রাতুল সেন

Published:
2020-07-01 19:41:00 BdST

স্যানিটাইজার




ডাঃ অনির্বাণ বিশ্বাস
কথাসাহিত্যিক
______________________

ঋভু পাজি আমার হাউসিং কমপ্লেক্সে থাকে। ওর বয়স ৭-৮ বছর। ওর সাথে আমার মারপিটের সম্পর্ক।

পুরো ব্যাপারটা বছর দুয়েক আগে শুরু হয়েছিল। তখন ও সাধু ভাষায় কথা বলত। এখনও আমার সঙ্গে সাধু ভাষায় কথা বলে !

'তুমি ডাক্তার খুড়ো ? রুগী দেখিলেই ইঞ্জেকশন দাও ? তোমার মায়া দয়া নাই ?'
আমি দেখি এক উজ্জল সপ্রতিভ শিশু আমার সিঁড়ি দিয়ে নামার রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমায় প্রশ্ন করছে।

এই রকম সম্ভাষনে চমৎকৃত হয়ে আমি হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। তারপর একটু ঝুঁকে বলি,
'হ্যাঁ আমি ডাক্তারখুড়ো। না, আমার কিঞ্চিৎ মায়া দয়া রহিয়াছে।সবাইকে ইঞ্জেকশন দেই না। তবে চান্স পাইলেই তোমাকে দিব। এখন তোমার পরিচয় দাহ।'
শিশুটি কিছুক্ষন চুপ করে ভুরু কুঁচকে আমায় দেখে। তারপর বলে,
' চান্স পাইলেই আমাকে ইঞ্জেকশন দিবে ? তুমিতো বুকের ডাক্তার। আমি তো বাচ্চাদের ডাক্তারকে দেখাই। বাবা বলিয়াছে। বাবা আমায় ঋভু পাজি বলিয়া ডাকে। আচ্ছা তুমি বর্ণপরিচয় পড়িয়াছ ?'
'পড়ি নাই। তবে এই বার পড়িব' বলে ওর গাল টিপে বেড়িয়ে পড়ি।

সেই শুরু। একদিন সিঁড়ির মুখে,

' ডাক্তারখুড়ো,একদিন তোমায় ল্যাঙ মারিব।তুমি সিঁড়ি দিয়া গড়াইয়া পড়িবে। আমি তালি দিব' ঋভু পাজি বলে।
'তাই ? আচ্ছা মাঝে মধ্যে তোমার মাতা তোমায় উত্তমরূপে প্রহার করে। আমি টের পাই,তোমার চিৎকারে । কি স্ফূর্তি যে হয় আমার !তখন দুপাক নাচিয়া লই আমি..'

ঋভু খুব রেগে যায়। আমাকে জিভ ভেঙিয়ে দৌড় মারে। আমি দৌড়ে ওকে কোলে তুলে ওর পশ্চাতে ডান হাত দিয়ে মৃদু চাপড় মারি।

একদিন বিকেলে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছি। নিচে ক্যাম্পাসে ঋভু পাজি তার বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছে। হঠাৎ,
'ডাক্তারখুড়ো, পাকড়াও !'

চমকে কিছু বোঝার আগেই ঋভু পাজির ছোঁড়া বল সোজা আমার চায়ের কাপে। তারপর, আমার চিৎকার,ঋভুর দৌড়,ওর মায়ের আগমন এবং প্রকাশ্যে ঋভু পাজিকে প্রহার।ফলতঃ দ্রুত আমার নিচে নেমে ঋভু পাজির মাতাশ্রীকে শান্ত করা, ঋভুকে আড়ালে ওর মায়ের হাতে প্রহারের জন্য খুব খুশি হয়েছি এমন ভাব করা।প্রত্যুত্তরে ঋভু পাজির আমার জামায় চা পড়ায় উল্লাস প্রকাশ....

এই ভাবে সব চলছিল.. আকাশ বাতাস পুজো জন্মদিন পৃথিবী....

এখন আমাদের ক্যাম্পাস শান্ত থাকে। লকডাউনে বাচ্চাগুলো ঘরে বন্দি। আমি মাস্ক পরে চেম্বারে যাই। মাঝে মাঝে ঋভু পাজি ওর বাবার ফোন থেকে আমায় ফোন করে,
'ডাক্তারখুড়ো....' ঋভু চুপ করে থাকে।
'হ্যাঁ,বল ..চুপ কেন ?' জানতে চাই
ওপাশ থেকে জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ার আওয়াজ আসে। তারপর,
'ডাক্তারখুড়ো,করোনা কি যাইবে না ? আমরা বিদ্যালয়ে যাইব না ? তুমি মাস্ক পরোতো ?'
' হ্যাঁ ঋভু পাজি ! পরিধান করি '

আজ সকালে মাস্ক পরে নিচে নেমেছি। চেম্বারে যাব। দেখি একটু দূরে ঋভু পাজি মাস্ক পরে দুটো হাত পেছনে রেখে দাঁড়িয়ে আছে।

'ডাক্তারখুড়ো,চেম্বারে যাইতেছ ?'
'হ্যাঁ'
'তোমার গায়ে অ্যাস্ট্রোনটের মত ড্রেস কই ? ওটা না পরিলে করোনা হইবে,তুমি ডাক্তার হইয়াও জানো না ! '
'শোন,ঐ অ্যাস্ট্রোনটের মত ড্রেস পরিয়া চেম্বার গেলে রাস্তায় কুকুর তাড়া করিবে। ঐ ড্রেস আমার চেম্বারে আছে।ঐ খানে পরি '

ঋভু পাজি মুখ তোলে। চোখে জল। বলে,
'হাত পাতো'
ডাক্তারখুড়ো হাত পাতে। ঋভু পাজি ওর ডান হাত সামনে আনে। একটা স্যানিটাইজার। মুখ খুলে ডাক্তারখুড়োর হাতে ঢালে। বলে.
'ভাল করিয়া দুই হাতে মাখো '

ডাক্তার খুড়ো মাখে। ঋভুপাজি মাথা নিচু করে আছে। চোখ উপছে মাস্ক ভিজিয়ে জল টপ টপ করে পড়ছে।
ঋভুপাজি ডাক্তারখুড়োর হাতে স্যানিটাইজারের শিশিটি গুঁজে দেয়। কান্না ভেজা কন্ঠে বলে,
'ঠিক করিয়া হাতে লাগাইবে। অ্যাস্ট্রোনটের ড্রেস পরিয়া রুগী দেখিবে...'
ঋভু পাজি একছুটে চলে যায়।

ডাক্তার খুড়ো জীবনের পাথেয় হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

_______________INFORMATION_____________

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়