|

বিএম এ র কাছে দেশের চিকিৎসক সমাজের ১১ দফা প্রাণদাবি


Published: 2016-11-28 11:22:16 BdST, Updated: 2017-10-22 05:15:56 BdST

 

 

ডাঃ নির্ঝর অলয়, ডাঃ সৌমিত্র চক্রবর্তী এবং ডাঃ দুলাল চক্রবর্তী
__________________________________


বাংলাদেশে চিকিৎসকদের কার্যবিবরণ (Job Description)অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও সুস্পষ্ট নির্দেশনাবিহীন বিধায় চিকিৎসকগণ প্রায়ই অস্বাস্থ্যকর, অবৈজ্ঞানিক এবং অনিরাপদ পদ্ধতিতে কাজ করছেন এবং বিভ্রান্তি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

কর্মঘণ্টার কোন সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও সীমা না থাকায় সরকারী পর্যায়ে প্রায়ই সীমাহীন কর্মঘণ্টা, রাত্রিকালীন ডিউটির পর আন্তর্জাতিকভাবে ও বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত অবকাশ না দেয়া, বেসরকারী পর্যায়ে বিনা ওভারটাইমে সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা খাটানো- ইত্যাদি নিগ্রহমূলক ও অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন চিকিৎসকগণ।

এতে করে চিকিৎসক সমাজে হতাশা, অবসাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পারিবারিক ও সামাজিক জীবন মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তরুণ চিকিৎসকদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্যও কার্যবিবরণীতে পরিবর্তন প্রয়োজন।

এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কর্মবিবরণীর আলোকে এবং বর্তমান বাংলাদেশের চিকিৎসকদের সংখ্যা ও বণ্টন বিবেচনা করে নিম্নোক্ত ধারাগুলো কর্মবিবরণীতে সংযোজনের বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।


প্রাথমিক পর্যায়ে নিম্নোক্ত বিধিগুলো শুধু নন-ট্রেনিং পোস্টগুলোতে বাস্তবায়নের জন্য বিবেচনা করার অনুরোধ করা হচ্ছেঃ


১। কার্যদিবসঃ সাপ্তাহিক কার্যদিবস ৬ দিনের পরিবর্তে রোটেশন অনুযায়ী প্রতি চিকিৎসকের জন্য সপ্তাহে ৫ দিন হবে। উল্লেখ্য পৃথিবীর প্রায় কোন দেশেই আউটডোর সেবা সপ্তাহে ৬ দিন খোলা থাকে না এবং সে কথা মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মহোদয় বলেছেন। এক্ষেত্রে দুটি মডেল বিবেচনা করা যায়। যুক্তরাজ্যে প্রচলিত মডেল হচ্ছেঃ ৯টা-৫টা কার্যদিবস, সোম-শুক্রবার ৫ দিন। শনি-রবি বহির্বিভাগ বন্ধ থাকে শুধু অন্তবিভাগ ও জরুরি বিভাগ চালু থাকে। উইকেন্ড এবং সান্ধ্য ও রাত্রিকালীন শিফটে রোস্টার অনুযায়ী চিকিৎসকগণ কাজ করেন।

বাংলাদেশে এই মডেল চালু করা যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে, বর্তমান দাপ্তরিক সময় অপরিবর্তিত রেখে (৮টা-২.৩০টা, শনি-বৃহস্পতি) প্রত্যেক চিকিৎসককে রোটেশন অনুযায়ী ২ দিন অবকাশ দেয়া যেতে পারে। শনিবারে বহির্বিভাগে চিকিৎসক সংখ্যা কিছুটা কমিয়ে এটা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। কিংবা চিকিৎসক সংখ্যা অপরিবর্তিত রেখে রোটেশন অনুযায়ী শুক্রবার ছাড়া অন্য যেকোন একদিন অবকাশ দেয়া যেতে পারে।

        

      হাজার হাজার রোগী প্রতিদিন সেবা পায়। সেটির কেন করুণ চেহারা।

 


২। কর্মঘণ্টাঃ সকল পর্যায়ের চিকিৎসকদের নিয়মিত সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা হবে অনুর্ধ্ব ৪০ ঘণ্টা। সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা ৪০ ঘণ্টা অতিক্রম করলে তা অবশ্যই অতিরিক্ত সময়ের কাজ বা ওভারটাইম হিসেবে গণ্য হবে। উল্লেখ্য বর্তমানে বাংলাদেশের সব সিভিল পেশায়ই নিয়মিত কর্মঘণ্টা ৪০ ঘণ্টা (৫*৮=৪০)। শুধুমাত্র চিকিৎসকদেরই বেসরকারী খাতে ৪৮ ঘণ্টায় মূল বেতন হিসেব করা হচ্ছে। এই অতিরিক্ত ৮ ঘণ্টা বিনা ওভারটাইমে খাটানো শ্রম আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।


৩। অতিরিক্ত সময়ে কাজের মূল্যায়নঃ বেসরকারী খাতে ৪০ ঘণ্টার পর ওভার-টাইম হিসেব হবে এবং প্রতি ঘণ্টায় প্রাপ্য মূল বেতনের দ্বিগুণ হারে বেতন প্রাপ্য হবে। সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারী ছুটির দিনে কাজের মূল্যায়ন করতে হবে। সরকারী খাতে অতিরিক্ত সময়ের ব্যবস্থা না থাকায় এক্ষেত্রে বাড়তি ইনক্রিমেন্টের কথা বিবেচনা করতে হবে। উল্লেখ্য পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই চিকিৎসকদের বেতন সরকারী খাতে অন্যান্য কর্মকর্তাদের চেয়ে অধিক।


৪। রাত্রিকালীন কর্তব্যের পর আবশ্যিক অবকাশঃপ্রতিটি রাত্রিকালীন কর্তব্য সমাপন এবং কর্তব্য হস্তান্তরের পর চিকিৎসক অবশ্যই ২৪ ঘণ্টা অবকাশ পাবেন। উল্লেখ্য এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি। এই অবকাশকে কোনভাবেই ছুটি হিসেবে গণ্য করা যাবে না। বিশেষ ক্ষেত্রে যদি পরপর দুই কার্যদিবসে রাত্রিকালীন ডিউটি পড়ে- সেক্ষেত্রে প্রথম ডিউটির পর দিবাকালে (৯টা-৫টা) এবং দ্বিতীয় রাত্রীকালীন কর্তব্য সমাপন ও হস্তান্তরের পর ৪৮ ঘণ্টা অবকাশ দিতে হবে। এই অবকাশ ছুটি হিসেবে গণ্য হবে না।


৫। রাত্রিকালীন কর্তব্যের সীমা ও বিশ্রামঃ কোন চিকিৎসককে কোনভাবেই সপ্তাহে ২টির বেশি নাইট শিফট করতে বাধ্য করা যাবে না। রাত্রি বা সান্ধ্যকালীন কর্তব্যের কারণে কর্মঘণ্টা ৪০ ঘণ্টা অতিক্রম করলে অবশ্যই অতিরিক্ত বেতন প্রদান করতে হবে। রাত্রিকালীন কর্তব্যের সময় চিকিৎসা-সংক্রান্ত জরুরি কর্তব্য না থাকলে চিকিৎসক বিশ্রাম গ্রহণ করতে পারবেন এবং জরুরি কল এটেন্ড করার আবশ্যিক শর্তে নিদ্রাও অনুমোদিত হবে যদি তা কর্তব্যে অবহেলা না ঘটায়। রাত্রিকালীন ডিউটি যেদিন থাকবে সেদিন সকালে কোন ডিউটি থাকবে না এবং উপস্থিতিও বাধ্যতামূলক করা যাবে না।

 

 

        ডাক্তার এখন নিপীড়িত । কেন! 

 


৬। কর্তব্যরত চিকিৎসকের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যকর কর্ম-পরিবেশ নিশ্চিতকরণঃ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কর্তব্যরত চিকিৎসকের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর, কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে বাধ্য থাকবে। শুধুমাত্র হাসপাতাল নয়, ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্যেও অনুরূপ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং তাঁদের যাতায়াত, নিরাপত্তা ও আবাসনের সুব্যবস্থার উপর বিশেষ জোর দিতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে পর্যাপ্ত সংখ্যক স্যাকমো, ফার্মাসিস্ট, নিরাপত্তাকর্মী এবং এমএলএসএস নিয়োগ করতে হবে। নতুবা ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।


৭। ইউনিয়ন পর্যায়ে দ্বৈত প্রশাসন সংক্রান্ত জটিলতা দূরীকরণ: সম্প্রতি একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো স্থাপনা নেই সেসব স্থানে পদায়নকৃত বিসিএস চিকিৎসকদের পরিবার কল্যাণ অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন স্থাপনায় কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে সৃষ্টি হয়েছে দ্বৈত প্রশাসন সংক্রান্ত এক জটিলতা। কেননা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনের বিসিএস নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকেরা প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা (সহকারী সার্জন) এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে পদায়নকৃত সহকারী সার্জনবৃন্দ সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্বাস্থ্য ও প: প: কর্মকর্তার অধীনস্থ। এই সহকারী সার্জনবৃন্দ যখন পরিবার কল্যাণ অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন স্থাপনায় কাজ করছেন তখন তাঁরা কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছেন কেননা ওই স্থাপনার উপরে উপজেলার স্বাস্থ্য ও প: প: কর্মকর্তার কর্তৃত্ব নেই, বরং রয়েছে টিএফপিও-এর কর্তৃত্ব যিনি প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা নন। তাই ব্যাপারটি শুধু দ্বৈত প্রশাসনই সৃষ্টি করছে তা নয়, অফিশিয়াল প্রটোকলেরও পরিপন্থী। এমতবস্থায় উক্ত সহকারী সার্জনবৃন্দ কর্মস্থলে নানা রকম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এর আশু প্রতিকার প্রয়োজন।


৮। স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সময়ক্ষেপনের রীতি বিলোপকরণ:বর্তমানে সরকারী চাকুরিরত চিকিৎসকদের স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণের জন্য দুই বছরের বাধ্যতামূলক বিরতি নিতে হয় যেসময়ে তিনি ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকেন। এমতবস্থায় পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় যা স্নাতকোত্তর পাঠকে অনাবশ্যকভাবে দীর্ঘায়িত করে। শুধু তাই নয় এর ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ জনবল গড়ে উঠতেও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় লাগছে যাতে শেষতক বঞ্চিত হচ্ছেন এদেশের সাধারণ মানুষ। তাই কোনো সরকারি চিকিৎসক যাতে বিরতিহীনভাবে তাঁর স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রি অর্জন সম্পন্ন করে তারপর দুই বছর ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা দিতে বাধ্য থাকেন (যদি ইতোপূর্বে তা না দিয়ে থাকেন) সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করার জোর দাবী জানাচ্ছি।

 

 

    হাসপাতালে হামলা নিয়মিত। চাই সুরক্ষা ।

 


৯। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়ে পাঠদানে মেধাবীদের আকৃষ্টকরণ: আমাদের প্রচলিত স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যবস্থায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের সুযোগসুবিধা এত কম যে তুলনামূলকভাবে অধিক মেধাবী শিক্ষার্থীরা এতে সাধারণত আকৃষ্ট হন না। ফলে স্বাস্থ্যশিক্ষার মৌলিক ভিতই দূর্বল থেকে যায় যা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চিকিৎসক হিসেবে গড়ে ওঠার প্রতিবন্ধক। বিশ্বের অন্য সব দেশের মতো চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়ে পৃথক এবং উচ্চতর (অন্তত দ্বিগুণ) বেতন কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে যাতে মেধাবীরা এতে আকৃষ্ট হন।


১০। স্বাস্থ্যসেবাদাতা জনবল পর্যাপ্ত সংখ্যায় নিয়োগকরণ: হাসপাতালসমূহে শয্যা হিসেবে নয়, বরং প্রকৃত অর্থে বাস্তব পরিসংখ্যান অনুযায়ী কতজন করে রোগী ভর্তি থাকেন সেই হিসাবে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত অনুপাতে চিকিৎসক, সেবিকা, ওয়ার্ডবয় প্রভৃতি নিয়োগ করতে হবে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৃথকভাবে চিকিৎসকসহ সহায়ক জনবল নিয়োগ করতে হবে। জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদেরকে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও দায়িত্বের মাত্রা অনুযায়ী অতিরিক্ত ভাতা ও ওভারটাইম প্রদান করতে হবে। একটি শক্তিশালী জরুরি বিভাগ একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা নির্মাণ করে।


১১। মেডিকেল অফিসারদের কর্মবিবরণীতে অযৌক্তিক ধারার বিলোপঃ মেডিকেল অফিসারদের কর্মবিবরণীতে ৮ নং ধারায় উপজেলা পরিষদের ম্যানুয়ালে বলা হয়েছে, “ তিনি সরকার, উপজেলা পরিষদ বা অন্য কোন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত অন্যান্য দায়িত্ব পালন করিবেন।”- এই ধারাটি অত্যন্ত অযৌক্তিক এবং সারা পৃথিবীতে নজিরবিহীন। উল্লেখ্য যে, স্বাস্থ্যসেবায় সরকার-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে জবাবদিহিতার ব্যাপারটিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেই নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যব্যবস্থায় স্থানীয় সরকারগুলোর প্রতিনিধিদের সরাসরি হস্তক্ষেপ খুবই অশোভন অযৌক্তিক, অপমানজনক এবং চিকিৎসকদের নিগ্রহের কারণ। কাজেই এই ধারাটি নিম্নরূপে সংশোধন করা প্রয়োজন।

 

“মেডিকেল অফিসারগণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অর্পিত অন্যান্য স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যৌক্তিক দায়িত্ব পালন করবেন।
বিনীত
বাংলাদেশের চিকিৎসকবৃন্দ।

_________________________________

(স্মারকলিপি আকারে প্রস্তাবনাটি করেছেন ডাঃ নির্ঝর অলয়, ডাঃ সৌমিত্র চক্রবর্তী এবং ডাঃ দুলাল চক্রবর্তী)

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।