রাতুল সেন

Published:
2020-05-18 12:39:08 BdST

একটি সড়ক দুর্ঘটনার ইতিবৃত্ত





ডাঃ সুকুমার সুর রায়
__________________________

সত্যি সত্যিই দুর্ঘটনা ঘটে গেল। সেই দুর্ঘটনার শিকার হলাম আমি নিজে!

দুর্ঘটনা ঘটবেনা কেন? প্রতিনিয়ত জার্নি করতে থাকলে, এবং দেশে প্রতিদিন ২/৪ টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটতে থাকলে ; আপনার ভাগ্যে স্বাভাবিক ঐকিক নিয়মে দুর্ঘটনা দুর্ঘটনা ঘটবে,এইটিই স্বাভাবিক ঘটনা।

তখন ১৯৮৫ সালের মাঝামাঝি সময়। চাঁদপুর জেলায় একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রথম বারের মত চাকুরী জীবনের শুরু হয়েছিল।
চাকুরীর ধরনটিও আবার ডাইনামিক গোছের ছিল। প্রতিদিন কম করে হলেও ৪০/৫০ কিলোমিটার জার্নি করতে হতো। তবে সুখের বিষয় এই যে, জার্নি করতে হতো নৌপথে। স্পিডবোটে চেপে মেঘনা - ধনাগোদা নদী দিয়ে ছুটতে হতো প্রজেক্টের সুপারভাইজারি কাজে। মাস চারেক এইরকম ডাইনামিক কাজের মাঝেই জানা গেল যে, সদাশয় সরকার আমাদের ব্যাচের ডাক্তারদের এডহক চাকুরিতে নিয়োগের জন্য প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

তখন আবার শুরু হল ঢাকায় দৌড়াদৌড়ি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, থেকে আবার দৌড়াতে হল রাজশাহী, রংপুর পর্যন্ত।

এরপর পোষ্টিং অর্ডার হল চৌহালি উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে । বাড়িতে আসতে হল। তারপর ক্ষ্যাতা কাপড়ের বোচকা নিয়ে লঞ্চে চেপে, যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে কর্মস্থলে যোগ দিতে হল।

নতুন চাকুরীতে যোগ দিয়ে মনে হলো, যাক্ বাবা! হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এবার হয়তো নিরিবিলি কর্মস্থলে দৌড়াদৌড়ির অবসান হল।
কিন্তু না ; অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে যায়।
কয়েকদিনের মধ্যেই ঢাকা যাওয়ার হুকুম হল। সেমি অফিসিয়াল কাজে উপজেলা চেয়ারম্যানের সাথে স্পিডবোটে চেপে ধলেশ্বরী নদীর পথ ধরে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছুটে চললাম।
সাভারের অদুরে নয়ারহাট ঘাটে স্পিডবোট রেখে গাড়িতে ঢাকায় চলে গেলাম।

ঢাকার কাজ শেষে ফেরার পালা।
কথা ছিল আমার মত আমি পরদিন সকালে বাস ধরে নয়ারহাট ঘাটে পৌছে যাবো।

সাইয়েন্স ল্যাবের মোড় থেকে ধামরাই গামী একটি মুড়ির টিন মার্কা মিনি বাসে চেপে বসেছিলাম । মুড়ির টিন মার্কা হলে কি হবে!? দেখলাম বাসের গায়ে স্পষ্ট বাংলা অক্ষরে বিপদ থেকে উদ্ধারের দোয়া লেখা আছে -- " লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্তি কুন্তু মিনাজ্জোয়ালেমিন "।

সাইয়েন্সল্যাব এর মোড় থেকে ছেড়ে, মিনিবাসটি যেন আগে পিছে শিল পাটার মশলা পেষার মত ঘষাঘষি করতে লাগলো। এক গজ এগিয়ে আবার তিন গজ পিছিয়ে আসতে লাগলো। হেল্পারের কান ফাঁটানি চিৎকার সমানে চলতে লাগলো। -- এই ধামরাই, ধামরাই, ধামরাইএর ফাস্ট টিপ! ফাস্টটিপ চইল্যা গ্যালো।।ডাইরেক্ট ধামরাই! আসল গেটলক ধামরাই! ২০ মিনিটে ধামরাই! ছাইড়া গেলো, ধামরাই ছাইড়া গ্যালো!!
উচ্চঃস্বরে চিৎকারের পাশাপাশি মুড়ির টিনের গায়ে সমানে ধমাধম থাপড়াতে লাগলো।
এসব বিষয়ে আমার কোন বিকার নাই।
ড্রাইভারের হাতের বাঁয়ে, সিট কভারের বাম পাশে যে লম্বা এক ফালি সিট থাকে, সেখানে আমি বসে পড়লাম। আরো একটু নিশ্চিত হলাম , " মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন" এই রকম কিছু লেখা নাই দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম!

মিরপুর রোড ধরে গড়াতে গড়াতে জোরে জোরে থাপড়াতে থাপড়াতে প্যাসেঞ্জার উঠানো হতে লাগলো।
একসময় ছোট্ট মিনিবাসের মধ্যে তিলধারণের জায়গা আর অবশিষ্ট রইলো না।
যাত্রীদের মাঝে অসহিষ্ণুতা দেখা দিল।
কার পায়ে কার জুতার পাড়া লাগলো! কার মাথায় কার কনুইয়ের গুঁতা লাগলো এসব নিয়ে মৃদু গুঞ্জন উঠলো।
তবে বোঝা গেল, সবাই ধামড়াইয়ের অফিস যাত্রী এবং ডেইলী প্যাসেঞ্জারি করে অভ্যস্ত।

গাবতলি বাসটার্মিনাল ছাড়তেই বাসের গতি রকেটের মত বেড়ে গেলো। হেল্পারের থাপড়ানিও সমান গতিতে চলতে লাগলো ; অফিস টাইমে পৌছানোর জন্যে সময়ের মেকআপ দিতে হবে তো!

সেই আমলের ঢাকা আরিচার রাস্তা ছিল সিঙ্গেল রাস্তা।
জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকা পার হয়ে গিয়েছিলাম ।
পেছন থেকে একটি দূরপাল্লার বিআরটিসির বাস অনবরত হর্ন বাজিয়ে সাইড চাচ্ছিলো।
আমাদের হেল্পার মশাই অনবরত থাপ্পড় বাজিয়ে সাইড না দেওয়ার পক্ষে জোড়ালো অবস্থান জানান দিচ্ছিলো।
আমাদের ড্রাইভার ঠিক কোন পক্ষে তার মতিগতি বোঝা যাচ্ছিলো না।
বাস চলছিল দ্রুত গতিতে এবং প্রচন্ড দুলুনি হচ্ছিল। যাত্রিরা ভীতসন্ত্রস্ত হলেও টাইমলি অফিসে পৌছানোর আশায় কেউই মুখ খুলছিল না।
এমন সময় সামনের দিক থেকে একটি তেলবাহী ট্যাংকলরী ছুটে এলো।
সেই ট্যাংকলরীকে জায়গা দেওয়ার জন্য ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে, আমাদের ড্রাইভার বাম দিকে চেপে এলো!
একই মুহুর্তে বিকট হর্ন বাজাতে বাজাতে পেছনের বিআরটিসির বাসটি ডান দিক দিয়ে মুখ বের করে দিয়ে এক সমান্তরালে চলে এলো।!
ড্রাইভারের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম যেন তার দুই চোখ বড় বড় হয়ে গেছে! ক্কড় ক্করাত্ শব্দ করে তিনি কঠিন ব্রেক কষলেন। কিন্তু ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গেছে!
আমাদের সামনের বাম পাশের চাকা রাস্তা ছেড়ে খাদের মাঝে চলে গেছে!
তারপর আস্তে করে বাসটি কাঁত হয়ে বাম দিকে গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
প্রথমে মনে হল, কারা যেন হুমড়ি খেয়ে আমার গায়ের উপরে পড়ে গেল! পরক্ষণেই যেন আমি আবার তাদের উপর গিয়ে পড়লাম, তারপর আবার তাদের নীচে পড়ে গেলাম। এইবার মনে হলো শরীরের উপরে ভারী কিছু চেপে বসলো। ভারী চাপে অনুভব হল বুকের পাঁজর ভেঙে যাবে হয়তো!
চারিদিক থেকে আল্লাহ! আল্লাহ!, লাইলাহা ইল্লাল্লাহু! শব্দ কানে ভেসে আসতে লাগলো !
আমার শুধু একবারই মনে হলো _ " নির্ঘাত মরেই গেলাম!! "
যখন হুঁশ হল, দেখলাম - কোমর সমান জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি!
বুঝলাম, বাস রাস্তার পাশে খাদের মধ্যে পড়ে গেছে ! বাস আস্তে আস্তে খাদের জলে ডুবে যাচ্ছে! বাসের মধ্যে থেকে খুব তাড়াতাড়ি বের হতে না পারলে নির্ঘাত মারা যাবো।!
যেন অন্ধের মত হাঁতড়াতে হাতড়াতে জানালার ভাঙা কাঁচে হাত বিঁধে গেলো।
তখনই মনে হল, এতো ভাঙা জানালা!!
মাথা ঝাঁকি দিয়ে দিক ঠিক করলাম ।
দরজার অবস্থান খুঁজে পেতেই দেখা গেল - সবাই এক যোগে দরজা দিয়ে বের হতে চেষ্টা করছে। কিন্তু দরজা প্রায় জলে ডুবে আছে । ঠেলাঠেলি করে লোকজন জলের মধ্যে সাঁতরে বের হচ্ছে!
ঠিক সেই সময় আমার হক্কত করে মনে হলো - আরে! ড্রাইভারের সিটের পাশেতো একটা দরজা আছে! সেখান দিয়েতো বের হওয়া যাবে।
ড্রাইভারের দরজার কাছে গিয়ে দেখলাম, হ্যাঁ, ড্রাইভারের দরজা হাট করে খোলা এবং বাম দিকে কাত হয়ে আছে। চারিদিক থেকে লোকজন এগিয়ে এসেছে।
দরজা দিয়ে লাফ দিবো! ঠিক সেই সময় হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমার কাছে একটি ছোট ট্রাভেল ব্যাগ ছিল! মনে হলো, বেঁচে যখন আছি তখন ব্যাগটা নিয়ে যাবোনা কেন!?
নিজের সিটের কাছে গিয়ে জলের মধ্যে হাঁতড়ে হাঁতড়ে ব্যাগটা টেনে তুললাম।
আবার ড্রাইভারের দরজার কাছে গিয়ে এক উদ্ধারকারী মানুষের হাতে ব্যাগটি দিয়ে নিজেও সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে কোমর পানির মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। অনতিবিলম্বে উদ্ধারকারী ভাইয়ের কাছ থেকে নিজের ব্যাগটি ছিনিয়ে নেওয়ার মত করে টেনে নিয়ে, পাহাড় বেয়ে ওঠার মত খাদের নীচে থেকে মহাসড়কে উঠে এলাম।
নীচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের মুড়ির টিন খাদের জলে অর্দ্ধনিমজ্জিত অবস্থায় শুয়ে আছে।!
কেউ একজন বলল, একজন মানুষ মারা গেছে! তার মাথা ও কান দিয়ে রক্ত ঝরছে!
একজনের হাত, আরেকজনের পা ভেঙে গেছে!
রাস্তায় অনেক মানুষ ও গাড়ি জমায়েত হয়ে গেছে!
এতক্ষন পর - ভয়ে, আতংকে, উদবেগ, উত্তেজনায়, আমার হাত পা কাঁপতে লাগলো !!।।

AD...

 

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়