচ্ছে। কে জানে জীবন পরিক্রমায় ডিরেক্টরের নির্দেশে হয়তো পাশার দান উল্টে আমাকে ভবিষ্যতে উবার চালাতে হবে। তবে আপাতত মুহিব সেই চরিত্রে চমৎকার অভিনয় করছে। দুজন চমৎকার অভিনেতা বন্ধুর এই অভিনয় থামানো কঠিন, দৃশ্যপট বা স্ক্রীপ্ট পরিবর্তন করাও কঠিন। সৃষ্টিকর্তা তার স্ক্রীপ্টের বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে পৃথিবীতে পাঠান নি।

“তুমি আমার পাশে বন্ধু হে, বসিয়া থাকো ।
একটু বসিয়া থাকো … ।”

তারিক, ২৮ নভেম্বর ২০২১ এর বিষাদসন্ধ্যা
রকহ্যাম্পটন।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়