Dr.Liakat Ali

Published:
2021-10-27 11:39:27 BdST

"কাফিরিস্তান" থেকে "নুরিস্তান "


ডা.সুকুমার সুর রায়
___________________________


দীর্ঘ বিশ বছর পরাশক্তি আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে অবশেষে তালিবান প্রায় বিনা রক্তপাতে নাটকীয় কায়দায় আফগানিস্তান দখল করেছে।
ফলে সারা বিশ্বের নজর এখন আফগানিস্তানের দিকে।
আফগানিস্তান দেশটির অবস্থান এমন এক জায়গায় যেটা মধ্যপ্রাচ্য , মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রস্থল বলা যেতে পারে।
প্রাচীন কালে এই জায়গাটি পারস্য সাম্রাজ্য, গ্রীক সাম্রাজ্য এবং ভারতীয় মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
মধ্যযুগে ইসলামি খেলাফত, মোঙ্গল সাম্রাজ্য, তুর্কি ও মোগল সাম্রাজ্য পর্যায়ক্রমে আফগানিস্তানকে কব্জা করে।
আধুনিক যুগে রাশিয়ান জার সাম্রাজ্য এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের যাঁতাকলে পড়ে যায় আফগানিস্তান। এই কারনে আফগানিস্তানকে সেই সময় রাশিয়া ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী একটি ' বাফার স্টেট' হিসেবে বলা হতো।
এতোসব সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের মোকাবিলা করে স্বাধীনচেতা আফগানরা ( পশতুন/ পাঠান)
আফগানিস্তানের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখে। এই কারনে আফগানিস্তান ' সাম্রাজ্যবাদীদের কবরস্থান ' হিসেবেও পরিচিতি লাভ করে।

আফগানিস্তানের আয়তন প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। বাংলাদেশের আয়তনের চার গুনের বেশি। দেশটির চার ভাগের তিন ভাগ অংশই পর্বতময়। জনসংখ্যা প্রায় চার কোটি। প্রধান জাতিগোষ্ঠী পশতুন প্রায় ৪২%।
এরপরেই তাজিক ২৭%, হাজারা ৯%, উজবেক ৯%, আইম্যাক ৪%, তুর্কমেন ৩%,বালুচ ২%, অন্যান্য ৪%। মোট জনসংখ্যার ৯৯.৭% মুসলিম।

আফগানিস্তানের চারিদিকে যে দেশগুলি রয়েছে সেগুলি হলো পুর্ব ও দক্ষিনে পাকিস্তান, পশ্চিমে ইরান,উত্তর পশ্চিমে তুর্কমেনিস্তান, উত্তরে উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান এবং উত্তর পুর্ব কোনায় চীনের সাথেও এক চিলতে সীমান্ত রয়েছে।

প্রাগৈতিহাসিক যুগে এইরকম কোন বর্ডার ছিলোনা।
বরঞ্চ আফগানিস্তানের উত্তরে তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানে ব্যাকট্রিয়া মার্জিয়া প্রত্নতাত্ত্বিক কম্পলেক্সে যে প্রাচীন সভ্যতার ( অক্সাস সভ্যতা) নিদর্শন পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায় যে, আজ থেকে সাড়ে চার হাজার বছর আগে এই অঞ্চল সহ আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলে ইন্দো-ইরানীয় ( আর্য) জাতি বসবাস করতো।
এই সমগ্র অঞ্চল ' আরিয়ানা ' নামে পরিচিত ছিলো। আরিয়ানা শব্দের অর্থ আর্যদের বাসস্থান। পরবর্তীতে ' আরিয়ানা ' শব্দটি থেকেই ' ইরান ' দেশের নামকরণ হয়ে থাকতে পারে। ' ব্যাকট্রিয়া' শব্দটি থেকে ব্যাকট্রা এবং আরো পরে আজকের বলখ্ এলাকার অস্তিত্ব রয়েছে। সেকালের অক্সাস নদী আজকের - ' আমু দরিয়া'।
আরো পরে আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদে এবং পারসিয়ান জরাথ্রুষ্টবাদীদের ধর্মগ্রন্থ ' জেন্দ আবেস্তায় ' আফগানিস্তানের 'গান্ধারা সভ্যতার' উল্লেখ পাওয়া যায়। ' গান্ধারা' হলো আজকের কান্দাহার।
প্রাচীন এই জনপদের মানুষের প্রধান প্রধান ধর্ম বিশ্বাস ছিলো জরাথ্রুষ্ট ধর্ম, প্যাগানিজম, প্রকৃতি পুজারি,প্রাচীন হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম ইত্যাদি।

আফগানিস্তানে মোট ৩৪ টি প্রদেশ রয়েছে।
এই ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে একটি প্রদেশের নাম ' নুরিস্তান '।
এই নুরিস্তান প্রদেশের অবস্থান হলো আফগানিস্তানের সর্ব উত্তরপুর্ব কোনায় হিন্দুকুশ পর্বত মালার দক্ষিন ঢালে দুর্গম পার্বত্য উপত্যকায় ( ম্যাপ দ্রষ্টব্য)।
এই নুরিস্তান প্রদেশের পুর্বের নাম ছিলো ----- ' কাফিরিস্তান'।
এরও আগে কাফিরিস্তান, পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং কাশ্মীর অঞ্চল মিলে গোটা অঞ্চলটির নাম ছিলো ' পরিস্তান'!
কাফিরিস্তান শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো যেখানে কাফির বা বিধর্মীরা বসবাস করে।
কীভাবে একটি এলাকার নাম কাফিরিস্তান হলো, হাজার বছর যাবত এই নাম বহাল থাকলো এবং পরিশেষে কীভাবে এর নাম বদলে নূরিস্তান হলো সে এক দীর্ঘ ইতিহাস।

৬৭৮ খ্রীস্টপূর্ব থেকে ৫৪৯ খ্রীস্টপূর্ব সময়কালে কাবুল উপত্যকা মেদিয়ান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
৫৫০ খ্রীস্টপূর্ব পারস্য সম্রাট সাইরাস দি গ্রেট কাবুল দখল করেন।
৫১৬ খ্রীস্টপূর্ব পারস্য সম্রাট দারিয়াস গোটা আফগানিস্তানকে একিমেনিড সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।
৩৩০ থেকে ৩২৭ খ্রীস্টপূর্ব আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট আফগানিস্তান জয় করেন।
৩১২ খ্রীস্টপূর্ব আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তার সেনাপতি সেলুকাস সেলিউসিড সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
৩০৫ থেকে ৩০৩ খ্রীস্টপূর্ব ভারতীয় মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্র গুপ্ত মৌর্য্য সেলুকাসকে পরাজিত করে আফগানিস্তান দখল করেন।
প্রায় ৪০০ বছর মৌর্য সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির পর
১২০ খ্রীস্টাব্দে কনিষ্ক দ্য গ্রেট কুষান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।
৩২০ খ্রীস্টাব্দের পরে হুন'দের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
৬৬৫ খ্রীস্টাব্দে বৌদ্ধ তুর্কশাহী রাজবংশের শাসন শুরু হয় যাদের রাজধানী ছিলো বাগরামের নিকটে কাপিশি।
ওদিকে ৬৮০ খ্রীস্টাব্দে গজনীতে প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দু জানবিল রাজবংশের শাসন।

৬৮৩ খ্রীস্টাব্দে উমাইয়া খেলাফত আমলে ইয়াজিদ ইবনে জিয়াদ এর নেতৃত্বে প্রথম আরবীয় মুসলিম বাহিনী আফগানিস্তান আক্রমণ করে কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়।
৮১৫ খ্রীস্টাব্দে আব্বাসীয় খেলাফতের সময় আরব বাহিনী তুর্কশাহীকে পরাস্ত করে ইসলাম ধর্ম গ্রহনে বাধ্য করে।
৮৫০ খ্রীস্টাব্দে আবার হিন্দু শাহী রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
অবশেষে ১০০১ খ্রীস্টাব্দে গজনীর সুলতান মাহমুদ পেশোয়ারের যুদ্ধে হিন্দু রাজা জয়পলের সৈন্যবাহিনীকে পর্যুদস্ত করে সমগ্র আফগানিস্তান দখল করেন।
১২১৯ - ১২২১ সালে মঙ্গোল বাহিনী কাবুল কান্দাহার ও জালালাবাদ দখল করে নেয় এবং হাজার হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে।
১২৫৯ সালে চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর আফগানিস্তান চাগতাই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৩৮৩ - ১৩৮৫ সালে তিমুর কর্তৃক আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চল তিমুর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৫০৪ সালে সমরখন্দের শাসক বাবর কাবুল দখল করে নেয়।
১৭০৯ সালে উপজাতীয় নেতা মীরওয়াইজ হোতাক পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে কান্দাহারের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেন।
তারপর ইতিহাসের বহু চড়াই-উৎরাই পাড়ি দিয়ে
১৮২৩ সালে আফগানিস্তানে আমীরের শাসন' কায়েম করেন আমীর দোস্ত মোহাম্মদ খান।
এরপর পারস্য ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে আফগানদের দফায় দফায় যুদ্ধ চলে অর্ধ শতাব্দী ব্যাপী। তারপর ১৮৮০ সালে আমীর আব্দুর রহমান খান নিজেকে আমীর হিসেবে ঘোষণা করেন এবং গোটা আফগানিস্তানের উপরে নিয়ন্ত্রণ নেন।
আমীর আব্দুর রহমান খান বিভিন্নমুখি অভিযান পরিচালনা করেন যাতে আফগানিস্তানে কোন বিরুদ্ধবাদী কিংবা ভিন্নমতাবলম্বীর অস্তিত্ব না থাকে।

কাফিরিস্তানের অধিবাসীরা ছিলো মুলত প্রাচীন বৈদিক ধর্ম ও তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক সংস্কৃতির মিশ্রণে গড়ে ওঠা এক বিশেষ ধর্মের অনুসারী।
তাদের ভাষা নূরিস্তানি ভাষা যা প্রাচীন ইন্দো-ইরানীয় ভাষাগোষ্ঠীর একটি বিশেষ ভাষা এবং এই ভাষার সাথে আফগান অঞ্চলের অন্য কোন ভাষার সাথে আদৌ কোন মিল নাই।
সম্ভবত সারা আফগানিস্তান ব্যাপী যখন দ্রুত ইসলামিকরন হচ্ছিলো তখন অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা হয় ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছিলো নয়তো দেশান্তরি হচ্ছিলো।
এদেরই কিছু সংখ্যক মানুষ পালিয়ে দুর্গম হিন্দুকুশ পর্বত এলাকায় লুকিয়ে নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছিলো।
এই জনগোষ্ঠীই আস্তে আস্তে স্থানীয় মুসলিম দের দ্বারা কাফির নামে পরিচিত হতে থাকে এবং এলাকাটির নাম হয়ে যায় ' কাফিরিস্তান '।
১৮৯৬ সালের বসন্ত কালে আমীর আব্দুর রহমান খান এর বাহিনী তিন দিক থেকে দুর্গম কাফিরিস্তানে অভিযান পরিচালনা করেন।
কাফিররা অধিকাংশই ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হয়। বাকিরা পালিয়ে পুর্ব দিকের ' ডুরান্ড লাইন' অতিক্রম করে পাকিস্তানের চিত্রল জেলায় চলে গিয়ে প্রান বাঁচায়। চিত্রল ছিলো তখন স্বাধীন রাজা শাসিত রাজ্য।
এভাবেই কাফিরিস্তান রাজ্যের অবসান হয় এবং সেই অঞ্চলের নতুন নাম রাখা হয় নুরিস্তান। প্রকৃত পক্ষে গোটা আফগানিস্তানই নূরিস্তানে রুপান্তরিত হয়। নুরিস্তানের আভিধানিক অর্থ নূরের রাজ্য অথবা আলোকিত মানুষদের বাসস্থান।
এরপরে ইতিহাসের অনেক উত্থান পতন ঘটে।
একাধিকবার ইঙ্গ- আফগান যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
১৯০১ সালে আমীর আব্দুর রহমান এর পুত্র হাবিবউল্লাহ খান আমীর হন।
১৯১৯ সাল হাবিবুল্লাহ খান খুন হন। তার পুত্র আমানুল্লাহ খান আমীর হন।
১৯২৯ সালে আমানুল্লাহ খান কে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। প্রাক্তন সেনাপতি মোহাম্মদ নাদির শাহ আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন।
১৯৩৩ সাল নাদির শাহ খুন হন। তার পুত্র মোহাম্মদ জহির শাহ কে রাজা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর
১৯৭৩ সালে রাজা মোহাম্মদ জহির শাহ এর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান হয় এবং মোহাম্মদ দাউদ খান নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন।
১৯৭৮ সালে সামরিক বাহিনীর একাংশ প্রেসিডেন্ট দাউদ খান ও তার পরিবারকে হত্যা করে। নুর মোহাম্মদ তারাকী নতুন প্রেসিডেন্ট হন।
১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট তারাকীকে হত্যা করা হয়।
১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী হাফিজুল্লাহ আমিনিকে ফাঁসীতে লটকানো হয়। এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে নেয়।
অনেক অনেক রক্তপাতের পরে
১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে যায়।
এরপর শুরু হয় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ।
১৯৯৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রথম তালিবান সরকার কাবুল দখল করে নেয়, প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নাজিবুল্লাহকে হত্যা করা হয় এবং আফগানিস্তানকে ইসলামিক আমিরাত হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
২০০১ সালে ' সন্ত্রাস বিরোধী অনন্ত যুদ্ধ' এর নামে আমেরিকা আফগানিস্তানের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
অতঃপর সুদীর্ঘ ২০ বছরের লড়াই সংগ্রাম শেষে পরাশক্তি আমেরিকা লেজ গুটিয়ে পালায়।
১৫ আগষ্ট ২০২১ সালে তালেবান যোদ্ধারা বীরের বেশে কাবুলে প্রবেশ করে।
দুই মাস পার হয়ে গেছে। এখন মাঝে মধ্যে টুকটাক শিয়া মসজিদে আত্মঘাতি বোমা হামলার খবর পাওয়া যায়।
শান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন কতদূর তা ভবিষ্যতের ইতিহাসে লেখা হবে।
তথ্যসূত্র ঃ https://www.bbc.com
Afghanistan profile- Timeline - BBC News
https://en.m.Wikipedia.org
Timeline of Afgan history.Wikipedia

Copyright ডা সুকুমার সুর রায়।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়