|

এফসিপিএস ও ইউরোপ কানাডার পরীক্ষা পদ্ধতি : নানা গ্যাঁড়াকল


Published: 2017-01-11 13:54:16 BdST, Updated: 2017-01-20 05:31:32 BdST


ডা. অসিত বর্দ্ধন
____________________________

 

এবারের এফসিপিএস প্রথম পর্ব পরীক্ষায় পাশের হার নাকি ছিল ১০ শতাংশের কাছে। সেই সুবাদে নিজের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য এই লেখা।

শুরু করি নিজেকে দিয়ে। এনেস্থেসিয়া তে ডিপ্লোমা পরীক্ষা দেওয়ার সময় অধ্যাপক খলিলুর রহমান স্যার ভাইভা বোর্ডে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি পার্ট ১ দিয়েছেন?” না সূচক উত্তরে বললেন, আপনি আগামী পরীক্ষাতেই পার্ট ১ দিবেন। স্যারের কথাতেই যথেষ্ট জোশ নিয়ে ফর্মফিলাপ করলাম। ফেল । দ্বিতীয় বার ও ফেল । রিটেনেই। কারও কোন দোষ নেই। আমার খাতা দেখেছিলেন এমন একজন অন্য আরেকজনকে মন্তব্য করেছিলেন যে ওভার কনফিডেন্স থাকলে এমনি হয়! নিশ্চয়ই আমার প্রস্তুতি পাশের উপযুক্ত ছিল না।

 

এরপর ৫ বছর মফস্বলে কাটিয়ে সৌদি আরবে। ওখানে দেখি আয়ারল্যান্ডের রয়্যাল কলেজের পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ আছে। ব্যস পড়তে লেগে গেলাম। মাথায় ছিল ২ বার ফেল করার পীড়াদায়ক স্মৃতি। পরীক্ষা সেন্টার রিয়াদে। ভয়ে ভয়ে গেলাম। কারণ মোটামুটি জানি যে পাশের হার সব সময় ৪০ এর ঘরে। সে যাত্রা পার হয়ে গেলাম। এরপর ট্রেনিং এর জন্য গেলাম আয়ারল্যান্ড । ১৮ মাস পরে পার্ট ২ পরীক্ষা। এখানেও সবাই একই ভয় দেখালেন, পাশের হার তো ৩০-৪০! সেই সময় আরও একটা প্রচলিত ভয় ছিল যে আগে সাদারা পাস করবে, তারপরে জায়গা থাকলে বাদামী চামড়ার লোকজন। প্রথম বারে হোলো না। দ্বিতীয়বারে ভালভাবেই উতরে গেলাম।

 

স্পেশালিষ্ট ট্রেনিং শেষ করে যখন কানাডায় এলাম চাকরি নিয়ে, শর্ত ছিল ৩ বছরের মধ্যে কানাডার রয়্যাল কলেজের পরীক্ষা পাশ করতে হবে। পরীক্ষা দেওয়ার আগে শুনলাম পাশের হার নাকি ৯০ ভাগের উপরে। তবে এখানেও গ্যাঁড়াকল আছে। স্থানীয়রা পাশ করার পরে যেটুকু জায়গা থাকে সেটা বিদেশিদের। সেজন্য IMG( ইন্টারনাশানাল মেডিকেল গ্রাজুয়েট) রা পাশ করে কম। তবে এখানে উতরে গেলাম প্রথমবারেই, হয়ত কপাল গুণে!

 

তুলনাটা তাই মাথায় এসেই যায়, কেন এক জায়গায় পাশের হার ৪০ আর আরেক জায়গায় ৯০ এর উপরে? ব্রিটিশ পদ্ধতিতে পাশের হার কম। এটা কৃত্রিম। প্রশ্ন এমনভাবে সাজানো হয় যেন শতকরা ৪০ জন সমস্ত প্রশ্ন উত্তর করতে পারে। ভাইভাতে আবার কোন কিছু পরীক্ষকের মনোমত না হওয়ার উপরে পাস ফেল নির্ভর করে। সেজন্য লং কেস, ৪টা বোর্ডের ৩ টা বোর্ড ভালভাবে পাশ করেও একটা প্রশ্নে মনোমত উত্তর না দেওয়ার জন্য ফেল হয়ে যায় একবার। হারিয়ে যায় কষ্টের ৬ মাস।


বোর্ডের কানাডিয়ান পদ্ধতিতে ছাত্র দের তৈরি করা হয় পরীক্ষার জন্য এমনভাবে যেন পরীক্ষার প্রশ্ন তাদের নিত্য ব্যবহারিক জ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ হয়। খুব অপ্রচলিত কোন রোগের বিষয় দিয়ে তাদের পাশ ফেল নির্ধারণ হয় না।


কানাডা (এবং আমেরিকার) পোষ্ট গ্রাজুয়েশান পদ্ধতি নির্দিষ্ট সময়ের। যেমন Family practice বা জিপি’র জন্য ২ বছর, সার্জারি বা এনেস্থেশিয়ার ৫ বছর। প্রত্যেক ৬ মাসে একটা ইভালুয়েশান পরীক্ষা হয়। সেই পরীক্ষা একেবারে ফাইনালের ভাইভার মত। এর ফলে সেই শিক্ষার্থী পরীক্ষা সঙ্ক্রান্ত মনস্তাত্ত্বিক ভয় কাটিয়ে ওঠেন । আসল পরীক্ষায় ভাল করেন । এছাড়া গোটা ৫ম ইয়ার জুড়ে প্রত্যেক্ সপ্তাহে একদিন একজন “মক” ভাইভা দেন সবার (রেসিডেন্সি স্টুডেন্ট) সামনে । পরীক্ষক হিসেবে থাকেন সেই হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ। তিনি প্রত্যেক প্রশ্নের জন্য আধুনিক উত্তর কি সেটা বিশ্লেষণ করে দেন সকল পরীক্ষার্থীর সামনে। এই সময় সেই বিষয়গুলোকে বারবার উপস্থাপন করা হয়, যা আমাদের নিত্য দিনের প্রয়োজনীয়। ফলে একজন ছাত্রের মোটামুটি সাধারণ বিষয়ে ফেল হয় না। তবে তাদের বিচারপদ্ধতি ও ব্যবহারিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে নিরাপদ বিশেষজ্ঞ হিসেবে তৈরি করা হয়।

 

কানাডায় এনেস্থেশিয়াতে আরেকটি চমৎকার ব্যবস্থাপনা আছে। এর নাম “ Making a mark”। ফাইনাল ভাইভার ২ মাস আগে এক ধরনের মক পরীক্ষা হয়। একেবারে আসল পরীক্ষার আদলে। সেই পরীক্ষার ফলাফল পরীক্ষার্থীকে তার ভাইভার সাথে সাথে বিশ্লেষণ করে জানিয়ে দেওয়া হয়। বিশেষত জানানো হয় তাঁর দুর্বল জায়গা গুলো। এবং কোথায় কোথায় উন্নতি করতে হবে তা। কারো সাথে নেতিবাচক আচরণ করা হয় না। এর ফলে পরীক্ষার্থী তাঁর প্রস্তুতির সবলতা দুর্বলতা জেনে বাকি সময়টুকু প্রস্তুত হন।



পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিটাও একটু অন্য রকম কানাডার পরীক্ষায়। একটা প্রশ্নের মার্কিং করেন ২ জন। যিনি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছেন তিনি ও অন্য আরেকজন। পরীক্ষার শেষে ২ জন তাঁর নম্বর প্রধান পরীক্ষকের কাছে জমা দেন। যদি কোন পরীক্ষার্থী কোন প্রশ্নে ফেল করেন, কিন্তু অন্য সব বিষয়ে পাশ করে থাকেন তাহলে সেই পরীক্ষককে জানানো হয় যে সামগ্রিক ফলাফলের ভিত্তিতে তিনি ঐ পরীক্ষার্থীকে সেই প্রশ্নে পাশ করাতে চান কিনা।


পাশ করাতে চাইলে পরীক্ষার্থী পাশ করেন, আর না চাইলে পরীক্ষককে লিখিত জানাতে হয় যে কি কারণে তিনি মনে করেন এই পরীক্ষার্থী পাশের যোগ্য নন। এর সাথে ফোন করা হয় ঐ পরীক্ষার্থীর প্রোগ্রাম ডিরেক্টরকে। যিনি ৫ বছরের ইভাল্যুশান ফাইল দেখে জানান এই পরীক্ষার্থীর এ ধরনের ভুল অস্বাভাবিক কি না। এর পরে নির্ধারিত হয় একজন পরীক্ষার্থী ফেল করছেন কি না। আমার মনে হয় এর ফলে পরীক্ষার দিনের নার্ভাস নেসের কারণে ভুল গুলকে আলাদা করা যায়।

 

কোন পদ্ধতি ভাল বা খারাপ সেটি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আমাদের সামগ্রিক পাশের হার যদি কম হয় , তবে শিক্ষার্থীর সাথে শিক্ষকদেরও বড় দায়িত্ব রয়েছে এই সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ খোজার। আশার আলো দেখাতে পারে বিসিপিএস নিজেই। কারণ আমাদের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থার মহারথীগণ আছেন এখানেই। আগামী পরীক্ষায় সবার চমৎকার ফলাফলের আশাবাদ রাখছি। মিলিতভাবে উন্নতির কোন বিকল্প নেই।

____________________________

ডা. অসিত বর্দ্ধন

প্রবাসী এনেস্থেটিস্ট ,ভাঙ্কুভার , কানাডা ও bdemr.com এর প্রতিষ্ঠাতা।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।