ডাক্তার প্রতিদিন

Published:
2020-05-19 09:49:10 BdST

"লাইভ" এর প্যানডেমিক



ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ
সহযোগী অধ্যাপক
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট

 ________________________


করোনা ভাইরাস এর প্যানডেমিক এর সাথে পাল্লা দিয়ে আরো বহু কিছুর প্যানডেমিক শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়ে।

অনলাইন কেনা কাটার প্যানডেমিক; পিপিই এর প্যানডেমিক; করোনা ভাইরাস এর আশির্বাদের প্যানডেমিক; এন নাইনটি ফাইভ এর বাক্সে ত্যানার মাস্ক এর প্যানডেমিক; নিজের একটি বড় পদ বা স্ত্রীর প্রমোশনের জন্য জ্বী হুজুর বলার প্যানডেমিক; অবিস্মরণীয়-বিষ্ময়কর গবেষনার প্যানডেমিক; গণ পরিবহন বন্ধ রেখে পোশাক কারখানা খুলে দেবার প্যানডেমিক; জীবনের শেষ ঈদ জ্ঞান করে দোকানে দোকানে কেনা কাটার মাতমের প্যানডেমিক; গরম আবহাওয়া-থানকুনি আর ইথানল এর প্যানডেমিক; প্রজ্ঞাপন জারি করে বাতিল করার প্যানডেমিক; প্রণোদনার প্যানডেমিক; নিলাম এর প্যানডেমিক; চোখ রাঙানোর প্যানডেমিক আরো কত কি। কিন্তু সব কোমরবিড প্যানডেমিককে হারিয়ে দিয়ে করোনার সাথে সমানে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ফেসবুক লাইভের প্যানডেমিক।

যে যেখান থেকে পারেন, যে পেইজ থেকে পারেন, যে গ্রুপ থেকে পারেন সমানে লাইভ আর লাইভ। এর লাইভের চক্করে পরে আমাকে প্রায় প্রতিরাতেই লাইভে অংশ নিতে হয়। কোনো কোনো রাতে একাধিক ! কখনো টিভি চ্যানেলের লাইভ, কখনো প্রখ্যাত গ্রুপের লাইভ, কখনো সদ্যজাত নবীন গ্রুপের লাইভ। কখনো সাথে থাকেন বড় হোমড়া চোমড়া- যারা লাইভ আরো লাইভলি করেন । কখনো উচ্চপদস্থ কর্তা, কখনো চিকিৎসক নেতা, কখনো অভিনেতা, অভিনেত্রী, শিল্পী , গায়ক আবার কখনো লাইভে আমিই একমাত্র আলোচক। নিজের প্রোফাইল থেকে কখনো কোনো লাইভ করি নাই। সবসময়ই অনুরোধের আসরে যোগদান।
আমি একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। করোনাকালে ভাইরাসের গতি প্রকৃতি আর চিকিৎসা নিয়ে আমার বলার যোগ্যতা, এক্তিয়ার কোনটাই নেই। আমি বলা শুরু করেছিলাম করোনায় মনের যত্ন নিয়ে, করোনা-আতংকে মানসিক চাপ দূর করা নিয়ে। এরপর আজতক সমাজতত্ত্ব, মানুষের আচরণ, কার্যকরী যোগাযোগ, ঝুঁকিবার্তা, শিশুর বিকাশ, মানুষ কেন আদেশ না মেনে বাইরে যায়, কার মনোবল কমলো বাড়লো , অনলাইন ক্লাস ভালো না মন্দ, বাড়িতে বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব ভালোবাসা কেমন চলছে, করোনায় মৃতের সৎকার কেমন হবে জাতীয় আলোচনা থেকে শুরু করে মীনা রাজু আর মিঠুর সাথেও সাক্ষাৎকার দিতে হয়েছে।

লাইভে এত বার আসার কারণে আমার মুখ দেখতে দেখতে আর কথা শুনতে শুনতে পরিজন, বন্ধু আর সহকর্মীরা বিরক্ত, ক্লান্ত বা ক্ষুব্ধ। একজন জিজ্ঞেস করেছে – ‘ভাই, রোজ রোজ একই কথা কিভাবে বলেন’? উত্তরে আমি বল্লাম- ‘ভ্রাত, আমি এককথার মানুষ, রোজরোজ আমার বয়ান পাল্টাতে পারবোনা।‘ তারপরও নতুন নতুন কথা বলি। লাইভে থাকাকালীণ মনের কিছু কথা –ক্ষোভের কিয়দংশ প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে আমার নিজেরও কিছুটা মানসিক প্রশান্তি বাড়ে। লাইভ থেকে আমিও শিখি। উপস্থাপক বা উপস্থাপিকার কাছে শিখি। যাদের সাথে লাইভে আলোচনা করি- প্রায় সবাই আমার চাইতে শিক্ষায়-জ্ঞানে অনেক বড়; তাদের কাছ থেকেও শিখি। মাঝে মাঝে আমিও কিছু কথা বলে ফেলেছি যেগুলো অনেকেই গ্রহণ করেছে।উনারা সেই কথাগুলো বেশি বেশি প্রচার করছেন- যেমন “সারাদিন করোনা করোনা করবেন না” বা “আপনি ঘরে বন্দী নন, ঘরেই আপনি মুক্ত আছেন, বাইরের পৃথিবীটাই বন্দী”। লাইভ আমি উপভোগ করি। আমার কিন্তু হাজার হাজার লাখে লাখে ফলোয়ার নেই, লাইভ আর ভিডিও করার জন্য আমার কয়েকজন পরিচিত মানুষ একেবারে পেশাদার ব্যক্তিদের সাহায্য নিয়ে বাসায় লাইট-সাউন্ড ফিট করে ফেলেছেন! কেউবা স্টুডিয়ো স্টুডিয়ো আমেজ এনেছেন বাড়িতে। আমি একটি জানালার পর্দার সামনে আমার আব্বার ব্যবহৃত পুরোনো চেয়ারে বসে তার সামনে একটি মোড়ায় সেলফি স্টিক বসিয়ে কোনোমতে মোবাইলটাকে আটকাই! এরপর বকবক বকবক । আর যেহেতু করোনাকালে সকল পোশাক নিজেই ধুয়ে পরি, আয়রন করিনা তাই একটি কালো গেন্জিকে (ছোটবেলায় আমরা গেন্জিই বলতাম-এখন দেখি সবাই এটাকে বলে টিশার্ট) বারবার লাইভে ব্যবহার করতে করতে আমার লাইভের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে ফেলেছি!

লাইভে যেতে ক্লান্তি অনুভব করিনা। কিন্তু সব লাইভ যে ভালো লাগে তা নয়। কোনো কোনোটার উপস্থাপনা মানসম্মত নয়, কোথাও আলোচকরা কী বিষয়ে কথা বলবেন তাই জানেন না, একটি টিভির লাইভে সহ- আলোচক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ না হয়েও জ্ঞানী জ্ঞানী কথা বলে আমার বিরক্তি উৎপাদন করছিলেন, আরেক লাইভে তরুণ অতি উৎসাহী উপস্থাপক যে এ্যাপ এর সাহায্যে লাইভ করছিলেন তা ছিল তার জীবনে প্রথম পরীক্ষামূলক ব্যবহার আর আমি ছিলাম তার গিনিপিগ! কিন্তু হাতে সময় থাকলে আমি কাউকে মানা করিনা। প্রথিতযশা সাংবাদিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এর ডাকে আমি যেমনি লাইভে যাই তেমনি দূরবর্তী জেলা শহরের কিছু তরুণ যখন লাইভের আয়োজন করে, ঢাকায় তাদের এক বড় ভাইকে (যিনি আমারও পরিচিত) দিয়ে সলজ্জ্ব রিকোয়েস্ট করে আমাকে তাদের লাইভে নিতে চান তখন আমি তাদের ফিরাইনি। আমি মনে করি যেসকল লাইভে হাজার হাজার ‘লাইক’নাই, ‘চমতকার বলছেন ভাই-দারুন’ এই জাতীয় তোষামুদে কমেন্ট নাই সেগুলোতে অংশ নেয়াটা বেশি জরুরি।

দেশের বাইরে থেকেও লাইভ এর আয়োজনে আমাকে যুক্ত হতে হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংগালি কমুনিটির জন্য স্ট্রেস কিভাবে কমানো যায় সে বিষয়ে লাইভ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক টিভি চ্যানেল, গ্রুপ এর সাথে লাইভ, ভারতের বিশেষজ্ঞের সাথে লাইভ সবই করতে হয়েছে।

আমার লাইভের ফ্রিকোয়েন্সি দেখে আমার এক স্নেহের সহকর্মী আমার নাম দিয়ে দিল ‘লাইভ বাবা’। এই লাইভ এ যেয়ে উৎসাহ আর প্রশংসা জুটেছে অনেক। তবে নিন্দাও কম নয়। বেশি করে খেপেছে দেখি আমার বাসার মানুষজন। তারা বলে আমি নাকি সারাদিন বকরবকর করি। আর এত জোরে কথা বলি আমার নিচের তলার মানুষেরাও নাকি আমার লেকচার শুনে শুনে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। আমার স্ত্রী Tanjina Hossain বলে –"এসব লাইভে কোনো লাভ নাই। ফালতু। কেউ শোনেনা।" হয়তো ঠিক, ঠিকই ফালতু। কেউই শোনেনা। ফেসবুক একটি আজব জায়গা- ল্যানসেট জার্নাল এর এডিটোরিয়াল শেয়ার করলে- দেখে, পড়ে সাড়ে তেরো জন বন্ধু। আর বাতাবী লেবুর চাষ নিয়ে একটু স্যাটায়ার করলে তিনশজনের বাহবা! তাই লাইভ কেউ দেখে কি না-দেখে সেটা বড় কথা নয়- বড় কথা হচ্ছে এই সময় মুখ খোলা-কথা বলা। কেউ শুনুক আর নাই শুনুক বলতে আমাদের হবেই। করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে যারা থাকবে তারা জানবে – বহু মানুষ কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু বলার চেষ্টা করেছিল ! সব কিছু বলা যায় না- সবকিছু বলা হয়না। শত সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনা করেই বলতে হবে। কেউ শুনছেনা মানে কিন্তু এইনা যে কেউ শুনবেনা। বলা বন্ধ হবেনা। কথা চলবেই। যতটুকু বলা যায় –ততটুকুই বলতে হবে।

কেবল বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বজুড়ে কেবল লাইভ আর ওয়েবইনার। এত এত লাইভ দেখে আর ওয়াচপার্টির নোটিফিকেশন পেয়ে বেশিরভাগ ফেসবুক ব্যবহার কারীই ত্যক্ত বিরক্ত। আর সত্যিই কি লাইভে বকর বকর করে কোনো লাভ হয় নাকি কেবল আত্মপ্রচার ? লাইভে কি সব সত্য বলা যায়? নাকি সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ মেনে রেখে ঢেকে বলতে হয় ? লাইভে কি নতুন নতুন দর্শক শ্রোতা যুক্ত হয় নাকি একই মানুষ বারবার লাইভ দেখতে থাকে? সব প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।

আমি যেমনি লাইভে যাই তেমনি অন্যের লাইভও শুনি। আমি মানুষের ভাবনার জায়গাটা বুঝতে চাই। বাংলাদেশে এত এত লাইভ দেখে কিছু ফেসবুক সেলিব্রেটি যে হঠাৎ ভীষণ ক্ষেপে গেলেন তাদের ভাবনাটাও বুঝতে চাই। আমাজন জঙ্গলের আগুন থেকে শুরু করে লেডি গাগার গানের মর্ম পর্যন্ত সবকিছু নিয়ে তাদের চওড়া চওড়া বক্তব্য ছিল এতদিন। ফেসবুকে তাদের আছে লক্ষ লক্ষ ফলোয়ার; ‘জ্বি ভাই’, ‘সহমত ভাই’, ‘দারুন বলেছেন ভাই’। সেই ‘ভাইভজা’ ফেসবুক যোদ্ধারা কেন ক্ষেপলেন- সেটাও কিন্তু ভাববার বিষয়। লাইভের ডামাডোলে তাদের সেলিব্রেটিপনার চর্চায় মনে হয় ব্যাঘাত ঘটছে। আবার কারা কারা নাকি লাইভগুলো আর্কাইভ করে। এগুলো নাকি আমলনামা। লাইভের কথা কার পক্ষে বিপক্ষে যায় সেগুলোই নাকি ‘খতিয়ে’ দেখা হয়। আরেক চিকিৎসক বড় ভাইএর কাছে শুনলাম তিনি লাইভ থেকে বের হয়ে আসার পরও অপরদিকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হওয়ায় তিনি শুনতে পেলেন – অপরপ্রান্ত থেকে লাইভে থাকা একজন কর্তাব্যক্তি খানিকটা উষ্মাপ্রকাশ করে সেই চিকিৎসকের রাজনৈতিক পরিচয়সহ নানাবিধ বিষয় লাইভের পরিচালকের কাছে জানতে চাইছেন!

এই লাইভ এর প্যানডেমিক শুরু হবার বহু আগে একটি টিভি চ্যানেলে গিয়েছিলাম গণপিটুনিতে ঢাকায় একজন নারীর মৃত্যুর পর সেবিষয়ে আলোচনা করতে। তিন চারজন আলোচক ছিলেন। আলোচনার এক পর্যায়ে আমার কথাগুলো একজন সহআলোচকের পছন্দ হয়নি। তিনি একজন কর্তাভজা অধ্যাপক। বিজ্ঞাপন বিরতিতে তিনি আমাকে বললেন- ‘হেলাল ভাই-আপনি এত ওপেন কথা বললে আপনাকে তো টিভি টুভিতে ডাকবেনা’। আমি উত্তর দিলাম- ‘ভাই, আমার মূল পেশা ডাক্তারি –মাঝে মাঝে টেকনিক্যাল কথা বলতে টিভিতে আসি। না ডাকলে নাই । যাদের মূল পেশাই টকশো- তারাই টিভি-টুভিতে ডাকাডাকি নিয়া চিন্তা করে’ । বিজ্ঞাপন বিরতির পর তিনি কেমন যেন ম্রিয়মান হয়ে গেলেন।

আমার পেশা কিন্তু লাইভ করা না, ফেসবুকিং করা না। করোনা কালে আমি নিয়মমাফিক আমার কর্মস্থলে যাই, অনলাইনে-অফলাইনে আমার ছাত্রদের ক্লাস নেই । সরকারী আদেশে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের আইসিউতে যেয়ে কোভিড -১৯ রোগী দেখে এসেছি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনা বিষয়ক গাইডলাইন/ প্রচারণা টেমপ্লেটের কমপক্ষে ১০ টিতে আমার অংশগ্রহণ আছে। (সেগুলিও আসলে কেউ পড়েনা !) টেলিফোনে , হোয়াটসআ্যাপে আমার রোগীদের সাধ্যমত বিনা ফীতে সেবা দেয়ার চেষ্টা করি, করোনাকালে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে একাধিক গবেষনায় সহযোগী হিসেবে রয়েছি। কেবল আমার ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ আছে। সেই ব্যক্তিগত চেম্বারের সময়টিতে লাইভ করি।

বদরের যুদ্ধ থেকে সাইবার ক্রাইম পর্যন্ত আমি সর্ববিষয়ে পন্ডিত নই। আমি মানসিক স্বাস্থ্য আর শিশুর সোশিয়ো ইমোশনাল বিকাশ নিয়ে বলে এসেছি। মানুষের সামাজিক আচরণ আর ঝুকিঁবার্তা নিয়ে বলে এসেছি। আরো বলবো। বলতেই থাকবো।

‘Live’ সবসময় লাইভই থাকবে!

________________

AD..

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়