SAHA ANTOR

Published:
2020-07-11 19:36:28 BdST

লখনৌর নবাবের গল্প : লন্ডনের বাঙালি চিত্রশিল্পী




রাজিক হাসান
_________________

সে অনেক দিনের আগের কথা। লক্ষ্মনৌর নবাবের শখ রাতের বেলা মোসাহেব নিয়ে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ানো। একরাতে নবাব তার মোসাহেবদের নিয়ে বেরিয়েছেন ছদ্মবেশে। ঘুরতে ঘুরতে নবাব চলে এসেছেন এক বাজারের পাশে। একটা ঘর থেকে নানা হট্টগোলের শব্দ ভেসে আসছে। নবাব কোন দ্বিধা না করেই তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ভেতরে গেলেন। নবাব দেখলন কিছু লোক শরাব পান করছে আর কাওয়ালী গাইছে। ওই খানে বসা আছে লক্ষ্মনৌর বিখ্যাত গায়ক সিঁড়ে হায়দারি খাঁ। বন্ধুরা ডাকে সিঁড়ে নামে । ঘটনাচক্রে নবাব ও গায়ক কেউই কাউকে চিনতো না। সিঁড়ে হায়দারকে দেখে মোসাহেবরা নবাবকে বলে, জাঁহাপনা ওই লোকটা খুব মধুর সুরে গান গাইতে পারে, শুনবেন নাকি?
নবাব কাওয়ালীর ভক্ত। মোসাহেবদের বলে, বিশ্রাম করার জন্য চমৎকার জায়গা। কিছু ভালো শরাব জোগাড় কর। আজ রাতে কাওয়ালী হবে। মোসাহেবরা নবাবের সামনে হাদার আলীকে নিয়ে আসলো। হায়দারি নবাবকে বললে তা বাপু তুমি থাকো কোথায়? আগে গলাটা ভেজাতে দাও তারপর গান শোনাবো।
তারপর অসামান্য সুরের নৈপুন্যে নবাবকে কাওয়ালী শোনালেন হায়দরি খাঁ। নবাবের মন ভরে গেল আর সেই সাথে নেশাও চড়ে গেল।
নবাব এবার বলে উঠলেন, খাঁ সাহেব এবার এমন একটা গান শোনাও যা আমার নয়ন থেকে অশ্রু ঝরাবে।
যদি অশ্রু ঝরে তাহলে যা চাইবে তাই পাবে, আর যদি না ঝরে তবে কোতল করে গোমতীর জলে দেব ভাসিয়ে।
খাঁ সাহেব এবার ভয় পেয়ে গেল।এতক্ষনে বুঝে গেল এই রূপবান পুরুষটি লক্ষ্মনৌ রাজ্যের নবাব, সর্বময় কর্তা।
খাঁ সাহেব গান শুরু করলেন। অপূর্ব সেই সঙ্গীত। সেই করুণ সুরের মুর্চ্ছনায় নবাব অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। কাওয়ালী শেষ হলে হায়দারি উঠে দাঁড়ালেন। সাথে সাথে নবাব চিৎকার দিয়ে বললেন - বলুন, বলুন কি চাই আপনার.. জমি, বাড়ি, খুবসুরত জেনানা...যা চান তাই পাবেন ..বলুন বলুন-
হায়দারি নবাবের দিকে সোজা তাকিয়ে বললেন - একটাই আবেদন আছে আপনার কাছে, দেবেন..হুজুর -
নবাব এবার ভয়ঙ্কর চটে গেলেন। একটা সামান্য গায়ক হয়ে তুমি জবান চাইছ নবাবের কাছে? ঠিক আছে দিলাম। গায়ক বললেন - আমি গান করি ...খোদার অঙ্গনে আমার বাস, আমি কোনো নবাবের তোয়াক্কা করিনা। আপনার কাছে আমার শুধু একটিই আবেদন, আপনি আর কোনদিন আমাকে গান গাইতে ডাকবেননা। "কিন্তু আপনার গানে মুগ্ধ হয়েছি বলেই" .. নবাবের কথা শেষ না হতেই হায়দার আলী খাঁ বলে ওঠে, কোতল করার ভয়ও দেখিয়েছেন আমায়। আপনার মৃত্যু হলে আপনার ছেলে নবাব হবে আর তাতে কারো ক্ষতি হবে না কিন্তু এক হায়দার আলীর মৃত্যু হলে ক্ষতি হবে বিস্তর, এই রাজ্যে আরেকটা হায়দার আলী সহজে জন্মাবেনা।

একজন শিল্পী, লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবীর সবচে বড় সম্পদ তার আত্মমর্যাদা। সেই আত্মমর্যাদা ধ্বংস হলে তার মৃত্যু ঘটে। আজকের যুগে অবশ্য বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে সেই আত্মমর্যাদা খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা সবাই ক্ষমতাধরের পদলেহন করেই স্বস্তি প্রকাশ করেন।

২.

দীর্ঘদিন লন্ডন শহরে বাসের কারণে ইউরোপিয়ান চিত্রশিল্পের সাথে পরিচিত হতে পেরেছি বেশ ঘনিষ্ঠভাবে। ট্রাফালগার স্কোর্য়ারের রয়াল আর্ট গ্যালারি আমার প্রিয় আর্টগ্যালারির একটি। গ্রীষ্মের বহু বিকেল কাটিয়েছি সেখানে। ভাগ্যক্রমে বাঙালি চিত্রশিল্পী জামানের (Zaman Md Fakruzzaman) সাথে পরিচয় কাজের সূত্র ধরে। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল অফিসে কাজ করতাম আমরা। পরে জানালাম তিনি প্রফেশনাল আর্টিস্ট। অল্প সময়েই ভাব জমে যায় বেশ। ওনার নিজের কিছু চিত্র প্রদর্শনীতে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। পেন্সিল স্কেচ ও তৈল রং সম্পর্কে ওনার কাছে থেকে বুঝেছি ও জেনেছি অনেক। পরিচয় হয় ডাচ শিল্পী গ্যাবির (Gaby Verhelst) সাথে। সে প্রফেশনাল আর্টিস্ট ও প্রফেশনাল সিঙ্গার। পৃথিবীর কোন আর্ট গ্যালারিতে কোন বিখ্যাত ছবি আছে তা ওর নখদর্পনে। আমস্টার্ডাম আর্ট গ্যালারিতে "রয়েল বেঙ্গল টাইগার" নামে বিখ্যাত একটি শিল্পকর্ম আছে তা ওর কাছে থেকেই জেনেছি আমি। শুধু হলুদ ও কালো রং দিয়ে এই ছবিটি এক ডাচ শিল্পী এঁকেছেন। আমার এই ডাচ বন্ধু গ্যাবির কারণে চিত্রশিল্পের খুঁটিনাটি অনেক ইতিহাস জানার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। পরের পর্বটি ছিল ল্যুভ'র মিউজিয়াম দেখা। নিজের চোখে মোনালিসা ছবিটি দেখার অভিজ্ঞতাটি খুব অন্যরকমের। ছবিটির সামনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ল মুজতবা আলীর সেই কথা," মোনালিসা যে এত অবিস্মরণীয় এক চিত্রকর্ম, তার পেছনে দা ভিঞ্চির আঁকিয়ে-হাতের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না তাঁর পরিমিতিবোধ। ব্রাশের একটা অতিরিক্ত সঞ্চালন ছবিটির রহস্য কেড়ে নিত।" মোনালিসা ছবিটি দেখে বুঝেছিলাম সৃষ্টিশীল কাজে পরিমিতিবোধটা কতটা জরুরী।

পরিচয় হয় বাংলাদেশের বর্তমানকালের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী আফরোজা খন্দকারের (Afroza Khondoker) সাথে। তাঁর প্রতীক্ষা ছবি দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই আমি। নিজের অজান্তেই নিজেকে বলি, আমাদের দেশেও এমন অসাধারণ চিত্রশিল্পী আছেন। একে একে তাঁর আঁকা ছবিগুলো দেখি আমি, বিস্ময় যেন কাটে না।

আফরোজা আপুর বেড়ে ওঠা দিগন্ত ছোঁয়া প্রান্তরের সীমান্তে অবিরল পাহাড়, পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝর্ণা, কর্নফুলী নদী, শংখ মাতামুহুরি আর পাহাড় চূড়া থেকে পশ্চিম দক্ষিণ দিগন্তে সমুদ্র বঙ্গোপসাগর তীরে চট্টগ্রাম শহরে। হয়তো একারণেই এ শহর শিল্পী ও শিল্পের লালনভূমি চারণভূমি। যদিও ওনার জন্ম সিরাজগঞ্জে তাঁর নানা বাড়িতে। দাদার বাড়ি কুমিল্লাতে। বাবার চাকরির সুবাদে তিনি চট্টগ্রামেই থেকেছেন জীবনের অনেকটা সময়।

মাধ্যমিক পাশ করেই ১৯৭৭ সালে আর্ট কলেজে ভর্তি হন তিনি। ছোট বেলা থেকেই মনের মধ্যে একটা শিল্পী মন ছিল তাঁর তাই আর্ট কলেজকেই বেছে নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৮৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রী শেষ করে তিনি তাঁর কর্মময় জীবন শুরু করেন। ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামে একটি গ্রুপ অব কোম্পানিতে চীফ ডিজাইনার এর কাজে নিয়োজিত হন। সেখানেই তিনি ২০০৫ সাল পর্যন্ত কাজ করেন। দেশ ও দেশের বাইরে অনেক কর্পোরেট ডিজাইন করেন এবং প্রশংশিতও হন অনেক।

ছবি আঁকার স্পৃহা সবসময়ই ছিল তাঁর। তাই চাকরি জীবন ছেড়ে দিয়ে ছবি আঁকার দিকেই মনোযোগী হন তিনি। বাস করছেন ঢাকায়। প্রতি বছর তিনি অনেক গ্রুপ প্রদর্শনীও করেন।

রুপসী বাংলার নানারূপ মূলত তাঁর অনুপ্রেনার উৎস। বাংলাদেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের রূপের দৃশ্য ছবির মাধ্যমে তিনি ফুটিয়ে তুলতে বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বাংলার মাঠ,ঘাট,নদী প্রান্তরের শ্যামল শোভা তাঁকে অনুপ্রানিত করে। কবি জীবনানন্দের ভাষায় " বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি " তাই যেন সেই মুখ,সেই রূপ তাঁর মানস পটে সব সময় জ্বলজ্বল করে।

যদিও বাস্তব মুখি ছবি এঁকে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি, এখন কিছু বিমূর্ত ও আধা বিমূর্ত ছবি আঁকেন। তবে তাঁর ছবির পেছনে বাস্তবতার একটা উপাদানও কাজ করে। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন তিনি।

নানা কাজের মাঝে তিনি ছবি আঁকেন। ছবি আঁকতে ও বিভিন্ন আঙ্গিকে রং নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে তাঁর ভাল লাগে। নীল,সবুজ ও হলুদের সংমিশ্রণ তাঁর ছবিতে প্রাধান্য পায়। ভোরবেলায় ছবি আঁকতে ভালোবাসেন। তাঁর মতে ভোরের স্বাভাবিক এবং স্নিগ্ধ আলোতে রং এর কাজ করতে সুবিধা অনেক।

তিনি-বিশ্ব নারী দিবসে আলোকিত মা হিসাবে পুরষ্কৃত হয়েছেন। বিভিন্ন সংস্থা থেকে বহু পুরষ্কার তিনি পেয়েছেন। তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নোভেরা আহমেদ পুরস্কার। এছাড়াও award from spreed wings an international exhibition at india. Rootbridge an international exhibition. 2018.

আফরোজা আপুর মতে ছবি আঁকা একটা সাধনার বিষয়,একটা সৃষ্টিশীল কাজ। একে ভালবেসে করতে হয়। এখনও থেমে নেই; নিয়মিত ছবি আঁকেন তিনি। তিনি ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট। ছবি আঁকেন ও বিক্রিও করেন।

তিনি যখন ছবি আঁকার লাইনে আসেন তখন অনেক প্রতিকুল পরিবেশের মধ্যেই তাঁকে যেতে হয়েছিল। তারপরও তিনি না থেমে এগিয়ে গেছেন, সংসার করেছেন, সন্তান মানুষ করেছেন। তাঁর দুই মেয়ে, একজন ডাক্তার আর একজন ফার্মাসিস্ট।

____________INFORMATION__________________

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়