Ameen Qudir

Published:
2020-04-09 10:46:48 BdST

করোনা প্রস্তুতিতে যা করা উচিত ছিল আর যা হয়েছে


লেখকের ছবি। সংগৃহীত।

ডেস্ক
__________________

করোনা প্রস্তুতিতে যা করা উচিত ছিল আর যা হয়েছেঃ শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখেছেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী ডা. অভিষেক ভট্টাচার্য । লেখাটি জনস্বার্থে প্রকাশ হল।

 
যা হয়েছেঃ
======
ডিসেম্বর মাসে যখন উহানে করোনা আউটব্রেক করে তখন মূলত আমরা ঘুমাচ্ছিলাম। ভাবাছিলাম এটা নিপাহ ভাইরাস জাতীয় কিছু একটা হবে। আমরা আই ই ডি সি আর এর গবেষক টিম পাঠিয়ে সেটাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসব। জানুয়ারীতে যখন তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়ানো শুরু করল তখন আমাদের সমাজের কিছু সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করার অভিপ্রায়ে লিপ্ত লোকজন লাইভে এসে মানুষ কে বোঝাতে লাগল ২৩ ডিগ্রীর উপর করোনা ছড়ায় না, তরুনদের করোনা ছড়ায় না, মুসলিম দেশে করোনা আসবে না, চাইওনিজরা বাদুড়-সাপ-ব্যাং খায় তাই করোনা হয়েছে আমাদের হবে না। কপাল গুণে এসব কথা যে শুধু সাধারণ অশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত মানুষ বিশ্বাস করেছে তা নয় বরং নীতি নির্ধারকদের অনেকেও এসব বিশ্বাস করে বসে আছেন। যাই হোক বিশ্ব ব্যাপী করোনা আক্রান্তের গতি যখন শনৈ শনৈ বৃদ্ধি পেতে থাকল তখন আমাদের নীতি নির্ধারকেরা লোক লজ্জার কারণে নিজেরা কিছু মিটিং সিটিং করতে থাকলো আর তাতে চা নাস্তা সমানে চলতে থাকলো। মার্চ মাস আসতেই সেই নীতি নির্ধারকেরা আমাদের কিছু সুখবর দিলেন । তাঁর আগে আই ই ডি সি আর নামক একটি রঙ চয়েস কে চালু করা হল জনগণ কে বোঝাতে যে আমরা বিষয় টা নিয়ে কন্সারন। তারা প্রতিদিন টিভির সামনে এসে আমাদের দেখাতে লাগল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনা আক্রান্তের ও মৃতের পরিসংখ্যান; যা এদেশের পাবলিকের খাইতেও গায়ে লাগে না, গায়ে দিতেও লাগে না। তাহলে উদ্দেশ্য ছিল একটা ই জনগণ কে বোঝানো আমরা আসলে ব্যাপারটা নিয়ে গভীর ভাবে কাজ করছি। আপনার চিন্তা করবেন না। যাই হোক তাঁর ই প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে আমরা প্রথম জানতে পারলাম আমাদের মেগা প্রস্তুতির কথা মানে আমাদের করোন প্রস্তুতি ইউরোপের অনেক দেশ থেকেই ভাল। (দুঃখজনক হচ্ছে এ ধরণের কথা আপনার পাবলিক হেলথ সেন্স নিয়ে প্রকাশ্য প্রশ্ন ছুড়ে দেয়)। যাই হোক, অবস্থান থেকে সরে আসতে বেশী দিন সময় লাগলো না। সম্ভবত ৮ মার্চ প্রথম রোগী ডিটেক্ট হয়। তারপরে এক মাসে যাবার আগেই আমরা জানতে পারলাম ওসব প্রস্তুতি ফস্তুতি (ইউরোপের চেয়ে ভারী) সব ফাকা বুলি। কারণ তখন বেছে বেছে করোনা টেস্ট করা হচ্ছে। কেননা মাত্র ৫৪৩ কীট নিয়ে আমরা এসব ভাল প্রস্তুতির দাবী করেছি।তবে একটি ভাল কাজ হয়েছিল। ৫০০ সদস্যর একটি জাতীয় কমিটি করা হয়েছিল। কিন্তু সে জাতীয় কমিটির পুরোধা হিসাবে রাখা উচিত ছিল পাবলিক হেলথ স্পেশালিস্টদের । কিন্তু রাখা হয়েছে কাদের এবং এটা কতটা কারযকরী হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আরো শুনবেন? অনধিক ৫০০ আই সি ইউ বেড (সম্ভবত ২৪৩ পুরো দেশে) নিয়ে আমরা এসব রাজা উজির মেরেছি। যেখানে হাজার হাজার আইসিইউ বেড নিয়ে ইউরোপের দেশ গুলো হিম শিম খাচ্ছে। এখন তাহলে আমাদের সক্ষমতা জনসম্মুখে নগ্ন হয়ে গেল। তাহলে বাকী থাকে কি। উপায় কি। এখন দোষ কাকে দেওয়া যায়। মিডিয়ার হাতে আছে মোক্ষম উপায়। ডাক্তারদের বিরুদ্ধে লিখে লিখে তারা এদেশের জনগণ কে বিষিয়ে মোটা মুটি একটা পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তাহলে সেই পুরানো অস্ত্র টাই ব্যবহার করা যায়। নাহলে পাবলিক ত নীতি নির্ধারকদের গায়ে আর জামা কাপড় রাখবেনা যারা এতদিন ইউরোপের চেয়ে ভাল প্রস্তুতির আফিম গিলিয়েছে।


এখন আসি আমরা কি করতে পারতামঃ
=====================
১) জানুয়ারী মাসেই আমাদের একটা মেগা প্রজেক্ট হাতে নেওয়া উচিত ছিল যার প্ল্যানিং ও ইনিসিয়েশন ফেইস এ দেশের প্রথিত যশা পাবলিক হেলথ স্পেশালিষ্ট, প্রশাসক, যৌথ বাহিনী,মিডিয়া, ব্যবসায়ী নেতা, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক, আলেম ওলামা সহ সমাজের স্টেকহোল্ডারদের সকলকে অন্তুরভুক্ত করে।
২) প্রজেক্ট হবে দেশের সব বিভাগীয় শহরে একটি বিল্ডিং নির্ধারণ করে দ্রুত অস্থায়ী করোনা হাসপাতাল করা। কমপক্ষে ১০ লাখ পিসি আর কিটস/ পিপিই/ আমদানী করে মজুত রাখা।
৩) কমপক্ষে ৩৫০০ আইসোলেটেড আই সি ইউ বেড প্রস্তুত করা যা শুধু ক্রিটিক্যাল করোনা রোগী ভর্তির জন্য ব্যবহৃত হবে। অর্থাৎ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত আই সি ইউ রোগীর সাথে করোনা রোগী রাকাহ যাবে না। (যে কারণে বর্তমানে ক্রিটিক্যাল করোনা রোগী গুলো মারা যাচ্ছে।)
৩) হাসপাতালের কাজ শেষ হয়ে গেলে কমপক্ষে ৫০ জন ডাক্তার সহ অন্যান্য জনবল বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ডেপুটেশনে নিয়োগ দেওয়া। আর যারা এখানে কাজ করবেন তাঁদের স্পেশাল প্রণোদনা, স্বাস্থ্য বীমা সহ পরবর্তী প্রমোশন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা।
৪) এরপর মিডিয়া, ধর্মীয় নেতাদের কাজে লাগানো প্রচারের ক্ষেত্রে যাতে করোনার উপসর্গ মানে জ্বর-সর্দি-গলা ব্যাথা-কাশি এসব থাকলে যে কোন রোগী প্রথমে করোনা বিভাগীয় হাসপাতালে চিকিতসা নিতে আসবে যেখানে ব্যাংকের এটি এম বুথের মত একটা বুথ থেকে স্যাম্পল কালেকশন করা হবে (কোরিয়া মডেল যা কেরালা তেও শুরু হয়েছে)। ৩-৪ ঘন্টার ভেতরে রিপোর্ট আসলে তখন যদি করোনা পজিটিভ হয় তবে সে ওই হাসপাতালে ভর্তি হবে আর না হলে সে রোগী অন্য যে কোন হাসপাতালে তাঁর পছন্দ মত চিকিতসা নিতে পারবে (সরকারী-বেসরকারী)।
৫) জাতীয় সমন্বয় কমিটি পাবলিক হেলথ স্পেশালিষ্ট রা যখন লক ডাউন করতে বলবে তখন তা বাস্তবায়ন করবে পুলিশ। এর আগে একদিন পর্যন্ত যারা ঢাকা ছাড়তে চায় তাঁদের চলে যেতে বলা হবে। এক্ষেত্রে ভূমিকা নেবে ট্রান্সপোর্ট ও শ্রমিক নেতারা ও রেল্পথ/নৌপথ/বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়। এই সমন্বয় কমিটির হাতে সব ক্ষমতা দিতে হবে যাতে অন্যান্য ডিপার্টমেন্ট যেমন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কল কারখানা তাঁদের ডিসিশান ছাড়া খোলা রাখতে না পারে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ী নেতারা/বাণিজ্য /শিল্প মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। আর এর লাভ ক্ষতি, সরকারী প্রণোদনা কিভাবে ঠিক করা হবে তা নির্ধারণ করবেন অর্থনীতি বিদ রা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কবে থেকে বন্ধ হবে এবং হলে সেক্ষেত্রে পাঠ দান কিভাবে হবে তাঠিক করবেন শিক্ষহ/শিক্ষা/বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্তণালয়। একজিকিউশন ফেইজে আইন না মানলে কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা ঠিক করবে স্বরাষ্ট্র/ সামরিক ও আইন মন্ত্রণালয়। প্রত্যকটা মন্ত্রণালয় তাঁদের কাজের জন্য সমন্বয় কমিটির কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। সমন্বয় কমিটির কো অরডিনেশন করবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আর কার্যক্রম প্রচারে সাহায্য করবে তথ্য মন্ত্রণালয়।
৬) প্রতিদিন মিডিয়ার কাছে ব্রিফ করবেন জাতীয় সমন্বয় কমিটির একজন মুখপাত্র যিনি পিপল, লীডারশীপ পারফরম্যান্স এ সিদ্ধহস্ত। টিম ওয়ারকে যিনি কো অরডিনেটরের ভূমিকা পালন করেন ও যিনি শব্দচয়নে ডিসেন্ট। প্রশাসন থেকে এ ধরণের লোক ঠিক করা উচিত।
৭) জাতীয় সমন্বয় কমিটির একটা ২৪ ঘন্টা কন্ট্রোল রুম থাকবে যারা উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সকল ইউ এন ও / স্বাস্থ্য প্রশাসকদের কার্যক্রম মনিটরিং করবেন ও তাঁদের সমস্যা সমাধানের দ্রুত প্রচেষ্টা করবেন। এছাড়া জনসাধারণের জন্য একটি পৃথক কন্ট্রোল রুম (যেখানে তারা অভিযোগ জানাবে) নূযনতম ২৫ টা নাম্বার সহ খুলতে হবে ও প্রত্যকটার ভয়েস রেকরডিং হবে। সেখানে কোন অপ্রয়োজনীয়/উত্যক্তকারীর কল আসলে সাথে সাথে পুলিশ প্রশাসন তা ব্যবস্থা নেবে।
৮) পুরো কার্যক্রম চলবে মেগা প্রজেক্টের একজিকিউশন ফেইজে। তাই টাইম এস্টিমেট ও বাজেট কস্ট আগেই ঠিক করে সরকারের কাছে চাহিদা পত্র দিতে হবে।
৯) বেসরকারী হাসপাতাল্গুলো কে এই কমিটির মনিটরিং এর আওতায় আনতে হবে। যতে কোথাও মিস ম্যানেজমেন্ট না হয়।
১০) বিষেষজ্ঞ প্রাইভেট চেম্বার গুলো টেলিফোন কনফারেন্স (অস্ট্রেলিয়া মডেল) ব্যতীত বন্ধ রাখতে হবে। কেউ তথ্য গোপন করলে তাকে কমপক্ষে ৫০০০০ টাকা ফাইন করতে হবে।
আমার কাছে মনে হচ্ছে এ কাজগুলো মিনিমাম করা গেলে আমরা এ পরিস্থিতি ভালভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম।
ডা অভিষেক ভট্টাচার্য
হেলথ সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়া
এডিলেইড, অস্ট্রেলিয়া।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়