SAHA ANTAR

Published:
2022-05-16 11:24:47 BdST

সেরা লেখা শালবনের ঝরা পাতার মধ্যে জন্ম নেয়া মাতৃহারা রাজপুত্রকে বড় করলেন বিমাতা গৌতমী: তাই নাম সিদ্ধার্থ গৌতম


 


রঞ্জন বন্দ্যোপাধ‌্যায়/সংবাদ প্রতিদিন :

ঘটনাটা ঘটল যিশুখ্রিস্ট জন্মাবার ৫৬৩ বছর আগে। তিনি এলেন পৃথিবীতে। তাঁর তো জন্মানোর কথা নেপালের কপিলাবস্তুর রাজপ্রাসাদে। কিন্তু তিনি জন্মালেন পথের ধারে শালবনের ঝরা পাতার মধ্যে। অথচ এই ছেলের বাবা শুদ্ধোদন শাক‌্যরাজ্যের রাজা। থাকেন রাজধানী কপিলাবস্তুর বিলাসবহুল প্রাসাদে। কেন প্রাসাদে না জন্মে শুদ্ধোদনের পুত্র জন্মালেন শাল-অরণ্যের ঝরাপাতার বিছানায়?

 

 


কারণ সদ্যোজাত পুত্রের মা মায়াদেবী, যিনি শাক‌্যরাজ শুদ্ধোদনের স্ত্রী এবং কোল রাজ‌্য দেবদহের রাজকুমারী – তিনি বাপের বাড়িতে যেতে চাইলেন সন্তানের জন্মের আগে। কিন্তু তা তিনি পারলেন না। পথের ধারে এক শালবনের ঝরা পাতার বিছানায় শুয়ে জন্ম দিলেন তাঁর পুত্রের। এবং মারা গেলেন এক সপ্তাহের মধ্যে। সেই শালবনের কোনও নাম আছে? আছে তো। কপিলাবস্তু থেকে কিছু দূরে লুম্বিনী-র শালবন, সেখানেই জন্ম সিদ্ধার্থর। মাতৃহারা শিশুকে বড় করলেন মাসি ও বিমাতা প্রজাপতি গৌতমী। ছেলেটির তাই নাম রাখা হল সিদ্ধার্থ গৌতম।


কপিলাবস্তু-রাজপ্রাসাদের বিলাস, আনন্দ, উৎসব, উপভোগের মধ্যে বড় হতে লাগলেন সিদ্ধার্থ গৌতম। এক মহাপণ্ডিত জ্ঞানী সাধক ইতিমধ্যে রাজা শুদ্ধোদনের মাথায় একটি ভয় ঢুকিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন। কী সেই ভয়? সিদ্ধার্থ গৌতম যত বড় হবেন, ততই তিনি হবেন জ্ঞানের সন্ধানী! জ্ঞান, প্রজ্ঞা এসব ভারি ভয়ের শব্দ শুদ্ধোদনের কাছে। প্রজ্ঞার অন্বেষ ছেলেকে সন্ন‌্যাসের পথে নিয়ে যাবে না তো? তাহলে কে করবে বংশরক্ষা? স্ত্রী মায়াদেবীর কথা মনে পড়ে শুদ্ধোদনের। আটদিনের শিশু তার মা মায়াকে হারিয়েছে। শুদ্ধোদন ভাবেন মায়ার এই মৃত্যু প্রতীকী।

সিদ্ধার্থর মায়ার বন্ধন সত্যিই কি কেটে গিয়েছে সে যখন দুধের শিশু? মায়ার বন্ধনে সিদ্ধার্থকে ফিরিয়ে আনার জন‌্য দু’টি সবথেকে সহজ পথ নিলেন রাজা শুদ্ধোদন। তিনি পরমাসুন্দরী যশোধরার সঙ্গে বিয়ে দিলেন সিদ্ধার্থর। আর রাজপ্রাসাদের মায়ারাজ্যে প্রায় বন্দি করে রাখলেন সিদ্ধার্থকে। গান-বাজনা, সুখ ঐশ্বর্য, ভোগ বিলাস, এরই নাম জীবন। এরই নাম বেঁচে থাকা। জীবনে শুধু নিরবচ্ছিন্ন উপভোগ। জীবনে নেই ব‌্যাধি, নেই দুঃখ-কষ্ট, নেই মৃত্যু ও বিচ্ছেদ– এই মায়াবাস্তবে বড় হয়ে উঠতে লাগলেন সিদ্ধার্থ গৌতম। তাঁর একটি পুত্রও হল। রাহুল। নাতির মুখ দেখে বিপুল উৎসবের আয়োজন করলেন রাজা শুদ্ধোদন।

কিন্তু জীবনের বাস্তবকে, পৃথিবীর প্রকৃত চেহারাটাকে পুত্রের কাছ থেকে বেশিদিন সরিয়ে রাখতে পারলেন না তিনি। বন্ধু ছন্দকের উসকানিতেই হয়তো প্রাসাদের বাইরে লুকিয়ে ভ্রমণে বেরলেন সিদ্ধার্থ। ছন্দক পথ চিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁকে। বাস্তব পৃথিবীর পথ চেনেন ছন্দক। সেই পথের শেষে কেমন ওই মানুষ, যার শরীর দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়? এই প্রথম ব‌্যাধির ভয়ংকর চেহারাটা দেখলেন সিদ্ধার্থ। কী মিথ‌্যার মধ্যে বড় হয়েছেন তিনি! বুঝতে পারলেন এই প্রথম।

 

পরের দিন ছন্দক আবার ঠিক পথে নিয়ে গেলেন সিদ্ধার্থ গৌতমকে। দেখলেন একটি মৃত মানুষকে। জীবনের পরিণতি, সমস্ত আনন্দ-উৎসবের শেষ তাহলে মৃত্যুতে? যা কিছু জন্মায় তারই মরণ, বিনাশ, লুপ্তি অনিবার্য? পরিত্রাণের উপায় নেই? ছন্দকের কাছে কোনও উত্তর নেই। পরের দিন অন‌্য পথ ধরে ছন্দক সিদ্ধার্থকে নিয়ে গেলেন এক গভীর ধ‌্যানমগ্ন সন্ন‌্যাসীর কাছে। সিদ্ধার্থ বুঝলেন, এই সাধক বুঝি বা জীবনের দুঃখ-কষ্টের থেকে মুক্তি লাভ করেছেন। ভারি সুন্দর এক দ্যুতি ফুটে উঠেছে সাধকের নীরব ধ‌্যানমগ্ন চেহারায়!

সমস্ত মায়ার বন্ধন ত‌্যাগ করে, স্ত্রী যশোধরা, পুত্র রাহুলকে প্রাসাদেই রেখে দিয়ে, সব ভোগ বিলাস আনন্দ উৎসবকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে রাতের অন্ধকারে পথে বেরিয়ে পড়লেন সিদ্ধার্থ গৌতম। না, পেতে চান না কোনও ভগবানকে। যে-পৃথিবীতে এত দুঃখ কষ্ট, এত রকমের অসুখ আর নির্যাতন, মানুষের এই বিস্তৃত অসহায়তা আর অনিশ্চয়তা, দুর্ভাগ্যের এসব বিপুল পীড়ন আর যে-পৃথিবীতে মৃত্যু অনিবার্য, কোথায় সেখানে ভগবান? ঈশ্বরের জন‌্য সংসার ও গৃহত‌্যাগ করেননি সিদ্ধার্থ গৌতম। তিনি গৃহত‌্যাগী হলেন নিজের মধ্যে ডুব দিয়ে নিজেকে জানার জন‌্য। আত্মজ্ঞানের তৃষ্ণা তাঁকে উপড়ে নিয়ে গেল মায়ার সমস্ত বন্ধন থেকে। যিশুখ্রিস্ট জন্মানোর ৫৩৪ বছর আগে ঘটল এই ঘটনা। সিদ্ধার্থ গৌতমের বয়স উনতিরিশ।


পরের ছ’বছর নিরন্তর তপস‌্যায় তিনি নিজেই হয়ে উঠলেন বোধের আলো। খ্রিস্টপূর্ব ৫২৮ অব্দে, পঁয়তিরিশ বছর বয়সে তিনি হলেন সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ। অর্থাৎ জ্ঞানপ্রাপ্ত। পেয়েছেন সেই পরম প্রজ্ঞা যা তিনি খুঁজছিলেন। কী সেই জ্ঞান? যে-জ্ঞানের প্রধান উদ্দেশ‌্য জীবনের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট যন্ত্রণা থেকে নিষ্ক্রান্তি! কোন ঈশ্বর বাঁচাবেন আমাদের জীবনের কষ্ট থেকে? জন্ম মানেই তো নির্যাতন। গৌতম বুদ্ধ উত্তর দিলেন, কোথাও কোনও ভগবান নেই। মানুষ বড় একা। মানুষ কাঁদছে। কোনও ভগবান হাত বাড়িয়ে তাঁকে বাঁচাবেন না। মানুষ নিজেই নিজেকে বাঁচাতে পারে। তার সেই ক্ষমতা আছে। মানুষকে শুধু সেই ক্ষমতাকে নিজের মধ্যে জাগ্রত করতে হবে। বুদ্ধপূর্ণিমার (Buddha Purnima) আলোর মতো মানুষের মধ্যে ক্রমশ ফুটে উঠবে সত্যের আলো, নিজেকে জানার আলো, জীবনযন্ত্রণা থেকে মুক্তির আলো।

বোধিপ্রাপ্ত হওয়ার পর আরও পঁয়তাল্লিশ বছর বেঁচে ছিলেন গৌতম বুদ্ধ (Gautama Buddha)। এই পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে বুদ্ধ প্রচার করে বেড়ালেন তাঁর ধর্ম ও দর্শন, যা পরিচিত হল বৌদ্ধধর্ম নামে। যে ধর্মের কেন্দ্রে নেই কোনও ভগবান। শুধু আছে জীবন-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার কয়েকটি সম‌্যক সংকল্প। জীবনের গোড়া থেকেই যেন আমরা চর্চা করি সম‌্যক দৃষ্টির। অর্থাৎ ভাল-মন্দ কাজকে যেন সঠিকভাবে চিনতে শিখি। যেন কোনও কাজের সঙ্গে জড়িয়ে না থাকে ক্রোধ, হিংসা, স্বার্থ, সংকীর্ণতা, ভ্রান্ত সংস্কার। সব কাজ যেন হয় সমাজ-সংসারের পক্ষে মাঙ্গলিক। আমরা যেন চর্চা করি সম‌্যক বাক্যের।

অর্থাৎ নিন্দা নয়, কটুকথা নয়, মিথ‌্যা নয়, কাউকে বাক্যের দ্বারা কষ্ট দেওয়া নয়। আমরা যেন জীবনচর্চার মধ্যে সম‌্যক কর্মকে স্থান দিই। অর্থাৎ প্রাণীহত‌্যা নয়, নিষ্ঠুরতা নয়, যুদ্ধ নয়, বিনাশ নয়। আর যেন সম‌্যক জীবিকার বাইরে না পা ফেলি। অর্থাৎ চুরিজোচ্চুরি করে, প্রতারণা করে, মিথ‌্যাচরণ করে উপার্জন নয়। সম‌্যক জীবিকায় শঠতার কোনও স্থান নেই। বুদ্ধদেবের উপদেশ অনুসারে, এই হল জীবনযন্ত্রণা থেকে মুক্তির মার্গ। এক কথায়, জীবনে প্রলোভনের কোনও স্থান নেই। লোভ বা বাসনাই সর্ব দুঃখের কারণ। ত‌্যাগের মধ্যেই জ্বলে ওঠে ক্রমিক শান্তায়নের আলো।

কোনও ভগবানের আলো নয়। নিজের উপলব্ধি, ধ‌্যান ও বোধিপ্রাপ্তির আলো। গৌতম বুদ্ধ ৪৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আশি বছর বয়সে সম্ভবত কোনও বিষাক্ত খাবার খেয়ে গোরক্ষপুরের কুশীনগরে ‘নির্বাণ’ লাভ করেন। আপাতভাবে এই মৃত্যু ছিল যন্ত্রণাময়। তবু হাসিমুখে তাঁর শেষ উচ্চারণ, যা কিছু এই ভুবনে জন্মায়, তাকেই মরতে হয়। সুতরাং মৃত্যুশোক বলে কিছু নেই।
এই ‘তথা’ বা পরম অবস্থার মধ্যে বুদ্ধ ‘গত’ হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম হল ‘তথাগত’!##

 

বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি

গৌতম বুদ্ধ নিজেকে দেবতা না মনে করে
‘মানবপুত্র’ মনে করতেন। এই মানবপুত্র, বুদ্ধদেবের প্রতি রবীন্দ্রনাথের ছিল অগাধ শ্রদ্ধা। আর কোনো ধর্মগুরুর প্রতি রবীন্দ্রনাথকে এতটা ভক্তিপূর্ণ মনে হয়নি। বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ না করলেও বুদ্ধের আদর্শকে তিনি গ্রহণ করেছেন, বুদ্ধের বাণীকে তিনি প্রচার করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ‘বুদ্ধদেব’ নামে একটি গ্রন্থও রচনা করেছেন। ওই গ্রন্থে তিনি লিখেছেন----
‘ভারতবর্ষে বুদ্ধদেব মানবকে বড় করিয়াছিলেন। তিনি জাতি মানেন নাই, যাগযজ্ঞের অবলম্বন হইতে মানুষকে মুক্তি দিয়াছিলেন, দেবতাকে মানুষের লক্ষ্য হইতে অপসৃত করিয়াছিলেন। তিনি মানুষের আত্মশক্তি প্রচার করিয়াছিলেন। দয়া এবং কল্যাণ তিনি স্বর্গ হইতে প্রার্থনা করেন নাই, মানুষের অন্তর হইতেই তাহা তিনি আহ্বান করিয়াছিলেন।
রবীন্দ্র-কবিতায় গৌতম বুদ্ধ :
----বিশ্বজিৎ ঘোষ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ও গানে বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের বহুমাত্রিক স্মরণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। গৌতম বুদ্ধকে রবীন্দ্রনাথ মানুষের অধ্যাত্মবোধের স্ফটিকসংহত রূপ বলে বিবেচনা করতেন।
রবীন্দ্রনাথের পরমার্থচেতনার বিশিষ্ট উৎস গৌতম বুদ্ধ ও তাঁর ধর্মদর্শন। গৌতম বুদ্ধ ও তাঁর নির্মাণ তত্ত্বের বিভিন্ন প্রসঙ্গ রবীন্দ্র-সৃষ্টিশীলতায় নানাভাবে ছড়িয়ে আছে।
এ প্রসঙ্গে তাঁর তিনটি কবিতার কথা আমরা স্মরণ করতে পারি ভিন্নমাত্রিক ব্যঞ্ছনার জন্য। এই কবিতা তিনটির নাম– ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’, ‘বুদ্ধভক্তি’ এবং ‘বুদ্ধ ও যুদ্ধ’ (পরবর্তীকালে একটি শিরোনামহীন ছড়া হিসেবে গ্রন্থ ভুক্ত)।
ঐতিহাসিক কারণে রবীন্দ্রনাথের উপর্যুক্ত রচনাত্রয় তাঁর বুদ্ধভাবনা প্রসঙ্গে বিশেষার্থে প্রণিধানযোগ্য।
জাপানের সমাজ-সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতি রবীন্দ্রনাথ বিশেষভাবে মুগ্ধ ছিলেন।
তাঁর `জাপান-যাত্রীর পত্র’ গ্রন্থটি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন– পূর্ব-পৃথিবীর জাপান হচ্ছে মানব-সভ্যতার অন্যতম রক্ষাকবচ। কিন্তু সেই জাপানকেই তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দেখলেন ভিন্নরূপে। ক্রমে তাঁর পূর্বতন বিশ্বাস দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বৌদ্ধধর্মাবলম্বী দেশ জাপানের ফ্যাসিবাদী হিংস্রতা রবীন্দ্রনাথকে চরমভাবে ব্যথিত ও মর্মাহত করে। জাপানের আগ্রাসী মানসিকতার প্রতিবাদ করতে গিয়েই দীর্ঘদিনের বন্ধু নোগুচির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মনান্তর দেখা দেয় এবং একসময় ছিন্ন হয়ে যায় বন্ধুত্বের মধুর সম্পর্ক। চীনের সমর্থনে এবং জাপানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা তাঁর রাজনীতিচেতনার বিশিষ্ট এক অধ্যায়।

‘পূর্বাচলের নবীন আলো’ জাপান যখন আগ্রাসী ভূমিকায় হায়নার মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো চীনের ওপর, রবীন্দ্রনাথ তখন চরমভাবে মর্মাহত হলেন। ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাপান কর্তৃক আক্রান্ত হলো চীন, তারা দখল করে নেয় মাঞ্চুরিয়া। এ-সময়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় এই সচিত্র খবর – ‘জাপানে একদল সৈনিক যুদ্ধযাত্রার পূর্বে ভগবান বুদ্ধের মূর্তির সামনে যুদ্ধ-জয়ের প্রার্থনা করছে। ’ এই সংবাদ পাঠ করে রবীন্দ্রনাথ ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হন। জাপানি ফ্যাসিস্টদের এই নির্লজ্জ আক্রমণ এবং গৌতম বুদ্ধকে নিয়ে এই ভণ্ডামিকে বিদ্রূপ করে কবি লিখলেন বিখ্যাত ব্যঙ্গ-কবিতা ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’ (পত্রপুট কাব্যে সংকলিত)।
ফ্যাসিস্টদের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে ঘোষিত হলো কবির এই তীক্ষ্ণ বিদ্রূপবাণ, এই ব্যঙ্গ-আয়ুধ-

যুদ্ধের দামামা উঠলো বেজে।
ওদের ঘাড় হল বাঁকা, চোখ হল রাঙা,
কিড়মিড় করতে লাগলো দাঁত।
মানুষের কাঁচা মাংসে যমের ভোজ ভরতি করতে
বেরোল দলে দলে।
সবার আগে চলল দয়াময় বুদ্ধের মন্দিরে
তাঁর পবিত্র আশীর্বাদের আশায়।
… … …
ওদের এইমাত্র নিবেদন, যেন বিশ্বজনের কানে পারে
মিথ্যামন্ত্র দিতে,
যেন বিষ পারে মিশিয়ে দিতে নিঃশ্বাসে।
সেই আশায় চলেছে ওরা দয়াময় বুদ্ধের মন্দিরে
নিতে তাঁর প্রসন্ন মুখের আশীর্বাদ।
বেজে উঠছে তূরী ভেরী গরগর শব্দে,
কেঁপে উঠছে পৃথিবী।
(‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’)

উপযুক্ত কবিতাটি পাঠ করে বোঝা যায়, জাপানি সমর-নায়কদের ভণ্ডামিতে কতটা গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। যুদ্ধজয়ের জন্য অহিংসার প্রতিমূর্তি গৌতম বুদ্ধকে ব্যবহার রবীন্দ্রনাথকে চরমভাবে ব্যথিত করে। তাই, বুদ্ধ-ভক্তির পরম প্রকাশ ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’ শব্দত্রয় তিনি নির্বাচন করেন কবিতার শিরোনাম হিসেবে।
চীনের ওপর জাপানি ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনে রবীন্দ্রনাথ বিচলিত হয়েছেন; কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছেন তখন, যখন অহিংসার বাণীমূর্তি, কপিলাবস’র পাহাড়ের বুক চিরে বেরিয়ে আসা মানবিক-বিভূতি গৌতম বুদ্ধকে ব্যবহার করেছে ফ্যাসিস্ট সমরবিদরা। তাই দেখি ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’ কবিতা লেখার কয়েক মাস পর ওই একই পটভূমিতে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন আর একটি কবিতা- নাম ‘বুদ্ধভক্তি’।
নবজাতক কাব্যগ্রন্থে সংকলিত ওই কবিতার প্রারম্ভে কবি সংযোজন করেছেন এই ভূমিকা- ‘জাপানের কোনো কাগজে পড়েছি জাপানি সৈনিক যুদ্ধের সাফল্য কামনা করে বুদ্ধমন্দিরে পূজা দিতে গিয়েছিল। ওরা শক্তির বাণ মারছে চীনকে, ভক্তির বাণ বুদ্ধকে। ’ ভণ্ড এই ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে ‘বুদ্ধভক্তি’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ উচ্চারণ করেন তীব্র এই বিদ্রূপবাণ-

হুংকৃত যুদ্ধের বাদ্য
সংগ্রহ করিবারে শমনের খাদ্য।
সাজিয়াছে ওরা সবে উৎকটদর্শন,
দন্তে দন্তে ওরা করিতেছে ঘর্ষণ
হিংসার উষ্মায় দারুণ অধীর
সিদ্ধির বর চায় করুণানিধির-
ওরা তাই সুধায় চলে
বুদ্ধের মন্দিরতলে।
… … …
হত-আহত গণি সংখ্যা
তালে তালে মন্ত্রিত হবে জয়ডঙ্কা।
নারীর শিশুর যত কাটা-ছেঁড়া অঙ্গ
জাগাবে অট্টহাসে পিশাচী রঙ্গ,
বিষবাষ্পের বাণে রোধি দিবে নিশ্বাস-
মিথ্যায় কলুষিবে জনতার বিশ্বাস,
মুষ্টি উঁচায়ে তাই চলে।
বুদ্ধেরে নিতে নিজ দলে।
ভূরী ভেরি বেজে ও।

আপনার মতামত দিন:


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়