ডাঃ রাজীব দে সরকার

Published:
2020-12-27 18:40:17 BdST

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় দেড়শ চিকিৎসক-এর জীবন দান  



ডাঃ রাজীব দে সরকার  
__________________________________

হাসপাতালে আমার রুমে ভর্তি রোগীদের অনেক স্বজনই আসেন। রোগ এবং রোগীর ব্যাপারে, অপারেশনের ব্যাপারে জানতে চান।

ইদানিং খুব কমন একটি প্রশ্ন পাচ্ছি, "স্যার এই করোনা রোগ যে কবে যাবে!?"

আমি একদিন বলেই বসলাম, "কোনদিন যাবে না!"

বলে নিজেই হোঁচট খেলাম! কি বললাম আমি!

উত্তরটা অতোটা না ভেবে দিলেও বেশ বুঝতে পারি আমার এই শঙ্কার কারন কী।

বাসা থেকে হাসপাতালে আসি, হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরি। শুধু এতোটুকুই যাত্রায় বুঝতে পারি, আমার দেশের মানুষ স্বাস্থ্যবিধির মতো প্রচন্ড সেন্সিটিভ একটা বিষয়কে কি পরিমাণ 'শৈল্পিক ফাইজলামি'র পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

ফাইজলামি শুধু করতে পারছেনা হাসপাতালের নার্স, হাসপাতালের প্রত্যেকটা কর্মচারী, ওয়ার্ডে কাজ করা পরিচ্ছন্নতাকর্মী আর স্বীকৃত 'অবিচার' এর শিকার হওয়া বালখিল্য পেশাজীবী প্রাণী আমরা (মানে ডাক্তাররা)।

গত ১০ টা মাস আমাদের কোন ছুটি নাই। না, সত্যি কোন ছুটি নাই। কারন হাসপাতালে বন্ধ থাকে না। দুপুর আড়াইটার পরেও হাসপাতাল বন্ধ থাকে না। রাত ১২ টার পরেও হাসপাতাল বন্ধ থাকে না। দুর্যোগে-উৎসবে, শুক্র কিংবা শনিবারে কখনোই হাসপাতাল বন্ধ থাকে না।

তাই আমাদের কাজ শেষও হয় না, কাজ থেমেও থাকে না।

গত ১০ টা মাস কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিয়ে আমরা কিছু জিনিস খুব স্পষ্ট টের পেয়েছি।

এদেশের "স্বাস্থ্য" এবং "বিধি" বরাবরই কিছু মানুষের কাছে কৌতুকের বিষয় ছিলো। তাই বার বার মাস্ক পড়তে বলেও আমরা মানুষকে মাস্ক পড়া শেখাতে পারিনি।


রাস্তায় একবার সময় নিয়ে ঘুরে আসুন আর নিজেই মনে ১.. ২... ৩... ৪... করে মানুষের মাথা গুণে যান। শুধু দেখুন কয়জনের মাস্ক আছে!


আর এবার দেখুন সেই মাস্ক টা কয়জন মানুষ সঠিক নিয়মে পড়েছেন। ইন্টারনেটের কল্যাণে অধিকাংশ মানুষই তো জানেন, মাস্ক ভুল ভাবে পড়া আর মাস্ক না পড়া একই কথা। মাস্ক পড়লেন থুতনিতে কিংবা নাকটা বের করে রেখে দিলেন, এই "মাস্ক-মশকরা" আসলে কার সাথে করছেন আপনি নিজেই ভালো জানেন।

হাসপাতালে কোরিডোরে হেটে আসার সময় আমার নিজের কানে শোনা কিছু মানুষের বক্তব্যের চুম্বক অংশ শেয়ার করার প্রয়োজন মনে করছি।

"করোনা মরোনা কিছু নাই, এগুলা ডাক্তার-বিজ্ঞানী গো শয়তানি। নতুন ওষুধ ব্যাচার ধান্দা"


"করোনা টেস্টের ব্যবসা জমানোর লেইগ্যা এতো করোনা করোনা রব। আসলে সব বোগাস"


"আমি যদি ৬ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলি, তাহলে মাস্ক পড়া লাগবে ক্যান?"


"মইরা গেলে যামু, তাও মাস্ক পড়ুম না। এই গরুর টোনা লাগায়ে বাঁচতে পারুম না"


"স্যার, করোনা টেস্ট করতে পারুম না। অপারেশন্ডা কইরা দ্যান। কিছু অইলে দ্যাহা যাইবো" (এক রোগীর অভিভাবকের আবদার)


এমনিতেই হাসপাতাল বাঙ্গালীদের আবদার এর সরাইখানা। আঙ্গুরের মতো থোকায় থোকায় আবদার ঝুলিয়ে অনেক রোগীর বিজ্ঞ স্বজনেরা আমাদের কাছে আসেন এবং রোগীর চিকিৎসায় বিঘ্ন ঘটান।

দেড়শ চিকিৎসক এর মৃতদেহ করোনার কলামে লিপিবদ্ধ হবার পরেও আমরা আমাদের কাজে এতোটুকু বিঘ্ন ঘটাইনি। আমরা ভুলে থেকেছি, আমাদেরও পরিবার আছে। আমাদের থেকে আমাদের প্রিয়মুখগুলো আক্রান্ত হচ্ছে, আমরা সেটাও ভুলে থাকছি। আমরা ভুলে থাকছি, এই রাষ্ট্রের কাছে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা 'ভাঙ্গা কুলা' ছাড়া আর কিছুই না।


তবু করজোড় অনুরোধ,
আপনি সঠিক নিয়মে মাস্ক পড়তে ভুলে যেন না যান।


কারণ
আমরা ক্লান্ত...
আমরা প্রচন্ড ক্লান্ত...

@@

আপনার মতামত দিন:


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়