SAHA ANTAR

Published:
2021-02-16 09:44:55 BdST

সমাজ সেবক, মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসক অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামান : একুশে পদক পেলেন,অভিনন্দন


 

ডা: আরিফুর রহমান
অধ্যাপক শিশু সার্জারী
সিএমসি২৮

-----------------------------

একুশে পদক’২০২১ পাওয়ায় অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামানকে অভিনন্দন

( লেখাটি লেখবার আগে যখন স্যারের সাথে কথা বলছিলাম, উনি বার বার করে বলছিলেন- নিজের সম্বন্ধে বলতে লজ্জা পাবার কথা, বলছিলেন তিনি কাজের লোক , কখনো প্রচার কামনা করেন নি)

অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামান- প্রথমত একজন ভাল মনের মানুষ। উনি একজন সমাজ সেবক, একজন দেশপ্রেমিক, একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন চিকিৎসক।
সমাজসেবার উদ্দেশ্য নিয়েই , মানুষকে সেবা দেয়ার লক্ষ্যেই চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিলেন। উনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৫ম ব্যাচের ছাত্র। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রী শেষ করবার পর নিজেকে চিকিৎসা শাস্ত্রে আরো শাণিত করবার জন্য বিলাতে পাড়ি জমান। বিলাতে সার্জারীর উচ্চতর ডিগ্রী এফআরসিএসের জন্য পড়াশুনা করছিলেন। ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে আমাদের অধিকার আদায়ের মুক্তিযুদ্ধ। একজন দেশপ্রেমিক এই অবস্হায় কোনক্রমেই মাতৃভূমিকে পাশকাটিয়ে বইয়ে নিমগ্ন থাকতে পারে না। শুরু করলেন বিলাতে অবস্হানরত বাংগালিদের সাথে যোগাযোগ। উনি ছিলেন বিলাতের বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক। শুরু করলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত গড়ে তোলার কাজ। মুক্তিযুদ্ধের জন্য আর্থিক সাহায্য, সরন্জাম - অস্ত্র কেনার জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজ। শুরু করলেন ব্রিটেনের জনস্টোন হাউজ, হাউজ অব লর্ডস, হাউজ অব কমন্সে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থন আদায়ের দেনদরবার। ফ্রান্সে গেছেন মুক্তি যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র কেনার জন্য।
দেশপ্রেম এতই প্রবল এতেও কমছে না রক্তের টগবগানি। সিদ্ধান্তে নিলেন ফিরে যাবেন স্বদেশে , অংশগ্রহন করবেন সম্মুখ সমরে। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে তাদের সংগ্রহীত সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে পৌছান ভারত। সেখানে কোলকাতার ৮নং থিয়েটার রোডের মুক্তিযুদ্ধের কমান্ড কাউনসিল অফিসে দেখা করেন মুক্তি যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল উসমানির সাথে।
প্রথমদিকে কাজ করেন শরণার্থী শিবিরে। পরবর্তীতে আহত মুক্তিযাদ্ধাদের চিকিৎসা সেবাপ্রদানের জন্য ফিল্ডহাসপাতাল গড়ে তোলার ব্যপারে ডা: জাফরউল্লাহর সাথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
মনে মনে চিন্তা করছিলেন- আরও কিছু করার আছে তার। সেই ভাবনা থেকেই যোগদান সম্মুখ যুদ্ধে- কখনো ক্র্যাক প্লাটুনে , কখনো ২নং সেক্টরের মেজর হায়দারের সাথে। জয়পুরহাটের মুক্তিযাদ্ধা এমপি জনাব মফিজ চৌধুরীর ডাকে হিলি সীমান্ত দিয়ে আসেন জয়পুরহাট। এখানে পাঁচবিবি, ক্ষেতলাল, জয়পুরহাটের চিনি কল এলাকায় সরাসরি পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন। পাক বাহিনী যেদিন আত্মসমর্পণ করে অর্থাৎ বহুল কাংক্ষিত বিজয়ের দিনে উনারা বগুড়াতে পৌছান। পরে সেখান থেকে নিজ বাড়ি পাবনায়।

যুদ্ধশেষে আবার বিলাত। পড়াশুনা শেষ করেন- অর্জন করেন সার্জারীর সর্বোচ্চ ডিগ্রী এফআরসিএস। কিছুদিন বিলাতেই কাটান। ১৯৬৮ থেকে ১৯৮১ তে যুক্তরাজ্যে কাজ করেন ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে। কিন্তু প্রগাঢ় দেশপ্রেম তাকে বেশীদিন সেখানে তেস্টাতে দেন নি। ফিরে এলেন নিজভূমে। চোখে স্বপ্ন প্রতিটি বাংগালির সুস্বাস্হ্য। দেশে এসেই যোগ দেন ঢাকা শিশুহাসপাতালে। এখানে বিলাত ফেরত আরেক স্বপ্নবাজ ডা: এফ এম মাসুদের সাথে গড়ে তোলেন বাংলাদেশের প্রথম পেডিয়াট্টিক সার্জারী বিভাগ। সদ্যজাত শিশু , ছোট ছোট বাচ্চাদের সার্জিক্যাল সমস্যা গুলো এতদিন অবহেলিত কিংবা অমিমাংসিত ছিল। অধ্যাপক এ এফ এম মাসুদ ও অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামানের অবদানেই আজকের বাংলাদেশের শিশু সার্জারী এপর্যায়ে পৌঁছেছে।

চোখে যে অনেক স্বপ্ন, লক্ষ্য-পুরো দেশের মানুষের স্বাস্হ্য। সেই স্বপ্ন নিয়ে তারা কয়েকজন বন্ধু
মিলে ১৯৭২ সালে গড়ে তোলেন গণস্বাস্হ্য হাসপাতাল। গণস্বাস্হ্য প্রতিষ্ঠায় তাদের বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন ডা: জাফরউল্লাহ চৌধুরী, ডা: আলতাবুর রহমান (এখন ইংল্যান্ডে অবস্হান করছেন), অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামান, জনাব ডা:মবিন ( এখন ইংল্যান্ডে অবস্হান করছেন), ডা: বরকত চৌধুরী, ডা: নাজিমুদ্দিন সরকার( বর্তমানে টংগীতে থাকেন)।
এতকিছু করবার পরও মনের অপূর্ণতা থেকে যায়, লক্ষ্য পূরণ যেন দূরে থেকে যায়। অবশেষে কমিউনিটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়।

কমিউনিটি হাসপাতাল সম্বন্ধে এই স্বল্প পরিসরে সবিস্তার বর্ণনা সম্ভব নয়। এখানকার কর্মসূচীর মধ্যে আছে ঢাকা ও পাবনার দুটি বড় হাসপাতাল- যেখানে স্বল্পমূল্যে /বিনামূল্যে জনগণের স্বাস্হ্য সেবা নিশ্চিত করা হয়, আছে ৪ লক্ষেরও অধিক লোকের জন্য স্বাস্হ্যবীমা- বাৎসরিক মাত্র একশত টাকার বিনিময়ে পুরো বছরের ফ্রি স্বাস্হ্য সেবা, আছে কমিউনিটি বেসড স্বাস্হ্য সেবা- ৩০ টি স্বাস্হ্য কেন্দ্রের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্হ্য সেবা পৌছে দেবার কার্যক্রম, নিয়মিত হেলথ চেক আপ-স্যানিটেশন, টিকাদান,সেফ ওয়াটার ইত্যাদি সম্পর্কে জনসচেনতামূলক কার্যক্রম। এছাড়া আছে প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় সক্রিয় অংশগ্রহন। রোহিংগা ক্যাম্পে চারটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে যাচ্ছেন রোহিংগা জনসাধারণের স্বাস্হ্য সেবা। উল্লেখ্য অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামান , A-PAD(Asia Pacific Alliance for Disaster Management)-Bangladesh এর চেয়ারপারসন।

কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ, কমিউনিটি নার্সিং ইন্সটিটিউট কমিউনিটি হাসপাতালেরই সহযোগী প্রতিষ্ঠান। দেশের অন্যান্য বেসরকারী মেডিকেল কলেজের তুলনায় কমিউনিটি মেডিকেল কলেজে পড়াশুনার খরচ অনেক কম এবং পড়ালেখার ধরণও ব্যতিক্রম ধর্মী। কমিউনিটি বেসড লেখা পড়া- প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ১০ টি পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে বলা হয়- এর মধ্যে ৫টি শহুরে ও ৫টি গ্রামীন পরিবার। এতে করে চিকিৎসক জনগনের পারস্পরিক বোঝাপড়াটা ভাল হয় ও উভয়ের মধ্যের দূরত্বের ব্যবধান কমতে সাহায্য করে।

অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামান ও কমিউনিটি হাসপাতালের আরও একটি উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম- আর্সেনিক ম্যানেজমেন্ট ও আর্সেনিক নিয়ে গবেষণা। বিশ্বব্যাংকের সাথে যৌথভাবে একটানা দশ বছর কাজ করেছেন আর্সেনিক নিয়ে। সারা বাংলাদেশে কমিউনিটি হাসপাতালের তিরিশটি সেন্টারের মাধ্যমে জনগনকে আর্সেনিক সম্বন্ধে সচেতন করা, কিভাবে আর্সেনিক মুক্ত সেফ ওয়াটার পাওয়া যাবে, এসম্বন্ধীয় রোগে কি চিকিৎসা ইত্যাদি ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগীতা প্রদান করেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে আর্সেনিক আইন প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছেন।

পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তা কাজী নাঈম উদ্দীন ও মা হামিদা বানুর বারো সন্তানের অস্টম সন্তান অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামান। ১৯৪৩ সালের ২০ জুন রাজশাহীতে তিনি জন্ম গ্রহন করেন। ১৯৫৯ সালে পাবনা জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৬১ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ও ১৯৭৭ সালে এডিনবার্গ ও গ্লাসগো রয়াল কলেজ থেকে এফঅরসিএস ডিগ্রী লাভ করেন। প্রথম দফায় ১৯৮১ সালে ঢাকায় ফিরে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ও দ্বিতীয় দফায় ১৯৯৪ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু সার্জারী বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামানকে একুশে পদক ‘২০২১ পাওয়ার জন্য অভিনন্দন।
অভিনন্দন প্রিয় শিক্ষক।

ডা: আরিফুর রহমান
অধ্যাপক শিশু সার্জারী
সিএমসি২৮

আপনার মতামত দিন:


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়