ডাক্তার প্রতিদিন

Published:
2020-05-20 12:35:36 BdST

করোনা-পরবর্তী বিশ্ব: নজরদারি চামড়ার নিচেও:ইউভাল নোয়া হারারি বিশ্ব কাঁপানো লেখা


 

ডেস্ক
________________

মনুষ্যত্ব আজ একটি বিশ্বজোড়া সংকটের সম্মুখীন। এবং আমাদের প্রজন্মের এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় সংকট। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক এবং সরকার যে সিদ্ধান্তগুলো নিতে চলেছে, সম্ভবত তা পরবর্তী কয়েক বছরের জন্য গোটা পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে। সেগুলি শুধুমাত্র আমাদের স্বাস্থ্য-পরিষেবাই নয়, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতিরও অভিমুখ স্থির করে দেবে। আমদের অবশ্যই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সেগুলোকে কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি আমরা আবশ্যই আমাদের কাজের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলগুলিও মাথায় রাখব। সামনে থাকা একাধিক বিকল্পের মধ্যে একটাকে বেছে নেবার সময়, তাৎক্ষণিক এই সমস্যাকে কীভাবে অতিক্রম করব শুধু সেটুকু ভাবলেই চলবে না, ঝড় থেমে যাবার পর কীরকম পৃথিবী আমাদের জন্য পড়ে থাকবে – সেটাও আমাদের ভেবে দেখতে হবে। হ্যাঁ, ঝড় তো অবশ্যই থেমে যাবে, মানবসভ্যতাও টিকে থাকবে, আমাদের মধ্যে অধিকাংশই বেঁচেবর্তে থাকবে -- কিন্তু তখন আমরা সম্পূর্ণ নতুন একটা পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে যাব।

এই সময়ে নেওয়া প্রচুর অস্থায়ী এবং জরুরি পদক্ষেপ পরবর্তীকালে আমাদের জীবনে চিরস্থায়ী হয়ে যাবে। জরুরি অবস্থার বৈশিষ্ট্যই এই। ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলিকে তা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অতিক্রম করে যায়। সাধারণ অবস্থায় যে সিদ্ধান্তগুলি নেবার আগে বিচার-বিবেচনা করতেই কয়েক বছর লেগে যায়, সেগুলো কয়েক ঘন্টার মধ্যে নেওয়া হয়। অপরিণত, এমনকী বিপজ্জনক বিভিন্ন প্রযুক্তিকেও তখন জবরদস্তি কাজে লাগানো হয়, কারণ কিচ্ছুটি না করে চুপ করে বসে থাকার ঝুঁকিটা আরও মারাত্মক। গোটা দেশটাই তখন বৃহত্তর সামাজিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার গিনিপিগ হিসেবে কাজ করে। কী হয়—যখন প্রত্যেকে তার নিজের বাড়িতে বসে কাজ করে এবং একটা সামাজিক দূরত্ব রেখে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে? কী হয়—যখন সমস্ত স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে পড়াশুনা চালায়? স্বাভাবিক সময়ে কোনও সরকার, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিছুতেই এই জাতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে রাজি হত না। কিন্তু সময়টা এখন মোটেই স্বাভাবিক নয়।

এই সঙ্কট-মুহূর্তে, সামনে থাকা দু-জোড়া বিকল্পের মধ্যে একটি করে আমাদের বেছে নিতেই হবে—প্রথমটি হল একচ্ছত্র রাষ্ট্রীয় নজরদারী অথবা নাগরিক ক্ষমতায়ন। এবং দ্বিতীয়টি হল জাতীয় বিচ্ছিন্নতা অথবা আন্তর্জাতিক সহমর্মিতা।


  • সৌজন্য
    ২০ মার্চ ২০২০ দ্য ফিনানসিয়াল টাইমস-এ প্রকাশিত ইউভাল নোয়া হারারি-র প্রবন্ধ 'দ্য ওয়ার্ল্ড আফটার করোনাভাইরাস'। 'এখন আলাপ ব্লগ'-এ প্রকাশিত বাংলা অনুবাদটি করেছেন সীমান্ত গুহঠাকুরতা।

 

নজরদারি চামড়ার নিচেও


মহামারী রোধ করার জন্য সমগ্র নাগরিক-সমাজকেই কিছু নির্দিষ্ট অনুশাসন মেনে চলতে হয়। এই লক্ষ্যে পৌঁছনোর দুটি প্রধান রাস্তা রয়েছে। একটি রাস্তা হল সরকারের—সে নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালাবে এবং আইনভঙ্গকারীদের শাস্তি দেবে। সভ্যতার ইতিহাসে এই প্রথমবার সমস্ত নাগরিকের ওপর একযোগে সর্বক্ষণ নজরদারি চালানো সম্ভব হচ্ছে। এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে প্রযুক্তি। ৫০ বছর আগে, কেজিবি-র পক্ষে ২৪০ মিলিয়ন সোভিয়েত নাগরিককে ২৪ ঘন্টা অনুসরণ করা সম্ভব ছিল না। অথবা সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ তথ্যকে কার্যকরী উপায়ে বিশ্লেষণ করাও সম্ভব ছিল না। কেজিবি মূলত রক্তমাংসের গুপ্তচর এবং বিশ্লেষকদের ওপর নির্ভর করত। ফলত তার পক্ষে প্রত্যেক নাগরিককের পিছনে একজন করে চর নিয়োগ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু এখন সরকার রক্তমাংসের গুপ্তচরদের থেকে সর্বভূতে বিরাজমান সেন্সর এবং অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন অ্যালগরিদম-এর ওপর অনেক বেশি নির্ভর করে।

করোনাভাইরাস অতিমারীর সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য বিভিন্ন দেশের সরকার ইতিমধ্যেই বেশ কিছু নতুন নজরদারী-প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। এ ব্যাপারে সবথেকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে চীন। মানুষের স্মার্টফোনের ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালিয়ে, লক্ষকোটি ফেস-রেকগনাইজিং ক্যামেরা ব্যবহার করে, মানুষকে তাদের শারীরিক অবস্থা এবং দেহের তাপমাত্রা মেপে তা জায়গামত জানাতে বাধ্য করার মাধ্যমে চীনের সরকার এখন যে শুধুমাত্র খুব দ্রুত সন্দেহজনক করোনা-বাহকদের চিহ্ণিত করতে পারছে তাই-ই নয়, আক্রান্ত ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সেই সমস্ত মানুষদেরও চিহ্ণিত করা সম্ভব হচ্ছে, যারা ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছে। এমন কিছু মোবাইল অ্যাপ-ও বেরিয়ে গেছে যা কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি গেলেই নাগরিকদের সাবধান করে দিচ্ছে।

এই জাতীয় প্রযুক্তি শুধুমাত্র পূর্ব এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানহু সম্প্রতি করোনাভাইরাস আক্রান্তদের চিহ্ণিত করার জন্য সে দেশের নিরাপত্তা সংস্থাকে সেই সমস্ত নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছেন, যেগুলি সচরাচর সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। সে দেশের পার্লামেন্টারি সাব-কমিটি এই পদক্ষেপকে স্বীকৃতি দিতে রাজী ছিল না। নেতানহু একটি ‘জরুরি অধ্যাদেশ’ জারী করে তাদের সেই আপত্তি গুঁড়িয়ে দেন।

পালটা তর্ক তুলে আপনি বলতেই পারেন যে এর মধ্যে তো নতুন কিছু নেই। বিগত কয়েক বছর ধরেই তো সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থার তরফে মানুষের ওপর নজরদারি চালানো, নিবিড়ভাবে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং তার চিন্তা-চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অনেক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এখনও যদি আমরা যথেষ্ট সতর্ক না হই, এই অতিমারী কিন্তু একটি নজরদারীর ইতিহাসে অন্যতম মাইল-ফলক হয়ে দাঁড়াবে। শুধুমাত্র এই কারণে নয় যে, যে সমস্ত দেশ এতদিন গণ-নজরদারীর প্রযুক্তিগুলোকে ব্যবহার করতে অস্বীকার করেছিল, তারাও একে নিতান্ত স্বাভাবিক একটি ব্যবস্থা হিসেবে প্রয়োগ করবে, বরং তা নজরদারির ক্ষেত্রে আরও বড় নাটকীয় পরিবর্তন এনে দেবে—এতদিন যে নজরদারি শুধুমাত্র মানবদেহকে বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করত, এখন তা ঢুকে পড়বে দেহের অত্যন্তরেও।

এতদিন পর্যন্ত আপনি আপনার আঙুল দিয়ে স্মার্টফোনের স্ক্রিনটা স্পর্শ করলে এবং কোনো লিঙ্কে ক্লিক করলে রাষ্ট্র শুধু এইটুকুই জানতে চাইত যে আপনার আঙুল ঠিক কোন জিনিসটায় ক্লিক করছে। কিন্তু করোনাভাইরাস এসে সেই আগ্রহের অভিমুখটাকে বদলে দিয়েছে। এখন রাষ্ট্র আপনার আঙুলের তাপমাত্রা এবং চামড়ার নীচে আপনার রক্তচাপের পরিমাণও জানত আগ্রহী।

 

জরুরি অবস্থায় পুডিং তৈরির নিয়ম

 

কার্যক্ষেত্রে আমরা সচরাচর নজরদারি সংক্রান্ত যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হয়ে থাকি, তার একটা হল এই যে, আমরা কেউই জানতে পারি না ঠিক কীভাবে আমাদের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং পরবর্তীকালে এর ফলে কী কী হতে পারে। নজরদারির প্রযুক্তি অবিশ্বাস্য গতিতে উন্নতি করছে। মাত্র দশ বছর আগেও যা ছিল নেহাত কল্পবিজ্ঞান, আজ তা বাসী খবরে পরিণত। এমন একটা সরকারের কথা কল্পনা করুন, যে তার নাগরিকদের এমন একটা বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরতে বাধ্য করে, যেটা চব্বিশ ঘন্টা ধরে দেহের তাপমাত্রা এবং হৃৎ-স্পন্দন মাপতে থাকে। এতে যে তথ্য পাওয়া যাবে, সরকারী অ্যালগরিদমের মাধ্যমে তার শ্রেণি-বিভাজন এবং বিশ্লেষণ চলতে থাকবে। আপনি অসুস্থ কিনা আপনি নিজে তা টের পাবার অনেক আগেই এই অ্যালগরিদম তা জেনে যাবে। পাশাপাশি এও জানতে পারা যাবে যে, আপনি কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন এবং কাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এইভাবে অসম্ভব দ্রুতগতিতে সংক্রমণের শৃঙ্খলটাকে ছোট করে দেওয়া যাবে, এমনকী ভেঙেও দেওয়া যাবে। এই রকম একটা ব্যবস্থায় মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে যেকোনো মহামারীর ছড়িয়ে পড়া রোধ করা যেতে পারে। শুনতে চমৎকার লাগছে, তাই না?

মুশকিল হল, এর ফলে একটা হাড়-হিম-করা নজরদারী ব্যবস্থাও বৈধতা পেয়ে যাবে। উদাহরণ হিসেবে, ধরা যাক, যদি আপনি জানতে পেরে যান যে আমি সিএনএন এর বদলে ফক্স নিউজের লিঙ্কে ক্লিক করছি, তাহলে আপনি আমার রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে, এমনকী ব্যক্তিত্ব সম্পর্কেও অনেক কিছু বুঝতে পেরে যাবেন। কিন্তু লিঙ্কের ভিডিওটি দেখার সময় আপনি যদি আমার দেহের তাপমাত্রা, রক্তচাপ এবং হৃৎস্পন্দন মেপে ফেলতে পারেন, তাহলে আপনি এও জানতে পেরে যাবেন যে কীসে আমার আনন্দ হয়, কখন আমার কান্না পায় আর কখন আমি সত্যি সত্যি ভয়ঙ্কর রেগে যাই।

মনে রাখা জরুরি যে, রাগ-আনন্দ-বিরক্তি-ভালোবাসা এগুলো সবই জ্বর বা সর্দিকাশির মতই নিছক শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য। কাজেই যে প্রযুক্তি আমার সর্দি হয়েছে কিনা তা ধরে ফেলতে পারে, তার পক্ষে আমার আনন্দকেও চিনে ফেলা সম্ভব। যদি বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থা বা সরকার আমাদের বায়োমেট্রিক তথ্যগুলো এক জায়াগায় জড়ো করে তা নিয়ে নাড়াঘাটা শুরু করে, তাহলে তারা আমাদের এতটা ভালভাবে চিনে যাবে, যতটা আমরা নিজেরাও নিজেদের চিনি না। তখন যে তারা শুধুমাত্র আমাদের যাবতীয় অনুভূতিকে আন্দাজ করতে পারবে, তাই-ই নয়, আমাদের চিন্তাভাবনাকেও এমনভাবে প্রভাবিত করতে পারবে যাতে যেকোনো দ্রব্য থেকে শুরু করে যেকোনো রাজনৈতিক নেতাকে পর্যন্ত তারা আমাদের কাছে বিক্রি করে দিতে পারবে। বায়োমেট্রিক নজরদারি যদি চালু হয়, তবে তা এতটাই আধুনিক হবে যে কেমব্রীজ অ্যানালেটিকার ডেটা হ্যাকিং সিস্টেমকেও তখন আদিমযুগের জিনিস বলে মনে হবে। কল্পনা করুন, ২০৩০ সালের দক্ষিণ কোরিয়া, যখন প্রত্যেকটি নাগরিককে ২৪ ঘন্টা একটি বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরে থাকতে হয়। তখন যদি আপনি সেই ‘মহান নেতার’ একটি ওজস্বী বক্তৃতা শুনতে থাকেন আর সেই ব্রেসলেটটি আপনার মনের গোপন রাগের সংকেতগুলিকে নিঁখুতভাবে রেকর্ড করতে থাকে, তাহলে আপনার কী পরিণতি হতে পারে আশা করি তা বুঝতেই পারছেন!



আপনি অবশ্যই আপতকালীন পরিস্থতিতে গৃহীত একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে বায়োমেট্রিক নজরদারি চালু করার পক্ষে সওয়াল করতে পারেন। জরুরি অবস্থার অবসানের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থাটি বিলুপ্ত হওয়া উচিত। কিন্তু জরুরি অবস্থা কেটে যাবার পরেও এই জাতীয় অস্থায়ী ব্যবস্থাগুলোর থেকে যাবার একটা বদভ্যাস আছে, কারণ সবসময়ই দিগন্তে কোনো না কোনো নতুন জরুরি অবস্থার মেঘ উঁকি মারতে থাকে। আমার স্বদেশ ইজরায়েলের কথাই ধরা যাক। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় সেদেশে জরুরি অবস্থা জারী হয়েছিল। খুব সঙ্গতভাবেই সেই সময় সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ, জমি অধিগ্রহণ, এমনকী পুডিং তৈরির ব্যাপারেও বিধি-নিষেধ আরোপের মতো (বিশ্বাস করুন, মজা করছি না) কিছু অস্থায়ী জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার যুদ্ধে জয়লাভ সুসম্পন্ন হয়েছে বহুকাল আগেই, অথচ আজ পর্যন্ত ইজরায়েল সেই জরুরি অবস্থার অবসান ঘটায়নি। এবং ১৯৪৮ সালে চালু হওয়া সেই অস্থায়ী ব্যবস্থাগুলোও বিলুপ্ত করতে সে বেমালুম ভুলে গেছে (পুডিং সংক্রান্ত জরুরি অধ্যাদেশটি অবিশ্যি দয়াপরবশ হয়ে বিলুপ্ত করা হয়েছে, ২০১১ সালে)।

এমনকী যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পরিমাণ শূন্যে নেমে আসবে, তথ্য-বুভুক্ষু রাষ্ট্র তখনও বায়োমেট্রিক নজরদারি চালিয়ে যাবার জন্য নানান কুযুক্তি দেখাতে পারে। যেমন, এই ভাইরাসের দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে, কিংবা মধ্য আফ্রিকায় ইবোলা ভাইরাসের একটা নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে… ইত্যাদি ইত্যাদি। বিগত কয়েক বছরে আমাদের ব্যক্তিগত পরিসরগুলোর দখল নিয়ে একটা বিরাট যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে উঠেছে। করোনাভাইরাস-জনিত সংকট সেই বারুদে অগ্নিসংযোগ করে দিতে পারে। কারণ মানুষকে যদি তার ব্যক্তিগত পরিসরের গোপনীয়তা আর স্বাস্থ্য-সুরক্ষার মধ্যে যে কোনো একটা বিকল্পকে বেছে নিতে বলা হয়, সে দ্বিতীয়টাই গ্রহণ করবে।

 

সাবান দিয়ে হাত ধোও, নয়তো পুলিশ ধরবে


মানুষকে এইভাবে স্বাস্থ্য এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মধ্যে যে কোনো একটাকে বেছে নিতে বলাটাই আসলে মূল সমস্যা। কারণ এটা একটা ভুলভাল বিকল্প। ব্যক্তি-পরিসরের গোপনীয়তা এবং স্বাস্থ্য-সুরক্ষা দুটোই আমরা পেতে পারি এবং আমাদের পাওয়া উচিত। আমরা আমাদের স্বাস্থ্যরক্ষা করতে এবং করোনাভাইরাসের মহামারীকে রোধ করতে চাইতেই পারি, কিন্তু তা নজরদারীর একাধিপত্য স্থাপনের মাধ্যমে নয়, বরং নাগরিকদের ক্ষমতাবৃদ্ধির মাধ্যমে। বিগত কয়েক সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান এবং সিঙ্গাপুর কিছু নির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে করোনাভাইরাসকে বাক্সবন্দী করে ফেলতে সফল হয়েছে। এই দেশগুলি নজরদারীর কিছু কিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে বটে, কিন্তু তার থেকে অনেক বেশি নির্ভর করেছে নিবিড় পরীক্ষা, যথাযথ ফলাফল জ্ঞাপন এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত জনগণের সাগ্রহ সহযোগিতার ওপর।

কড়া নজরদারি এবং কঠিন শাস্তিই মানুষকে উপকারী আচরণবিধিগুলো মেনে চলতে বাধ্য করার একমাত্র উপায় নয়। মানুষকে যদি বিজ্ঞানভিত্তিক সত্যগুলি বুঝিয়ে বলা যায় এবং যে সরকারী কর্তৃপক্ষ এই কথাগুলি বলছে, তাকে যদি মানুষ বিশ্বাস করতে পারে, তখন তারা নিজেরাই কাজগুলি সঠিকভাবে করতে পারে। তখন আর তাদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে নজরদারি চালানোর জন্য কোনো ‘বিগ ব্রাদার’-এর প্রয়োজন হবে না। একদল অজ্ঞ এবং পুলিশী শাসনে চালিত জনগণের তুলনায় একটা স্বতঃস্ফূর্ত এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিকভাবে অবহিত জনসমষ্টি সবসময়ই অনেক বেশি ক্ষমতা-সম্পন্ন এবং কাজের হয়ে থাকে।

সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যাপারটাকেই উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। মানুষের স্বাস্থ্যরক্ষায় এর প্রচলন একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই অত্যন্ত সাদামাটা কাজটা প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন প্রাণ বাঁচায়। আজকে আমরা এটাকে খুবই সহজ ব্যাপার বলে মেনে নিয়েছি, কিন্তু মাত্র এই সেদিন, উনবিংশ শতকে বৈজ্ঞানিকরা এই হাত ধোয়ার উপকারিতাটি আবিষ্কার করেছিলেন। এর আগে, এমনকী ডাক্তার বা নার্সরাও একটা অপারেশন সেরে হাত না ধুয়েই আরেকটা অপারেশন করতে শুরু করতেন। এখন প্রতিদিন লক্ষকোটি মানুষ সাবান দিয়ে হাত ধোয়, তার কারণ এই নয় যে সাবান দিয়ে হাত না ধুলে পুলিশে ধরবে, তার কারণ হল এই যে, তারা বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে। আমি সাবান দিয়ে আমার হাত ধুই, কারণ আমি ভাইরাস আর ব্যাকটিরিয়ার বিষয়ে শুনেছি, আমি বুঝতে পেরেছি যে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবগুলি রোগ ছড়ায় এবং আমি জানি সাবান সেগুলোকে দূর করতে পারে।

কিন্তু এতটা সম্মতি এবং সহযোগিতা পেতে গেলে বিশ্বাসের প্রয়োজন হয়। মানুষকে বিজ্ঞানের ওপর, সরকারী কর্তৃপক্ষের ওপর এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর বিশ্বাস রাখতে হয়। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনৈতিক নেতারা বিজ্ঞানের ওপর, সরকারী কর্তৃপক্ষের ওপর এবং গণমাধ্যমের ওপর আস্থা ও ভরসাকে নাগাড়ে আহত করেছেন। এখন সেই দায়িত্বজ্ঞানহীন নেতারাই এই আজুহাতে একচ্ছত্র আধিপত্যবাদের রাস্তায় হাঁটবেন যে, অনুশাসন মানার ব্যাপারে জনতার ওপর মোটেই ভরসা করা যায় না।

 

 

এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার যে, অনেক বছর ধরে যে আস্থাকে তিলে তিলে নষ্ট করা হয়েছে, রাতারাতি তাকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। কিন্তু সময়টা তো এখন স্বাভাবিক নয়। সংকটের মুহূর্তে মনও খুব দ্রুত বদলে যায়। আপনার সঙ্গে আপনার ভাই বা বোনের অনেক বছর ধরে তিক্ত সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু যখন কোনো আপতকালীন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন হঠাৎই আপনারা নিজেদের অন্তরে বিশ্বাস আর উষ্ণতার এক গোপন ভাণ্ডার খুঁজে পান এবং পরস্পরকে সাহায্য করতে ছুটে যান। একটা নজরদার প্রশাসন কায়েম করার বদলে বিজ্ঞান, সরকারী কর্তৃপক্ষ এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর নতুন করে আস্থা তৈরি করার জন্য এখনও যথেষ্ট সময় আছে। আমরা অবশ্যই নিত্য-নতুন প্রযুক্তিরও ব্যবহার করব, কিন্তু সেই প্রযুক্তি নাগরিকদের ক্ষমতায়নের কাজে ব্যবহৃত হওয়া উচিত। নিজের দেহের তাপমাত্রা বা রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করাতে আমার কোনোই আপত্তি নেই, কিন্তু সেই তথ্য যেন কিছুতেই একটি একচ্ছত্র ক্ষমতাধর রাষ্ট্র তৈরির কাজে ব্যবহৃত না হয়। বরঞ্চ সেই তথ্য আমাকে আমার নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ বিষয়ে অনেক বেশি অবহিত রাখতে পারবে, এবং সরকারকে তার সিদ্ধান্তগুলোর প্রতি অধিক দায়বদ্ধ করে তুলতে পারবে।

যদি আমি ২৪ ঘন্টা আমার শরীর-স্বাস্থ্য সম্পর্কে অবহিত থাকতে পারি, তাহলে আমি অন্য লোকজনের কাছে ঝঞ্ঝাটে পরিণত হয়েছি কিনা, শুধু সেটাই জানতে পারব না, পাশাপাশি এও জানতে পারব যে কোন কোন অভ্যাসগুলো আমার স্বাস্থ্যের ওই অবস্থার জন্য দায়ী। এবং করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিষয়ে যাবতীয় তথ্যাদি যদি আমার নাগালে থাকে, এবং সেগুলো যদি আমি বিশ্লেষণ করতে পারি, তাহলে সরকার আমাকে সত্যি কথা বলছে কিনা কিংবা মহামারী প্রতিরোধে সরকার সঠিক নীতি-নির্ধারণ করছে কিনা তা আমি নিজেই বিচার করে দেখতে পারব। মনে রাখতে হবে, যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকার প্রত্যেকটি নাগরিকের ওপর নজরদারি চালাতে পারে, সেই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রত্যেকটি নাগরিকও সরকারের ওপর নজর রাখতে পারে।

অতএব এই করোনাভাইরাস অতিমারী নাগরিকতারও একটা বড় পরীক্ষা। আগামী দিনগুলিতে, আমাদের প্রত্যেককে ওইসব ভিত্তিহীন চক্রান্তের তত্ত্ব আর ধান্দাবাজ রাজনৈতিক নেতাদের বকুনির বদলে বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং স্বাস্থ্য-বিশেষজ্ঞদের কথার ওপর অধিক আস্থা জ্ঞাপন করতেই হবে। এই সঠিক বিকল্পটাকে আমরা যদি চিনে নিতে ভুল করি, আমরা আমাদের সর্বাধিক মূল্যবান সম্পদ যে স্বাধীনতা তাকেই হারাতে দেখব এবং সেটাকেই আমাদের স্বাস্থ্যকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় বলে ভেবে নেব।

 

একটা বিশ্বজনীন পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা

 

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল এই যে, জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা আর আন্তর্জাতিক সহমর্মিতার মধ্যে যেকোনো একটাকে আমাদের বেছে নিতে হবে। এই অতিমারী এবং তজ্জনিত আর্থিক সংকট দুটোই সারা বিশ্বজনীন সমস্যা। কাজেই একমাত্র আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিয়েই এই দুটি সমস্যার সমাধান সম্ভব।

এই ভাইরাসকে পরাজিত করার জন্য সবার আগে বিশ্বজুড়ে তথ্যের আদান-প্রদান খুব জরুরি। এই একটা বড় সুবিধা যা মানুষের আছে, ভাইরাসের নেই। চীনের একটা করোনাভাইরাস আমেরিকার একটা করোনাভাইরাসের সঙ্গে মানুষকে কীভাবে সংক্রমিত করা যায়, সে বিষয়ে ‘টিপস’ আদান-প্রদান করতে পারবে না। কিন্তু চিন চাইলে এই করোনাভাইরাসের বিষয়ে এবং কীভাবে তার মোকাবিলা করা যায় সেই বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক মূল্যবান পরামর্শ দিতে পারে। একজন ইটালিয়ান ডাক্তার মিলানে ভোরবেলা যে ওষুধটা আবিষ্কার করলেন তা দিয়ে সন্ধ্যাবেলা তেহরানে অনেক জীবন বাঁচানো যেতে পারে। যখন যুক্তরাজ্য কয়েকটি নীতি প্রনয়ণ করার ব্যাপারে সংশয়ে রয়েছে, তখন সে কোরিয়ার কাছে থেকে পরামর্শ নিতে পারে, কারণ কোরিয়াও হয়তো কিছুদিন আগে একই সংশয়কে অতিক্রম করে এসেছে। কিন্তু এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে হলে আমাদের সমগ্র বিশ্বব্যাপী আস্থা এবং সহযোগিতার বাতাবরণ তৈরি করতে হবে।

খোলাখুলি তথ্য আদানপ্রদানের ব্যাপারে সদিচ্ছা এবং বিনীতভাবে পরস্পরের কাছে পরামর্শ চাইবার মানসিকতাও দেশগুলির মধ্যে থাকা দরকার। এবং যে তথ্য এবং পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে তার ওপর নির্দ্বিধায় ভরসা করতে পারাটাও প্রয়োজন। ওষুধ এবং চিকিৎসা-সরঞ্জাম—বিশেষ করে টেস্টিং কিট এবং ভেন্টিলেটর—তৈরি করা এবং বিলিবন্টন করার ব্যাপারেও পৃথিবীজুড়ে একটা সার্বিক প্রচেষ্টা জরুরি। প্রত্যেকটি দেশের নিজের মত করে এগুলি তৈরি করা এবং যা সরঞ্জাম পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়ার বদলে একটি বিশ্বজনীন সমন্বয়ী ব্যবস্থায় এই উৎপাদন প্রক্রিয়াকে অনেক বেশি গতিশীল এবং জীবনদায়ী চিকিৎসা-সরঞ্জামগুলি অনেক সুষ্ঠুভাবে বিলিবন্টন করা যেতে পারত। ঠিক যেমনভাবে যুদ্ধবিগ্রহ চলাকালীন প্রধান প্রধান শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘জাতীয়-করণ’ করা হয়, একইরকম ভাবে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে জরুরি জিনিসপত্রের উৎপাদন ব্যবস্থাগুলোকে ‘মানবিকীকরণ’ করা উচিত। খুব অল্প সংক্রমণ হয়েছে এমন কোনো ধনী দেশের স্বেচ্ছায় অধিক-সংক্রমিত তুলনামূলক দরিদ্র দেশগুলোতে মূল্যবান চিকিৎসা-সরঞ্জাম পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। এবং তারও এই বিশ্বাস থাকা উচিত যে যখন তার একইরকম প্রয়োজন হবে, অন্যান্য দেশগুলি তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে।

চিকিৎসা-কর্মীদেরও একইভাবে দুনিয়া জুড়ে কাজে লাগানোর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। এই মুহূর্তে তুলনামূলক কম সংক্রমণ-যুক্ত দেশগুলি পৃথিবীর সেই সমস্ত অঞ্চলে চিকিৎসা-কর্মীদের পাঠাতে পারে যেগুলি খুবই সঙ্কটজনক অবস্থায় রয়েছে। এতে একদিকে যেমন বিপদের সময় তাদের সাহায্য করা হবে, তেমনি প্রচুর মূল্যবান অভিজ্ঞতাও সঞ্চিত হবে। পরে যদি মহামারীর কেন্দ্রবিন্দুটা সরে যায়, সাহায্যটা তখন উলটো দিকে বইতে শুরু করতে পারে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বিশ্বময় সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক অর্থনীতির আন্তর্জাতিক চরিত্র এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলগুলোর কথা ভুলে গিয়ে এবং অন্যদের কথা না ভেবে যদি কোনো সরকার শুধুমাত্র নিজেদের ইচ্ছেমত কাজ করে যায়, তার ফলে একটা সামগ্রিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে এবং সংকট গভীর হবে। আমাদের একটা বিশ্বজনীন কর্ম-পরিকল্পনা দরকার। এক্ষুনি দরকার।

যাতায়াতের ওপরও বিশ্বের সমস্ত দেশের মধ্যে একটা চুক্তি হওয়া খুব দরকার। কয়েক মাস ধরে সমস্ত আন্তর্জাতিক যাত্রী-পরিবহণ বন্ধ রাখার ফলে ভয়ঙ্কর সমস্যা তৈরি হবে এবং তাতে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইটাও ব্যাহত হবে। বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, রাজনীতিক এবং বড় ব্যবসায়ীদের মত জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত যাত্রীদের খুব স্বল্প সংখ্যায় হলেও আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করার অনুমতি দেওয়া উচিত। দেশগুলিকে এই ব্যাপারে পারস্পরিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। যাত্রীদের নিজেদের দেশেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যাত্রার অনুমতি দেওয়া উচিত, একটি বিশ্বজনীন চুক্তির মাধ্যমে কাজটা করা যেতে পারে। যদি আপনি এই মর্মে নিশ্চিত থাকেন যে যথেষ্ট সাবধানতার সঙ্গে পরীক্ষা করার পরই যাত্রীদের বিমানে ওঠার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে আর তাঁদের আপনার দেশে প্রবেশ করতে দেবার ব্যাপারেও আপত্তি থাকবে না।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই মুহূর্তে কোনো দেশের তরফেই এমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেন এই মুহূর্তে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কারোকেই যেন আজ আর সাবালক বলে মনে হচ্ছে না। বিশ্বের তাবড় নেতাদের সমবেত কর্ম-পরিকল্পনা নিয়ে একটা জরুরি মিটিং হয়ে যাওয়া উচিত ছিল অন্তত হপ্তাখানেক আগেই। জি-সেভেন নেতৃবৃন্দ অবশেষে এই সপ্তাহে একটা ভিডিও কনফারেন্স করে উঠতে পেরেছেন বটে, কিন্তু তাতেও এমন কোনও সার্বিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায় না।

 

ইতিপূর্বে যে দুনিয়াজোড়া সংকটগুলো দেখা গিয়েছিল – যেমন ২০০৮-এর আর্থিক মন্দা অথবা ২০১৪ সালের ইবোলা মহামারী – তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই গোটা বিশ্বের নেতৃস্থানীয় ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন নেতৃত্ব দেবার দায়ভার ঝেড়ে ফেলেছে। সে খুব পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে মনুষ্যত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে সে যতটা না চিন্তিত, তার থেকে অনেক বেশি যত্নবান আমেরিকার মহত্ত্ব প্রচার নিয়ে।

এই প্রশাসন তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুরাষ্ট্রগুলিকেও পরিত্যাগ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের থেকে সমস্তরকম যাত্রী পরিবহণ নিষিদ্ধ করার মত গুরুতর পদক্ষেপ গ্রহণের আগে আমেরিকার তরফে তাদের সঙ্গে একবার আলোচনা করা তো দূর, একটা আগাম নোটিশ দেবারও প্রয়োজন বোধ করা হয়নি। এমন অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উঠেছে যে, জার্মানীর একটি ফার্মাসিউটিকাল কোম্পানীকে এক বিলিয়ন ডলার ঘুষ দিয়ে কোভিড-১৯ এর একটি নতুন ভ্যাকসিনের ‘মনোপলি রাইট’ কিনে নেবার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকী এখন যদি আমেরিকার প্রশাসন তার রাস্তা বদলায় এবং একটি আন্তর্জাতিক কর্ম-পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েও আসে, খুব কম রাষ্ট্রই এমন একজন লোককে নেতা হিসেবে মেনে নিতে রাজী হবে যিনি নিজে কখনও দায়িত্ব নেন না, কখনো ভুল স্বীকার করেন না এবং যিনি প্রায়শই যাবতীয় দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে সাফল্যের কৃতিত্বটা নিজেই নিজেকে দিয়ে থাকেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে শূন্যস্থানটি তৈরি করছে, তা যদি অন্যান্য দেশ পূরণ না করতে পারে, তাহলে যে শুধুমাত্র সাম্প্রতিক এই মহামারীটা রোধ করাই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে তাই-ই নয়, এর দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়ায় আগামী অনেকগুলো বছর ধরে আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলিও বিষিয়ে যেতে থাকবে। তথাপি, প্রত্যেকটি সংকটই আসলে এক-একটা সুযোগ। আমরা অবশ্যই আশা রাখব যে, এই মহামারী অন্তত মানবসভ্যতাকে এটা বুঝতে সাহায্য করবে যে আন্তর্জাতিক অনৈক্যের ফলে কী ভয়ানক বিপদ ঘটতে পারে।

আজ মনুষ্যত্বের সামনে দুটো রাস্তা খোলা আছে। আমরা কি অনৈক্যের পথ বেয়ে আরও নীচে নেমে যাব, নাকি আমরা বিশ্বজনীন সহমর্মিতার রাস্তা ধরব? যদি আমরা অনৈক্যের পথ ধরি, তাহলে তা শুধুমাত্র সমস্যাকে দীর্ঘায়িতই করবে না, বরং ভবিষ্যতে হয়তো আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। আর যদি আমরা সহমর্মিতার পথ বেছে নিই, তাহলে শুধুমাত্র করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধেই নয়, বরং এই একুশ শতকে অনাগত সমস্ত মহামারী এবং সংকটের বিরুদ্ধেই আমাদের জয় নিশ্চিত থাকবে।

 

প্রথম প্রকাশ: ২০ শে মার্চ ২০২০, ‘দ্য ফিনানসিয়াল টাইমস’

অনুবাদ: সীমান্ত গুহঠাকুরতা

AD..

 

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়