Ameen Qudir

Published:
2016-12-30 12:34:33 BdST

ডায়াবেটিস রোগ নিয়ে সামান্য কথন : তৃতীয় কিস্তি


 

 

ডা. মোরশেদ হাসান

____________________________

 

 


শায়লা প্রশ্ন করে,
ফাহিম ভাই, আপনি ডায়াবেটিস সম্পর্কে যা বললেন বুঝলাম বলেই তো মনে হল। আবার মনে হচ্ছে বুঝিনি।
-- আচ্ছা গত দুদিনের আলাপ থেকে তো এটুকু বুঝেছেন বেঁচে থাকার জন্য আমাদের খাবার খেতে হয়। আচ্ছা আমরা খাবার খাই কেন?
শায়লা মুচকি হেসে তাকায়।
-ক্ষুধা লাগে তাই খাবার খাই। স্বাদ লাগে সে জন্য খাই।
-- সেটা তো বুঝলাম। কিন্তু খাবার না খেলে কী হয়?
-- দুর্বল লাগে। মাথা ঘোরায়।
-- হুম, এটাই হচ্ছে আসল কথা। খাবার না খেলে শরীর দুর্বল লাগে। তা হলে শরীরে এনার্জি পাওয়ার জন্য আমরা খাবার খাই। সেই খাবার পরিপাক ও বিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষুদ্রতম উপাদান গ্লুকোজে পরিণত হয়। পরিপাক ও বিপাক হওয়াকে ইংরেজিতে বলে Digest ও Metabolism। গ্লুকোজ সরাসরি চলে যায় ব্লাডে। কিন্তু সেটা ব্লাডে গিয়ে বসে থাকলে তো হবে না। মানব শরীর গঠিত হয় Cell বা কোষ দ্বারা। এই প্রতিটি কোষে গ্লুকোজকে পৌঁছতে হবে। সেখানে দহন প্রক্রিয়ায় শক্তি ও পুষ্টি তৈরি হয়। কথা হচ্ছে গ্লুকোজ নিজে নিজেই শরীরের কোষে গিয়ে প্রবেশ করতে পারে না। ইনসুলিন হরমোনের সহায়তায় গ্লুকোজ মাংসপেশিসহ শরীরের সব কোষে পৌঁছায়।
শায়লার চাচা মনসুর তালুকদার এবার মুখ খোলেন,
-- আচ্ছা ডাক্তার সাহেব বুঝতে পেরেছি। ইনসুলিন তৈরি হয় প্যানক্রিয়াসের বিটা সেল থেকে। বিটা সেল যখন ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না বা যেটুকু তৈরি করে তা শরীর ব্যবহার করতে পারে না যাকে বলে ইনসুলিন রেসিস্ট্যান্স তখন ব্লাড থেকে গ্লুকোজ শরীরের কোষে পৌঁছতে পারে না। তখন গ্লুকোজের অভাবে শরীর শক্তি না পাওয়াতে দুর্বল লাগে, দুর্বল লাগলে বেশি বেশি খেতে ইচ্ছে করে।
-- এই তো ভালো বুঝতে পেরেছেন। তা হলে ইনসুলিন হরমোন কত গুরুত্বপূর্ণ বুঝতে পেরেছেন!

-- আচ্ছা ডাক্তার সাহেব সেদিন বললেন গ্লুকোজের রেনাল থ্রেশহোল্ড। এটি বুঝতে পারি নি।
-- আচ্ছা বলছি। ব্লাড থেকে মাংসপেশির কোষে ইনসুলিনের অভাবে গ্লুকোজ যেতে পারছে না। তা হলে কী হবে? আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই সেখান থেকে গ্লুকোজ তৈরি হয়ে ব্লাডে তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতেই থাকবে। যেটাকে বলা হয় হাইপারগ্লাইসেমিয়া।
কিন্তু ব্লাড তো এত গ্লুকোজ ধরে রাখতে পারবে না। শরীরের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি তখন এগিয়ে আসবে। আপনি তো জানেন সোজা বাংলায় কিডনির কাজ অনেকটা ছাঁকনি যন্ত্রের মতো। শরীরের সমস্ত ব্লাড দুটো কিডনি দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিডনি ছাঁকনি যন্ত্রের মতো দরকারি উপাদানগুলো পুনরায় ব্লাড সার্কুলেশনে ফিরিয়ে দিয়ে অপ্রয়োজনীয় ও শরীরের জন্য ক্ষতিকর উপাদানগুলো প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বের করে দেয়।

এখন ফিরে আসি আবার ব্লাডে জমা হওয়া অতিরিক্ত গ্লুকোজের বেলায়। কিডনি তখন ব্লাড থেকে অতিরিক্ত গ্লুকোজ বের করে দিতে এগিয়ে আসে। রেনাল শব্দটি দিয়ে কিডনিকেই বোঝায়। গ্লুকোজ়ের রেনাল থ্রেশহোল্ড ১০ মিলিমোল/লিটার। ‘Threshold’ শব্দটির মানে হচ্ছে আরম্ভ বা সূত্রপাত। রেনাল থ্রেশহোল্ড অতিক্রম করলেই গ্লুকোজ বা সুগার তখন প্রস্রাবের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসবে। প্রস্রাবের মাধ্যমে গ্লুকোজ বা সুগার বেরিয়ে আসা নিশ্চয়ই শরীরের জন্য ভালো কথা নয়। গ্লুকোজ বের করে দেওয়ার জন্য কিডনিকে বেশি কাজ করতে হবে। বেশি বেশি প্রস্রাব হবে। বেশি বেশি প্রস্রাব হলে তৃষ্ণা বা Thirst বেশি হবে। সে বেশি বেশি পানি পান করবে।
শায়লা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। ফ্যান খুব আস্তে ঘুরছে। ফাহিমের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে। শায়লার কেন যেন ইচ্ছা করে ওর ওড়না দিয়ে ফাহিমের কপালের ঘাম মুছে দেয়। মেয়েদের মনে অনেক রকম ইচ্ছের উদয় হয়। কিন্তু সবকিছু প্রকাশের জন্য নয়। এটাই জীবনের নিগূঢ় রহস্য।
--আচ্ছা ফাহিম ভাই। মানুষের ছোট বেলায় তো শরীর ঠিক থাকে। বড় হলে এমন কী হয় যে প্যানক্রিয়াস থেকে ইনসুলিন ঠিকমতো তৈরি হয় না?
-- কথাটা ঠিক নয়, শায়লা। ছোট বেলায়ও শরীর খারাপ হতে পারে। আমরা বলেছিলাম ডায়াবেটিসের টাইপ চার প্রকার। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে Type-1 Diabetes, এর অন্য নাম হচ্ছে Insulin Dependent Diabetes বা Juvenile Diabetes। Juvenile শব্দ থেকে বোঝা যাচ্ছে এই টাইপ-১ ডায়াবেটিস হয় ছোটবেলায়। এই ডায়াবেটিসে প্যানক্রিয়াস থেকে ইনসুলিন একেবারেই তৈরি হয় না। তখন সারা জীবন ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ইনসুলিন নিতে হয়।
-- কেন?
-- এই কেনর উত্তর তো জটিল। এটা এক ধরনের অটো-ইম্যুউন ডিজিস।
-- ও বাবা সেটা আবার কী?
সেটা বললে তো আবার অনেক কথাই বলতে হয়।

ফাহিম শায়লার চাচার দিকে তাকিয়ে বলে একটু চা খেতে পারলে মন্দ হত না। শায়লা দ্রুত উঠে যায়। আমি চা বানিয়ে নিয়ে আসছি আপনার আর চাচার জন্য।
মনসুর সাহেব বলেন, আচ্ছা ডাক্তার সাহেব শরীরের যে কার্যকলাপের কথা আপনি বললেন এই জিনিস কে তৈরি করেছেন?
-- আপনি মানব শরীরের শুধু এটুকুই দেখলেন। এর যে আরও কত অসংখ্য কাজ আছে। আমি হাজার ভাগের এক ভাগও বলি নি।
-- এই জিনিস তো এমনি এমনি তৈরি হয় না; কেউ যদি বানিয়ে না দেয়। মনসুর সাহেব দুদিকে প্রবলভাবে মাথা নাড়িয়ে বলেন, এ অসম্ভব। কেউ একজন মানব শরীরকে নিশ্চয়ই বানিয়েছেন। এমনি এত জটিল সিস্টেম তৈরি হতে পারে না।
ফাহিম জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।
-- এক সর্ব শক্তিমান আল্লাহ ছাড়া কারও পক্ষেই সম্ভব নয় এই জিনিস তৈরি করে।
তবুও তো মানুষ না বোঝার চেষ্টা করে। সে যে কী বোঝে তা একমাত্র আল্লাহতালাই জানেন। শায়লার চাচা স্বগতোক্তি করেন।
ফাহিমের চায়ের তৃষ্ণা প্রবলতর হচ্ছে...(ক্রমশ)


_________________________________

 

 

 

লেখক ডা. মোরশেদ হাসান ।
Works at Medical College, Assistant Professor.
Past: Works at Ministry of Health, Maldives and ICDDR,B


প্রেসক্রিপশন এর জনপ্রিয়