SAHA ANTOR

Published:
2020-07-22 10:48:10 BdST

কাহিনিফাটল


লেখক ডা. জোহরা জামিলা খান এর ছবি

 

অধ্যাপক ডা. জোহরা জামিলা খান


_______________________

বহু লোকেশন ঘুরে, নামকরা ডেভেলপার রীতিমতো ভেজে খেয়ে পাঁচ বছর আগে ধানমন্ডি লেকভিউতে ফ্ল্যাটটা নিয়েছিল নাফিস আর রোশনি। ইন্টেরিয়র রেশমির বন্ধু সঞ্চিতার করা। বাহুল্যহীন তবে অসাধারণ। শৈল্পিক বলুন, নান্দনিক বলুন সবকিছুর অসাধারণ ব্লেন্ড। ফ্ল্যাটের ডিটেলস নিয়ে কিছু বলতে চাই না। যে রুম আর ব্যালকনিটি এই দম্পতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সেখানেই থাকছি আপাতত।
ছুটির দিনগুলো বিকেলের চা টুইন কাপে, সাউথফেসিং ব্যালকনিতে। দুটি গার্ডেন চেয়ার আর গোল গ্লাসটপ টেবিল। হাওয়াশিসে রোশনির চুল অবাধ্য হয়ে মুখে-নাকে এসে পড়ে---এলোমেলো খেলে। নাফিস মুগ্ধ হয় আর মাঝেমাঝে গুছিয়ে দেয়। পারে না ঠিকমতো। এরপরেও রোশনির মন জুড়ায়।

ঘরকন্নার জরুরি কিছু কেনাকাটা দরকার, প্রায় ছুটির বিকেলে মনে করিয়ে দেয় রোশনি। নাফিস বউয়ের কথা শুনেও শোনে না যেন। দুজনেই মেধাবী, ভালো জবে আছে বিয়ের আগ থেকেই। কিন্তু কোথায় যেন তাল কেটে গেছে বেশ কয়েকমাস ধরেই!
যে বিষয়ে নাফিসের এখন শতভাগ মনোযোগ আর নেশা তা হলো গবেষণা। শয়নে-স্বপনে-জাগরণে একটাই বিষয়। নিত্যনতুন রিসার্চ আইডিয়া, ক্লাসে তুমুল জনপ্রিয়তা, সায়েন্টিফিক ফোরামে প্রেজেন্টেশন, ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে ছাপা হওয়া আর্টিকেলস...
প্রিয়জনের এমন সাফল্যে অখুশি হয় এমন বাঙালি রমণী বিরল। তবে সত্যটা হলো, এই আনন্দ সংবাদগুলো রোশনিকে আর আগের মতো শেয়ার করে না নাফিস। প্রয়োজন মনে করে না হয়তো। বন্ধুরা ইনবক্সে সৌভাগ্যবতী হিসেবে অভিনন্দিত করে রোশনিকে। ট্রিটের আবদার করে। স্বামী নাফিস মাহতাবের ফেসবুক ওয়াল উপচে পড়ে শুভেচ্ছা আর অভিনন্দন বার্তায়।

সাউথফেসিং ব্যালকনির একটি চেয়ার কখন থেকে যে একা হতে হতে, পরিত্যক্ত হয়ে গেল! চা-পাগল রোশনির টুইন মগের একটি আছড়ে ভাঙতে ইচ্ছে করে। চায়ের স্বাদে বিষ যেন! নিজের চা বাদ দিয়েছে। নাফিসের আবার চা খাওয়ার মাত্রা বেড়েছে। অনেকবার বানিয়ে দিতে হয়---'রোশনির স্পেশাল চা!'
ব্যালকনিতে তরতাজা মানিপ্ল্যান্টের লতা আর ব্লিডিং-হার্ট ফুলের ঝাড়। মধুমঞ্জুরি গ্রিলের ফাঁক গলে চারতলা থেকে নিচে চলে গেল, তবে নিয়মিত সুবাসিত করে বসার জায়গাটা। এই ঘ্রাণ রোশনির মন খারাপ করে দেয়। দুজন একসাথে পুরাতন ফিল্ডার গাড়ির পেছনের বনেট আধখোলা রেখে বিশেষ কায়দায় চারা আর টবগুলো বাসা অবধি এনেছিল।

--নাফিস, চলো না, এ সপ্তাহে বিকেলে বেরোই।
--কেন? আশ্চর্য! বেশি জরুরি হলে নিজেই যাও। আমি খুব ব্যস্ত, জানোই তো।
--প্লিজ, চা খাওয়া কমাও। মিল্ক এন্ড মিল্ক প্রোডাক্ট একদম বাদ দিয়েছো। তোমার ভাইটামিন 'ডি' লেভেল সিগ্নিফিকেন্টলি লো! সাপ্লিমেন্টগুলো প্যাকেটেই পড়ে আছে। প্লিজ, টেক কেয়ার।
--কিসের ভেতর কি! ডিজগাস্টিং!

কাজপাগল, অনন্য মেধাবীকে বড় বেশি পছন্দ করেছিল রোশনি। খানিকটা অহমও কি ছিল 'সেরা বর' জুটে গেছে বলে। এখন শুধু খাবার টেবিলে তরকারি বেড়ে দিতে অথবা চায়ের মগ এগিয়ে দিতে যতটুকু ছোঁয়া অতটুকুই। কে নাফিস, কে রোশনি? কারো কি জ্বর---জানা হচ্ছে না আজকাল কারোই!
এসব পরিবর্তন রোশনিকে যতটা বিচলিত করে, শূন্য করে, নাফিসকে তা করে না। বাসায় যতক্ষণ থাকে ছোট্ট গোছানো রিডিংয়ের রিভলভিং চেয়ার আর ল্যাপটপই সঙ্গী নাফিসের। নিতান্তই খেতে হয় তাই খায়। লবণ-ঝালের কমবেশি নিয়েও কোনো আলাপ-আপত্তি নেই।
অনেকদিন অপেক্ষা করে রোশনি, পর্যবেক্ষণ করে। এরপর সনাতনী বাঙালি রমণীর কৌশল ধরে। বারবার আয়না দেখে, শারীরিক ত্রুটি খোঁজে। ইয়োগা-স্পাও শুরু করেছে।

ছুটির বিকেল এক। পত্রীবাবুর কথোপকথন লেখা শাড়ি আর খোঁপায় গাজরার মালা প্যাঁচিয়েছে রোশনি। ব্যালকনিতে নিজের চেয়ারে বসে নরম গলায় ডাকে,
--এই এসো না। এখানটায় বসে গল্প করি...
--(নাফিস ভ্রূকুটিহীন) কী বলবে কুইক বল। কাল সকালে প্রেজেন্টেশন। বাইরের অনেক ডেলিগেটস আসবেন।
--এই, মনে আছে এই শাড়িটা তুমি চিটাগাং ডলস্ হাউজ থেকে এনে দিয়েছিলে? রাঙাদি'র নিজ হাতে করা।
--তো! এসব কথা এখন জরুরি?
(ইচ্ছে করেই মন ও প্রসঙ্গ উভয়ই ঘুরিয়ে নেয় রোশনি। নিচে তাকায়। ড্রাইভওয়েতে কী সুন্দর মখমলি মেরুন চকচকে নতুন গাড়ি!)
--নাফিস, দেখো... গাড়িটা কী দারুণ, তাই না?
--কী?
--আরে, ঐ মেরুন গাড়িটা, কোন্ ফ্ল্যাটের?
--ওটা! ওটা তো আমিই কিনেছি ৮ দিন আগে। কোন্ জগতে যে থাকো তুমি? আজব!
(নিজেকে রক্তশূন্য অনুভব করে রোশনি। একটু ব্ল্যাকআউট।)
ভেতরটা সামলে নিয়ে বলে,
--আমাদের সাদা ফিল্ডার?
--আছে, সেল করে দেবো। তবে তুমি চাইলে রাখতেও পারো। ড্রাইভ তো পারোই। যাই, ফাইনাল টাচ দিই প্রেজেন্টেশনে। উফ্! কত যে প্রশ্ন-উত্তর-আলোচনা হবে---আই এম রিয়েলি এক্সাইটেড!

রোশনির মন আর শরীরজুড়ে কোবরার বিষ! এ সংসারে একটা নতুন গাড়ি আসার ৮ দিন পর সে জানলো! এতটাই মূল্যহীন হওয়ার মতো লজ্জার আর কী থাকতে পারে! মনে মনে আওড়ায়, 'সংসারের শুরুতে বালতি, গামলা, কাপড় শুকানোর ক্লিপ ইত্যাদি খুঁটিনাটিও যেখানে দুজন পরখ করে, দামদস্তর করে কিনেছি সেখানে আজ! বাড়িতে যেন একটা মামুলি খেলনা গাড়ি এলো! সংসারকে প্রাধান্য দিয়ে সব ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাটুকুই ধরে রেখেছিলাম। অথচ আজ? তুমি যা পারো, আমিও কম পারি না, না... ফি... স...'
রাত আড়াইটা। একটু আগেই শুতে গেল নাফিস। রোশনির চোখে ঘুম নেই। রিডিংরুমে ঢুকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে ল্যাপটপ, চেয়ার, কাগজপত্র সব। প্রায় আধঘণ্টা পর, রিডিংরুম থেকে চাকা ঠেলে রিভলভিং মেরুন চেয়ারটা নিয়ে যায় স্টোরে। টুলবক্স নিয়ে বসে। কিছুক্ষণ কাজ করে। এরপর রিভলভিং জায়গামতো রাখে। খুব ক্লান্তিতে ফ্রেশ না-হয়েই শুয়ে পড়ে।

খুব ভোরে ফরমাল পোষাকে তৈরি নাফিস চা, টোস্ট খেয়েই ফাইনাল চেক, ব্যাকআপ ইত্যাদির জন্য ল্যাপটপ ওপেন করতেই বিরাট এক ধাক্কা! ল্যাপটপ ক্রাশ! 'ও মাই গড! হোয়াট দ্যা হেল!' বলতে বলতে চেয়ারে বসতেই---ধপাস! ভয়ানক দুর্ঘটনা! ইন্টারকমে কেয়ারটেকারকে জানালো, ড্রাইভারকে কল দিল রোশনি। প্রতিবেশী, আত্মীয়, অ্যাম্বুলেন্স, হাসপাতাল...
স্পাইনাল ইনজুরি! অপারেশন লাগবে। কন্ডিশন খুব খারাপ। জ্ঞান ফেরেনি এখনও। রোশনি ওড়নার আড়ালে মুখ ঢেকে অঝোর কাঁদছে। হাসপাতালে আসা আত্মীয়, প্রতিবেশীরা একে একে বিদায় নিচ্ছে, 'ভেঙে পড়ো না, সব ঠিক হয়ে যাবে ইত্যাদি সান্ত্বনা দিতে দিতে...।' মুরুব্বি প্রতিবেশী আঙ্কেলের অনুরোধে, ওনার ছেলে ও নাফিসের এক কাজিনকে হাসপাতালে রেখে আঙ্কেলের সাথে ওনার গাড়িতেই বাসার উদ্দেশে রওনা দেয় রোশনি। তখন প্রায় বিকেল। রাতে আবার যাবে হাসপাতালে। গাড়িতে বসে নাফিসের ফোন চেক করে দেখে ২৭টা মিসড কল! অধিকাংশই নাফিসের প্রিয় ছাত্র তানভীর ও কলিগ মোকাম্মেল স্যারের। রোশনি কলব্যাক করে না কাউকেই।

ড্রাইভওয়েতে মেরুন গাড়িটা---রোশনি আড়চোখে তাকায়। বাসায় ফিরে মেইন দরজা লক করবার আগে আরও একবার ফুঁপিয়েছে রোশনি। শুভাকাঙ্ক্ষী, প্রতিবেশীদের আফসোস ঝরছে, 'আহারে!'
বেডরুমে এসে ওয়াশরুমে ঢোকে প্রথমে। ফ্রেশ হয়ে গা এলিয়ে দেয় বিছানায়। যেন অনেক মাস পর! আহা! এত আনন্দ কেন! এতদিন ধরে বয়ে যাওয়া মনের ঝড়টা কি থামলো তবে! নিজের অভিনয় ক্ষমতা দেখে নিজেই মুগ্ধ রোশনি।
এবার আয়নার সামনে দাঁড়ায় এককালের নাফিসের প্রিয় সিল্ক-লং-ড্রেস পরে। কোমরে নট লাগায়। 'প্যারাগন অফ বিউটি---ওয়াও!'
--বলতো আয়না, আমি কে?
--তুমি রোশনি। রোশনি রিফাত।

ঘর কাঁপিয়ে পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়ে রোশনি রিফাত। আয়নায় একটা ফাটল ধরে।

( জোহরা জামিলা খান)
২১ জুলাই, ২০২০


Professor, Pediatric Hematology & Oncology
Dhaka Medical College & Hospital

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়