রাতুল সেন

Published:
2020-07-01 11:32:07 BdST

ছোটগল্পক্রোধের মুকুট




মোহিত কামাল
বরেণ্য কথাসাহিত্যিক, বাংলাদেশ
_________________

ঘুম থেকে উঠে মুঠোফোন হাতে নিতেই হবে- এ ঘোরে অভ্যস্ত হয়ে গেছে লুশান্তা। চোখ খুললেই মাথার পাশে রাখা সেটটা চালু করে আগে ওকে দেখে নিতে হয় মেসেঞ্জার বা ভাইবারে কেউ কিছু পাঠাল কিনা। নিজের ওয়ালে বন্ধুরা কে কী পোস্ট করেছে, তা দেখার লোভও সামাল দিতে পারে না ও। গতকাল নিজের একটা ছবি পোস্ট দিয়েছিল। সেই ছবিতে কে কী মন্তব্য করেছে, দেখার ইচ্ছায় মুঠোফোনসেট অন করে দেখল চার্জ প্রায় শেষ। অফ হয়ে যাওয়ার সতর্ক সংকেত জানাচ্ছে সেট। দুম করে মন খারাপ হয়ে গেল ওর। চার্জার খুঁজে ফোনসেট চার্জে বসানোর সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। আবারও মাথায় বোমা ফাটল। জেনারেটর লাইন আছে বাসায়। তবে সুইচ বোর্ডে কেবল ফ্যান আর একটা টিউব লাইটের সংযোগ আছে জেনারেটরের লাইনের সঙ্গে। চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না মুঠোফোনে। তবুও সেট চার্জারে বসিয়ে দিল। ভেতরে চাপ বোধ হতে থাকায় উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হওয়ার চেষ্টায় আয়নার সামনে দাঁড়ানোর মুহূর্তে ইলেকট্রিসিটি চলে এলো। একবার নিজেকে দেখে নিয়ে ভাবল যাক এবার মোবাইলে চার্জ চলতে থাকবে।
আয়নায় নিজের চেহারা দেখে চমকে উঠল লুশান্তা।
চেহারার কোমলতা, লাবণ্য ক্ষয়ে গেছে, অন্যরকম রুক্ষ্মতা ভেসে উঠেছে। কেন?
তার গালের টোল নিয়ে সেদিন একজন কমেন্ট পাঠিয়েছিল :
‘টোল টোল টুলি
গেলে নাকি ভুলি
চোখে মেরে টোল-ছোপ
দিয়েছ মায়ার কোপ।’
তখন মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল চার পঙ্ক্তির ছড়া পড়ে। আর এখন সেই মুখের ত্বক জুড়ে বসে আছে এত বাজে মলিন ছোপ! এ অবস্থায় দেখলে মায়ার আঁচড় কি আর লাগবে আবরারের চোখে!
ক্লিনজার দিয়ে মুখ ধুয়ে ও আবার আয়নায় দেখল নিজের মুখ। না, ময়লার ছোপে মলিন হয়নি ত্বক। বুঝল, ভেতর থেকে অন্য কোনো মেকানিজম, ক্রিয়া-বিক্রিয়া কাজ করছে ত্বকের স্বাস্থ্যে। উজ্জ্বলতা হারিয়েছে ত্বক। ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে মুখ। দেখে বিস্ময় চিহ্ন ফুটে উঠল কপালে। তারপরও রাত জাগা ঠেকাতে পারবে কিনা, ভাবতে গিয়ে শংকা কাজ করতে লাগল নিজের মনেই।
আচমকা বজ্রপাতের মতো শব্দ হলো বুকের ভেতর। ত্বকের লাবণ্য কমে গেলে কি জীবন শেষ? নাকি লাবণ্য ছাড়াও জীবন চলে! আজকাল তো ঘুমই আসতে চায় না। কেবল চোখ যায় আইফোনের দিকে। মনে হয় আইফোনের চোখের ভেতর ঢুকে গেছে নিজের চোখ। আরও মনে হয় আইফোনের ‘আই’ ঢুকে বসে আছে নিজের মণিতে; আঠার মতো ওটা লেগে থাকতে চায়, গ্লু যেন লেগে আছে চোখে। অনেকক্ষণ ওয়াশরুমে কাটিয়ে ভাবতে ভাবতে শোবার ঘরে এসে সেটটা হাতে নিয়ে কিছুটা সময় তাকিয়ে রইল ওটার স্ক্রিনের দিকে। এর মধ্যে অনেকটা চার্জ খেয়ে অ্যাকটিভ হয়ে গেছে সেট। সেট অন করার তাড়া সামাল দিতে পারল না। অন করেই একবার মেসেঞ্জারে, একবার ভাইবারে, একবার ইমোতে, একবার হোয়াটস অ্যাপে ঢুকতে লাগল ও। নিজের ওয়াল ঘুরে আসতেও ভুলল না। হঠাৎ ‘নোটিশ অপশনে’ চোখ যাওয়ার পর লুশান্তা দেখল আবরারের পোস্টে দেওয়া ছবিতে কমেন্ট করেছে পরিচিত একজন, চাঁদনি। ‘এলিগেন্ট লুক!’ শব্দ দুটো চোখে ঠাস করে আছড়ে পড়ায় খানিকটা সময় হারিয়ে গিয়েছিল চোখের জ্যোতি। ধীরে ধীরে তা ফিরে এলো। আরও গভীর করে পড়ে ফেলল আবরারের জবাব, ‘থ্যাংকস ফর হার্ট থ্রবিং কমেন্ট।’
‘ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম’ চাঁদনির সৌজন্য কমেন্টটাও ওর আর সৌজন্যময় মনে হচ্ছে না, কোথায় যেন ছড়িয়ে দিচ্ছে বিষাদ-সুর। এ সুরের প্রকাশ নেই বাইরে। ভেতরে ভেতরে কেবলই ধ্বনিত হতে লাগল ‘ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম।’ এবার সেটটা বন্ধ করার আগে দেখে নিল চাঁদনির প্রোফাইল পিকটা। দেখল সেখানে পূর্ণাঙ্গ কোনো ছবি নেই। আছে একটা চোখ। বোজা চোখের ভেতর আলো ঢুকছে বলে মনে হলো না। ‘আই শেডো’ দিয়ে জবজব করে রেখেছে চোখের ওপরের পাতা। বিশ্রী! নাচতে নেমে ঘোমটার মতো মনে হলো সব। মনে মনে আওড়াল ‘ডাইনি’! আবরারকে দখল করতে চায়! তো চাস ভালো কথা, গোপনে কর সব। মেসেঞ্জারে বা ভাইবারে যা। খোলা ময়দানে এমন টোপমারা শব্দ ছোড়ার কী অর্থ! অন্যের মনে হিংসা জাগানো, ঈর্ষা জাগানোর মানে কী! অন্যকেও প্রলুব্ধ করা! ছিঃ!
আর কোথায় কে কী করছে দেখার লোভও সামলাতে পারল না ও। কয়েকজনের ওয়াল দেখল, তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। ভাইবারে গিয়েও তেমন কিছু পেল না। আচমকা নিজের মেসেঞ্জারে নোটিশ ঢোকার সংকেত পেল। ক্লিক করার সঙ্গে সঙ্গে দেখল, বান্ধবী যুঁথির মেসেজ।
‘ঘুম থেকে উঠেছিস? তোকে তো অনলাইনে দেখছি। তো দেখ, ভালো করে দেখ, চাঁদনির কমেন্টের জবাবে কী মেসেজ দিয়েছে আবরার!’
‘কী?’
‘পড়ে দেখ!’
আবার ফিরে এলো সে আবরারের স্ট্যাটাসে কমেন্ট দেখার জন্য। দেখে হতবাক হলো, তা নয়, ঈর্ষায়-হিংসায় জ্বলে গেল, তাও নয়, বিস্ময়ের চাবুক খেয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল। ওদের কীর্তিকলাপ দেখতে লাগল খোলা নেটে। চাঁদনি জবাব দিচ্ছে না দেখে আবরার লিখেছে :
‘আয় আয় চাঁদনি আয়,
খোলা চোখে আয়।
প্রাণ জুড়াতে রোদ তাড়াতে
রোশনি ছড়িয়ে আয় আয় আয়।’
জবাব দিচ্ছে না চাঁদনি। অনেকক্ষণ চলে গেছে। আবরার একটার পর একটা স্টিকার, জিফস, ইমোজি পাঠাচ্ছেই। আকুল করা একটা স্টিকারও পাঠাল- ‘মিস ইউ।’
কী সাংঘাতিক! সবাইকে জানান দিয়ে এমন কাণ্ড করছে কেন আবরার! সে তো ওর সঙ্গেই করার কথা এসব। ভেবেছিল আবরার কেবলই ওর। এখন দেখছে, তা ঠিক নয়। চাঁদনিকেও পটানোর চেষ্টা করছে সে! ভয়ংকর ছেলে তো!
লুশান্তার মাথায় বাজ পড়ল। আবার দেখল আবরারের ছন্দোবদ্ধ জিজ্ঞাসা :
‘চাঁদ উঠল, রোশনি ছড়াল
চুমু দিয়ে গেল চোখে
ঘুম পাড়িয়ে পালিয়ে গেল
কোন সে মুলুকে?’
হুট করে চাঁদনি কমেন্ট করল, ‘এসব কী? খোলা ময়দানে আমাকে নিয়ে কবিতা লিখছেন কেন? এসব ডিলিট করে দিচ্ছি এখান থেকে। মেসেঞ্জার বা ভাইবারে কপি করে পাঠান। দ্রুত।’
মুহূর্তেই ডিলিট হয়ে গেল ছন্দোবদ্ধ কমেন্ট। জবাব পাল্টা জবাব, সব উধাও হয়ে গেল। তবে কি মেসেঞ্জার বা ভাইবারে ডুবসাঁতার দিয়েছে ওরা! ভাবতে গিয়ে বুকটা কামড়ে ধরল। ক্রোধ? ঈর্ষা নাকি হিংসায়? বুঝে ওঠার সুযোগ পেল না। দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ও কল করে বসল আবরারের নম্বরে। তার মুঠোফেনে ঢোকা যাচ্ছে না। এনগেজড। একি! ফেসবুক থেকে কি কলবুকে চড়ে বসেছে ওরা! চাঁদনির নম্বর জানা নেই। জানা থাকলে ওকে কল দিলে বোঝা যেত দুইজনে কানেক্টেড আছে কিনা এখন। হঠাৎ মনে পড়ল কিছুক্ষণ আগে নক করা বান্ধবী যূথির কথা। যুঁথিকে কল করে প্রশ্ন করল, ‘চাঁদনির নম্বর আছে তোর কাছে?’
‘আছে।’
‘ওকে একটা কল দে তো!’
‘কেন?’
‘পরে বলব। আগে কল দে।’
‘শিওর। অপেক্ষা কর। ওর সঙ্গে কথা বলে কলব্যাক করব তোকে।’
‘থ্যাংকস দোস্ত।’
মনের শব্দ-দোলা অনুভব করতে পারছে লুশান্তা। তরঙ্গধ্বনি হাওয়ায় ভেসে পৌঁছে গেছে যেন আবরারের ঘরে। ফেরত হাওয়া-তরঙ্গে ভেসে কী মেসেজ ফিরে এসেছে জানে না ও। এও জানল না অভিমানের দাপুটে ধারে কেটেকুটে ছিন্নভিন্ন হতে যাচ্ছে অব্যক্ত কষ্টরা। পচেগলে বেরোতে লাগল সহ্যশক্তির পোড়া আগুন। আর সে আগুনে জ্বলে জ্বলে উঠতে লাগল বাতাস, জল, পায়ের তলার মাটি।
মুঠোফোনে যুঁথির কলব্যাক দেখে ফোন কানেক্ট করে সেট কানে ধরে বলল, ‘বল্। কথা হলো?’
‘না।’
‘কেন? ধরেনি কল্?’
‘না। ঢুকতেই পারিনি। তার মোবাইল এনগেজড।’
সঙ্গে সঙ্গেই অগোছালো হয়ে গেল লুশান্তার কথা। ভেঙে পড়ে যেতে যেতেও আবার কণ্ঠস্বর ঠিক রেখে বলল, ‘ওর নম্বরটা দে।’
‘আচ্ছা। মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মেসেঞ্জারে ঢুকল চাঁদনির নম্বর। কল করে লুশান্তা বুঝল চাঁদনির নম্বরও বুকড। আবার কল করল আবরারকে। এনগেজড। পায়ে পায়ে ধীর ধীর নয়, সুনামির ঢেউয়ের মতো এগিয়ে এলো বিষাদ আর দুঃখবোধ। দুঃখের ঢেউ উপচে উঠতে লাগল। ক্রমশ তা থেকে ফুলেফেঁপে উঠতে লাগল ক্রোধের আগুন। নিজের সকল ভালোবাসায় সকল আশায় তার ছাট লাগতে লাগল। নিজের বিশ্বাস আর আস্থা এক ফুৎকারে উড়ে যেতে লাগল। ঈর্ষা আর হিংসার পতাকা উড়তে লাগল বুকের ঘরে । আবরারের প্রতি ক্রোধ আর চাঁদনির প্রতি হিংসার। সব মাথায় নিয়ে সামনে-পেছনে কিছু না ভেবে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল লুশান্তা।
ভিখারিনির মতো লাগছে নিজেকে। বুকের ভেতরের শব্দঝড়কে কাঁসার ঘণ্টার মতো ঝাঁঝাল আর অভ্রভেদী মনে হচ্ছে। স্বপ্নময় মায়াবী চোখের জল শুকিয়ে যাচ্ছে। জলভরা চোখে জলশূন্যতা মাথায় বইতে থাকা অকুণ্ঠ ভাবনা নিয়ে ও বাসের আশায় ব্যস্ত সড়কে এসে দাঁড়াল। শুষ্ক অভিমানের ঝড় না উন্মুক্ত আগ্রাসী আবেগের আক্রমণ, কিছুই বুঝতে পারল না লুশান্তা। কাঁধে ঝোলানো ক্যাজুয়েল ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়েছে। ব্যাগে কিছু টাকা আছে। আর আছে আবরারের মেসের ঠিকানা। ব্যস্ত সড়কের কোলাহল আর শব্দদূষণের মাঝেও নিজের ভেতরের আর্তনাদ-কোলাহল ক্রমশ নিস্তব্ধ হতে লাগল। শুদ্ধতার মাঝেই শুষ্ক চোখে নেমে এলো লোনাজলের ঢেউ। পুরোটা, না আংশিক ভালোবাসে ও আবরারকে? নিজেকে প্রশ্ন করে তীব্র আর্তনাদ শুনতে পেল লুশান্তা। অর্ধেক নয়, পুরোটাই, ভালোবাসে। আর এ ভাবনা অভিঘাতে থেমে যেতে লাগল পুরো অভিমান-ঝড়।
বাস এসে দাঁড়াল সামনে। তেমন একটা ভিড় নেই। তবুও বাসে ওঠার সময় ছোকড়া হেলপার হাত বাড়াল অযাচিত হয়ে। টেনে তোলার ভান করে সে হাত বসাল ওর কোমল বুকে। চট করে মাথা ঘুরিয়ে কঠিন চোখে তাকাল ও ছোকড়াটার দিকে। পাত্তাই দিল না এতটুকুন ছেলে। বরং চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে জোর করে ওকে ঠেলে দিল বাসের পেটের ভেতর।
ঝনঝন করে উঠল পুরো শরীর। ঘৃণায় ক্ষোভে ভেতরে দুমড়েমুচড়ে উঠল প্রতিবাদী গর্জন। বাস-স্টার্টের আওয়াজের আড়ালেই দমে গেল নিজের আর্তচিৎকার। নামার সুযোগ নেই বলে দাঁড়িয়েই রইল লুশান্তা। মনে হচ্ছে দাঁড়িয়ে আছে ও ঘৃণার বালুচরে। ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে যেন পা-জোড়া চোরাবালির ভেতর। হাতের শক্তি দুর্বল হয়ে আসতে থাকায় বসে পড়ল সিটে। চোখ বুজে নিজের ঘৃণা আর ক্ষোভ সামাল দিতে লাগল। এ সময় পাশে এসে বসল এক মহিলা যাত্রী। ওনাকে পাশে পেয়ে কিছুটা স্বস্তি পেতে লাগায়, মুঠোফোন বের করে এবার কল করে কানের কাছে ধরল। না এখনো এন্গেজড আবরারের ফোন। এটা কী করে সম্ভব! এতক্ষণ টানা কথা বলা যায়? যায়। নিজেকে প্রবোধ দিয়ে ভাবল ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে কথা বলতে লাগলে কখন সময় চলে যায় টের পাওয়া যায় না। তাহলে কি ওরা পরস্পরকে ভালোবাসতে শুরু করেছে? নিজের জন্য আবরারের টান কোথায় পালাল? ভালোবাসা কি বদলে যায়? একপাত্র থেকে আরেক পাত্রে উড়ে চলে যায়? তবে কি আবরার আবার প্রেমে পড়েছে চাঁদনির! চাঁদনি আবরারের? ভাবনায় এলোমেলো হতে হতে শ্মশানের আগুনের মতো ও পুড়তে লাগল আবার। পোড়া ধোঁয়া থেকে গন্ধ বেরোচ্ছে। অবশ হয়ে যাচ্ছে দেহ-মন। সেটটা ব্যাগে ঢুকিয়ে চোখ বুজে বসে থাকে ও। কতক্ষণ বসে ছিল জানে না। ‘মগবাজার ওয়ারলেস’, ‘মগবাজার’। হেলপারের কথায় চোখ খুলে গেল ওর।
মগবাজারে ওয়ারলেস গেটের কাছে মেসে ভাড়া থাকে আবরার। এখানেই নামতে হবে। মুখোমুখি কথা বলতে হবে ওর সঙ্গে। এ চিন্তা মাথায় নিয়ে চলে এসেছে। এখন নামতে গিয়ে দেখল পাশে রাখা ব্যাগ নেই। মহিলাটিও নেই। কোথায় গেল সে! নেমে গেছে ব্যাগ নিয়ে!
ও মাগো! বাসভাড়া নেই। ব্যাগে ছিল। ফোন সেটটাও নেই! আবরারের চিন্তা ধোঁয়া হয়ে উড়ে গেল মুহূর্তেই।
বাস থেকে নামার সময় ভাড়া চাওয়ায় হেলপারকে লুশান্তা বলল, ‘ব্যাগ ছিনতাই হয়ে গেছে। পাশের মহিলাযাত্রী ব্যাগ নিয়ে কেটে পড়েছে। কোথায় নেমেছে সে?
‘ভাড়া দেন’। লুশান্তার কথা পাত্তা না দিয়ে ধমকের স্বরে বলল হেলপার।
‘বললাম তো ব্যাগ নিয়ে কেটে পড়েছে ওই যাত্রী ছিনতাইকারী। ভাড়া দেব কোত্থেকে?’
‘তামাশা কইরেন না। ভাড়া দিয়া নামেন।’ গায়ে ধাক্কা দিয়ে বাসের ভেতর লুশান্তাকে ঠেলে দিল হেলপার।
কোনো যাত্রী প্রতিবাদ করছে না। লুশান্তাও হকচকিয়ে গেল। উদ্ভূত অবস্থায় কী করা যায় কিছুই খেলছে না ওর মাথায়।
আচমকা পেছনে থাকা এক যাত্রী বলল, ‘এই ছেলে! ওনার গায়ে হাত দিচ্ছ কেন? ভাড়া কত তোমার?’
ধমক আর প্রশ্ন শুনে হেলপারের উত্তেজিত কথা থেমে গেল। ঠাণ্ডা গলায় সে বলল, ‘বিশ টেকা।’
‘এই নাও পঞ্চাশ টাকা। আমারটা সহ রাখো। দশ টাকা ফেরত দাও।’
হেলপার দশ টাকা ফেরত দিলে লুশান্তাকে উদ্দেশ করে পেছনের যাত্রী বলল, ‘নামুন।’
ওরা নিচে নামার সময় হেলপার দাঁত চিবিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘শালার মাগী!’
শব্দটা দুম করে মাথায় আঘাত হানল। নিচে নেমে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গাড়ি ছাড়ার মুহূর্তে ঠাস করে ছেলেটার গালে হঠাৎ চড় বসিয়ে দিল লুশান্তা। চালক দেখতে পায়নি দৃশ্যটা। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। ছেলেটি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করছে লুশান্তাকে।
সাহায্যকারী যাত্রী বলল, ‘থাক। ওদের সঙ্গে ঝামেলা করতে নেই। দেখে আপনাকে সজ্জন মেয়ে মনে হয়েছে। এ জন্য হেল্প করেছি। বাজে লোকদের কথা কানে তুলতে নেই।’
লুশান্তার উদ্যত ফনা নত হয়ে আসায় কোনো রকমভাবে বলল, ‘আপনাকে ধন্যবাদ। মহিলা যাত্রীবেশী নারী ছিনতাইকারীও যে থাকতে পারে, জানা ছিল না। পাশে বসে আমার ঝিমুনির আড়ালে কীভাবে ব্যাগটা নিয়ে গেল টেরই পাইনি।’
‘চারপাশেই তো ফাঁদ। ফাঁদ চিনতে হয়। না চিনলে বিপদ, আপনার মতো বয়সী মেয়েদের জন্য তা আরও বিপজ্জনক।’
‘ঠিক বলেছেন। আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ।’ বলল লুশান্তা।
‘কৃতজ্ঞতা দেখানোর প্রয়োজন নেই। বিপদে আপনাকে উপকার করতে পেরে শান্তি পেয়েছি। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সে-শান্তিটুকু কেড়ে নেবেন না।’
মুগ্ধ হয়ে গেল লুশান্তা। আর কী বলতে হবে কথার পিঠে, না বুঝে চুপ হয়ে ফুটপাত ধরে এগোতে গিয়ে বলল, ‘আসি।’
‘এদিকে কোথায় থাকেন আপনি?’
‘এ এলাকায় থাকি না, একজনের খোঁজে এসেছি। এখানে আগে কখনও আসিনি। মগবাজার ওয়ারলেস গেটের মোড়ে এক মেসে থাকে আমার পরিচিতজন।’
‘আগে কখনো আসেননি?’
‘না।’
‘বাসা চেনেন?’
‘না।’
‘তাহলে কল করুন। বাসার লোকেশনটা জেনে নিন।’
‘লোকেশন এখানেই আশেপাশে। তবে বাসার নম্বরটা জানা নেই। ভেবেছিলাম এখানে এসে কল করব। অথচ দেখুন সেটসহ ব্যাগটাই খুইয়ে ফেললাম।’
‘নম্বর মুখস্থ আছে কলারের?’
‘আছে।’
তাহলে নিন, আমার সেট নিন। কল করুন তাকে।’
ধন্দে পড়ে গেল লুশান্তা। অপরিচিত একজনের এত হেল্প নেওয়া উচিত হচ্ছে কিনা বুঝতে না পেরে ফোন সেট নিয়ে আবরারের মুখস্থ নম্বরটা টিপে কল করল ও।
আশ্চর্য। এখনো ফোন এন্গেজড! দীর্ঘক্ষণ সে কথা বলছে ফোনে!
‘বাসে বসে কল করেছিলাম। এন্গেজড পাচ্ছি। এখনও।’
‘তো। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবেন, নাকি আমার বাসায় যাবেন? ওই তো, ওই লাল দেয়ালওয়ালা বাসার পাশের গলিতে আমার বাসা।
ইচ্ছারা অনিচ্ছার সুতোয় গিঁট খেয়ে খেয়ে অর্থহীন জড়তায় ফেঁসে গেল। পায়ের গতি হয়ে পড়ল চলৎশক্তিহীন। সংকটে নিজের প্রতি বিশ্বাসের শেকড় উপড়ে গেল। ‘না’ বলার জোশ ভেতর থেকে নড়ে উঠলেও ও বলল, ‘চলুন।’
লাল দেওয়াল ঘেরা বাড়ির পাশের গলিতে ঢোকার পরই সম্বিত ফিরে পেল লুশান্তা। একা এভাবে অপরিচিত লোকের সঙ্গে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না ভেবে আতঙ্কিত হল। তবুও ‘না’-বলতে পারল না। তবে প্রশ্ন করল, ‘কে কে আছে বাসায়?’
প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির সামনে দাঁড়াল লোকটি। পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুলতে খুলতে বলল, ‘আপাতত একা আছি।’
ভেতরে ঢুকতে গিয়েও থমকে গেল লুশান্তা।
‘একা আপনার বাসায় ঢোকা কি ঠিক হচ্ছে?’
‘না। ঠিক হচ্ছে না। ভেতরে ঢোকার দরকার নেই। বারান্দায় বসুন আপনি। জিরিয়ে নিন। আবার কল করে দেখুন আপনার পরিচিত জনকে ধরতে পারেন কিনা। পেলে চলে যাবেন। দোষ কী?’
‘দোষের ব্যাপার না। অশোভন মনে হচ্ছে বিষয়টা। একা একটা মেয়ে অপরিচিত একজন পুরুষের সঙ্গে ঘরে ঢুকবে, অশোভন না?’
‘অবশ্যই না। বিপদগ্রস্ত এক তরুণীকে হেল্প করছি। সুন্দরভাবে দেখলে সুন্দর আর অসুন্দরভাবে দেখলে অশোভন। আসল কথা হচ্ছে, কে কীভাবে মেপে দেখবে ঘটনাটা, সেটাই মুখ্য বিষয়।’
এমন সুন্দর কথা উপেক্ষা করা গেল না। লুশান্তা ঘরে ঢুকে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে বসার ব্যবস্থা আছে। একটা চেয়ারে বসে বলল, ‘প্রবল তেষ্টা পেয়েছে। পানি খেতে পারি এক গ্লাস? আপনার সেটটা আবার দিন কল করে দেখি।’
মুঠোফোন ওর হাতে দিয়ে লোকটা ভেতরে যাওয়ার পর লুশান্তা আবার কল করল আবরারকে। আশ্চর্য! ওর ফোনে এখনো কথা চলছে! নাকি অন্য কোনো সমস্যা হয়েছে! ফোন এন্গেজড থাকলেও, কেউ কল করলে রিংটোন বোঝার কথা। আর তখনই তো কলব্যাক করা উচিত ছিল আবরারের। ওর কল পেয়ে কলব্যাক করবে না আবরার, এটা যে অচিন্ত্যনীয় ব্যাপার। তবে কি কোথাও ভুল হয়ে গেল! আবরার কি চাঁদনির সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছে না? তার মুঠোফোনে সমস্যা হতে পারে না? পারে তো! ভাবতে গিয়ে আবার কপালে ঘাম জমে যেতে লাগল! মগজের মধ্যে গেড়ে বসা রাগ-ক্ষোভ আর ঈর্ষা-হিংসার বদলে এবার উদ্বেগ হানা দিল। যতই সরিয়ে দিতে চাচ্ছে, ততই তা প্রবল বেগে আক্রমণ করছে বুকের শেকড়ে; উপড়ে যাচ্ছে দুঃখবোধ, উড়ে যাচ্ছে টান। বিলাপের মতো দুঃখধ্বনি বেরিয়ে আসতে লাগল। কী করবে ও এখন?
‘নিন, পানি নিন।’ ভাবনা থেমে গেল লোকটির কথা শুনে।
ডান হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা ধরে একঢোকে গ্লাস শেষ করে বলল, ‘আবরারের ফোন বন্ধ পাচ্ছি এখনও! কী করব বুঝতে পারছি না।’
‘আবরার কী হয় আপনার?’
‘ও আমার ফিঁয়ানসে।’
‘ওঃ। এতো বড় এলাকায় এখানে তো ঠিকানাবিহীন খুঁজে পাবেন না তাকে। নিশ্চয় কোনো ঝামেলা হয়েছে। সার্ভিস সেন্টারে গিয়ে সিম তুলে নিন। নিশ্চয় সে কল করবে আপনাকে।’
‘জি। সেটাই ভালো।’
‘খাবেন কিছু? আপনি কেবল তৃষ্ণায় কাতর ছিলেন না। উৎকণ্ঠায়ও ডুবে আছেন। নিশ্চয় খিদাও পেয়েছে। কিছু খাবেন?’
‘খাবারের কথা মনে হওয়ায় সত্যিই পেটজ্বলা খিদা টের পেল ও। তারপরও বলল, ‘আপনাকে ধন্যবাদ। উঠব এখন।’
এসময় বাইরে শোরগোল শোনা গেল। কয়েকটা ছেলে উত্তেজিত স্বরে কথা বলছে। কী হয়েছে বোঝার জন্য ঘরের বাইরে এসে তিনি বোঝার চেষ্টা করলেন। এক ছেলে প্রশ্ন করল, ‘আঙ্কেল, আপনি নাকি ভাড়াটে মেয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকেছেন?’
‘কী বলছ তোমরা! উনি ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন, মোবাইল ফোন আর টাকা-পয়সা খুইয়ে বিপদগ্রস্ত হয়েছেন। একজনকে খুঁজতে এসেছেন এ পাড়ায়।’
‘কথা রাখেন। মালটা বাইর করে দেন। নইলে এলাকার মানুষ ডাকতে বাধ্য হব।’
‘ভদ্র ভাষায় কথা বলো তোমরা। উনি সজ্জন মেয়ে। বিপদে পড়েছেন। ওনাকে সাহায্য করতে হবে না?’
ভদ্র ভাষায় কথা বলছে না তারা। আরও কয়েকজন এসে জুটে গেল। সবাই জানতে চাচ্ছে, ‘কী হয়েছে? কী হয়েছে?’
অশ্লীল শব্দের শব্দতির ঢুকল লুশান্তার কানে। বারান্দা থেকে বেরিয়ে দাঁড়াল দরজার সামনে। এত দ্রুত এত ছেলের জড়ো হওয়া দেখে হতবাক হয়ে গেল ও। ঘোরলাগা বিহ্বলতা কাটল হঠাৎ পরিচিত একজনের প্রশ্ন শুনে।
‘তুমি! তুমি এ ব্যবসায় নেমেছ, লুশান্তা?’ লুশান্তা নাম শুনে সাহায্যকারী সজ্জন লোকটি বলতে চাচ্ছিলেন, ‘উনি বোধ হয় আপনাকেই খুঁজতে এসেছেন এ পাড়ায়।’ মুখ ফুটে কথাটা বলার সুযোগ পেলেন না। তার আগেই তন্দ্রাভাঙা ঘোর থেকে বেরিয়ে ক্রোধের মুকুট মাথায় চেপে গর্জন তুলে লুশান্তা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, নেমেছি।’
‘কবে থেকে?’ পাল্টা প্রশ্ন করল ভিড়ের মধ্যে এসে দাঁড়ানো আবরার।
অচিন্ত্যনীয় অবিশ্বাস্য প্রশ্নের ঘা খেয়ে শীতল কণ্ঠে, দাঁত চেপে চেপে লুশান্তা জবাব দিল, ‘আ-জ-থে -কে।’
@mohitkamal

_______________INFORMATION________________

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়