ডেস্ক

Published:
2021-08-14 04:31:15 BdST

হিউম্যান ক্যারেক্টারের গ্রে এরিয়া: পরীমনি এবং একজন চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ


 

ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল, রক্ত রোগ বিশেষজ্ঞ, সঙ্গীত শিল্পী, সুলেখক
...........................................

একটি পরীমনি বিষয়ক পোস্ট::

কোন একটা টপিক নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লেখার অভ্যাস আমার নেই। মানুষের ব্যক্তিগত কেচ্ছাকাহিনী বরাবরই এভয়েড করি। তারপরও পরীমনি ইস্যুটি নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই লিখছি। তবে খন্ডিত ও বিভিন্ন অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়াছুড়ি করছি। তাই আমার বন্ধু, শুভাকাংক্ষীদের অনেকেই বিরক্ত হচ্ছেন৷ কেউ কেউ কনফিউজড৷

ব্যক্তি পরীমনি আমার আগ্রহের বিষয় নয়। তার সাথে আমার আলাপ হয়েছিলো নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবার সামান্য আগে, যখন সে এই মাধ্যমে প্রবেশ করেছিল মাত্র, সেই সময়ে। সেই আলাপ তার সম্পর্কে কোন আগ্রহ তৈরিতে আমাকে নিরুৎসাহিত করেছে।

পরিমনি সংক্রান্ত আলাপ আমার কাছে মনে হয়েছে যতটা না নায়িকা বিষয়ক, গ্ল্যামার ওরিয়েন্টেড, স্পাইসি টক তারচেয়েও অনেক বেশি আমাদের সমাজতত্ত্বের সাব্জেক্ট। এই মেয়েটি আমাদের সমাজ চিন্তা, প্রগতিবাদ,নারীবাদ, ব্যক্তিস্বাধীনতা, ধর্মীয় ও সামাজিক নীতিবাদ, গ্ল্যামার ও এন্টারটেইন্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রির চোরাগলি প্রভৃতি বিষয়ের অনেকগুলো সাংঘর্ষিক মতবাদকে মুখোমুখি এনে দিয়েছে৷ সে ইন্ডাস্ট্রিতে থাকবে কি থাকবেনা সে ব্যপারে নিশ্চিত না হলেও আমি এটুকু নিশ্চিত যে পরীমনি ও তার জীবন দীর্ঘদিন আলোচিত হবে৷ আগামি পঞ্চাশ বছর পর তাকে নিয়ে বায়োপিক লেখা হতে পারে। সিনেমাও হবে।

ওপরের কথা গুলো ডিসক্লেইমার৷ মূল আলাপে আসি। আমি কেন তার মুক্তি চাই বলে অনলাইন আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ছিনা সেই কৈফিয়ত এখানে দিতে চাই৷

পরীমনির মানবাধিকার নিয়ে আমি এখনো তেমন বিচলিত নই। তাকে জেল দেওয়া হয়নাই৷ র‍্যাবের ভাষ্যমতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে রিমান্ডে আনা হয়েছে৷ জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। র‍্যাবের প্রেস ব্রিফিংএ বলা হয়েছে মাদক (মদ ছাড়াও এল এসডি,আইস), ব্ল্যাক মেইলিং, নারীপাচার, পর্ণগ্রাফী ইত্যাদি অভিযোগ। তথ্য উদঘাটন করার চেষ্টা হচ্ছে। পেলে মামলা হবে, না হলে হবেনা৷ আইন আইনের পথে চলবে। ব্যত্যয় হলে দেশে মানবাধিকার ও মহিলা সমিতি আছে এবং তাদের আইনজীবিরা আছেন। তেমন হলে আমরাও দাঁড়াবো।

যতদুর জানি এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে মামলা একটাই। মাদক বিরোধী আইনে মামলা। মদ রাখা বা মদ খাওয়াকে আমি ব্যক্তিগতভাবে অপরাধ মনে করিনা।
আমার পারসোনাল চয়েজ দিয়ে তো আইন চলবেনা। আমাকে মদ সহ ধরতে পারলে আইন শৃংখলা বাহিনি ধরে নিয়ে যাবে। এখানে আমার পারসোনাল চয়েজ কাজে আসবেনা। এই ভয়ে আমি মদ সচরাচর খাইনা। কিন্তু আইনটা সংশোধনের দাবী তোলা যেতে পারে।

আমি মদ খাওয়াকে খারাপ মনে করিনা। কিন্তু অন্যের ক্লাবে গেস্ট হিসেবে গিয়ে নিয়ম বহির্ভূতভাবে মদ্যপান করতে চাওয়া, না দিলে মারধর করা, ভাংচুর করা, ফ্রি তে মদ আনতে যাওয়া, না দিলে মারধোর ভাংচুর ইত্যাকার মাস্তানিকে ভীষণ অপছন্দ করি। এই কাজ যে করবে সে যদি শিল্পী হয় তাহলে আরো অপছন্দ করি। পাবলিক নুইসেন্স শিল্পীর খাটেনা৷

কাউকে মিথ্যা বলে ফাসানো জঘন্য কাজ। মিথ্যা ধর্ষণের অভিযোগ ধর্ষণ অপরাধটিকেই হালকা করে দেয়। অসংখ্য বিচারপ্রার্থী ধর্ষিত নারীকে নির্মম ভাবে পরিহাস করে। আমি মনে করি পরীমনি নাসির মাহমুদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন। ফরেনসিকের সামান্য পড়াশুনা আর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে এই ধারণা আমার হয়েছে। একারণেও তার প্রতি আমার সিম্প্যথি কাজ করছেনা৷

পরিমনি এখন অব্দি যা করে এসেছে তা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের তাবেদারি ও স্টেইক হোল্ডারশিপ। এভাবেই সে বিলাসী জীবন যাপন করেছে। 'যেকোন উপায়ে ভোগ কর' এই নীতিতে আমি বিশ্বাসী নয়৷ শ্রম ও সাধনা ভিন্ন সাফল্য পাওয়ার যে চোরাইপথ আমি তাকে ভীষণ অপছন্দ করি। আমি প্রগতিশীল, মদপান সমর্থন করলেই স্বেচ্ছাচারিতার সমর্থক হব এটাও ভাবা ঠিক না।

এখন কথা হলো - সে কি একাই অপরাধী? আর কেউ নেই? এগুলো নিয়ে আলাপ করা সময় নষ্ট। যার যার অপরাধ তার তার৷ আইনের নিজস্ব ব্যখ্যাও আছে। পরিমনির দুজন ইম্পরট্যান্ট সংগী পুরুষকে ধরা হয়েছে। রাজ এবং অমি। আমি যদ্দুর জানি এরা তার অপকর্মের খুব ঘনিষ্ট সহযোগী। পরীর শয্যাসংগী হওয়াটা অপরাধ কিনা সেটা আইন ঠিক করবে। এখানে আমার মন্তব্য নাই৷ প্রতারণা না হলে এরকম সম্পর্ক নিয়ে আমার বলার কিছু নেই।

দৈনিক অনেক লোক হোটেল রেইডে ধরা পড়ছে, রাস্তা থেকে মদ বহন করার কারণে ধরা পড়ছে৷ এসব আইন ঠিক না বেঠিক সে আলোচনা ভিন্ন। কিন্তু আইনটা আছে এবং ধরা পড়ছে৷

আমাদের সমাজে ধনিক শ্রেনীর জন্য আইন নেই। ক্ষমতাবানরা আইনের আওতায় আসেন না। এগুলো আমরা সবাই জানি৷ এগুলো পশ্চাদপদ সমাজের বৈশিষ্ট। গোড়া থেকে পাল্টাতে হবে৷ পরিমনির মুক্তি চেয়ে এই সিস্টেম পাল্টাবেনা৷ বরং "সামাজিকভাবে ক্ষমতাবান, নায়িকা, পপুলার ইত্যাদি বিবেচনায় আইনকে প্রভাবিত করা যায়" এরকম ম্যাসেজই যাবে৷ অর্থাৎ অন্যায় দিয়ে অন্যায়কে ছাপিয়ে যাওয়া হবে৷ স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসবে তাহলে ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা, একা বা মৌ দের কি হবে?

আমাদের সমাজে নারীরা নানা সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। তারা আন্ডার প্রিভিলেজড। শিল্প ও বিনোদন ক্ষেত্রে নারীদের পথ চলা আরো কঠিন। পরী যদি এই সমস্যার শিকার হতো ও প্রতিবাদী হতো আমি দাঁড়াতাম তার জন্য সবার আগে৷ পরীমনি তেমনটাও বলেননি। পরীমনি এই ঘৃণ্য ব্যবস্থার বেনিফিশিয়ারি হবার চেষ্টা করেছে মাত্র। পা হড়কে এখন নিজেকে বিপন্ন বলে প্রচার করছে৷ পরীমনি এ যাত্রায় টিকে গেলে ভবিষ্যতে এই সিস্টেমের একজন মাসীও হয়ে উঠতে পারেন। আমার স্রেফ এটুকুই মনে হচ্ছে। এক্ষেত্রেও আমি সিম্প্যথি দেখাতে পারছিনা৷

গ্রাম থেকে এসে গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের চোরাগলিতে আটকে যাওয়া মেয়ে পরীমনি একা নন। এই গল্প অনেকদিনের। ডাক্তারি ও মিডিয়ায় সামান্য কাজ করার সূত্রে আমার অন্তত ডজন খানেক এরকম মেয়ের সাথে পরিচয় আছে৷ আমি এদের জীবন পাঠ করার চেষ্টা করেছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গল্পগুলি করুন। পরীমনি সেই করুন গল্পের একজন নন। সে এই সিস্টেমকেই উপভোগ করার চেষ্টা করেছে আইসক্রিমের মত তাড়িয়ে তাড়িয়ে। তাই আপাতত আমি তাকে মজলুম মনে করছিনা।

আমাদের পরিচিত নারীবাদীরাও দুইভাগে বিভক্ত। পরী সমর্থকদের পাল্লাই ভারী। কেউ কেউ তাদের টিজ করে বলছেন পরীবাদী। পরীমনির সমর্থকরাও অঞ্জনা অরুনা বিশ্বাসদের মত অভিনেত্রীদের এক হাত নিচ্ছেন৷ এক্ষেত্রে অবশ্য নারীর প্রতি সহিষ্ণুতা কাজ করছেনা৷ একজন তো পরীর প্রতি ভালবাসা থেকে অরুনা বিশ্বাসকেও বেশ্যা বলে গালি দিয়েছেন৷ বিভিন্ন প্রগতিশীল ও নারীমুক্তি বিষয়ক পেইজে অরুনা বিশ্বাস, অঞ্জনার মত শিল্পীকে নিলামে তোলা হয়েছে। নারীবাদীরা মিডিয়া ট্রায়ালের বিরুদ্ধে হলেও এক মাস আগে নাসির মাহমুদকে ভয়াবহ মিডিয়া ট্রায়াল করেছে। তার পরিবারের কাছে করুনভাবে হেয় করেছে৷ কেউ কেউ এখনো করে যাচ্ছে৷

পরীমনিকে অনেকেই সিম্প্যথি দেখাচ্ছেন একধরণের ভালাবাসা থেকে। আমি তাদের মনটাকে বুঝি। তারা মনে করছেন পরীমনি প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমকে নাড়া দিয়েছেন৷ সাহস দেখিয়েছেন৷ যা ইচ্ছা করেছেন৷ নিজের জীবন নিজে নিয়ন্ত্রণ করেছেন৷ যারা এটা পারেননা, সমাজের চোখে ভাল মেয়ে হবার তাগিদ থেকে একধরণের অবদমিত, প্রতিবাদহীন বন্দী জীবন যাপন করছেন তাদের চোখে পরীমনি 'এ রিয়েল ব্রেইভ গার্ল'.। আমি বুঝি এটা তাদের আবেগ৷ কিন্তু মিডিয়া ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে বলছে এটা নিছকই আবেগ। আমি তাদের এই আবগকে সহানুভুতি জানাই। কিন্তু বাস্তবতা হলো পরীমনির নিজের লাইফ এবং ওয়ার্কই হলো মিসোজেনিক। একজন ঘরবন্দী নারীর চেয়েও তার বন্দীত্ব বেশি৷ কিন্তু সে একে উপভোগের মোড়কে মুড়িয়ে, নানারকম দেখনদারি করে সবাইকে ধাঁধায় ফেলে দিচ্ছে।

তবে অবশ্যই পরীমনির জীবনে তার প্রতি কোমল হবার মত অসংখ্য উপাদানও আছে৷ তার শৈশব অনেক করুন। তার বৃদ্ধ নানাকে দেখে আমিই আবেগাপ্লুত হয়েছি৷ এক সমূদ্র ভালবাসা নিয়ে একটা বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষও কেমন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি তার জন্য প্রবল ভালবাসা অনুভব করেছি। তর্কের খাতিরে কেউ যদি বলেন পরীমনির নানা পুরুষ বলে আমি তার প্রতি ভালবাসা অনুভব করেছি তাহলে অবশ্য আমার কিছু বলার থাকবেনা৷ এ জাতীয় তর্কও কেউ কেউ করছেন।

তারপরও বলব আমি এখানে স্পষ্টত কঠোর কোন স্ট্যান্ড নিতে চাইনা। আমি হিউম্যান ক্যারেক্টারের গ্রে এরিয়াতে বিশ্বাস করি। আমি শুধু পর্যবেক্ষণ করতে পারি।

পরীমনি নিরপরাধ হলে মুক্তি পাক৷ তবে তার অপরাধ চক্রে সম্পৃক্ত হওয়াটাও বিচিত্র নয়, এটাও মাথায় রাখতে চাই। বাকিটা সময় বলবে৷

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়