Rajik Hassan

Published:
2021-01-11 12:40:10 BdST

"অসতী" এলোকেশী হত্যা, মহান্তর কান্ড এবং হত্যাকারী স্বামী বনাম মহারানীর সেই ঐতিহাসিক বিচারের কাহিনি


 

রাজিক হাসান

_________________

কত কথাই না বলা হচ্ছে। অনাদি কাল থেকে কত কটুকথা কুকথা বলেছে গুজব গল্পবাজ রক্ষণশীল বর্গ। কত রকম বিকারগস্ত তারা। এখন কার প্রেক্ষাপটে সেরকম এক কাহিনি বলছি।

"যা করেছে মেয়েটি সম্মতিতেই করেছে, কিন্তু দুর্ঘটনাবশত মেয়েটি রক্তক্ষরণে মারা গেছে।

ছেলেটি তাকে ভালোবাসত বলে নিজেই হাসপাতালে নিয়েছে ...........

ছেলেটি তাকে সর্বোচ্চ বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু মেয়েটির শরীর থেকে হঠাৎ এক কলসী রক্ত বেরিয়ে গেলে ছেলেটার কি দোষ?

গ্রুপ স্টাডি ফাডি সব বাজে কথা। মেয়েটির মা ছেলেটির পেছনে লেলিয়ে দিয়েছিল। কারণ ছেলেটার বাপের অনেক টাকা আছে।

বিবাহপূর্ব যৌনতা হল পাপ, আর সেই পাপের ফল মেয়েটা ভোগ করেছে।

ছেলেটার সঙ্গে মেয়েটার প্রেম ছিল। এই দেখো ইন্সটাগ্রামের ফটো (যাচাই করার উপায় নেই)। আর প্রেম ছিল যখন তখন তো ছেলেটার পূর্ণ অধিকার আছে "সম্মতিতে রক্তক্ষরণ করানোর"।

দেখালম ফেসবুকের পাতা এমন মন্তব্যে ছেয়ে গেছে। আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক বিকার একদিনে গড়ে ওঠেনি। হাজার বছর লেগেছে। চিন্তায়-চেতনায়-মননে এখনও আমরা প্রাচীনপন্থি। বছর ঘুরে নতুন দিন আসে কিন্তু ভাবনার জগৎ স্থির হয়ে পড়ে থাকে। অবশ্য মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ঘটনায় ধিক্কার জানাচ্ছে ও প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছে। ধন্যবাদ জানাই তাদের।

এবার পুরাতন একটি ঘটনা বলি। সত্য ঘটনা। ঘটনাটি ১৮৭৩ সালের। নবীনচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়; একজন সরকারী কর্মচারী। কর্মসূত্রে বাস কলকাতায়। তার স্ত্রী এলোকেশী; নিজের বাবা মায়ের সঙ্গে থাকতো, তারকেশ্বরে। তার স্বামী সন্তান না হওয়ার অপরাধে; তাকে পিত্রালয়ে ফেলে রাখা হয়েছিলো। এলোকেশীর বয়স তখন ১৬ বছর। ওই বয়সেই তাকে বন্ধ্যাত্বের অপবাদ সইতে হয়েছিল। সে তারকেশ্বর শিব মন্দিরের মহন্ত মাধবাচার্য গিরির কাছে সন্তানধারণ ক্ষমতা অর্জনের জন্য ওষুধ নিতে যেত।

মহন্তর কাছে ওষুধ নিতে গিয়ে এলোকেশী তার সঙ্গে সহবাস করে অথবা মহন্ত তাকে ওষুধ দেওয়ার নাম করে ডেকে নিয়ে যৌনসম্ভোগ করে; দুটো গুজবই প্রচলিত ছিল। মহন্তর কাজে এলোকেশীর বাবার সমর্থন ছিল।

খবরটা কলকাতাবাসী নবীনচন্দ্রের কানে যায় এবং সে ছুটে যায় তারকেশ্বরে এবং অসতী স্ত্রীকে মাছকাটা বঁটি দিয়ে গলা কেটে খুন করে। এবং খুনের পর 'অনুতপ্ত' হয়ে থানায় গিয়ে সারেন্ডার করে।

এরপর মামলা চলে। কুইন ভার্সাস নবীনচন্দ্র। ভারতীয় জুরিরা নবীনকে ছাড়ানোরই চেষ্টা করেছেন। তাকে পাগল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তবুও বিচারকের রায়ে নবীনচন্দ্রের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও মহন্ত মাধবাচার্যর তিনবছর কারাদণ্ড ও দুইহাজার টাকা জরিমানা হয়।

নবীনের এহেন শাস্তি হওয়ায় প্রবল জনবিক্ষোভ তৈরি হয়। সকলে এই রায়ের সমালোচনা করে। নবীনকে মুক্তি দেওয়ার জন্য দশহাজার স্বাক্ষরসংবলিত দরখাস্ত জমা পড়ে কোর্টে। কলকাতার বিশিষ্ট মানুষেরাও ছিল স্বাক্ষরদাতার তালিকায়। এরফলে, নবীন ১৮৭৫ সালে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে যায়।

এই কেস বাংলায় খুব বিখ্যাত হয়েছিল। শ্রীরামপুর কোর্টে মামলার শুনানী চলাকালীন জনতার ভিড় জমে যেতো। সর্বত্র এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা হতো। নবীনচন্দ্র সবার চোখে হিরো হয়ে গিয়েছিল। সে একজন প্রেমিক স্বামী, যে স্ত্রীর ব্যাভিচার সহ্য করতে পারেনি, এইভাবেই তার ইমেজ তৈরি হয়েছিল মানুষের মনে। তাকে ওথেলোর সঙ্গেও তুলনা করা হতো।

নবীনচন্দ্র এলোকেশীর ঘটনা নিয়ে প্রচুর কল্পকাহিনী লেখা হয়েছে, যাত্রাপালা হয়েছে। পটে ছবি আঁকা হয়েছে। তারপর একসময় সব থিতিয়ে গেছে। মানুষ ভুলে গেছে। কিন্তু সমাজ আজও নবীনচন্দ্রদের পক্ষে রয়ে গেছে।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়