Ameen Qudir

Published:
2019-09-02 20:29:27 BdST

ডা. দেবেন দত্তকে পিটিয়ে মারল ২৫০ জনের উন্মত্ত চা শ্রমিক


 

অধ্যাপক ডা. অনির্বাণ বিশ্বাস
______________________________

আমি এখানে কাঁদুনি গাইতে আসিনি। কিছু বলতে এসেছি।

ডঃ দেবেন দত্তকে 'গাফিলতির অভিযোগে' পিটিয়ে মারল ২৫০ জনের উন্মত্ত চা শ্রমিক,আসামের জোরহাটে Teok Tea Estateএ। আমি জানাতে চাইনা,উনি একজন ডেডিকেটেড ডাক্তার ছিলেন,২০০৫এ রিটায়ার করার পর একজন ডাক্তার হিসাবে ঐ Teokএই ভলান্টারি সার্ভিস দিচ্ছিলেন। জানলেও বলতে চাই না,ডাক্তার হিসাবে সবসময় নলেজ আপডেট করে রাখতেন,মিতভাষী,মৃদুভাষী মানুষ,দুই সন্তানের পিতা।ওনার বয়স হয়েছিল ৭৩।

যেটা বলতে চাই,পুলিশের সামনে গনপ্রহার করা হয়েছে।প্রায় মৃত হয়ে পরলেও ওনাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বাধা দাওয়া হয়েছে।শেষে প্যারামিলিটারি ফোর্স এসে ওনাকে কাপড়ে মুড়ে হাসপাতালে নিয়ে গেছে,যেখানে ডঃ দত্ত মৃত বলে ঘোষিত হলেন।অতঃপর কাপড়ে এবার পোটলার মত করে ওনার শরীর পোষ্টমর্টেমের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।তারপর আবার পোটলা করে বাড়ি....হতবাক পরিবার কাঁদতে পেরেছিল ? জানি না..আসাড় অনুভূতি..তারপর চিতায়..চিতা জ্বলছে....এখনও জ্বলছে..অন্তত আমার জ্বলছে।

সোসাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিও যে উন্মত্ত শ্রমিকদের দেখলাম,অনেকেই মোবাইল হাতে ভিডিও রেকর্ডিংও করছে..তাদের দেখে এটুকু বুঝলাম বিপ্লব আসন্ন।শ্রমিক ও কৃষকেরা বিপ্লব করে,এটাই এতদিন জেনে এসেছি।এই শ্রমিকদের সঠিক মুখে চালনা করলেই লাল সূর্য্য উঠবে।

মানসিকতার পচন কোথায় গেলে মানুষ নামক দুপেয়ে জন্তু এমন আচরন করে ? ডাক্তারের গায়ে হাত তোলা,কুৎসিত ভাবে মারা, গায়ে গু লেপে দেওয়া এমনকি খুন করা এসব কিছুই 'নেগলিজেন্স' 'রুগী মরল কেন' এই সবের নামে হয় ! যারা আইনের সাহায্য দেবে,প্রোটেকশন দেবে তারা চুপ। তাৎক্ষনিক ভাবে রোগীর বাড়ির লোক কিভাবে বিচার করে,ডাক্তার ভুল করেছে ? এসবের পেছনে প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ ভাবে শাসক দলের উস্কানি থাকে। নিজেদের অক্ষমতা ঢাকার জন্য ডাক্তারদের বলির পাঠা করে।

আমার এখন রাগ আসে না।ঘেন্নাও না। খালি বমি আসে। গত দশ বছরে ভারতে,বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে ডাক্তারদের ওপর আক্রমন বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছুদিন আগে গোবরায় ডাক্তারবাবুর গায়ে গু লেপে দেওয়া থেকে শুরু করে সদ্য ডঃ পরিবহর ঘটনা...সবকিছু আমাদের অনুভূতিকে আসাড় করে দেয়। NRS এর ঘটনার পর এত আন্দোলন হল...কিছু ফলপ্রসু হয়েছে ? হবে না।সরকারের সৎ ইচ্ছা নেই। নইলে তারপরেও ডাক্তার নিগ্রহ ঘটে ?

কি হবে এই সকল কুকর্মের প্রতিবাদে কালো ব্যাজ পড়ে ? পশ্চিমবঙ্গে ডাক্তার সংগঠন গুলো ডঃ দেবেন দত্তের নৃশংস খুনের প্রতিবাদে আজ আমাদের কালোব্যাজ লাগাতে বলেছিল ! কে পাত্তা দেয় ! আমি তো পরেছিলাম ! কেউতো জিজ্ঞেসও করল না কেন বুকে কালোব্যাজ ?
এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বলি।
প্রায় কুড়ি বছর আগে বর্ধমানের পশ্চিম দিকে আসানসোলের কাছে আকালপৌষ নামে এক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এক ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছিল (আমি সাক্ষী)।স্থানীয় মানুষ 'সরকার সব দিচ্ছে,অথচ ডাক্তার-সিস্টাররা' আমাদের সুচিকিৎসা দিচ্ছে না এই অভিযোগে হেল্থ সেন্টারে দু ডাক্তার,তিন সিস্টার আর দুইজন গ্রুপ ডি স্টাফকে প্রচন্ড গরমে রোদের মধ্যে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টে পর্যন্ত কানধরে বসিয়ে রেখেছিল। এর মধ্যে একজনের সান স্ট্রোক হয়।চার পাশে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল গ্রামবাসী।কেউ প্রতিবাদ করেনি।
একই জিনিস এখনও হচ্ছে।আরও বেশি মাত্রায় হচ্ছে।

ঘেন্না হচ্ছে ?মানে ডাক্তারদের বলছি,নিজেদের ওপর ঘেন্না হচ্ছে না ? ভাবছেন তো কেন ডাক্তার হতে গেলেন !

আমার আর কিছুই মনে হয় না। যে কোনদিন আমাকেও পিটিয়ে মারবে,আমি জানি।তাই বাড়িতে বলে রেখেছি,অপঘাতে মৃত্যু হলে তিন দিনে শ্রাদ্ধের কাজ।তোমাদের ঝঞ্ছাট কম পোয়াতে হবে। নিয়মভঙ্গতে বেশি মানুষ নেমনতন্ন কোর না।অনেকেই আসবে না।কারন মানুষ ডাক্তারদের ভেতর থেকে ঘৃণা করে।ডঃ দেবেন দত্তের হত্যার পর আমার এই ধারনা সিদ্ধ হয়েছে।

বিশ্বাস করুন আমার ডাক্তার বন্ধুরা,ভেতরে অনুভব করুন,বুঝবেন আমাদের মনুষত্ব,আত্মা সব পুড়ে কালো হয়ে গেছে। বাইরে কালোব্যাজের আর কোন প্রয়োজন নেই।

আর আমার পুত্রকন্যাসম ডাক্তারি ছাত্র-ছাত্রীরা,তোমাদের একটা কথা বলি। এত অন্ধকার চারপাশে। হতাশ হয়োনা। তোমরা সবুজ,তোমরা নোতুন...নিশ্চয় তোমাদের অন্যরকম ভাবনা চিন্তা থাকবে।তোমাদের শুভ কামনা করি । আমরা কাঠকয়লা হয়ে গেছি। এ ভাবেই পুড়ে মরব। কিন্তু তোমরা তোমাদের ভেতরের আগুনকে মশালে পরিনত কোর।

______________________________

অধ্যাপক ডা. অনির্বাণ বিশ্বাস

আপনার মতামত দিন:


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়