SAHA ANTAR

Published:
2022-09-06 10:33:11 BdST

মানুষের মাথায় ভাবনা যন্ত্র বসাতে প্রস্তুত প্রযুক্তি : বদলে যাবে কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসের বিশ্ব


 

______________________

মানুষের মাথায় ভাবনা যন্ত্র বসাতে প্রস্তুত প্রযুক্তি : বদলে যাবে অন্ধবিশ্বাসের বিশ্ব । কাজ চলছে জোরে শোরেই। একদিকে বিশ্বময় কেবলই কিসসা কাহিনি , কুসংস্কার আর অন্ধকার। তারই মাঝে আসছে নতুন পৃথিবীর আলোকমালা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি জার্মানি , চীন, ভারত এই নয়া বিজ্ঞানবিশ্বের জন্য কাজ করে চলেছে।
প্রথম আলো পত্রিকা এ নিয়ে চমৎকার এক লেখা প্রকাশ করেছে। লেখাটি প্রকাশ করা হল।
ফেসবুকের মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ সম্প্রতি তাঁর প্রতিষ্ঠানের নিউরাল ইন্টারফেস প্রযুক্তি নিয়ে কাজের রূপরেখা সামনে এনেছেন।

নিউরাল ইন্টারফেস ব্যবহার করে একজন ব্যক্তি তাঁর ভাবনার মাধ্যমে অন্য প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তি যুক্ত করার পথে অনেকটাই এগিয়েছেন গবেষকেরা। ধারণা করা হচ্ছে, কিছুদিনের মধ্যেই মানুষের মস্তিষ্কের অনেক তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে টাইপ করার মতো উন্নত যন্ত্রও চলে আসবে। এ ধরনের যন্ত্র তৈরি হলে মানুষের অনেক উপকার হবে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। ফেসবুক, গুগলের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌতুক অভিনেতা ও উপস্থাপক জো রোগানের পডকাস্ট অনুষ্ঠান ‘জো রোগান এক্সপেরিয়েন্স’-এ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকার দেন মার্ক জাকারবার্গ। সেখানে তিনি বলেন, মেটাভার্স প্রযুক্তিকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে নিউরাল ইন্টারফেস নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করছে মেটা। তাঁর প্রতিষ্ঠান প্রাথমিকভাবে মস্তিষ্ক থেকে সংকেত আদান–প্রদান করতে পারে এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।

‘মেটাভার্স’ মূলত ভার্চ্যুয়াল দুনিয়া। এটি এমন ত্রিমাত্রিক দুনিয়া, যেখানে অনেক মানুষ একসঙ্গে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত হতে পারেন। প্রত্যেকের ত্রিমাত্রিক অ্যাভাটারের মাধ্যমে ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায় পারস্পরিক যোগাযোগ হয়ে থাকে।

জাকারবার্গ বলেছেন, ফেসবুকসহ তাঁর প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য সেবার ভবিষ্যৎ হলো এই মেটাভার্স। তাই তিনি ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে রেখেছেন ‘মেটা’। এরই মধ্যে মেটাভার্স (ভার্চ্যুয়াল বিশ্ব) তৈরির পেছনে প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার খরচ করেছে মেটা।


জাকারবার্গ জো রোগানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নিউরাল ইন্টারফেসের ক্ষেত্রে কঠিন অংশটি হচ্ছে মস্তিষ্কে সরাসরি তথ্য পাঠাতে পারে, এমন কম্পিউটার স্থাপন করা। কিন্তু মেটা ঠিক এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে না। তিনি এ প্রসঙ্গে নিউরাল ইন্টারফেস নিয়ে কাজ করা আরেক প্রতিষ্ঠান নিউরালিংকের সঙ্গে মেটার তুলনা টানেন।

মহাকাশ প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক তাঁর নিউরালিংক প্রকল্প নিয়ে অনেক দূর এগিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি মূলত কম্পিউটারের সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্ক যুক্ত করার প্রযুক্তি তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে। এ জন্য বিশেষ চিপ তৈরি করছে নিউরালিংক। এটি একটি মানুষের মাথায় প্রতিস্থাপন করার লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানটির।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি তথাকথিত ‘স্নায়ু লেস’ প্রযুক্তি বিকাশ করবে, যার মাধ্যমে মস্তিষ্কে ক্ষুদ্র ইলেকট্রোড স্থাপন করা যাবে। এই প্রযুক্তি স্মৃতিশক্তির উন্নতির জন্য ব্যবহার করা যাবে কিংবা মানুষকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে।

কবে মানুষ অভ্যস্ত হবে

জাকারবার্গ বলেন, ‘ইলন মাস্ক ও তাঁর প্রতিষ্ঠান নিউরালিংকের মতো কিছু মানুষ এবং প্রতিষ্ঠান নিউরাল ইন্টারফেস প্রযুক্তিকে অনেক দূর নিয়ে যাচ্ছে। আমার ধারণা, এটি কয়েক দশকের মধ্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে।’

জাকারবার্গ কৌতুক করে বলেন, ‘আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে শুধু মজা করার জন্য কেউ তাঁদের মস্তিষ্কে চিপ বসাতে রাজি হবেন না। আপনি একটি উন্নত সংস্করণ চাইবেন। এমন কিছু চাইবেন না, যেটা আগামী বছরে অনেক উন্নত হবে, কিংবা আপনার মস্তিষ্কে স্থাপন করার পর প্রতিবছর প্রযুক্তি হালনাগাদ করতে হবে।’

অবশ্য এর আগে নিউরালিংক নিয়ে উদ্ভট কিছু দাবি করেছিলেন ইলন মাস্ক। তাঁর ভাষ্য, নিউরালিংক হবে মাথার খুলিতে স্থাপন করা এমন একটি যন্ত্র, যেটি ফিটবিটের মতো কাজ করবে। ফিটবিট হচ্ছে ফিটনেস ট্র্যাকার, স্মার্টফোনে বসানো যেসব চিপ মানুষের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বা রক্তচাপ ইত্যাদি রেকর্ড করে রাখে, সেগুলো।

এ ছাড়া এটি মানুষের চেতনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যে সংযোগ সহজ করবে। নিউরালিংকের লক্ষ্য হচ্ছে স্নায়বিক সমস্যা আছে, এমন ব্যক্তিদের মাথায় ওয়্যারলেস কম্পিউটার চিপ বসিয়ে আলঝেইমার, ডিমেনশিয়া কিংবা মেরুদণ্ডে সমস্যা ইত্যাদির সমাধান করা।


নিউরালিংকের পক্ষ থেকে ‘নিউরাল লেস’ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার কথা বলা হলেও এটি এখনো মানুষের ওপর পরীক্ষা করা শুরু হয়নি। তবে বসে নেই নিউরালিংকের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান সিনক্রোন। প্রতিষ্ঠানটি গত জুলাই মাসে মানুষের মস্তিষ্কে চিপসেট বসানোর কাজ শুরু করেছে।

জাকারবার্গ দাবি করেন, নিউরালিংকের মতো প্রযুক্তি আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে শিগগিরই কাজে লাগানো সম্ভব হবে। ২০২১ সালের জুলাইয়ে নিউরালিংকের এক বিবৃতিতে বলা হয়, তাদের চিপের প্রথম ব্যবহার নিয়ে কাজ চলছে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের ওপর এটির পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, তাঁরা চিন্তা করে কম্পিউটারের পর্দায় মাউসের কার্সর নড়াতে সক্ষম হয়েছেন।

হাত নাড়িয়ে পাঠানো যাবে বার্তা

মার্ক জাকারবার্গ তাঁর আলাপচারিতায় মেটাভার্সে কীভাবে নিউরাল ইন্টারফেস ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে তিনি অগমেন্টেড রিয়্যালিটি গ্লাস বা এআর প্রযুক্তির চশমার সঙ্গে নিউরাল ইন্টারফেস যুক্ত করার একটি উদাহরণ টানেন।

মানুষের মস্তিষ্কে চিপ বসানোর বদলে জাকারবার্গ পরিধানযোগ্য প্রযুক্তিপণ্যের মাধ্যমে মস্তিষ্কের সংকেত ধরার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, এই প্রযুক্তিপণ্য শরীরের যেকোনো অংশ থেকেই সংকেত গ্রহণ করতে পারবে।

জাকারবার্গ বলেন, ‘আমরা যে উপায়ে কাজটা করছি, তার ভিত্তি হলো, আমাদের সবার শরীরে থাকা অতিরিক্ত মোটর নিউরন।’ মোটর নিউরন হচ্ছে মস্তিষ্কের কোষ, যার মাধ্যমে মস্তিষ্ক থেকে দেওয়া নির্দেশনা শরীরের মাংসপেশিতে পৌঁছে যায়।


জাকারবার্গ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, মানুষের হাতে কোনো পরিধানযোগ্য যন্ত্র পরা থাকলে মস্তিষ্কের সঙ্গে হাতের যোগাযোগের সংকেত এটি শনাক্ত করতে পারে। এই সংকেত ধরে যন্ত্রটি তখন ভার্চ্যুয়াল কোনো হাতের নড়াচড়া সামনে তুলে ধরতে পারে।

জাকারবার্গ বাস্তব জীবনে এর একটি উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিজ্ঞতার সামনে পড়তে পারে মানুষ। যখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো আলোচনার সময় স্ত্রীর বার্তা আসবে ও ভার্চ্যুয়াল চশমার কোণে তা দেখে নেওয়া যাবে। কিন্তু উত্তর দেওয়ার জন্য ফোন হাতে নেওয়ার বদলে নিউরাল ইন্টারফেসের মাধ্যমে এর উত্তর দেওয়া যাবে। এ সময় সামান্য একটু হাত নাড়িয়ে মনে মনে চিন্তা করেই ওই বার্তার জবাব দেওয়া যাবে। এ ধরনের বার্তা পাঠানোর বিষয়টি আশপাশের কেউই টের পাবে না।

এ ধরনের প্রযুক্তি অবশ্য কবে নাগাদ হাতের নাগালে আসবে, জাকারবার্গ সে বিষয়ে কোনো সময়সীমার কথা বলেননি।
লেখা প্রথম আলো র সৌজন্যে ।
বিজনেস ইনসাইডার, এএফপি ও রয়টার্স অবলম্বনে মো. মিন্টু হোসেন

আপনার মতামত দিন:


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়