SAHA ANTAR

Published:
2020-09-19 10:22:27 BdST

পিতৃতর্পণ / মহালয়া ২০২০/ খেলাচ্ছলে



সুমিত চট্টোপাধ্যায়
কথাসাহিত্যিক,পেশায় চিকিৎসক
_____________________________


সুমিত চট্টোপাধ্যায়
বাবাকে নিয়ে একটা গল্প আজ আপনাদের শোনাই ।
গল্প ঠিক নয় , সত্যি ঘটনা ।
বাবা চলে যাবার পর থেকে প্রতি মহালয়াতেই বাবাকে নিয়ে আপনাদের গল্প শোনাই।
আজ বলব বাবার মৃত্যুর কথা । ব্যক্তিগত ব্যাপার , কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করাই যায় ।
কেন জানি না , আমার খুব মৃত্যুভয় । ছোট্টবেলা থেকেই ।
আর বয়স যত বাড়ছে , ভয়ও ততই বাড়ছে । তবে ছেলেবেলায় মৃত্যুভয়টা ছিল মূলত বাবাকেন্দ্রিক । বুঝতেই পারছেন সেটা যত না ভালবাসার জন্য তার থেকে বেশী ছিল নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে ।
আর সেটা শুরু হয়েছিল বাবার অসুখের সময় । তখন আমরা বেশ ছোট । বাবার সাংঘাতিক টাইফয়েড হল । প্রায় মরোমরো । একদিন ত খুব খারাপ অবস্থা । তখন একটা কথা কানে এলো । মা প্রতিবেশিনীকে বলছে - দিদি , দেখছ তো কি দশা । ওর যদি কিছু হয়ে যায় , আমাদের কে দেখবে !
আমার মনে একটা দারুণ ভয় ঢুকে গেল । সত্যি তো, বাবার কিছু হলে আমাদের কি হবে ।
যাই হোক । বাবা সেরে উঠল । তখনো পুরো সুস্থ হয় নি , বাড়িতেই আছে । বিছানায় হেলান দিয়ে বসে পেপার না কি একটা যেন পড়ছিল । আমি গুটিগুটি পায়ে বাবার পাশে গিয়ে বসলাম আর সটান জিগ্যেস করলাম - বাবা তুমি মরে গেলে আমাদের কি হবে ?
বাবা একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল ।
হঠাৎ- এই কথা ?
বা রে । মা যে জিগ্যেস করছিল মিনুকাকিমাকে । ।
ও । তাই বল । শোন তুই জানিস না । তোকে একটা মজার কথা বলি । আমি অত সহজে মরবো না । তুই না বললে আমি মারা যাবোই না ।
যা: । সত্যি ?
হ্যাঁ , সত্যি । কথা দিলাম ।
ব্যাস। আমায় আর পায় কে । আমি দারুণ খুশি । এখন ভাবলে হাসি পায় , কিন্তু আমি তখন মনে প্রাণে ব্যাপারটা বিশ্বাস করেছিলাম ।
ফলে হল কি, কিছুদিন পরে বাবার টনসিল অপারেশান করাতে গিয়ে কি একটা সমস্যা হল , বাবাকে কদিন হাসপাতালে বেশী কাটাতে হল , সবাই খুব উদ্বিগ্ন , কিন্তু আমি একেবারে বিন্দাস । আমি জানি কিছু খারাপ হতেই পারে না ।
বলাই বাহুল্য , বাবা সুস্থ হয়েই বাড়ি ফিরে এল ।
অনেক বছর পরে ।
বাবার বাইপাস সার্জারি হবে । অপারেশনের আগের রাতে বাবা আমায় বললো - বুঝলি বাবু , একটু ভয় ভয় করছে ।
আমি বেশ অবাক হলাম । অবাক হলাম কারণ বাবার বরাবরই খুব সাহস । এরকমভাবে কথা বলতে কোনদিন শুনি নি ।
কিসের ভয় ?
শুনলাম আট ন ঘন্টা লাগে অপারেশানে । যদি জ্ঞান না ফেরে । আমি এতক্ষণ অজ্ঞান থাকার মত ফিট তো ?
নিশ্চই । তোমার তো অ্যানাস্থেটিক চেক আপ হয়েছে । কিচ্ছু খারাপ ত পাওয়া যায় নি ।
এই স্মোকিং করে করেই না আমার বারোটা বাজল । তোর মা কত করে বারণ করত । শুনতামই না । আমার যদি উল্টোসিধে কিছু হয়ে যায় , তোদের যে কী হবে ! সবে ডাক্তারি পড়ছিস ।
তোমার মনে আছে তুমি আমায় ছোটবেলায় কি বলেছিলে ?
কি বলতো ?
বাবাকে টাইফয়েডের গল্পটা বললাম । বাবা ভুলে গেছিল । মনে পড়তে হাসল ।
তার মানে -তুই বলছিস , তুই না চাইলে আমি পটলম্ ন তুলিষ্যামি ?
একজ্যাক্টলি ।
ও কে , ডান ।
অপারেশান হয়ে গেল । তিন দিনের মাথায় বাবার সঙ্গে আই সি ইউতে দেখা । কষ্ট করে হাসল ।
বললাম - দেখলে ত ?
২০০৯ ।
বাবার ম্যাসিভ লেফট ভেন্ট্রিকুলার ফেলিওর হল ।
ডায়াবেটিস ছিল , রেনাল ফেলিওর ছিল , পটাশিয়ামটা হঠাৎ বেড়ে গিয়ে মারাত্মক কান্ড । ভেন্টিলেশানে দিতে হল । তবে এবারেও সেরে উঠে বাড়ি ফিরে এল । আর দুমাস পরে বাবাকে নিয়ে পুরী গেলাম ।
বাবা , এবার কিন্তু আমিই ভয় পেয়ে গেছিলাম ।
বিচে বসে ছিলাম । আমি আর বাবা । সন্ধেবেলা । সুন্দর হাওয়া দিচ্ছিল ।
কেন রে ?
কেন আবার । তুমি ন দিন ভেন্টিলেশানে ছিলে । কত কষ্ট পাচ্ছিলে ।
কষ্ট ? কিন্তু আমার তো কিছু মনে নেই ।
কিচ্ছু না ?
না । মনে হল বেশ একটা গভীর ঘুম থেকে উঠলাম ।
আমি ভেবেছিলাম …
আমি আর ফিরব না ?
হুঁ ।
তা কি করে হবে !! মনে নেই তুই না চাইলে আমি কখনোই মারা যাবো না ।
আরে তাই ত ।
এবারে আমি ভুলে গেছিলাম । বাবা মনে করিয়ে দিল । দুজনেই হো হো করে হেসে উঠলাম ।
২০১৪ । ডিসেম্বর ।
এবারও পুরী । তবে এবার এসেছিলাম আমার কলেজের কিছু বন্ধুর ফ্যামিলির সঙ্গে । বাবা মা কলকাতাতেই ছিল ।
একদিন সন্ধেবেলা মা ফোন করল । বাবার পায়ের জোর চলে গেছে । হঠাৎই । হাঁটা তো দূর , দাঁড়াতেই পারছে না । কি করবে বুঝতে পারছে না ।
আমি ফোনে ফোনে সব ব্যবস্থা করে ফেললাম । বাবাকে ভর্তি করে দিলাম । পরের দিন আমি ফিরলাম । বাবা খুব খুশি । পায়ের জোরটাও ফিরে এসেছে । কদিন পরে বাড়ি নিয়ে এলাম ।
কিন্তু বাবা কোনদিনই আর পুরোপুরি ভালো হল না ।
ইসকেমিক পারকিনসনস্ ডেভেলপ করল । হাত পা একদম স্টিফ হয়ে গেল । শয্যাশায়ী হয়ে গেল তিন চার মাসের মধ্যে । এমনকি কথাও খুব জড়ানো হয়ে গেল । কি যে বলত , কিছুই বুঝতে পারতাম না । তারপর বড় বড় বেডসোর হয়ে গেল ।
আমি রাতে চেম্বার থেকে ফিরে বাবার পাশে ঘন্টা খানেক মতন বসতাম ।
গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম । বাবা বেশ এনজয় করত । নতুন গাড়ি বুক করেছিলাম । তিন চার মাস আগে । কোম্পানি একদিন খবর দিল দিন কয়েকের মধ্যেই গাড়িটা ডেলিভারি দেবে । বাবাকে বলতে দারুণ খুশি হল । মুখে কিছু বলতে পারত না , কিন্তু মুখের এক্সপ্রেশনেই সব বুঝতে পারতাম ।
সেদিন দেখি বাবার চোখে জল ।
তখন বেশ অবনতি হয়েছে । ইউরিন কমে গেছে , একদম শীর্ণ হয়ে গেছে , এত বেডসোর হয়ে গেছে যে শুয়েও স্বস্তি পাচ্ছে না ।
বাবার গালে লেগে থাকা জল মুছিয়ে দিলাম । কিন্তু বাবার কান্না আর থামে না । কান্না ঠিক না , ফোঁপানো । বাবাকে কোনদিন এরকম দেখি নি । লম্বা চওড়া লোক ছিল -আমার চেয়েও দু ইন্চি বেশি , খুব সাহসীও । বিশ্বাসই হয় না সেই লোকের এরকম জড়ভরত দশা । মুখফুটে কথা বলার ক্ষমতা নেই , কিন্তু ইশারাতেই যেন বলছে - আমি আর পারছি না । এভাবে আমি আর পারছি না । আমায় তুই মুক্তি দে ।
আমি বিড়বিড় করে বললাম - বাবা , আমিও তোমাকে এই রকম অসহায় ভাবে পডে থাকতে দেখতে পারছি না । আমার সহ্য হচ্ছে না । বাবা , তুমি এবার চলে যাও ।
আমার মনের ভুল হতে পারে , কিন্তু বাবা যেন মৃদু হাসল । কৃতজ্ঞতার হাসি ।
পরের পরের দিন বাবা চলে গেল ।।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়