Ameen Qudir

Published:
2019-11-16 19:50:08 BdST

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ডা. মোহিত কামালের নির্বাচিত গল্প চড়


 

 

ডা. মোহিত কামাল
বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের
শীর্ষ জনপ্রিয় লেখক
অধ্যাপক , পরিচালক
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনিস্টিটিউট , ঢাকা
_________________________


মধ্যরাত পেরিয়ে যাচ্ছে।
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মেডিকেল ফ্যাকালটির ল্যাবরেটরিতে এখনও লাইট জ্বলছে। এয়ারকুলার চলছে। পিনপতন নিস্তব্ধতা জমে আছে রুমজুড়ে।
মুখে মাস্ক, কপাল জুড়ে সাদা ক্যাপ এবং গাউন পরে চুপচাপ বসে আছেন জিন বিজ্ঞানী ড. জেরি এল হল।
তাঁর কপালের শিরা দপদপ করছে। মাস্ক ও টুপির মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে থাকা চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। পরম বিজয় প্রাপ্তির নিশ্চয়তা জেনেও সংশয় কাটছে না ড. জেরির, বারবার তাঁর চোখ স্থির হচ্ছে ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপের ভিজ্যুয়াল স্ক্রিনের ওপর।
কিছুক্ষণ আগেই একটি মানবভ্রূণকে তিনি তিন অংশ বিভক্ত করেছেন। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে স্থাপন করেছেন ফলাফল দেখার জন্য। মাইক্রোস্কোপের ইন্টারপ্রিটেশনের ফলে যে রেজাল্ট বেরিয়ে আসছে তা দেখে তার চোখে ধাঁধা লেগে যাচ্ছে।
তিনি দেখতে পাচ্ছেন মূল ভ্রূণের প্রতিটি খণ্ডিত অংশই একেকটি আলাদা আলাদা ভ্রূণে রূপান্তরিত হয়েছে, একই চরিত্র ধারণ করেছে। মূল ভ্রূণের মতোই একই রূপ-বৈশিষ্ট্য বহন করছে, একই ক্রোমোজম এবং জিনের সম্পূরক অংশ সমানভাবে ভাগ হয়েছে।
চোখ সরিয়ে নেন ড. জেরি। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। সহকর্মীদের প্রায় সবাই চলে গেছে। কেবল জুনিয়র সহকর্মী মাইকেল নিবিষ্ট মনে কাজ করে যাচ্ছে।
মাইকেল! উত্তেজিত স্বরে ডাক দেন তিনি।
মাইকেল ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। চমকে ওঠে। বসের চোখে অনির্বচনীয় আনন্দস্রোত দেখতে পায়। উঠে, কাছে আসে।
দেখো, মাইক্রোস্কোপে রেজাল্ট দেখো! বিজয়সূচক ধ্বনি ড. জেরির মুখে।
তড়িঘড়ি করে মাইকেল মাইক্রোস্কোপের ফলাফল দেখতে শুরু করে। দেখে কতক্ষণ। হঠাৎ সোল্লাসে লাফিয়ে ওঠে। উল্লসিত কণ্ঠে বলে, বিজয় আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, স্যার।
হ্যাঁ বিজয়ই এটি। তবে এ বিজয় আমাদের নয়, বিজ্ঞানের। এ বিজয় অনেক সমস্যাও ডেকে আনতে পারে।
বুঝলাম না। মাইকেল ভুরু কুঁচকে নিজের আবোধ্যতার কথা জানায়।
শোনো, আমরা ভ্রূণ ব্যাংক করব। প্রয়োজনীয় ভ্রূণ কিংবা ভ্রূণাংশ থেকে সৃষ্ট নতুন ভ্রূণ সংরক্ষণ করব। ক্লায়েন্টরা পছন্দমাফিক ভ্রূণ নিয়ে নিজেদের জরায়ুতে স্থাপন করে অভিন্ন সন্তান লাভ করতে পারবে। অভিন্ন অসংখ্য সন্তান লাভের ফলে চারদিকে বিশৃঙ্খলা লেগে যেতে পারে। লোকালয়ে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে পারে।
তাহলে? আমাদের গবেষণা কি বিফলে যাবে? মাইকেলের উদ্বিগ্ন প্রশ্ন।
অস্থিরতার কিছু নেই। গ্যাঞ্জাম কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় সে চেষ্টা চালাতে হবে। তা ছাড়া আমাদের আবিষ্কার সুফলও বয়ে আনবে।
কীভাবে?
ধরো, আমাদের প্রক্রিয়াতে জন্মলাভ করা কারও সন্তান দুর্ঘটনা কিংবা রোগেশোকে মারা গেল, ভ্রূণ ব্যাংক থেকে অভিন্ন ভ্রূণ সংগ্রহ করে ওই মায়ের জরায়ুতে স্থাপন করে আবার একই ধরনের সন্তান লাভ করা যাবে। অর্থাৎ যে সন্তানটি মারা গেল, হুবহু একই রকম আরেকটি সন্তান পাওয়ার নিশ্চয়তা থেকে গেল।
এর ফলে কি জীবন-সংসারে মায়া-মমতার ঘাটতি দেখা দেবে না? সন্তানের প্রতি বাৎসল্য কমে যাবে না? পিতৃত্ব নিয়ে টানাপড়েনের সৃষ্টি হবে না?
ড. জেরি একটু চিন্তিত হন। চুপ হয়ে যান। কোনো জবাব না দিয়ে মাইক্রোস্কোপের দিকে মনোনিবেশ করেন।
মাইকেলের অস্থিরতা বাড়ে। আনন্দ ও অস্থিরতা মিলেমিশে তাকে বেপরোয়া করে তোলে। নিজেদের আবিষ্কারের সপক্ষে যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা চালায়।
স্যার, ঝামেলার কিছু নেই। সব স্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন। এখন তো বীর্য-ব্যাংক এবং ডিম্ব-ব্যাংক চালু হয়েছে। বহু অক্ষম দম্পতি এসব ব্যাংক থেকে ডিম্ব ও শুক্র কিনতে পারছে, টেস্টটিউবে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে সন্তান লাভ করতে পারছে।
হ্যাঁ, পারছে বৈকি। তবে তারা তো আগে থেকে জানতে পারছে না তাদের সন্তানটি কেমন হবে। বিল ক্লিনটন হবে, নাকি সাদ্দাম হবে, নাকি ম্যারাডোনা হবে? নাকি বুদ্ধির ঢেঁকি মার্কা কেউ একজন হয়ে সোশ্যাল সমস্যা বাড়িয়ে তুলবে?
কিন্তু স্যার, অধ্যাপক কলিন ম্যাথুস নির্ণয় করতে পেরেছেন পুরুষ শুক্রাণু নারী শুক্রাণুর চেয়ে ছোট। তা ছাড়া ডা. অ্যালেনরোজ ও ডা. পিটার লু একধরনের উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করে বেশিসংখ্যক ডিএনএধারী অতি উজ্জ্বল স্ত্রী শুক্রাণুগুলো আলাদা করতে পেরেছেন। সুতরাং ডিম্বকোষের সঙ্গে ইচ্ছেমত পুরুষ শুক্রাণুর মিলন ঘটিয়ে দম্পতিরা ছেলেসন্তান লাভ করতে পারবে।
তারা এ ক্ষেত্রে প্রজননের আগেই সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ করে নিতে পারবে ঠিকই, তবে অভিন্ন সন্তান তো পাবে না। তা ছাড়া এখানেও সমস্যা রয়ে যাচ্ছে। এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে যে একজন মেয়ের পেছনে ৫০ জন ছেলে ঘুরঘুর করছে, কেউই পাত্তা পাচ্ছে না।
তখন কি আবার দম্পতিরা ডিমান্ড অনুযায়ী মেয়ে-সন্তান জন্ম দিয়ে ব্যালান্স করে নিতে পারবে না? মাইকেলের আত্মপক্ষ সমর্থন।
পারবে ঠিকই। ততদিনে আমাদের আবিষ্কার থেকে রমরমা ব্যবসা শুরু হয়ে যাবে। ডুপ্লিকেট মেয়ে কিংবা ছেলেসন্তানের বেড়ে যাওয়ার কারণে মহা ফ্যাসাদ সপ্তমে উঠে যাবে। সে ক্ষেত্রে সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে হবে সে বিষয় গৌণ হয়ে পড়বে।
ড. জেরি হল চিন্তিত মুখে কথা শেষ করে আবার যোগ দেন কাজে। কী করবেন বুঝতে পারছেন না, একদম চুপ হয়ে যান। তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে উদ্রেক সঞ্চারিত হচ্ছে দ্রুত। একটা উসখুস ভাব তিড়বিড় করে তাঁর চিন্তাশক্তিকে আলোক-গতিতে সম্মুখে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, তিনি যেন মুহূর্তের মাঝে ত্রিশ বছর টপকিয়ে হাজির হয়েছেন ২০২৬ সালে।
ড. জেরির চোখ যেন কৃত্রিম উপগ্রহের বিশালাকৃতির ক্যামেরাতে পরিণত হয়েছে। সারা বিশ্ব তিনি দেখে নিচ্ছেন, আনাচে-কানাচে কী ঘটছে না ঘটছে, সবই তিনি দেখতে পাচ্ছেন।
হঠাৎ চোখ স্থির হলো বাংলাদেশের ঢাকা শহরের দিকে, একটি জীবন্ত দৃশ্যের ওপর তাঁর চোখ এসে ফ্রিজ হলো :
স্কুটারে বসে আছে ময়ূখ।
বারবার রিস্টওয়াচ দেখছে। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে অথচ সামনে ট্রাফিক জ্যাম। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট থেকে শাহবাগ মোড় পর্যন্ত রাস্তাটি বেশ চওড়া। চওড়া হলেও ভিড় বেশি শিশুপার্কের কাছে। রাস্তার ওপর এলোমেলো দাঁড়িয়ে আছে রিকশা, ট্যাক্সি, গাড়ির বহর এবং বিভিন্ন প্রকার ফেরিওয়ালা ফলে জ্যাম।
বিকেল পাঁচটা বেজে গেল। অথচ সাড়ে চারটা থেকে এলিফ্যান্ট রোডে ‘বাটা বাজারের’ভেতরে অপেক্ষা করার কথা মিশিতার।
অস্থির হয়ে ওঠে ময়ূখ। নিশ্চয় মিশিতা এতক্ষণে রেগে টানটান হয়ে আছে। কোথাও কারও জন্য অপেক্ষা করার যন্ত্রণা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানে।
শম্বুকগতিতে ভিড়ের ফাঁকে ফাঁকে স্কুটার এগিয়ে চলেছে। শাহবাগ মোড় পার হওয়ার পর ময়ূখ হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। তবে টেনশন তার বেড়েই গেল। মনে মনে প্রস্তুতি নিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য।
স্কুটার থেকে নেমেই সে দ্রুত ঢুকল বাটার দোকানে। কিন্তু মিশিতাকে দেখতে পেল না। নিশ্চিয়ই মিশিতা খেপেছে, রেগেমেগে চলে গেছে।
মেজাজ খিঁচড়ে ওঠে ময়ূখের। চিনচিনে অশান্তিতে মন বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
‘বাটা বাজারের’ছাদ ফুঁড়ে দোতালায় উঠে গেছে একটি সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় আসে ময়ূখ। না, এখানে নেই। হতাশ হয়ে পড়ে সে, নেমে আসে নিচে।
হঠাৎ দেখতে পেল মিশিতা দোকানে ঢুকছে। ফ্যানটাস্টিক লাগছে তাকে। মেরুন রঙের উজ্জ্বল সালোয়ার কামিজ পরেছে সে। এ রংটি ময়ূখের খুব প্রিয়। নিশ্চয়ই ময়ূখকে খুশি করার জন্য ড্রেসটি পরেছে আজ। কোনোদিন তো এটি পরেনি। নতুন বানিয়েছে নিশ্চয়।
মন তার ডগমগে হয়ে ওঠে খুশিতে, কাছে যায়।
একি! মিশিতা তাকে দেখেও না-দেখার ভান করছে। শোকেজে রাখা জুতো পছন্দ করছে।
নিশ্চয়ই অভিমানে ফুলে আছে, নিশ্চয় আগে এসে ঘুরে গেছে মিশিতা, আবার ফিরে এসেছে। ময়ূখ একটু গা ঘেঁষে দাঁড়ায়, ফিসফিস করে বলে, সরি মিশি, আমার দেরি হয়ে গেছে।
মিশিতা একটুও ফিরল না। একমনে জুতো দেখে যাচ্ছে।
কাঁচামাচু হয়ে ময়ূখ আবার বলল, ইয়ে মানে আমার কোনো দোষ নেই, রাস্তায় জ্যামে আটকা পড়েছিলাম, তাই আসতে দেরি হয়েছে।
মিশিতা চমকে ঘুরে তাকায়।
আমাকে কিছু বলছেন? বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করে।
প্লিজ মিশি, রাগ কোরো না। এমন ভাব দেখাচ্ছ যেন আমাকে চিনতেই পারছ না।
সরি। আমি মিশি নই। আপনি চিনতে ভুল করছেন। আমার নাম মুক্তি। আর আমি সত্যিই আপনাকে চিনতে পারছি না।
রাগ কমাও লক্ষ্মীটি। চলো, চন্দ্রিমা উদ্যানে যাব। ময়ূখের কণ্ঠে কাতরতা।
দেখুন, ছ্যাবলামি করবেন না। এটা ছ্যাবলামির জায়গা না। তা ছাড়া আপনার মতো সুদর্শন ছেলেকে এসব মানায় না। কড়া দুটো কথা শুনিয়ে দোতলায় উঠে যায় সে।
মেয়েরা এত রাগতে পারে! ময়ূখের মন কাহিল হয়ে পড়ে। খেপেও ওঠে সে ভেতরে ভেতরে, অভিমানাহত হয়ে বিমূঢ় দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এত রাগী মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখাই ভালো।
নিজেকে সংযত করে ময়ূখ। দোষ তো তারই। তাই বলে তো সে ইচ্ছেকৃতভাবে গুরুতর কোনো অন্যায় করেনি।
মিশিতার অভিমান ভাঙানোর শেষ চেষ্টা করার জন্য আবার দোতলায় আসে ময়ূখ। সরাসরি হাত চেপে ধরে। একটু তেজ নিয়েই বলে, এত রাগ ভালো না মিশি, চলো যাই।
ছট করে মেয়েটি চড় বসিয়ে দেয় ময়ূখের গালে।
আচমকা চড় খেয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ময়ূখ নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে। একটু পরেই নিজের ভেতর ঝাঁকুনি খেল। একটা উন্মত্ত ভাব তাকে গ্রাস করে ফেলে। সেও ডান হাত তোলে চড় দেওয়ার জন্য। কিন্তু হাত থেমে যায় শূন্যে। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে, আজ থেকে সব সম্পর্ক শেষ, মনে রেখো।
আর পেছনে ফিরে তাকাল না ময়ূখ। হনহন করে দোতলা থেকে নেমে এলো।
চড় মেরেই হতবিহ্বল হয়ে গেছে মুক্তি। ধাবমান ময়ূখের দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে। অন্য ক্রেতারা ওদের কা- দেখে। কেউ কেউ আবার মুচকি হেসে চোখ সরিয়ে নেয়।

ময়ূখ দ্রুত বাইরে আসে।
রাস্তা ক্রস করে লোপা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সামনে দাঁড়ায়। কী করবে বুঝতে পারছে না সে। তার বোধ ভোঁতা হয়ে গেছে। সম্মুখে হাঁটা শুরু করে।
মুয়ূখ! ময়ূখ! দাঁড়াও। পেছন থেকে মিশিতার ডাক শুনতে পায় সে।
ডাক শুনে ময়ূখের জেদ চেপে গেল। ঘাড় শক্ত হয়ে ওঠে। গোঁয়ারের মতো হাঁটতে থাকে।
ময়ূখ দাঁড়াবে না। একটুও না, মিশিতা বলে কাউকে চেনে না সে। সব সম্পর্ক শেষ। কারও জন্য তার ভেতরে মায়া নেই, ভালোবাসা নেই। সে একদম একা এখন।
দ্রুত ছুটে আসে মিশিতা। একটু পেছনে থেকে ময়ূখের গা ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে বলে, প্লিজ দাঁড়াও! আমি তো তোমার মতো হাঁটতে পারছি না। চারপাশের মানুষ কী ভাববে, বলো?
ময়ূখের জেদ আরও বেড়ে যায়। আরও শক্ত হয় সে।


শোনো, বাসা থেকে বের হব, এমন সময় ছোট মামা এসে হাজির। মামা কি আমাকে সহজে ছাড়তে চায়! এ জন্যই একটু দেরি হয়ে গেছে। প্লিজ রাগ ভাঙো, হাসো একটু।
মিশিতার ন্যাকামি সহ্য হলো না ময়ূখের। মাথায় রক্ত উঠে যায়। ঘুরে মূহূর্তের মাঝে মিশিতার গালে একটা চড় বসিয়ে দেয় সজোরে।
অ্যাঁ! বলেই চিৎকার দিয়ে দুপ করে ফুটপাথে বসে পড়ে মিশিতা। চারপাশের কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে। তার চোখের সামনে ধুধু অন্ধকার জেগে উঠেছে। হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে থাকে সে।
ময়ূখ চড় দিয়েই থমকে দাঁড়ায়। থাপ্পড় খাওয়া মিশিতার দিকে তাকিয়ে তার চক্ষু চড়কগাছ। ভয়ঙ্করভাবে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। একটু আগে দেখেছে মেরুন রঙের পোশাকে, এখন দেখছে গোলাপি রঙের ড্রেসে!
এ কী করে সম্ভব?
এত দ্রুত কি পোশাক পাল্টানো যায়?
ময়ূখের মাথা এক চক্কর ঘুরে গেল।
এই ঘোরাই শেষ ঘোরা নয়। ময়ূখের জন্য আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছে। সম্মুখে তাকিয়ে আরও একবার চক্কর খেল সে।
মেরুন রঙের পোশাক পড়া মিশিতা, সে বলেছিল তার নাম মুক্তি, হাতে একটি পলিথিনের ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে আসছে। ব্যাগের উপরে দিকে লেখা ‘ঈদ মোবারক’, নিচে লেখা ‘বাটাবাজার’।
ইতিমধ্যে চড় খাওয়া মিশিতা ধাতস্থ হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। অদ্ভুতভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ময়ূখের দৃষ্টি অনুসরণ করে মেরুন রঙের পোশাক পরা মেয়েটিকে দেখে আঁতকে ওঠে।
মুক্তিও চমকে দেখে মিশিতাকে। মিশিতা দেখে মুক্তিকে। পরস্পরে এক মায়াবী টান অনুভব করে। সামনাসামনি এসে দাঁড়ায় তারা। যেন কত জন্মের পরিচিত দুজন দাঁড়িয়েছে মুখোমুখি।
ময়ূখ টলতে থাকে। মাতালের মতো তার চিন্তাশক্তি লোপ পেয়ে যাচ্ছে। দুই মিশিতা সামনে দাঁড়িয়ে আছে। যাকে থাপ্পড় দিয়েছে কে সে? আগের জন বলেছিলে তার নাম মুক্তি। তাহলে!
তীক্ষè কষ্ট তার বুকে ছোবল বসায়। প্রিয় মানুষকে সে থাপ্পড় দিয়েছে?
মাগো!
ভয়াবহ চিৎকার দিয়েই সে ফুটপাথে লুটিয়ে পড়ে। মূর্ছা যায়।
তীব্র চিৎকারটি কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে ড. জেরির ব্রেইনে ক্ষিপ্ত আঘাত হেনেছে। আঘাতের যন্ত্রণা তার বুকে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। প্রায় একই সঙ্গে একটা আর্তচিৎকার দিয়ে মাইক্রোস্কোপের ভিজুয়্যাল স্ক্রিন থেকে তিনি চোখ সরিয়ে নেন। মুহূর্তের মাঝেই একুশ শতক থেকে পেছনের দিকে চলে এসেছেন। স্থির হয়েছেন তার বর্তমানে, ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মেডিক্যাল ফ্যাকালটির ল্যাবরেটরিতে।
মাইকেল ছুটে এসে বসকে ধরে। হতবাক হয়ে বসের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
আমাদের সৃষ্ট মানুষ সত্যিই সুখী হবে না মাইকেল। তারা কেবল বিশৃঙ্খলায় জড়িয়ে যাবে। ডা. জেরি হলের কণ্ঠে অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে।
স্যার, আমরা তো মানুষ সৃষ্টি করছি না। কেবল ভ্রূণ ভেঙে ডুপ্লিকেট মানুষের রূপ দিচ্ছি। আসল জীবন তো শুক্র এবং ডিম্বাণুর মধ্যে। ওই দুটি তো প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হচ্ছে। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গূঢ় রহস্য লুকিয়ে আছে। সেই রহস্য তো আমরা উদ্ঘাটন করতে পারছি না। আমরা কে যে এই সৃষ্টির শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করব? মাইকেল দীর্ঘ জবাব দিয়ে বসকে শান্ত করার চেষ্টা করে।
ড. জেরি হল মাইকেলের মুখের দিকে তাকালেন।
জুনিয়র সহকর্মীটির জন্য অদ্ভুত এক স্নেহ টের পেলেন। নিজের অজান্তেই তিনি হাত বাড়ালেন সামনে।
সামনে বিস্তৃত জগতের অনেক কিছু অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। রয়েছে একটি মায়াবন। কিছু যেন পাচ্ছে, কিছু পাচ্ছেন না। কেউ যেন তাকে অন্ধকারে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, টেনে নিয়ে চড় কষাল সজোরে।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়