Ameen Qudir

Published:
2020-03-22 10:22:30 BdST

করোনা যুদ্ধে শামিল একজন যোদ্ধা চিকিৎসকের কাহিনি


প্রতিকী ছবি।

 ওয়াসিম ইফতেখায়রুল হক
_______________________

করোনা যুদ্ধে শামিল একজন যোদ্ধা চিকিৎসক রঙ্গন। আপন মানুষদেরকে ছেড়ে অন্য শহরে পরে আছে হাসপাতালে। এই শহরে ১৫৭ জন রোগী আছে কোয়ারান্টাইনে। ভয় না পেয়ে ডিউটি করে যাবে ভাবলেও আজকাল ভয় পাচ্ছে সে। মৃত্যুর আতঙ্ক হচ্ছে তার। মন খারাপ লাগছে আপন মানুষদের জন্য । প্রিয় মানুষটির কাছে ডাক্তার রঙ্গন আবদার করেছিল ওকে নিয়ে একটা গল্প লিখতে ....... যদি আর কখনো দেখা না হয় এই জীবনে....
বিদায়ী উপহার হিসেবে চেয়ে নিয়েছিল একটা লেখা।

করো-না
~~~

কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ। দিন দুনিয়ার মানুষ যখন আদেখা শত্রুর ভয়ে তটস্থ আমি তখন নেমেছি এক বিলাসী খেলায়। সকাল বেলা বেড়িয়ে পরি ঘর থেকে, হাঁটতে থাকি ফুটপাতে। এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পৌঁছুতে তিনটে দিয়াশলাই কাঠি খরচা হয়ে যায়। ধোঁয়া উড়িয়ে দেই আকাশের পানে। ইদানীং অবশ্য সিগারেট টেনে সুখ টান আসে না। বয়স বাড়ছে, গলার ভিতর অস্বস্তি হতে পারে সুখের টান দিতে না পারার কারণ। আবার হতে পারে ভেজাল দেশ, ভেজাল ভোট, ভেজাল শাষনের যুগে স্মুথ ক্রিমিনাল সিগারেটেও হয়তো ভেজাল চলে এসেছে। কি আশ্চর্য ক্রিমিনালও এখন ভেজাল হয়। একটা সময় সিগারেট যখন শুরু করি, তখন থেকে আজ অব্দি বেনসন & হেজেসেই আছি। একটা মচমচে ভাব ছিল বেনসনে। সেই বেনসন এখন কেমন যেন পুতিয়ে গিয়েছে। বুকের বদলে মুখে আগুন ধারণ করলে এই জাতটাকেও সিগারেটের মত পুতিয়ে মরতে হবে।

সকাল ৭ টা বেজে গিয়েছে, তড়িঘড়ি করে এ্যপ্রোন, আর মাস্ক লাগিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছোটে রঙ্গন। তারে কদিন ধরে বলছি যথাযথ প্রোটেকশন কিট সাথে রাখতে। কিন্তু মেয়ে মানুষ বলে কথা। এরা প্রটেকশন বলতে বার্থ প্রোটেকশন আর স্যানিটারি ন্যপকিনের বাইরে কিছুই বুঝতে চাই না। সময় এগিয়ে যায়, শিক্ষা দীক্ষা'য় টেনশন এগিয়ে যায়, অভাব অভিযোগের ঝাগপি এগিয়ে যায় কিন্তু নারীকূলের প্রোটেকশন চিন্তা এগিয়ে ন্যাপকিনে আটকে যায়।

কদিন রঙ্গনের হাসপাতালে ভীড়ভাট্টা একটু বেশি। যে বুড়ো ছমাসেও একবার আসেনা চেক আপ করতে সেও হন্তাদন্ত করে ছুটে আসে ম্যডাম আমার তো ভোর রাতে কাশি'র মত হয়… কাশি দিলেই ওখানে পাতলা আঠালো জলের মত বের হয়..ফার্মেসির ডাক্তার স্যার কইসে শইলের সব প্রোটিন বের হয় নাকি..

এয়ারপোর্ট ষ্টেশনে কটা টি-ষ্টল আছে। দুধ হালকা আঁচে চব্বিশ ঘণ্টা জ্বলতে থাকে, সাথে টোস্ট বিস্কুটের গুড়ো মিশিয়ে বানানো হয় চা। অমৃতর মত চা। সেই চা খেতে এলাকার চোর বাটবার থেকে এয়ারপোর্টের বড় বড় অফিসারের মত টাই লাগানো চোর-বাটপাররাও আসে। বিদেশ ফেরত যাত্রীরা এই স্টেশন থেকে বাড়ির পথে ট্রেনে ওঠে। ওঠার আগে চা খেতে জমা হয় এই টি-ষ্টল গুলোয়। আমি আলগা খাতির জমাতে চেষ্টা করি এদের সাথে..হাজী ক্যাম্পের বদলে বাড়ি যাবার সুযোগ পাবার জন্য বেশ ক'খানা চকচকে নোট খরচ করতে হয় এদের। আমি কথা বলি, হ্যান্ডসেক করি, খাতির বেশি জমলে হাগ করে বিদায় জানাই। তবুও সর্দী কাশি ঠান্ডা কোনটাই লাগেনা আমার। আমার খুব ইচ্ছা করে এদের কারো শরীরের কালো অসুখ আমার শরীরে বাসা বাঁধুক। এয়ারপোর্ট পর্ব শেষ করে বাসে উঠেপড়ি। চলে আসি কার্জন হল সচিবালয় এলাকায়। কখনো কখনো চলে আসি কমলাপুর ষ্টেসনে। প্রতিটি রাতেই স্বপ্ন দেখি কালো অসুখ বুঝি আশ্রয় নিল আমার শরীরে।

আমি মৃত্যু কামনা করি। ভয়ংকর একাকী মৃত্যু। কেউ যেন আমার মৃত লাশ ছুতে না পারে। সন্তানরা বাবা-বাবা চিৎকারে ঝাপিয়ে পরতে না পারে আমার বিদেহী শরীরে। প্রেমিকা যেন আঁচলে চোখ ঢেকে দাতে ঠোট কামরে অশ্রুপাত করতে না পারে আমার লাশে। কি এক অজানা অভিযোগ অভিমানের বিষে নীল হয়ে থাকে আমার দেহ মন প্রাণ। কি সেই অভিমান কি সেই অভিযোগ নিজেও কি জানি তার কিছু?

প্রায় নীশিথে ঘুম ভেঙে যায় আমার। এক কাপ ইন্সট্যান্ট কফি বানিয়ে হাভানা চুরুট জ্বালিয়ে খোলা ছাদে হাটাহাটি করি আমি। রুফ রকে মিউজিক সিষ্টেম চালু করে দিই..
আমি চিরতরে দূরে চলে যাব তবু আমারে দেবনা ভুলিতে, আমি বাতাস হইয়া জড়াইব কেশ বেণী যবে যাবে খুলিতে…

দুঃখ বিলাশী আহাম্মকের মত আমি আমার অনুপস্থিতির জ্বালা হারে হারে টের পাওয়াতে চাই সবাইকে। তোমাদের সমাজ থেকে দূরে কোথাও মরে গিয়ে পঁচা গলিত লাশ হয়ে শেষ যাত্রায় শামিল হতে ইচ্ছা করে আমার। শেষ সৎকারের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য থেকে বঞ্চিত করতে চাই আমি সবাইকে।

রঙ্গন বহুবার চেষ্টা করেছে এই তাড়নার কারণ খুঁজতে। কখনো পেরেছে কখনো পারেনি। আসলে পারতে দিইনি আমি। আমার তো যোগ্যতা, স্বক্ষমতা আত্মবিশ্বাস বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই, সেই অযোগ্যতা ঢাকতে আমারে আমার নিজের চারপাশে রহস্যর ঘেড়া টোপ খাঁচা তৈরি করতে হয়। অন্ততঃ এই ঘেরা আবরণ তৈরি করতে পেরেছি স্বার্থকভাবে।

হতাশা, ব্যথা আর আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে সব শক্তি হারিয়ে আমি যখন একটা জীবিত লাশের মত হয়েছিলাম রঙ্গগনের সাথে তখনই চেনাজানা আমার। হয়তো রঙ্গগনের আত্মবিশ্বাসের ছোঁয়ায় আমার ভেতরেও জেগে উঠতে চেষ্টা করেছিল হারিয়ে যাওয়া শক্তি। সত্যি কথা বলতে জীবন ফিরে পাবার আকাঙ্ক্ষা আমার ভেতর জন্ম দিয়েছিল ও।

কিন্তু ঐ যে অভ্যাস, খারাপ থাকার অভ্যাস সেই অভ্যাস তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় আজো আমাকে। যতক্ষণ রঙ্গনের মুখোমুখি থাকি ততক্ষণ বেশ স্বাভাবিক থাকি আমি। কোন জড়তা বিষন্নতা ছুঁয়ে যায় না আমাকে। চোখের আড়াল হলেই আমি আবার সেই আগের আমি। নোংরা কীটাণু কালা অসুখের মত মরণঘাতি আমি।

আমি বাসে উঠে বসি। আমার আঙুলের ফাকে কৌশলে আলপিন ধরা। নামার সময় পেছন থেকে কারো না কারো পশ্চাৎ দেশে এই পিন ফুটাব আমি। আজ পুরুষ যাত্রীর সংখ্যা কম, নারী বেশী। ভীড়ের ভেতর নারীদের পশ্চাতে শুচালো পিন ফুটিয়ে দেবার মজাই আলাদা। আমি অবশ্য সব নারী পুরুষের পেছনে পিন ফুটায় না। আমার কাছাকাছি বয়সী পুরুষ আর আর আনুমানিক ২৮-৩৫ বছর বয়সের নারীর পাছাই আমার পছন্দ। আসলে তাদের পশ্চাৎ পছন্দ তা না। বরং পশ্চাতে পিন ফুটানোর পর তাদের আর্তচিৎকার আমার পছন্দ, পাংশু হয়ে যাওয়া চেহারা আমার পছন্দ। বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আমি লক্ষ করি, যতদূর চোখ যায় লক্ষ করি। লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে উন্মুক্ত রাস্তায় নারী পুরুষের ব্যথার্ত পাছা চুলকানি দেখে প্রমোদ পাই আমি। পাছায় পিন ফুটায় বলে আমারে মন্দ চরিত্র ভাববেন না। পাছাতে ফুটানো সবচে নিরাপদ তাই পাছাতেই ফুটাই।

আমি অবশ্য সব নারী পুরুষের পেছনে পিন ফুটায় না। আমার কাছাকাছি বয়সী পুরুষ আর আর আনুমানিক ২৮-৩৫ বছর বয়সের নারীর পাছাই আমার পছন্দ। আসলে তাদের পশ্চাৎ পছন্দ তা না। বরং পশ্চাতে পিন ফুটানোর পর তাদের আর্তচিৎকার আমার পছন্দ, পাংশু হয়ে যাওয়া চেহারা আমার পছন্দ। বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আমি লক্ষ করি, যতদূর চোখ যায় লক্ষ করি। লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে উন্মুক্ত রাস্তায় নারী পুরুষের ব্যথার্ত পাছা চুলকানি দেখে প্রমোদ পাই আমি। পাছায় পিন ফুটায় বলে আমারে মন্দ চরিত্র ভাববেন না। পাছাতে ফুটানো সবচে নিরাপদ তাই পাছাতেই ফুটাই। ফুটিয়েই পিন টা আস্তে করে ফেলে দিই। পেছনে ঘার ঘুড়িয়ে আমাকে দেখেও কেও সন্দেহ করতে পারে না। ভাবে বাসের সিটে হয়ত ছারপোকা ছিল বা আন্ডার ওয়ারে লাল পিঁপড়া...আমি মধুর ভুবন ভুলানো মায়াবী হাসি দিয়ে তাকানোর প্রতিউত্তর করি। আমার ইচ্ছা করে এই কুৎসিত শুয়োরগুলোর চোখের মনি আর যৌনাঙ্গতে যদি ইচ্ছা মত সুচালো পিন দিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করতে পারতাম… আমার মাথার সব যন্ত্রণা বুঝি লাঘব হত। হাজার বছর বয়ে চলা ঘৃনার পারদ হয়ত বাষ্পীভূত হত। এই বয়সের নারী পুরুষ মানেই একেকটা পাগলা কুকুর। বিশ্বাস ঘতকতা ছাড়া যেন আর কোন কাজ নেই এদের। যেন এদের প্রত্যেকের জন্ম হয়েছে কোন আনজানি বীর্য ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়ে।

ফোন হাতে নিয়ে দেখি রঙ্গনের অনেকগুলো মিস কল। টেক্সটে দেখি ভার্চুয়াল ওয়ালেটে ২৫৮০ টাকা জমা হয়েছে। নিশ্চয় রঙ্গন পাঠিয়েছে। ২৫০০ টাকা আমার আর ৮০ টাকা সার্ভিস চার্জ।

রঙ্গন লিখেছে অন্ততঃ আজ বা কাল যেন ওর সাথে দেখা করে আসি আমি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ২য় বার ইতস্তত করিনা। আমার বিশ্বাস এই দফার কালা অসুখে আমার অসভ্য জীবনের শেষ লেখা আছে। কালো অসুখে মৃত্যু হলে কেউ লাশ ছুঁয়ে দেখেনা, গোসল দেয় না, কারো চোখে জল ঝরে না- এমন মৃত্যু তো আমার সাধনা.. অতএব রঙ্গনের সাথে শেষ দেখা করে আসাই উচিৎ।

শুনেছি রঙ্গন মহা ব্যস্ত। ২৪ ঘন্টার অন কল ডিউটি। মেডিসিন কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটেটিভ থেকে রোগীর সাথের আলগা ভিজিটর সব নিষিদ্ধ করেছে রঙ্গনরা। হাসপাতালের একটা ছোট্ট ওয়ার্ড আলাদা করে সেখানে পালাক্রমে ঘুম আর বিশ্রাম নেয় ওরা। হাসপাতালের এম্বুলেন্স ড্রাইভার থেকে শুরু করে অফিস পিয়ন আর ঝাড়ুদার - সব গুলারে ধরে বেঁধে হাতে কলমে পেশেণ্ট ম্যাণেজমেন্টের প্রাথমিক কলা কৌশল শিখানো হয়েছে। যেমন ইঞ্জেকশন গ্রুপ আলাদা করা, সিরিঞ্জের সাইজ বুঝা, রক্ত নেবার বিকারে লেবেল লাগানো বা ক্যথেটার খুলে নিরাপদে ফেলে আসার নিয়ম কানুন - এসব।

কিছু কিছু মেডিকেল ষ্টুডেন্ট জুটেছে তাদের সাথে। তারা একটু কারনে অকারনে উত্তেজিত অবস্থায় আছে। এই কোন পেসেন্ট কে বকাবকি করছে যে পাবলিক প্লেসে বায়ু ত্যাগ করা কতটা অসভ্যতা আবার কিছুক্ষণ পর দেখা যাচ্ছে হাসপাতালের কিচেন ভিজিট করে তিল পরিমান নোংরা দেখলেও ম্যজিষ্টেট রকোনুদ্দৌলার মত ঝাঁপিয়ে পরছে।

বড় বড় ডাক্তাররা অবশ্য টেলিভিশনে ইন্টার্ভিউ নিয়ে বেশী ব্যস্ত। টক-শোতে হাজিরা দেবার ব্যস্ততার কারণে হাসপাতালে আসা হচ্ছে না তাদের। এদের অবস্থা অনেকটা ১৯৭১ সালের কলকাতায় আশ্রয় নেয়া রাজনীতিবিদদের মত। মেডিকেল ষ্টুডেন্টগুলো নেমেছে গেরিলা যোদ্ধাদের ভুমিকায়। আর রঙ্গনদের মত মাঝ বয়সি ডাক্তাররা যেন একেকজন কমান্ডার..কমান্ড কাউন্সিল বিহীন এক অসম যুদ্ধ….

আমার বেশ ভালো লাগে এসব শুনে। হঠাৎ ইচ্ছা হয় আমার আশু নিশ্চিত মৃত্যুটা যদি রঙ্গনের রুগী হয়ে তার হাতেই হত! হয়তো ষ্টেটিস্কোপ আমার বুকে ধরে গভীর শ্বাস শুনে আশ্বস্ত হল রঙ্গন, মুখে দেখা গেল চওয়া হাসি। ওর সেই হাসি দেখেই আতকে উঠলাম আমি। মূহুর্তে পিঞ্জিরার প্রাণের পাখি থামিয়ে ডাকাডাকি উড়ে যায় অনুশাসনের ফাঁক গলে। রঙ্গন সেই প্রাণপাখি ধরতে প্রাণপণে দৌড়চ্ছে...আমি জানি বৃথাই তার কারিগরি..

নিয়ম ভাঙ্গার নিয়মে আমার বরাবর আগ্রহ। ডাক্তার রঙ্গন ডাক্তার হওয়া স্বত্তেও আমারে ডাকছে, বিষয়টা আমোদ দিচ্ছে আমারে.. আমি ঘরে ফিরে যাবতীয় প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। সময় নিয়ে সেভ করলাম, অবাঞ্ছিত লোম বিলোপ করলাম। হট ওয়াটারের কল ছেড়ে দিলাম বাথটাব পূর্ণ হতে। ডাক্তার রঙ্গন আর তার স্যারদের কড়া বারণ আছে গরম পানিতে শাওয়ার যেন না নিই। আমার চিকিৎসার বড় অংশ জুড়ে আছে আইস ওয়াটার থেরাপি। মাঝরাতে যখন শরীরের রক্ত হাড্ডিমাংসে জ্বালা শুরু হয় তখন গা'য়ে বরফ কুচি মিশ্রিত পানি ঢালা হয়। শীতল জলে শরীরের যন্ত্রণা না তেমন না কমলেও মন টা ঠান্ডা হয়ে আসে। সেই ছোট্ট বেলার স্কুল জীবনে কাঠের বাক্সে বরফ দিয়ে আইস্ক্রিম বিক্রি হত। শৈশবের সেই লাল রঙা আইসক্রিম খাবার মত ঠাণ্ডা হয়ে আসে দিল। নিজেকে সুখি সুখি লাগে। ৮/১০ ফোটা অডিকলন ছেড়ে দিই বাথটাবের উষ্ণ জলে। দু আউন্স হোয়াইট ওয়াইন গেলাসে ঢেলে টাবের পাশে রাখি। সব প্রস্তুতি শেষ করে নেমে পরি সিনানে।

ওয়াইন খেয়ে টাবে নামা এমনিতে বিপজ্জনক। তবুও আমি এই কাজটা করি, কোন একদিন দুর্ঘটনা ঘটবে আশা করে কাজ টা করি।

আজ টাবে নেমে সত্যিই ঘুমিয়ে পরেছি আমি। যখন টের পেলাম আমি টাবে ঘুমচ্ছি শরীরে হটাৎ তীব্র বিদ্যুতের তরিৎ প্রবাহ বয়ে যায় আমার। আজীবন নিষ্ঠুর মৃত্যুর কামনা লালন করা আমি ভয়ে কুঁকড়ে উঠি মৃত্যু ভয়ে। কেবল রংগনের মুখচ্ছবি ভাসতে থাকে চোখে...নাহ জীবন টা বুঝি এতটা বিভৎস নয়, যতটা আমি দেখেছি।

পরক্ষনেই আমার বেচে থাকা অতীত আর বর্তমানকে মিলিয়ে দেখতে চেষ্টা করি। অতীতের পানে চোখ রাখি। চোখে ভেসে ওঠে প্রায় ১৫ বছর আগের ছবি। কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের সংবাদ এসেছে, তাই ৫ দিনের ভিজিট কমিয়ে আজই ঢাকায় ফ্লাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ঢাকা থেকে ইষ্ট এশিয়া খুব দূর তো নয়! ঈদের সময় ঢাকা থেকে গাজিপুর পৌঁছবার আগেই ঢাকা থেকে ব্যাংকক বা সুমাত্রা পৌঁছানো যায়…
বাড়ি ফিরে চাবি দিয়ে ঘরে ঢুকে দেখি নীলার আর আমার স্লিপিং গাউন বিছানাতে এলোমেলো পড়ে আছে, অথচ মাস ছয়েক এই গাউনে হাত দেবার দরকার হয়নি।
আমার লাইব্রেরী রুমে ভদকা খাওয়া দুটো গ্লাস, হোম থিয়েটারে পজ হয়ে আছে রোমান হলিডে। ৩০০ বছরের পুরান কাঠের তৈরি এষ্ট্র্বতে পরে রয়েছে সিগারেটের অজস্র ফিল্টার। ফিল্টারে ব্রান্ড নেম শোভা পাচ্ছে মার্লবোরো। মার্লবোরো তো কোন দিন ই আমার ব্রান্ড
মার্লবোরো তো কোন দিন ই আমার ব্রান্ড নয়… দুয়ে দুয়ে চার মিলাতে দেরি হয় না আমার...

নাহ্ নীলার দেয়া সে সব নীলচে বিষাক্ত দিনের কথা ভুলেও মনে করতে চাই না। নীলা সব নারী'র প্রতিনিধিত্ব করেনা। রঙ্গন আমার প্রিয় নারী, তাই বলে রঙ্গনকে দিয়েও অন্যদের বিচার করা যায় না। রঙ্গন-ও সমস্ত নারী কূলের প্রতিনিধিত্ব করে না। পৃথিবীতে প্রতিটা প্রাণ-ই ইউনিক। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা জীন। একজনের সাথে অন্যজনের কিছু না কিছু পার্থক্য থাকবেই। অন্তত ১ শতাংশ হলে হবে।

এই যে আমি একজন মানুষ প্যাথলজিকাল রেসিষ্ট, নির্দিষ্ট বয়স ও লিঙ্গ'র প্রতি আমার তীব্র ঘৃণা। আবার নীলাও একজন মানুষ যার শুধু আমার প্রতি ছিল তীব্র ঘৃণা। অন্যদিকে রঙ্গন- প্রতিটি বিপদের মুখে পড়া জীবনের জন্য তার সব আকুলতা। পার্সোনাল সিকিউরিটি কিটের তোয়াক্কা না করেই নেমে গিয়েছে মানুষের জীবন বাঁচানো যুদ্ধে। অথচ আমি অথবা নীলা বা রঙ্গন সাইন্টিফিকালি আমাদের ৯৯% জিন-ই এক রকম। মাত্র ১ শতাংশ জেনেরিক ভিন্নতা কাউকে পাগল বানিয়েছে, লাফাঙ্গা ছন্নছাড়া, আবার কাউকে বানিয়েছে দরদী মানুষ, কাউকে করেছে বিশ্বাস ঘাতগতার বর্গা চাষী।

ভাবতে ভাবতে কিছুটা ভয় কেটে যায় আমার। আমি ব্লু ডেনিমের ওপর সাদা হাফহাতা শার্টের বোতামগুলো লাগাতে শুরু করি। সেল ফোন ফ্লাইট মুডে দিয়ে, বহুদিন পর ষ্টার্ট করি হার্লে ডেভিডসন মটর বাইক। আজ রঙ্গনকে তুলতে হবে বাইকে। ঘণ্টা দুয়েক ছুটি ওরে নিতেই হবে আজ। ডাক্তারি ফাক্তারি, মানব সেবা, জীবন যুদ্ধ এসব ঘণ্টা দু তিনেক বন্ধ থাকলে আহামরি কিছু হবে না। যেখানে ভোটার ছাড়া ভোট হয়ে যায়, সেখানে ঘণ্টা ২/৩ ডাক্তার ছাড়াও হাসপাতাল চললে সমস্যা হবার কথা না। সব কিছুই নীপাতনে শুদ্ধ হতে হবে এমন কোন কথা নেই। ওরে নিয়ে সোজা চলে যাবো মাটির ঘরে। যান্ত্রিক এই নগরে মাটির ঘর নামের রেস্তরাতে আজো সোদা মাটির ঘ্রাণ পাওয়া যায় ওখানে। রঙ্গনই সন্ধান বের করেছে এই রেস্তোরার।

আমি কাছাকাছি চলে এসেছি। টি-ষ্টলে দাঁড়িয়েছি চা আর সিগারেট খেতে। সেলফোন টা চালু করে রিং দিলাম রঙ্গন কে। ধন্যবাদ নাই বা জানালাম, অন্তত টাকা'র প্রাপ্তি স্বীকার তো জানাতে হবে তারে। কথা বলার মিনিট কুড়ি পর হাসপাতালে আমাকে দেখলে নিশ্চয় ভুত দেখার মত চমকে উঠবে সে… অথচ মুখে কিছুই স্বীকার করবে না। তার চকচকে চোখে শুধু বয়ে যাবে খুশির ঝিলিক।

কড়া লিকারে দু কাপ চা খেতে খেতে দুখানা সিগারেট শেষ করলাম আমি। হেলমেট লাগিয়ে ষ্টার্ট দিলাম বাইক। এদিকটাতে মহামারির ভয়ে ভীত রাস্তাঘাট একেবারেই ফাঁকা।ঘড়ি ধরে ১২ মিনিটের মাথায় পৌঁছে গেলাম হাসপাতালে। হাসপাতালে প্রচুর রুগী স্বত্তেও নিস্তব্ধতা চেপে ধরেছে চারপাশ থেকে। কারো মুখে কোন কথা নেই। প্রায় সবার চোখ ই পান্ডার মত ডার্ক সার্কেল। কপালে কুঞ্চিত অসহায়ত্ব। এই প্রথম আমি কালা অসুখের ভয়াবহতা উপলব্ধি করলাম। চারিদিকে একটা নিঃশব্দ হাহাকার। হাসপাতাল এলাকার ফুটপাতের দোকান পাটগুলো কিচ্ছু নেই। ইচ্ছা ছিল এখান থেকে এক গুচ্ছ রজনীগন্ধা নেব তারে চমকে দিতে। এখানকার কুকুরগুলো আমাকে দেখলেই ছুটে আসে, হয়তো ওরা বুঝে এলাকার ভবিষ্যত কোন আত্মীয় হতে যাচ্ছি আমি। আজ কোন কুকুরের নিশানাও দেখতে পেলাম না। প্রাণের অস্তিত্ব যেন জড় পদার্থের রুপ ধারণ করেছে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি আর এক মূহুর্ত্ব রঙ্গন কে এখানে থাকতে দেব না। রেস্তরাঁ প্রোগ্রাম বাদ। বাইকে তুলে সোজা ঢাকা চলে আসব ওরে নিয়ে। ইলেক্ট্রনিক মেইলে রিজাইন লেটার পাঠিয়ে দেয়া হবে। রঙ্গন আমার সাথে পালিয়ে যেতে অস্বীকার করবে জানি। যুদ্ধ ক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মানুষ সে না। যারা রনাংগন মুকাবিলার ভয়ে জীবন নিয়ে পালিয়ে যায় তারা তো কাপুরুষ, নির্বীর্য। তবুও রঙ্গনকে মিথ্যা বলে, ফাঁদে ফেলে হলেও নিয়ে যাব আমি। যদি আজীবন আমারে ঘৃণা করে তাতে, তো করুক। এই মৃত্যু উপত্যাকায় রঙ্গনকে মরতে দিতে পারিনা আমি।

এদিক ওদিক তাকিয়ে রঙ্গনকে দেখলাম না। হয়তো ব্যস্ত রোগী নিয়ে। দেরি হলে হোক সারপ্রাইজ দিতেই তো চাই আমি। তাড়াহুড়ো করলে কি আর সারপ্রাইজ হয় নাকি!

রঙ্গনের রুমে বসে আমি প্রায় আধাঘণ্টা হয়ে গেছে। নেটে নিউজ দেখলাম এই ছোট্ট শহরে আজ হোম কোয়ারেন্টিনে গিয়েছে ১৫৭ জন মানব সন্তান। তবে আক্রান্ত কাউরে পাওয়া যায়নি। এখন কিছুটা বিরক্ত তো লাগছেই। এত কিছু ভেবে যখন দেখা যাবে ঘটনাই ঘটেনি তখন বিরক্ত লাগারই কথা। এরচে ওকে জানিয়ে আসাই ভালো ছিল।

ম্যানেজার এসে বলল স্যার এদিকে আসুন। একটা শীতল কক্ষে ঢুকতে বলা হচ্ছে আমাকে। আমি খুবই বিরক্ত বোধ করছি। হাত, পা, মুখ, মাথা শরীর সব পাতলা নীল আবরণে ঢেকে মোটামুটি এলিয়েন বেশে ঢুকলাম। দক্ষিণ কোনে একটা যন্ত্রদানব ধরনের বেডের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। নাক মুখ পেট সব কিছুতেই যন্ত্র লাগানো...হার্ট রেট উঠানামার মনিটরে দেখলাম বুকের হাফরের ওঠা নামার শব্দ। সাদা চুলের ডাক্তার বলেতে শুরু করল জয়েনিং ফর্মে দেখলাম আপনার নাম দেয়া অথচ আমরা জানি সে বিবাহিত নয়...ডিভোর্সি। ব্যসিকালি টানা ৫ দিন ৬ রাত নাওয়া খাওয়া প্রায় ভুলেই ডিউটি করছিল ওরা। সেল্ফ প্রটেকশন তেমন নেই আমাদের, এফেক্টেড তো কিছুটা হয়েছেই। সাথে দুশ্চিন্তা ছিল, প্রেসার খুব-ই লো হয়ে গিয়েছিল। দায়িত্বশীল ডাক্তার হিসাবে তার নিজের ই রিপোর্ট করার কথা। সময় মত রেসপন্স পেলে কিছুই হত না। কিন্তু এই যুদ্ধ দামামার আবেগে সে মজে গিয়েছিল।

আপনি অনুমতি দিলে আমরা অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ করব। আমাদের রিপোর্ট অনুযায়ী এ ধরনের কেইসে রিকাভারি রেট পুওর, ভেরি পুওর। তার ওপর প্রেগনেন্সির ক্রিটিকাল সিচুয়েসন.. আপনি সিদ্ধান্ত দিলে আমরা ফর্ম প্রোভাইড করব… সাইন করবেন।

ডাক্তার রুম ত্যাগ করল। আমি রঙ্গনের হাতটা খুব সাবধানে ধরলাম। নল লাগানো ঠোঁটে আলতো করে চুমু খেলাম। তলপেটে হাত রেখে বাচ্চাটার নড়াচড়া বুঝতে চাইলাম। পিঠ বাঁকিয়ে ঠোট ছোঁয়ালাম পেটে, কিছুক্ষণ মা আর মা'র পেটের কন্যাকে ছুঁয়ে কাঁদলাম আমি। এই কান্না আমার জীবনের শেষ কান্না...এরপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডারের লিভার সিষ্টেম অচল করে রাখলাম মিনিট মিনিট পাঁচেক….

##

আপনার মতামত দিন:


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়