SAHA ANTAR

Published:
2022-06-04 13:39:43 BdST

হাসপাতালে উন্নত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন রংএর রিবনের চেস্টকার্ড ব্যবহার: কিছু প্রস্তাবনা


অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিন মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ কনসালটেন্ট , ওসিডি ক্লিনিক ও জেরিয়াট্রিক ক্লিনিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় , ঢাকা

 

অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিন
মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ
কনসালটেন্ট , ওসিডি ক্লিনিক ও জেরিয়াট্রিক ক্লিনিক
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় , ঢাকা
____________________________

হাসপাতালে হাজার লোকের সমাবেশ,আনাগোনা দিনরাত লেগেই আছে। মানুষের আশাস্থল ভরসাস্থল হলো এই হাসপাতাল। এখানে সামান্য হাসি মুখের ব্যবহার মানুষের মনে বেঁচে থাকার আশা যোগায়। হাসপাতালে কর্ম ভেদে নানা শ্রেণীবিভাগ আছে। শিক্ষক, রেসিডেন্ট,মেডিক্যাল অফিসার , নার্স, এমএলএসএস, অফিস কর্মকর্তা ,ল্যাব এসিস্ট্যান্ট ইত্যাদি বিভিন্ন ক্যাটাগরীতে বিভিন্ন রং এর রিবনসহ চেষ্টকার্ড ব্যবহার খুবই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। ভারতবর্ষ সহ বিভিন্ন মহাদেশে বেশ কিছু স্বনামধন্য হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। সেখানে ব্যবস্থাপনা অনন্য ও সুশৃঙ্খল। হাসপাতালে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা খুব জরুরি। স্বাস্থ্য সেবায় একজন চিকিৎসক যেমন জরুরি; পাশাপাশি একজন স্বাস্থ্য সেবী নার্স, ব্রাদার, ল্যাব এসিস্ট্যান্ট,এমএলএসএস, অফিস কর্মকর্তা কম গুরুত্বপূর্ণ নন। সকলের মিলিত শৃঙ্খলাপূর্ণ কর্মকান্ডেই একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

আমরা বাংলাদেশের বাইরে গিয়ে নান প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হই। কিন্তু দেশে ফিরে সেসব প্রতিষ্ঠানের মত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা , শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় তৎপর হই না। শুধু নিজেদের দোষ ত্রুটি খুঁজি। বলে বেড়াই। অথচ দেশে একটু উদযোগী হলেই সুশৃঙ্খল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

হাসপাতাল একটা বড় ক্যাম্পাস। ওয়ার্ডে বহিরাগতদের আনাগোনা , ভীড় যেন বাংলাদেশের মান্ধাতার স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার প্রতীক । বড় বড় সরকারি হাসপাতালে গুটিকতক লিফটে ঠেলাঠেলি করে সবাই এক কাতারে দাঁড়ানোর প্রাণপন চেষ্টা ।হাসপাতাল ডাক্তার, স্টাফ কর্মকর্তাদের লিফটে বাইরের লোকজন এমন ভাবে দাঁড়ায় যে তারা সবাই ওই প্রতিষ্ঠানের আসল কর্মকর্তা। তাদের যেন হাসপাতালের মধ্যে সবচেয়ে বেশী কাজ ও তাড়া । অনেকে ভুয়া পরিচয় দেনও। এ নিয়ে নানা বাক বিতন্ডা হয়।
অথচ মানুষের জীবন বাঁচানোর মহত্তম কাজে যাদের দ্রুত যাতায়াত দরকার। তারা অনাকাঙ্খিত লোকজনের ভীড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। যেন তারাই বহিরাগত।
সকালে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা বলি। হুট করে অনাহুত লোকজন ঢুকে পড়ে। কি এক অচিন কাজে তারা হাসপাতালের এ ভবন, ও ভবন ঘুরে বেড়ান। যেন হাসপাতাল হল ঘুরে বেড়ানোর মনোরম জায়গা। তারা লিফটের সামনে অকারণে ভিড় করেন। কেউ জানতে চাইলে সপাটে জবাব: স্টাফ। কেউ বলেন ডাক্তার। ঠেলাঠেলি করে ছোটছুটি করেন। কে স্টাফ বা ডাক্তার ; কে বহিরাগত, সেটা বোঝা ভার।
অন্যরা অর্থাৎ ডাক্তার , হাসপাতাল স্টাফ ; যাদের তাড়াতাড়ি রোগীর কাছে পৌছাতে হবে, কিংবা সময়ের মধ্যে হাজিরা দিতে হবে তারা বিরক্ত বিরস বদনে অপেক্ষায় থাকেন। বাধ্য হয়ে দাড়িয়ে থাকেন। নতুবা একটা কেওয়াজ তৈরী হওয়া আশংকা দেখা দেয়। বিতন্ডা মাঝে মধ্যে হয়ও। যা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির জন্ম দেয়। বাকবিতন্ডা শেষে দেখা যায়, বহিরাগতরা স্টাফ বা এমন কি ডাক্তার পরিচয় দিয়ে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে।


এখন আবার বায়োমেট্রিকের যুগে পদার্পণ। ফলে সবাইকে সময় মত হাজিরা দিতে হলে মেশিনের সামনেও এক অরাজকতা সৃষ্টি হয়। করিডোর দিয়ে হাটঁছেন কে সিনিয়র কে জুনিয়র; কে শিক্ষক কে ছাত্র; কে অফিস স্টাফ বোঝা দায়। এসব নিয়ে নানা ঝুট ঝামেলা , কমপ্লেন কম নয়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান যেমন বিএসএমএমইউ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ : এতো বিশাল প্রতিষ্ঠান । সরকারি মেডিকেল কলেজগুলো বিরাট প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আমরা কেন এসব প্রতিষ্ঠানে সুন্দর ব্যবস্থাপনা কায়েম করতে পারছি না।
এত সব বড় প্রতিষ্ঠানে সবার সবাইকে চেনার কথাও নয়। তাই স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান যখন বিশাল হয়; তখন সেখানে নিয়ম মেনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা অতি জরুরি। সেটা আমরা উপমহাদেশের বিশাল স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান দেখে শিখতে পারি। চাইলে বাংলাদেশের বিভিন্ন সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠান দেখে শিখতে পারি। সিএমএইচ, ডিফেন্স হাসপাতাল , পুলিশ হাসপাতালে সুন্দর শৃঙ্খলা বিদ্যমান। সেখানে প্রতিষ্ঠা করা গেলে অন্য বিশাল স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কেন করা যাবে না।

করপোরেট হাসপাতালের কথা বলব না। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কথা বলি।
নয়া দিল্লীর অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস : এইমস নামে সকলে র পরিচিত। সেখানে সুন্দর ব্যবস্থাপনা দেখেছি।
বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ এন্ড নিউরোসায়েন্সেস কথা বলি। উপমহাদেশের এই দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানের সুনাম জগত জুড়ে। আকারে আয়তনে রোগী সেবার বিশালতায় আমাদের বিএসএমএমইউ, ঢাকা মেেকেল কলেজের সঙ্গে তুলনীয়।
এইমস, নিমহানস দুটি প্রতিষ্ঠানের র্যাঙ্ক অনুযায়ী বিভিন্ন রং এর রিবনসহ চেষ্টকার্ড এর ব্যবহার নতুন কিছু নয়। দীর্ঘকাল ধরে তা চালু করে সুন্দর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সেখানে বিদ্যমান।

ডিফেন্সে তারকা চিহ্ন তাদের পদমর্যাদা তুলে ধরে।পুলিশ বিভাগ বিশাল প্রতিষ্ঠান। সেখানে সুন্দর সুশৃঙ্খল সিস্টেম চালু আছে। সুবিশাল স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে চালু করতে সমস্যা কোথায়।

স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান সুবিশাল প্রতিষ্ঠান। এখানে সবচেয়ে বেশী শৃঙ্খলা দরকার। কয়েক মিনিটের হের ফেরে মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে। সেখানে এতো উদাসী অনাহুত মানুষের ভীড় দিনভর কেন। অনেকে বলবেন , এরা রোগীর লোকজন। মানলাম। কিন্তু রোগীর লোকজনের নামে এতো অনাহুত ভীড় যদি রোগীর জীবন বিপন্ন করে, সে দায় কে নেবে। দিন শেষে তো ওই ডাক্তারই মার খায়।

আমাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এখন সময়ে জরুরি দাবি। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা কর্মচারী সবাইকে তাদের পদ অনুযায়ী বিভিন্ন রং এর রিবনসহ চেষ্টকার্ড ব্যবহার করতে দেখা যায়। হাসপাতালে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা হলে সবাই সবার আচরণ সম্পর্কে সচেতন হবে। চলার পথে সবাই আরও দায়িত্বশীল আচরণ করবেন। অনাহুত লোকজনের ভীড় পরিহার হবে।
করোনাকালের ভয়াবহতা আমরা পেরিয়ে এসেছি কিন্তু একে অস্বীকার করতে পারছি না। তাই মাস্ক ব্যবহার আমাদের মোবাইলের মত দৈনন্দিন একটা অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে পড়েছে। সে কারণে আমরা চেনা মানুষকেও সবসময় চিনতে পারি না। তারপর ঋতুভেদে শাল কোট পরলে পরিচয় বোঝা দায়। এছাড়া হিজাব বোরখার কথা নাইবা বললাম। যারা ধর্মপ্রাণ , তারা অবশ্যই পরবেন।
একাধিক জগতখ্যাত
বিশাল স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা দেখার অভিজ্ঞতার আলোকে বলবো,
শিক্ষক লাল,রেসিডেন্ট ফেজ এ হালকা সবুজ,ফেজ বি গাঢ় সবুজ , সুপারস্পেশালিটি রেসিডেন্ট নীল, অফিস কর্মকর্তা হলুদ, এমএলএসএস কমলা,ল্যাব এসিস্ট্যান্ট বেগুনী রং ব্যবহার করলে কর্মক্ষেত্রে সুশৃঙ্খলা পালনেও সুবিধা হয়। বাইরের লোকজন চেনাতে সুবিধা হয়। এপ্রনের ব্যবহার এখন যত্রতত্র। নার্সদের ক্যাপ ব্যবহার তাদের পবিত্র পোশাকের একটি অংশ। ।ক্যাপ পরলেই সমস্যার অনেকখানি সমাধান হয় । কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে সাদা রং এর রিবন দেয়া যেতে পারে।
এই রিবন ব্যবহার শ্রেণীভেদের জন্য নয় । বরং নিয়ম শৃংখলার মধ্যে কাজের পরিবেশ হতে পারে আরও গতিময়। সবার আত্মবিশ্বাস বাড়বে । অনিয়মের মাত্রা কমে আসবে। দায়িত্ববোধ হবে সুস্পষ্ট । তারই প্রত্যাশা রইল।

আপনার মতামত দিন:


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়