SAHA ANTOR

Published:
2020-07-12 19:53:18 BdST

ফ্রেন্ড


 



মোহিত কামাল
বাংলাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক
______________

কপালে হাতের স্পর্শ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেল মেধার। শুধু নামে নয়, পড়াশোনায়ও সে মেধাবী। অথচ স্কুলের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে জেনেও ঘুম ভাংছে না ওর।
‘স্কুলে যাবে না, মেধা?’ মায়ের প্রশ্ন শুনে আবার চোখ বুজে গেল। ওর মুখ থেকে হ্যাঁ-না কোনো শব্দ বেরোল না। শরীর মোচড় দিয়ে কোলবালিশটা চেপে শুয়ে রইল।
মা, ঊর্মিলা চৌধুরীর বুক ধক করে উঠল। স্কুলের প্রতি মেয়ের আকর্ষণ কমে যাচ্ছে দেখে দিশেহারা লাগতে থাকায় বুকের মধ্যে একটা চাপ নিয়ে জানালা খুলে দিলেন। জানালার পর্দা সরিয়ে দিয়ে বাইরের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে আবার তাকালেন খাটের দিকে। ঘরের ভেতরে আলো ঢুকছে। কিন্তু মেয়ের টনক নড়ছে না।
চাপা উদ্বেগ সামলে ঊর্মিলা চৌধুরী আবার ডাকলেন, ‘মেধা, দেখো কী সুন্দর রোদ উঠেছে! দেখো ওই রাস্তায় স্কুল বাস এসেছে। বাচ্চারা হুটোপুটি করে স্কুলে যাওয়ার জন্য ছুটছে!
ঝুম করে লাফ দিয়ে উঠে, একটা চিৎকার দিয়ে মেধা বলল, ‘যাও, যাও আমার ঘর থেকে যাও, বেরোও! বেরোও।’
স্তব্ধ হয়ে গেলেন ঊর্মিলা চৌধুরী। বড় অসহায় চোখে একবার তাকালেন এলোমেলো হয়ে যাওয়া মেয়ের খাটের দিকে। একবার তাকালেন জানালার দিকে। কোমল রোদের ঢল ঢুকে ভাসিয়ে দিয়েছে খাট। মেধার মুখেও পড়ছে তার ছাট। তবু ঘুম ভাঙল না ওর। বেঘোরে ঘুমাতে লাগল। যাক। ও ঘুমাচ্ছে, ঘুমাক। মনে হলো সারারাত মেয়ে ঘুমোয়নি, হয়ত ভোর রাতের দিকে ঘুমিয়েছে।

নাশতা খেতে এসে সুমন চৌধুরী দেখলেন টেবিল ফিটফাট, সাজানো। প্লেটের ঢাকনা সরিয়ে দেখলেন গরম পরোটা আর ডিমের মামলেট। এক পাশে সবজি ভাজি, আরেক পাশে ভুনা গরুগোস। নিজের প্রিয় আইটেমগুলো দেখে বুঝলেন আজ গিন্নির মেজাজ ভালো। মেয়ের ঘর থেকে স্ত্রীকে ফিরতে দেখে বললেন, ‘বাহ্! মেয়ের সঙ্গে তাহলে ঝগড়া-ঝাটি মিটে গেছে। মান-অভিমানও!’
কোনো জবাব পেলেন না সুমন চৌধুরী। স্ত্রীর মুখের দিকেও তাকানোর ইচ্ছা জাগেনি, ভুলেও না। প্রশ্ন শেষ করে আবার বললেন,‘গরুগোসের গন্ধে খিদা বেড়ে গেছে। তোমরা কি বসবে না?’
এবারও কোনো উত্তর পেলেন না তিনি। উত্তর না পেয়েও স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন না। বরং প্লেট সামনে টেনে নিয়ে বলতে লাগলেন, ‘আমার তাড়া আছে আজ। খেয়ে নিই। বেরোতে হবে। তুমি পরে মেয়েসহ খেয়ে নিয়ো। তাহলে তোমার আর মেয়ের মধ্যে শত্রুতা কমবে, বন্ধুত্ব বাড়বে।’
টেবিলে সাজানো নাশতার প্লেট আচমকা উড়ে গিয়ে পড়ল পাশের দেয়ালের ওপর। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে পরোটা, আর ভুনা মাংস। হাতের ঝাপটায় সব উড়িয়ে দিয়ে গটগট করে ঊর্মিলা চৌধুরী ঢুকে গেলেন নিজেদের শোবার ঘরে। তারপর দরজা লক করে দিলেন ভেতর থেকে।
সুমন চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে গেলেন। স্ত্রীর মেজাজের কারণ নিজে না বুঝতে পেরে ভেবে নিলেন মা-মেয়ের সংঘাত চূড়ান্ত পর্যায়ে গেছে। সারাক্ষণ যে-মা মেয়ের ভালোর চিন্তায় মশগুল থাকেন, এটা সে-রকম মায়েরই আচরণের বহিঃপ্রকাশ ভেবে চুপ হয়ে গেলেন। না-খেয়ে উঠে বেরিয়ে যেতে গিয়েও ফিরে এলেন বাইরের দরজা থেকে। একবার মেয়ের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। কখনো মেয়ের ঘরে ঢোকেন না তিনি। তবু মেয়ের অবস্থা বোঝার জন্য দরজায় দুটো টোকা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সুমন চৌধুরী।
বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হলো না। ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে দরজা খুলে গেছে। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে মেধা বলল, ‘দরজা তো খোলাই আছে, বাপি!’
‘ওঃ। সরি। ঘুম থেকে এখন উঠলে?’
‘না। আরেকটু আগে উঠেছি। মা এসে তুলে দিয়ে গেছেন। ঘুম ভাঙিয়ে গেছেন।’ শান্ত স্বরেই জবাব দিল মেধা। দরজায় টোকা দেওয়ার ধরন দেখেই বুঝে নিয়েছে ও এটা মায়ের নয়, বাবার টোকা। মা সাধারণত দরজা টোকা দেন না, ধাক্কা দেন বন্ধ থাকলে। অথবা অনুমতি ছাড়া ওর ঘরে ঢুকে পড়েন। ‘পড়ো’ ‘পড়ো’ ‘স্কুলে যাও’ ‘কোচিংয়ে যাও’ ‘গৃহ শিক্ষকের কাছে বসো’ এসব আদেশ ছাড়া মা আর কিছু বলতে জানেন না। তাই মায়ের উপস্থিতি মোটেই সইতে পারে না ও। অথচ দরজায় বাবার টোকা দেওয়ার শব্দ শুনে শীতল কণ্ঠে এখন কথা বলছে। কিছুক্ষণ আগে মা’র সঙ্গে কী আচরণ করেছে তা সম্পূর্ণ ভুলে গেছে।
সুমন চৌধুরী একবার তাকালেন মেয়ের মুখের দিকে। ঘুমকাতুরে মুখটা দেখে মোটেই বুঝতে পারলেন না, মেয়ে কিছুক্ষণ আগে মায়ের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছে। বরং একবার তাকালেন মেয়ের ঘরের খোলা জানালার দিকে। রোদের জোয়ার দেখলেন ঘরে। বুঝে গেলেন বেলা অনেক হয়েছে। স্কুলে যায়নি মেধা। এ কারণেই হয়ত ক্ষেপেছে স্ত্রী ঊর্মিলা। স্ত্রীকে আর দোষ দিতে পারলেন না। হতাশ চোখে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আবার তাকালেন বাইরের খোলা জানালা দিয়ে। মনে একবার চিন্তা এসে জড়ো হলো- ওর ঘরে আছে দুদিকে দুটো জানালা। একটা ঘরে দুটো জানালাই যথেষ্ট। অথচ জানালাগুলো মনে হয় না খোলা হয়। জানালার পাটে মাকড়সার জাল। বিপন্ন বিষাদে ওরা জানালার রোদ গিলে খেলেও মনে হয় এ ঘর কখনো আপনা-আপনি খোলা হয় না। বন্ধ করে রাখা হয়। ভেতরের গুমোট বাতাস আর উৎকট গন্ধ। এমন পরিবেশে কীভাবে ডুবে থাকে, থাকতে পারে মেধা, বুঝে উঠতে পারলেন না। একবার বলতে চাচ্ছিলেন, স্কুলে যাবে না? জিজ্ঞাস করতে পারলেন না। বরং হাতটা ওর মাথার ওপর বুলিয়ে বললেন, ‘নাশতা করে নিয়ো, স্কুলে যেও, আমি যাচ্ছি।’
মেধা ছোট্ট করে জবাব দিলো, ‘আচ্ছা।’
একবারও কটু কথা বলল না, একবারও দ্বিমত করল না। সুমন চৌধুরী বেরিয়ে যাওয়ার পর দরজা লক করে আবার গিয়ে খাটে শুয়ে পড়ল।

॥ দুই ॥ চিঠিটা হাতে পেয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলেন ঊর্মিলা চৌধুরী। মেধার স্কুল থেকে এসেছে চিঠি। অভিভাবকদের ডেকে পাঠিয়েছেন প্রধান শিক্ষক। অভিযোগ ৪টি। প্রথমত মেয়ে তিন সাবজেক্টে ফেল করেছে। দ্বিতীয় অভিযোগ : মেয়ে স্কুলে অনিয়মিত। তৃতীয় অভিযোগ : স্কুলে মেয়ে গোপনে স্মার্টফোন নিয়ে ঢোকে। মেয়েদের আজেবাজে ওয়েবসাইট দেখিয়ে মজা করে। তাতে তার স্খলন তো হচ্ছে, কোমলমতি মেয়েদেরও ক্ষতি করছে। আর সবচেয়ে বড় অভিযোগ হচ্ছে : স্কুলের নিয়ম-নীতি মানছে না মেয়ে। অবাধ্য আর বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
বাসায় এখন কাজের বুয়া ছাড়া কেউ নেই। দম বন্ধ বন্ধ লাগছে ঊর্মিলা চৌধুরীর। বরফ শীতল পানিতে মাথাটা ভেজাতে ইচ্ছা করছে। মনে হলো প্রেসার বেড়ে গেছে। বুকেও চাপ অনুভব করছেন। ব্যথা না হলেও কষ্ট কষ্ট লাগছে। মনে হতে লাগল হাজার মণ ধ্বংসস্তূপের বোঝা চেপে বসেছে তাঁর বুকে। নিজের অস্তিত্বের ভেতরও ফাটল টের পাচ্ছেন তিনি। কান্না আসছে না। মনে হচ্ছে কাঁদতে পারলে ভালো লাগত।
‘মরিচা! এই মরিচা!’ হাউস গভর্নেসকে ডাকলেন ঊর্মিলা চৌধুরী।
‘জি আফা। কন। কী কইবেন।’
‘ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা পানি বের করে দাও।’
‘শরীর খারাপ লাগছে, আফা?’
‘হ্যাঁ, মাথাটা একটু ম্যাসাজ করে দিবে?’
‘ম্যাসাজ’ শব্দের অর্থ না বুঝলেও মরিচা বুঝেছে মাথা টিপে দেওয়ার কথা বলছেন আফা। দ্রুত শীতল জল নিয়ে এসে বলল, ‘লন। পানি খান। আর এদিকে মাথা দিয়া খাটে হুইয়া পড়েন।’
মরিচার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যাচ্ছেন ঊর্মিলা চৌধুরী। হাউজ গভর্নেসের হাতে মরিচের জ্বলুনি নেই। আছে শান্তি, আছে প্রশান্তি। চোখ বুঁজে থেকে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘মেধা ক’টায় ঘর থেকে বেরিয়েছে আজ, খেয়াল করেছ?’
‘না। আফা। ক’টা খেয়াল করিনি।’
‘খেয়ে গেছে?’
‘না।’
‘সাজুগুজু করে বেরিয়েছে, না স্কুলের পোশাকে?’
‘না। স্কুলের পোশাকে না। সাজুগুজুও করে নাই।’
‘স্কুলে না গিয়ে প্রায় সারাদিন সে ঘরে থাকে। কী করে ভেতরে? নজর করে দেখেছ?’
‘হ। আফা, ঘর ঝাড় দিতে গেলে ধমক দেয়। হগল সময় দেহি মোবাইল ফুন টিপাটিপি করে। কম্পুটরে বইয়া থাহে। কী দেহে কে জানে। আমারে বকা দেয়। কম্পুটর ঘুরায়ে লয়। হগল সময় এগুলা লইয়াই থাকে।’
‘পড়াশোনা করে না? বই পড়ে না? টেবিলে বসে না?’
‘না আফা। আফনে মেধারে শাসন করণ ছাইড়া দিছেন, ঠিক অয়নাই। খালুজানও সময় দেয় না মাইয়াডারে। স্কুলে যায় না। কি যে হইব কে জানে। ’
‘মরিচা, মাথাটা তো আরও জ্যাম হয়ে গেল। আরও ভালো করে মাসাজ দাও।’
মরিচা শক্ত হাতে টিপতে লাগল। কিছুটা আরাম পাওয়ার পর ঊর্মিলা চৌধুরীর মনে পড়ে গেল মেধার প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর দিনের কথা। মেয়ে সবকটা সাবজেক্টে ভালো করে গোল্ডেন এ+ পেয়েছিল। সেকি আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল ঘরে। জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায়ও গোল্ডেন এ+ পেয়েছে। বৃত্তি পেয়েছে। মেয়েকে নিয়ে মায়ের মনে উড়ে এসে বসেছিল আশার প্রদীপ। সে প্রদীপের আলো এক বছরের মধ্যেই নিভে যাচ্ছে ভেবে দিশেহারা হতে লাগলেন তিনি।
‘মরিচা।’
‘কন আফা।’
‘ফ্যানটা আরেকটু বাড়িয়ে দিবে।’
‘দিচ্ছি আফা। জেনারেটর চলে অহন। নইলে এসি চালায়া দিতাম।’
‘থাক। এসি লাগবে না। তোমার কাজ করো। আমাকে একা থাকতে দাও।’
‘আফা, খারাপ লাগছে? ভাইজানরে খবর দিমু?’
‘না।’ শক্ত গলায় জবাব দিলেন ঊর্মিলা চৌধুরী।
মুখে না বললেও ভেতরে ভেতরে চাইছেন স্বামী আসুক। পাশে থাকুক। তিনি পাশে থাকলে ঊর্মিলা চৌধুরী শান্তি পেতেন। সে-কথা না বলে বলেলেন, ‘মরিচা, যাও তোমার কাজে যাও।’
মরিচা ফিরে গেছে কিচেনে। একা হয়ে গেছেন ঊর্মিলা চৌধুরী। আর তার মনে হতে লাগল অদৃশ্য শেকলে শৃঙ্খলিত হয়ে গেছে নিজের দু’পা। এ পা আর কখনও সামনে এগোতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। জীবনপোড়া কয়লা যেন উড়ে উড়ে আসছে তার দিকে। ঘরে এসে জমা হচ্ছে কয়লার স্তূপ। সে-স্তূপের তলে চাপা পড়ে যাচ্ছেন তিনি। আগুন লেগে গেছে যেন কয়লার মধ্যে আর তার তাপে দাহ হচ্ছেন- দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। শিখা ঊর্ধ্বমুখী নয়। বরং যেন চতুর্মুখী আগুনে পুড়ে যাচ্ছেন ঊর্মিলা চৌধুরী। মৃতের কাছে সংসার স্বামী-সন্তান অর্থহীন। কিন্তু কোনো কিছুই অর্থহীন মনে হচ্ছে না তার। বরঞ্চ অর্থপূর্ণ অর্থরা চাবুক পেটাচ্ছে তার চেতনায়, বোধে।

॥ তিন ॥ স্কুলের খবর হঠাৎ করে স্বামীকে না জানিয়ে ধীরে ধীরে জানাবেন ভেবে রেখেছিলেন। স্বামীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করার পর অনুতাপেও পুড়ছিলেন বলে কাছে ঘেঁষা হয়নি। থমথমে আবহে ভরে আছে ঘর। মুঠোমুঠো রাগ, অভিমান, আর দুঃখে ভরা মনটা অপেক্ষা করছিল স্বামীর জন্য। আজ রোববার। মঙ্গলবার যেতে হবে স্কুলে। মা-বাবা উভয়কে যাওয়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ করা হয়েছে। আহ্বানের ভাষা ভদ্র হলেও অভিযোগের ভাষা অনাকাক্সিক্ষত। স্কুলের নোটিশের কথা স্বামীকে জানাতে হবে ভেবে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে খাবার ঘরে দেখা হয়ে গেল মেধার সঙ্গে। ওকে বেশ ফুরফুরা লাগছে। বেশ সহজ আর হাসিখুশি লাগছে। তার নিজ জীবনে যে বড় বিপর্যয় ঘটে গেছে, স্কুল থেকে যে পাহাড়সম অভিযোগ আসতে পারে তা মোটেও কাজ করছে না মেধার মাথায়। এমনটাই মনে হলো ঊর্মিলা চৌধুরীর। থমকে দাঁড়ালেন মেয়ের সামনে। কোথাও কোনো অঘটন ঘটেনি, মায়ের সঙ্গে কোনো দুর্ব্যবহার করেনি, আগের মতো আছে মেধা- এমনটাই মনে হলো তাকে দেখে।
‘বাপি কখন ফিরবে, মা-মণি?’ মেয়ের গলার স্বর আর প্রশ্নে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। প্রশ্নের জবাব দিতে হবে, জানেন তিনি। উত্তর না পেলে ভয়াবহ রকম খেপে উঠতে পারে ও। ইতিমধ্যে তার খ্যাপাটে আচরণের সঙ্গে বহুবার পরিচিত হতে হয়েছেন। প্রশ্ন শুনে তাড়াতাড়ি জবাব দিলেন, ‘সন্ধ্যার আগে ফিরতে পারবেন না।’
‘গুড। আচ্ছা শোনো, আজ আমার এক ফ্রেন্ড আসবে বাসায়। বিকেল পর্যন্ত আমরা আড্ডা দিব। আমাদের জন্য ভুনা খিচুড়ি আর গরুর গোস রেঁধে মরিচাকে দিয়ে আমার ঘরে পাঠিয়ে দিয়ো।’
মেয়ের কথা শুনে ঊর্মিলা চৌধুরী একবার প্রশ্ন করতে চেয়েছিলেন ঘরে কেন, খাবার টেবিলে বসে খেয়ো, বলতে পারলেন না। নীরবে শুনে গেলেন মেয়ের কথা। মেয়েকে স্বাভাবিক দেখে মেলাতে পারলেন না স্কুলের অভিযোগের কথা। মনে হচ্ছে মেয়ের জীবনে কোথাও বিপর্যয় ঘটেনি, ও ঠিকঠাকই আছে। মনে হচ্ছে স্কুল থেকে ভুল চিঠি এসেছে। অথবা অন্য কারও চিঠি ভুল করে চলে এসেছে তাদের বাসায়। আর এ কারণেই তার ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ মনের দরজা খুলে স্বাভাবিক স্বর বেরিয়ে এলো, ‘আচ্ছা।’
অদ্ভুত এক কাণ্ড ঘটল। মেয়ের স্বাভাবিক কথা শুনে মায়ের মনের ঝড় কমে গেছে। সহজ হয়ে গেছেন ঊর্মিলা চৌধুরী। জানেন তিনি মেয়ে তার হাতে রান্না করা ‘ভুনাখিচুড়ি’ আর ‘গরুগোস’ খেতে পছন্দ করে। মেয়ের এ আবদার ফেলতে পারলেন না। কিচেনে ঢুকে গেলেন তিনি। ফ্রিজ খুলে গরুগোস বের করে তা প্রসেস করার কাজ শুরু করলেন।
বেগম সাহেবাকে কিচেনে দেখে মন ভালো হয়ে গেল মরিচারও। সমান তালে সেও হাত চালাচ্ছে। নির্দেশ মতো সব কাজ ঠিক মতো করছে। গুছিয়ে দিচ্ছে। ‘হাউজ গভর্নেস’ আর গৃহকত্রীর যৌথ উদ্যোগে সব রান্নাবান্না শেষ হলো। মূল রান্না করলেন ঊর্মিলা চৌধুরীই। এ আয়োজনে মেয়ের জন্য পুরো মমতা ঢেলে দিলেন তিনি। ভুলেও মনে আসল না স্কুলের অভিযোগপত্রের কথা।

‘মরিচা খালা’ মেধার ডাক শুনে ছুটে গেল হাউজ গভর্নেস।
‘মা-মণি কোথায়?’
‘ওনার ঘরে, গোসলে ঢুকছে।’
‘আচ্ছা। তুমি যাও। আমাদের দুজনের খাবার দাও আমার ঘরে।’
‘ও। আফনার মেহমান আইছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘কই? আমি তো দেকলাম না।’
‘তোমার দেখার দরকার নেই। সে ওয়াশরুমে ঢুকেছে। খাবার দিয়ে যাও ঘরে।’
মরিচা ছুটে গেল কিচেনে। দ্রুত খাবার ট্রলিতে সব ডিশ সাজিয়ে নিল। একই সঙ্গে দুজনের খাবার। তারপর মেধার ঘরে গিয়ে ট্রলিটা ঢুকিয়ে দিতে গিয়ে চমকে উঠে দেখল ঘরে কেউ আসার আলামত নেই।
‘অবাক হয়ে কী দেখছ? যাও।’ বলেই ট্রলিটা নিজেই টেনে নিল মেধা। তারপর এসে দরজা বন্ধ করার সময় বলল, ‘ডাকাডাকি করো না। বুঝেছ?’
এই প্রথম মেধাকে অন্য রকম লাগল মরিচার। মেহমান কখন ঢুকল বাসায়, মেহমানটা কে? জিন? ভূত? কী? মনে প্রশ্ন নিয়ে বিষাদ মনে ও ফিরে গেল কিচেনে। ভয় হতে লাগল। মেধা মা-মণির কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? একা ঘরে দুজনের খাবার নিল ক্যান?’ প্রশ্নগুলো হতবাক করে দিল মরিচাকে।

॥ চার ॥ গোসল সেরে কিচেনে ঢুকে মরিচাকে হতভম্ব হয়ে বসে থাকতে দেখে ঊর্মিলা চৌধুরী প্রশ্ন করলেন, ‘কী হয়েছে, মরিচা? এমন লাগছে কেন তোমাকে?’
পুরো ঘটনা খুলে বলে চুপ হয়ে বসে থাকল সে। ঊর্মিলা চৌধুরী তবু প্রশ্ন করলেন, ‘মেহমানকে চোখে দেখেছ?’
‘না। আফা কইল ওয়াশরুমে গ্যাছে।’
‘ঘরে ঢোকার সময় দেখোনি?’
‘না।’
‘আচ্ছা থাক। ভেবো না। তুমি হয়ত কিচেনে ছিলে, আমিও গোসলে ছিলাম। সে-সময় বোধহয় এসেছে!’
‘হ। আফা তেমনই হইব।'
মরিচার কথায় চিড়ে ভিজলেও মন অশান্ত হয়ে গেল ঊর্মিলা চৌধুরীর। বিন্দুমাত্র সৌজন্যবোধ থাকতে হবে না! ফ্রেন্ডকে মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিবে না মেয়ে? দরজা বন্ধ করে আলাদা খাওয়াটা অশোভন নয়! মা যেহেতু ঘরে আছে, তার প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধা থাকতে হবে না মেয়ের মাথায়! একবার তিনি এগিয়ে গেলেন ভেজানো দরজার দিকে। ঠেসে ধরে বুঝলেন দরজা ভেতর থেকে লক করা। খোলা যাবে না। শব্দ না করে ফিরে এলেন নিজের ঘরে। এ বাসায় সাজানো সংসারটাকে আর নিজের সংসার মনে হচ্ছে না। কাজের বুয়াকে ‘হাউজ গভর্নেস’ উপাধি দিয়েছেন তিনি। বুয়ার মর্যাদা ধরে রাখার জন্য এ উপাধি দেওয়া হয়েছে। অথচ মনে হচ্ছে মেয়ের কাছে মায়ের অবস্থান হাউজ গভর্নেসের চেয়েও তুচ্ছ। মেয়ের বান্ধবী আসবে, আনন্দের খবর! হইচই হবে। মাকেও আনন্দের সঙ্গী করবে ওরা। তা না, ঘরে এসেই দরজায় খিল দিয়ে আড্ডা দেবে! কী এ গোপনীয়তা! ভাবনার শব্দরা মিলেমিশে যেন লম্বা চাবুকে পরিণত হয়ে গেছে। সে-চাবুকের ঘা খাচ্ছেন, অপমানের আগুনে দাহ হতে হতে চেয়ার টেনে এনে বসে রইলেন নিজ-ঘরের দরজায় । মনে মনে আশা করছেন খাওয়ার পর হয়ত মাকে ডাকবে মেয়ে, বান্ধবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। তিনিও শরিক হতে চান ওদের আনন্দে।

প্রায় দুই ঘণ্টা পর ভাবনা থেমে গেছে। মেয়ে দরজা খুলেছে। ওর ঘর থেকে বেরিয়ে মায়ের ঘরের দরজায় বসা দেখল মাকে। কিছুটা হোটচ খেয়েই স্বাভাবিক কন্ঠে বলল, ‘মা-মণি এসো, তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই- ‘ও হচ্ছে আমার ফ্রেন্ড।'
কথা শেষ করেই ডেকে বলল, ‘এসো, এই, এসো, মার সঙ্গে পরিচিত হও।’
ঊর্মিলা চৌধুরী দেখলেন মেধার ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে সুঠাম দেহের এক তরুণ। মুখে খোচা খোচা দাড়ি। বিনয়ের সঙ্গে সে বলল, ‘গুড আফটার নুন, আন্টি! আর ইউ ফাইন? আই’ম অনিকেত, ভেরি ক্লোজড ফ্রেন্ড অব মেধা।’

______________INFORMATION_________________

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়