ডা লুৎফর রহমান

Published:
2021-03-29 09:24:10 BdST

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সেবার আলাউদ্দিন খাঁর সেতার সানাইয়ে বেজে চলেছিল আল্লাহ  আল্লাহ সুরধ্বনি


 

ডা. লুৎফর রহমান খান 

----------------------------------

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সুরসম্রাট আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গনে বার বার আগুন ভাংচুর করে চলেছে একদল অগ্নি সন্ত্রাসী। 

সুর সম্রাট আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গনের প্রতি,  সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁর প্রতি কেন অগ্নি সন্ত্রাসীদের এত বিভৎস বর্বর বিদ্বেষ!  

তারা কি জানে,  কে এই মহান সঙ্গীত উপাসক। তিনি বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া শ্রেষ্ঠতম সন্তান। 

এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটি তাঁর জন্য ধন্য। তাঁকে জন্ম দিতে পেরে ধন্য।  শুধু ভারতবর্ষ নয়, বিশ্ব সঙ্গীতের তিনি মহান সম্পদ।

কবি আল মাহমুদ এক লেখা য় জানিয়েছিলেন তার জীবনের দেখা শ্রেষ্ঠতম অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি অর্জনের কথা।

 


আল মাহমুদের নবীন যৌবনের দিনে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ একবার পদধূলি দিয়ে  ধন্য ও পবিত্র  করেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটি। 

সেখানে ও-ই ছোট শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীতাসরের। কিন্তু সেকালেও ধর্মান্ধ মোল্লা রা তাকে বিতাড়িত করতে মরীয়া হয়েছিল।
জেহাদি মিছিল করে ছিল।

আলাউদ্দিন খাঁ ওসবে দমেন নি । তিনি মঞ্চে উঠলেন। বাজাতে থাকলেন তাঁর সঙ্গীত যন্ত্র টি। সেই যন্ত্রে কেবলই আল্লাহ আল্লাহ সুরধ্বনি। তিনি সেতার বাজালেন। তাতে কেবলই অাল্লাহ অাল্লাহ সুরধ্বনি।
সেতার রেখে সানাই বাজালেন। কি অাশ্চর্য! তাতেও কেবল আল্লাহ আল্লাহ সুরধ্বনি।
পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে তিনি বাজালেন নানা বাদ্য যন্ত্র । নানা কেতায়, নানা সুরে। নানা মুন্সিয়ানায়। কিন্তু কেবলই তাতে বেজে চলছিল আল্লাহ আল্লাহ সুরধ্বনি।
সেবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোল্লা দের মুখ চুন হয়েছিল। তারা বিস্মিত হয়ে শ্রদ্ধা জানাতে বাধ্য হয় মহান আল্লাহ ভক্ত ওস্ততা দ আলাউদ্দিন খাঁ।
আলাউদ্দিন খাঁ বলেছিলেন সুরে সুরেই সুরেশ্বর। সুরই ইশ্বর। সুর অাল্লাহর ই মহান সৃষ্টি। সুর অাল্লাহ, ভগবান ইশ্বর, স্রষ্টার জন্যই বাজে।
মহান মানব সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁর সম্পর্কে কিছুই জানে না একালের অগ্নি সন্ত্রাসী জঙ্গিরা।

ভারত বর্ষের হৃদয় ছিলেন আলাউদ্দিন খাঁ। ভারত সরকার তাকে পদ্ম বিভূষণ এ সম্মানিত করে। 

অার এক মহত্তম সঙ্গীতগুরু ভারতরত্ন ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান  সম্পর্কে এক শ্রদ্ধা লিপিতে কবি শ্রী জাত বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন, তখন বিশ্বজোড়া খ্যাতি হয়েছে উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান সাহেবের। কেবল দেশে নয়, পৃথিবীর সর্বত্র সানাইকে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি, নহবতের বাইরে তার আলাদা অস্তিত্ব তৈরি করেছেন একা হাতে। মধ্য বয়সে পৌঁছচ্ছেন, তাঁর সতীর্থ দিকপালরা একে একে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন পাকাপাকি ভাবে। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সে-সময়ে মার্কিন সমাজে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত বিষয়ে উৎসাহের বিপুল এক ঢেউ এসেছে, ভারতবর্ষকে সুরের মধ্যে দিয়ে নতুন করে আবিষ্কার করছেন তাঁরা। আর সেই কারণেই, তাবড় গাইয়ে বাজিয়েদের অনেকেই দেশের পাট চুকিয়ে থিতু হচ্ছেন পশ্চিমের পাড়ে। বিসমিল্লাহ খান সাহেবও তখন পশ্চিমের একের পর এক দেশ ও শহর জয় করে বেড়াচ্ছেন, তাঁর অবিস্মরণীয় ফুঁ-এর দৌলতে।
এমন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে তাঁর কাছে এক অভাবনীয় প্রস্তাব এল। যতদূর শোনা যায়, সে-দেশ থেকেই এক ভদ্রলোক এই প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছিলেন তাঁর বেনারসের কোঠিতে। স্বাভবাবিকভাবেই, তিনি বা তাঁরা চাইছেন, খান সাহেব যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়ে সেখানকার উৎসাহী মানুষজনদের বাজনা শেখান। যাতায়াত করে নয়, একেবারে পাকাপাকি ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা হয়ে। সাম্মানিক নাগরিকত্বের প্রস্তাব নিয়েই ভদ্রলোক এসেছেন খান সাহেবের ভিটেয়। সঙ্গে সম্মানদক্ষিণা হিসেবে যে-অঙ্কের কথা বলছেন তাঁরা, তাকে লোভনীয় বললে কম বলা হয়। লোভনীয় এই কারণেই যে, তখন বিসমিল্লাহ খান সাহেবের উপার্জনের উপর নির্ভরশীল একটা গোটা পরিবার, যার সদস্য সংখ্যা নেহাত কম নয়। ফলে দেশে বিদেশে বাজিয়েও তিনি যে কিছু সঞ্চয় করে উঠতে পারছিলেন, তেমনটা নয়। তাঁর যাপন ভারী সাধারণ ছিল বলেই হয়তো, সবটা মিলিয়ে চলে যেত। সেই পরিস্থিতিতে এহেন প্রস্তাব লোভনীয় হতে পারে বৈকি। বিশেষত অর্থের সঙ্গে যখন প্রভূত সম্মানও জড়িয়ে আছে।
কিন্তু খান সাহেবের মতলব ছিল অন্য। তিনি প্রথমেই বললেন, ‘আমার এত বড় পরিবার, এতজন মানুষের সংসার, তাদের সকলকে এখানে ফেলে রেখে আমি একা কীভাবে যাব? এ হতে পারে না’। হয়তো এ-কথা বলেই ভেবেছিলেন, প্রথম চালেই কিস্তি মাত করেছেন তিনি, মানুষটি বেজার মুখে, খালি হাতে ফিরে যাবেন। কিন্তু তাঁর নিজেরও তখন কল্পনায় ছিল না, সংগীতপিপাসু পশ্চিমিরা উস্তাদ বিসমিল্লাহ খানকে পাবার জন্য কতদূর যেতে পারে। এ-কথা শুনে সেই ভদ্রলোক বিন্দুমাত্র চিন্তা না করেই বললেন, ‘এটা কোনও ব্যাপারই নয়। আপনার থাকবার জন্য বিশাল বাসস্থানের ব্যবস্থা হবে, আপনার সঙ্গে আপনার পরিবারের সকলকেই নিয়ে যাওয়া হবে। তাঁদেরও কাগজপত্রের ব্যবস্থা আমরাই করে দেবো। এবারে নিশ্চিন্ত তো?’
খান সাহেব পড়লেন বিপদে। আরও এক ধাপ এগিয়ে বললেন, ‘কিন্তু কেবল পরিবারের মানুষজন হলেই তো চলবে না, বেনারসে এতজন শাগির্দ আমার কাছে শিখতে আসে। তাদের তালিম ছেড়ে আমি যাই কী করে? সে হয় না’। উল্টোদিকে বসা ভদ্রলোক এটা আঁচ করে আসেননি। কিন্তু হার মানবেন না কিছুতেই, সে-প্রতিজ্ঞা করে এসেছিলেন। অগত্যা বললেন, ‘ওখানে তো আপনার নামে কলেজ হবে, আপনি চাইলে আপনার শাগির্দদেরও একে একে নিয়ে যাওয়া হবে। এবার নিশ্চয়ই আপত্তির আর কোনও কারণ নেই?’ বাজি জিতে গেছেন, এমন ভঙ্গিতে প্রশ্নটা করলেন ভদ্রলোক। কিন্তু তাঁর খেয়াল রাখা উচিত ছিল, সামনের মানুষটির নাম স্বয়ং বিসমিল্লাহ খান। যাঁর এক ফুঁয়ে শ্রোতারা মাতাল হয়। তাঁকে এত সহজে ধরে ফেলা যায় না।
খান সাহেব এবার মোক্ষম চালটি চাললেন। বাঁকা ঠোঁটের স্বভাবসিদ্ধ হাসিটি হেসে বললেন, ‘উও সব তো ঠিক হ্যায় বেটা। লেকিন ম্যায় রোজ সুবহ গঙ্গা মইয়া কে সামনে রিয়াজ করতা হুঁ। উনকো প্রণাম কিয়ে বিনা মেরা দিন শুরু নাহি হোতা। আপ থোড়া দেখিয়ে, অগর গঙ্গা মইয়া কো অমরিকা লে যা সকতে হ্যাঁয়। তো ফির মুঝে কোই এতরাজ নহি, ম্যায় আপকে সাথ চলুঙ্গা'। ভদ্রলোকের বুঝতে কিছুটা সময় লাগল যে, উস্তাদজী এবার আস্ত একখানা নদীকে তুলে নিয়ে যাবার কথা বলছেন। কিন্তু কেবল নদী তো নয়। একটা সভ্যতা, একটা সংস্কার, একটা শিকড়, একটা বন্ধনের কথা বলছেন বিসমিল্লাহ খান সাহেব। এক্ষেত্রে যার পোশাকি নাম গঙ্গা। ভদ্রলোক বুঝলেন, ভাণ্ডার উজাড় করে ডাকলেও এই মানুষটি বেনারসের গলি ছেড়ে এক পা নড়বেন না। সারা পৃথিবীর মাটি হাতে মেখে এসে আঁজলা করে তুলে নেবেন এই গঙ্গারই জল। অন্য কোথাও তাঁর শান্তি নেই। শেষমেশ পরাস্ত হয়ে ফিরলেন সেই মানুষটি। আর জয়ীর শেষ হাসি হাসলেন উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান।
আজকের ভারতবর্ষে দাঁড়িয়ে বিশ্বাস করা হয়তো কঠিন যে, এই দেশের মাটিতে এমন সন্তানেরাও থাকতেন। পৃথিবীর ইতিহাসে চিরকালই বড় নদীদের ধার ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বিরাট সব সভ্যতা। তেমনই এক সভ্যতার নাম উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান সাহেব। তেমনই এক তেহজিব তাঁর সানাই। যিনি কখনও সাময়িকের চমকে আবহমানকে বিসর্জন দেননি। আমার বিশ্বাস, তাঁর মৃত্যুর এত বছর পর, আজও যখন বেনারসের বুকে গঙ্গা জেগে ওঠে ভোরের প্রথম আলোয়, চোখ বন্ধ করলে সানাইয়ে শোনা যায় ভৈরবী’র আলাপ। যে-আলাপের মৃত্যু নেই, কেননা তা গঙ্গার মতোই বহমান, চিরন্তন, আদি।
আজ, তাকে প্রণাম জানাই। আমাদের সকলের শিকড়ে যেন তাঁর সানাইয়ের সুর লেগে থাকে, যতদিন বেঁচে আছি...

আপনার মতামত দিন:


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়