Ameen Qudir

Published:
2019-11-07 12:03:12 BdST

৫ মৌলিকসহ ১৫ অধিকার : এক চিকিৎসক দেখালেন জীবনের করুণ খতিয়ান



ডাঃ মোঃ শরিফুল ইসলাম সুজন

_______________________________

আমাদের মৌলিক অধিকারঃ
১) অন্ন;
২) বস্ত্র;
৩) বাসস্থান;
৪) শিক্ষা ও
৫) চিকিৎসা।

কিন্তু এর সঙ্গে
৬) পরিবহন খাত,
৭) অবসরকালীন পেনশন (Pensions),
৮) ব্যক্তিগত ইন্সুয়েরেন্স (personal insurance),
৯) সামাজিক নিরাপত্তা (social security),
১০) বিনোদন (entertainment),
১১) ইউটিলিটি (বিদ্যুৎ, শীততাপ, পানি ও জঞ্জাল / পয়ঃনিঃসরন garbage),
১২) মোবাইল বিল,
১৩) ইন্টারনেট,
১৪) হেল্থ ফিটনেস ও
১৫) ঋন পরিশোধ।

পরিসংখ্যন বলছে, বাৎসরিক আয় $ 150 K হলে পৃথিবীর যেকোন দেশে, যেকোন শহরে আপনি স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দময় জীবন-যাপন করতে পারবেন।

তাহলে আপনার ৫ সদস্যের পরিবারের (পিতা/মাতা, স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে) জন্য মাসিক নূন্যতম আয় হতে হবে ৯ লক্ষ টাকা মাত্র,

কেননা, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের নূন্যতম বাৎসরিক ব্যয় $ 20 K. (K মানে হাজার)

১) খাদ্যঃ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ও পূর্ণাঙ্গ ক্যালরি খেতে হলে "মাসিক জনপ্রতি ১৫ হাজার টাকা" প্রয়োজন (কোনরূপ নেশা জাতীয় জিনিস ছাড়া)।

২) বস্ত্রঃ বলতে শুধু মৌলিক অধিকার মেটানো মোটা সুতার তাতের শাড়ি আর লুঙ্গী-গেঞ্জি বুঝায় না, দুই ঈদ, জন্ম দিন, বিবাহ বার্ষিকী, সামাজিক অনুষ্ঠানাদি যেমনঃ পহেলা ফাল্গুন, পহেলা বৈশাখ, শোক দিবসের পোষাক, স্কুল ড্রেস সহ দৈনন্দিন পোষাক-পরিচ্ছদ ও স্কুল বা অফিসিয়াল ড্রেস ও পাদুকা বুঝায়। মহিলাদের পার্লারের বিল ও মেক আপও এর অন্তর্ভুক্ত। সব দিক সামলে এ খরচটা বছরে জনপ্রতি ৫০ হাজারের নীচে নামাটা কঠিন অর্থাৎ, "মাসে বস্ত্রখাতে জনপ্রতি ৪ হাজার টাকা" সেভিন্স দরকার।

৩) বাসস্থানঃ বস্তি বাসস্থানের নূন্যতম রূপ।
বিলাসিতা নয়, নূন্যতম সুস্থ স্বাভাবিক জীবন ধারনের জন্য মাথাপিছু ৮৫ স্কয়ার মিটার বা ৩০০ স্কয়ার ফিট জায়গা দরকার।
এখন, আপনার পরিবারের সদস্য সংখ্যা যত জন হবে,
জায়গার পরিমান হবে তার গুনিতক।
যেমনঃ ৫ সদস্যের একটি পরিবারের জন্য নূন্যতম ১৫০০ স্কয়ার ফিটের জায়গা দরকার।
বাড়ি ভাড়া বা বাড়ি কিনতে এলাকা ভিত্তিক খরচ হবে।
এর জন্য "মাসিক বরাদ্দ ৪০ হাজার টাকা" রাখতে পারেন, ইউটিলিটি বিল সহ।

৪) শিক্ষাঃ সন্তানকে কোন মিডিয়ামে পড়াবেন, এটা কোন বিষয় নয়, ইংলিশ মিডিয়ামে খরচ যতটা বেশী, বাংলা মিডিয়ামে স্কুলের সঙ্গে কোচিং ও প্রাইভেট মিলিয়ে খরচ, ব্যস্ততা ও বিড়ম্বনা তার চাইতে বেশী বৈ তো কম নয়।
বাংলা মিডিয়ামে যে পড়াবেন, H.S.C. র পর দেশে কোন subject টা বাংলায় honours level এ পড়ানো হয়! (বাংলায় অনার্স-মাষ্টার্স ছাড়া)
মিথ্যে দেশপ্রেমের ভন্ডামি করে তো লাভ নেই,
ইংরেজরা গেছে ৬৮ বছর আগে,
কিন্তু তার গোলামির ঘানী টানছি আমরা শতাব্দীকাল ধরে।
এক একজন ছেলে মেয়ের পড়াশোনার খরচ, যতায়াত, গৃহশিক্ষকের নাস্তা সব মিলিয়ে কি এ'যুগে "১০ হাজার টাকার" কমে সম্ভব নয়, কোন মাসে, এর মধ্যে অবশ্য তাদের আব্দারকৃত টিফিন-নাস্তা ও খেলনা আছে।

৫) চিকিৎসাঃ
এটা ডাক্তারদের কাছে একজন রোগীর অত্যন্ত বিব্রতকর অবস্থা।
দেহ দিয়েছেন যিনি, রোগ দিবেন তিনি।
এটা তো কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়,
বছরে কখনও না কখনও পরিবারের সকল সদস্যই অস্তত্য একবার সপ্তাহখানিকের জন্য অসুস্থ হবেন,
সঙ্গে জীবনে প্রত্যেকের অন্তত্য একবার বড় কিছু অসুখ হওয়াটাই স্বাভাবিক,
দেহঘড়ি এমনিভাবেই তৈরী।
কিন্তু অস্বাভাবিকভাবে, আমাদের এজন্য কোন প্রস্তুতি থাকে না, যেন এটা সরকারের জিম্মাদারী, অথচ সরকারী হাসপাতালে গেলে সেবা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট হবেন না। কিন্তু সারা মাস ধরে আমরা যেমন অন্ন ও বাসস্থানের যোগাড়যন্ত্র করি, তেমনি চিকিৎসা খাতে সঞ্চয়টাও বাঞ্চীয়।
এখন, প্রশ্ন হল, পরিমানটা কত হবে, আন্তর্জাতিকভাবে বলে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য বাৎসরিক ৮৫ হাজার টাকা দরকার বা, "মাসে জনপ্রতি ৭ হাজার টাকা"। মান সম্পন্ন চিকিৎসার জন্য,
আপনি নাহয় মাসে নূন্যতম কিছু টাকা করে জমান, যেন হঠাৎ হাউতাশ শুরু হয়ে না যায়, খরচ না হলে জমা থাকল, লাগলে পরে খরচ হবে।

৬) পরিবহনঃ
যদি আপনি ব্যক্তিগত ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করেন (private car) নূন্যতম খরচ "মাসে গাড়িপ্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা"।
এর মধ্যে জ্বালানী "জৈবতেল মাসে ৮০ লিটার"।

আর যদি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করেন নগর জীবনে "জনপ্রতি প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা" ধরে রাখতে পারেন।

৭) পেনশনঃ
ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই জ্ঞানের কাজ।
৩৫ থেকে ৬৫ বছর, এই ৩০ বছরের কর্মময় জীবনে বাকী হায়াতের জিন্দেগীর ব্যবস্থা করা নিজেদেরই জিম্মাদারী। এর সঙ্গে আছে

৮) ব্যক্তিগত ইন্সুয়েরেন্সঃ
যা আপনাকে আমাকে নানা কপালের দুর্ভোগ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করবে। তারও সঙ্গে আছে

৯) সামাজিক নিরাপত্তা বা social security:
যেমন, ছেলে-মেয়েদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, তাদের বিবাহ-স্বদী, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, দেশ ও দশের বিপদে এগিয়ে আসা।

এই পেনশন, ব্যক্তিগত ইন্সুয়েরেন্স ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য "মাসে অন্তত্য ১৫ হাজার টাকা" দরকার।

১০) বিনোদনঃ
মানুষ যন্ত্রও নয়, পশুও নয়।
যদিও সে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যন্ত্র ও পশুর মতই খাটে।
তবুও কিছু পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধ, weekend, গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন vacation গুলিতে কিছু relaxation ও recreation দরকার। আপনি পরিবার নিয়ে আশে-পাশের যেকোন দেশে ঘুরতে গেলেও জনপ্রতি ফি বছরে ৭০ হাজার টাকা তো দরকারই। অর্থাৎ, "মাসে জনপ্রতি ৬ হাজার টাকা" মাত্র।

১১) ইন্টারনেটঃ
ইন্টারনেট মানে কোন কিছু সার্চ দিলে শুধু মনিটরে গোল গোল ঘুরা নয় বা প্যাকেজ নয়, এত জিবি, এত জিবি। ইন্টারনেট মানে অসীম গতি আর আনলিমিটেড ডাটা।
এরকম ১০ মেঃবাঃ স্পীডের কানেকশন আপনি "মাসে ৩ হাজার টাকার" কমে পৃথিবীর কোথাও পাবেন না।
এখন, একই স্পীডের আনলিমিটেড ডাটা আপনার জন্য, বিবির জন্য, সন্তানদের জন্য, টিভির জন্য, প্লে স্টেশন ফোর অথবা এক্স বক্সের জন্য, ট্যাবের জন্য, ল্যাপটপের জন্য, মোবাইলের জন্য লাগবে।
যত কানেকশন, তত ৩ হাজার, তত উন্নত জীবন-যাপন।

১২) হেল্থ ফিটনেসঃ
শুধু কামাইলাম, খেলাম আর ভুড়ি বানাইলাম করলে তো হবে না,
জিম করতে হবে, সঙ্গে স্টীম বা আইস বাথ আর সুইমিং।
এসব সুবিধে সম্পন্ন জিম "মাসে জনপ্রতি ২,৫০০/- টাকার" কমে কি পাওয়া সম্ভব!
মিয়া-বিবি দুজনেরই লাগবে।
শরীরটা ফিট ও চামড়াগুলা টান টান থাকা চাই।

১৩) ঋন পরিশোধঃ
ঘুষ তো খাওয়া যাবে না, অবৈধ টাকাও কামাই করা যাবে না। তাই বলে কি একটা বাড়ি বানানোর জন্য রিটায়ার্ডমেন্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, কখনই না। গাড়ি-বাড়ি জীবনের সমান্তরালে চলবে। এজন্য অভিজ্ঞতা, work experience, জীবনের অর্জিত সার্টিফিকেট মূলধন হিসেবে কাজে লাগবে। উপার্যনের পরিমানটা এতটাই হ্যান্ডসাম হতে হবে যাতে "মাসে হাজার ৫০ টাকা" লোন শোধ করা যায় অনায়েসে।
যেমন, বিভিন্ন ব্যাঙ্ক ডাক্তারদের ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত কোনরূপ mortgage ছাড়াই any purpose loan দেয়।

১৪) ইউটিলিটিঃ
ইউটিলিটি বলতে বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, গ্যাস ইত্যাদি বুঝায়।

বিদ্যুৎ সরবরাহ মানে থমকে থমকে কারেন্টের আসা-যাওয়ার মিছিল নয়, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, কোন রকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই। প্রতিবন্ধকতা বলতে আমাদের দেশে যেমন নতুন লাইন দিলে এবং পল্লী বিদ্যুতের শর্ত হল, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু সভ্যতা বলতে বুঝায়, গরমকালে এ,সি, শীতকালে রুম হিটার-গিজার্ড, ময়লা থালা-বাসন ও কাপড়-চোপড়ের জন্য ছুটা বুয়ার জন্য অপেক্ষা না করে ডিস ওয়াসার-ওয়াশিং মেশিং-ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার। তার জন্য বিদ্যুৎ খরচটাও হবে সেই রকম।
"প্রায় ১১ হাজার টাকা প্রতি মাসে" বিদ্যুৎ বিল আসতে পারে।

ফাষ্ট ক্লাস গ্রেজেটেড অফিসার হওয়া ও
ফাষ্ট ক্লাস লাইফ লিড করার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। যারা পে কমিশনের সদস্য হন, তারা জীবন-যাপনের এসব উপাদান আমলে নেন বলে মনে হয় না।

আমরা সকাল থেকে রাত্রি অব্দি কামাই করছি, অসীমকে লক্ষ্য করে,
কিন্তু জমানো টাকাগুলো হয়তো খাত ওয়ারী হচ্ছেনা।

এগুলো কোন স্বপ্ন নয়, স্বাভাবিক জীবন-যাত্রার নূন্যতম মানদন্ড,
যদিও বাস্তবিকতায় আমাদের ধরা-ছুঁয়ার বাইরে।

আগামী দশ বছর দেশের বাইরে থেকে আসতে পারলে ভাল হত, কিছু কামাই-রোজগারের বরকতও হত, এর মধ্যে পদ্মা ব্রিজ, দ্বিতীয় পদ্মা ব্রিজ, দেশের সবগুলো হাইওয়ে ৪ লেনের, ঢাকা শহরে দোতালা এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, মেট্রোরেল এবং সর্বপরী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা হয়ত একটা সহনীয় মাত্রায় আসবে।
যদিও মনের প্রকৃত উদ্দেশ্যটা জনসম্মুখে প্রচার ও প্রকাশ করা সমীচীন নয়।

নিম্ন আয়ের দেশ থেকে যখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া গেছে,
তখন সব হবে ইন্শাল্লাহ্ কিন্তু কবে হবে কে জানে,
কেননা, গায়েবের মালিক একমাত্র আল্লাহ্।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়