Ameen Qudir

Published:
2020-04-10 17:44:16 BdST

একজন করোনা যোদ্ধার কাহিনি


ডা.রাজন সিনহা
___________________________

বাসায় ছোট তিনটা বাচ্চা আছে।ওরা বুকের মানিক,সুখের খনি।জমজ বাচ্চা দুটোর বয়স ২বছর। এই দুই বছর বয়সে ওরা ৫ বার ICU তে থেকেছে,জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়ে মা-বাবার কোলে এসে পরম স্নেহে বড় হচ্ছে। ছোট্ট সোনামনিদের মা-বাবা জীবনে সকল দুঃখ কষ্ট ভুলে থাকেন তাদের আদরের সন্তানদের মুখে তাকিয়ে।স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে সুখের ঘর ডা.আব্দুর রহিমের।

সোনামনিরা গত ৪ সপ্তাহ তাদের বাবাকে কাছে পায়না,কোলে ওঠেনা।কলিং বেলের শব্দের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ওদের দিন রাত পার হয়ে যায়। কিন্তু বাবার সাথে দেখা নাই।

দেখা হবে কি করে?বাবা যে বীর,বাবা যে সৈনিক।বাবা যুদ্ধে গিয়েছে,বাবা যোদ্ধা।বাবা দেশের তরে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধে করছে।

ডা.আব্দুর রহিম দেশমাতৃকার মেধাবী সন্তানদের মধ্যে অন্যতম।সারাজীবন প্রচুর পড়ালেখা করা মানুষটা বর্তমানে কর্মরত কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে। গত মার্চ মাসের ১৩ তারিখ বাংলাদেশ সরকার ডা.আব্দুর রহিম কে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে যোগদানের নির্দেশ দেয়।তিনি সাথেসাথেই পুরাতন কর্মস্হল শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেন।কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের তিনি করোনা কন্ট্রোল সেল এর জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন)।

বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ডা.আব্দুর রহিম দেশের প্রয়োজনে নিজের জীবনের মায়াকে ত্যাগ করেছেন,নিজের পরিবার এর পাশে না থেকে Covid-19 এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে এগিয়ে চলেছেন।করোনা আক্রান্ত রোগিদের চিকিৎসা করছেন,মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি যাচ্ছে।

প্রায় একমাস হতে চলল তিনি পরিবার, সন্তান,স্ত্রী থেকে দূরে আছেন।এই দুর্দিনে ঘরে স্ত্রী বাচ্চা গুলো নিয়ে কি করছে,কি খাচ্ছে, কে বাজার করছে,কে ঔষুধ কিনে দিচ্ছে তা সময়মত খোঁজও নিতে পারছেন না। ৮ দিন আগে জেনেছিলেন সোনামনিগুলো বাবার ছবি দেখে কাঁদে, বাবাকে কাছে পেতে চায়। অনলাইনে ভিডিও কল দিলে তিনটা বাচ্চাই বাবাকে দেখে সমানে কাদতে থাকে,কবে বাবা আসবে... নিরুপায় হয়ে, বাচ্চাদের সাথে অনলাইন যোগাযোগ ও বন্ধ করেছেন এই পিতা।

এই মহান পেশায় নিজেকে ভাইরাসের সমুদ্র ঠেলে দিয়ে অবিরাম কাজ করে চলেছেন আমার মেডিকেল কলেজের শ্রদ্ধেয় বড় ভাই ডা.আব্দুর রহিম।

এটি একটি খন্ড চিত্র মাত্র...

করোনা যোদ্ধা ডা.আব্দুর রহিমের মতন সারাদেশের হাজার হাজার চিকিৎসক আজ বুক চিতিয়ে সামনের সারিতে থেকে যুদ্ধ করছে,করোনা মোকাবেলায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই জাতীয় সংকটকালিন সময়ে এসকল দেশপ্রেমিক বীরদের পাশে আমাদের থাকার খুব দরকার ছিলো।

এই চিকিৎসকদের অনুপ্রেরণার খুব দরকার,প্রচন্ড পরিমানে দরকার ভালোবাসার।যে প্রেরণা আর ভালোবাসা তাদের মনটাকে শান্ত রাখবে,যে ভালোবাসা তাদের সুস্থ মনে কাজে মগ্ন রাখবে।এই চিকিৎসকরা টাকা পয়সা, অনুদান,প্রণোদনা কোন কিছু চেয়ে এই যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরেনি।বরং যখন সবকিছু অগোছালো,কি হবে না হবে এই ভয়ে সবাই ভীত তখন এই যোদ্ধারা মহাসমুদ্রে ঝাপ দিয়েছে।তাদের জন্য শ্রদ্ধা, তাদের দরকার ভালোবাসা। আমরা চিকিৎসকদের পাশে দাড়ালে,তাদের সাপোর্ট দিলে দেশ বাঁচবে -জাতি বাঁচবে।

জাতিয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার বিখ্যাত লাইনগুলো কানে বেজে চলেছে অবিরত....

মোদের লক্ষ্য চির-অটল
অগ্র-পথিক ব্রতীর দল,
বাঁধ রে বুক,চল্ রে চল্।।

ডা.রাজন সিনহা
খুলনা মেডিকেল কলেজ

আপনার মতামত দিন:


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়