Ameen Qudir

Published:
2019-08-19 20:53:10 BdST

ডাক্তাররা যেভাবে ২৪ ঘন্টা চিকিৎসা দিচ্ছেন, ১৮ কোটি মানুষকে তা বোঝানো অসম্ভব ব্যাপার


ডা. ফাতেমা জোহরা
____________________________

ডেঙ্গু এখন একটা আতঙ্কের নাম, ভয়াবহ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশব্যপী। প্রতিটা হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্সসহ চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ইউনিট যে কতটা অমানবিক পরিবেশ এবং সীমাবদ্ধ পরিস্থিতিতে ২৪ ঘন্টা চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে দেশের ১৮ কোটি মানুষকে তা যারা হাসপাতালে যায়নি তাদেরকে বোঝানো অসম্ভব ব্যাপার।এই অবস্থায় ঈদে যখন প্রায় সবগুলা সেবা প্রতিষ্ঠান আনন্দ উদযাপন করলো , পরিবারের সাথে সময় কাটালো , ডাক্তাররা যুদ্ধে রত থেকেছে।সকল চিকিৎসকদের ছুটি বন্ধ ছিল । চিকিৎসকরা দিন রাত খেটেগেছেন রুগীদের জন্যে, নিজের পরিবারের খোঁজ তো তারা ঠিকমতো নিতে পারেন না ! চিকিৎসকদের পরিবারের কেও অসুস্থ হলেও ছুটি বাতিল। যে চিকিৎসকরা রাত-দিন অন্যের সুস্থ থাকার জন্য সেবা দিচ্ছে, তার-ই আবার নিজের পরিবার, প্রিয়জনদের অসুস্থতার সময় ছুটি পাবে না। নিজের এই অসহায়ত্তের কথা অনেকে পরিবারকেও বলতে পারে নি!
কাছের মানুষের অসুস্থতা কিংবা মৃত্যুর সময় তাদের প্রাপ্য সেবাটুকু-ও দিতে পারে না, যেটা পাবার তাদের অধিকার ছিলো । চিকিৎসকদের নিজের অসুস্থতা বলতে কিছু নাই,পরিবার বলতে কিছু নাই।তারা শুধু সেবাই দিবে কিন্তু সেবা পাবেনা।

এই কষ্ট বুঝে সাধারণ মানুষ আমাদেরকে সহযোগিতা না করলে একা চিকিৎসকদের পক্ষে চিকিৎসা করা অসম্ভব ব্যাপার।একবার সবার ছুটি বাতিল করে পরিপত্র, এখন আবার জরুরি বিভাগ এবং ইনডোর চালু রেখে সীমিত আকারে ছুটির পত্র।এই অবস্থায় ইমার্জেন্সি,ইনডোর, আউটডোর সবখানে ডাক্তাররা নিরলস কাজ কিরে যাচ্ছেন।অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল এখনো এই হাসপাতাল।তাই নিজেদের স্বাভাবিক সুস্থ জীবন এর জন্য নিরাপদ কর্মস্থল গড়ে তোলা উচিত। আমরা যারা জীবনের ঝুকি নিয়ে সেবা দিচ্ছি তাদের ঝুকি ভাতা নাই।যারা ঝুকি নিতে গিয়ে মারা গেলেন তাদের পরিবারকে ক্ষতি পূরন দেয়া উচিত।

আমরা কতটা ই মূল্য হীন।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডেঙ্গুতে মৃত অতিরিক্ত আইজিপির স্ত্রীকে দেখতে গিয়েছেন এবং পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সৌজন্যেতা।দেশের ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি চিকিৎসক এবং নার্সরা একাই মোকাবেলা করছে, বাকিরা কথার ফুলঝুরি ফোটাতে আর ফটোসেশনে ব্যস্ত। একজন সিভিল সার্জন সহ ১০/১২ জন চিকিৎসক মারা গেলেও সরকারের কেউ সমবেদনা জানাতে আসেননি।পুলিশের একজন মহিলা এসআই ডেংগু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন- এই খবরটি আজ সবগুলো মিডিয়ায় এসেছে । অথচ ডেংগু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকদের মৃত্যুর সংবাদ সব মিডিয়াতেও আসেনি।এমনকি বর্তমান ভয়াবহ ডেংগু পরিস্থিতিতে ডাক্তাররা যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন - এ সংক্রান্ত কোন সংবাদ বা আলোচনাও সব মিডিয়াতে নাই । সরকার ডাক্তারদের ঈদের ছুটি বাতিল করেছেন-অথচ ডাক্তারদের কোনরকম ধন্যবাদ দেবার ন্যুনতম সৌজন্যটুকু দেখান নি।

বাংলাদেশে এডিস মশা আসার সম্ভাব্য উপায় তুলে ধরে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী জানান, হয়তো বিদেশ থেকে কিছু মশা বিমানের ভেতরে চলে আসছে।মশা নিধনে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মেয়র,মন্ত্রী, অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয় ব্যর্থতার দায় স্বীকার করবে না।যারা পরিস্কার রাস্তাঘাট ঝাড়ু দিয়ে ডেংগু তাড়াচ্ছেন, তারা দয়া করে হাসপাতাল ঝাড়ু দিয়ে যান। কারন হাসপাতালগুলিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর প্রচন্ড অভাব রয়েছে।ডেঙ্গু নিয়ে মানুষের মাঝে সচেতনতা গড়ে তুলুন,নিজের চারপাশ পরিষ্কার রেখে সরকার ও সংশ্লিষ্ট ইউনিট কে সাহায্য করুন এবং সাধারণ জনতাকে উদ্বুদ্ধ করুন।স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সকল ব্যর্থতার দায় শুধুমাত্র চিকিৎসক নেবেন তা আমরা কিভাবে মেনে নিব।

ব্যবসায়ীরা ডেংগু ভারাক্রান্ত দেশের এই চরম বিপর্যয়ে ৯০টাকার অডমস(odomos) ক্রিমের দাম করে দিলেন ১০০০-১২০০ টাকা! মশার কয়েল ,মশারী, মশামারার ঔষধ, কিট বা রক্তের জন্য কোন প্রতিষ্ঠানেই যান না কেন সবখানে দাম বেশি। কিন্তু দিনরাত খেটেও ডাক্তারের সার্ভিসের রেট বেড়ে যায় না!তারউপর যখন তখন মার খায়।তবুও তাদের সেবা বন্ধ নাই।শুধু যে ডেঙ্গু রোগী তা নয়, এর সাথে অন্যান্য রোগীতো আছেই। তাদের ব্যবস্থাপত্র লিখে দিতে হচ্ছে, এমার্জেন্সি রোগীকে ভর্তির জন্য বেড খালি আছে কিনা সেটারও খোঁজও তাদেরকেই নিতে হচ্ছে।বেড ফাঁকা নেই। নতুন কাউকে ভর্তি নেয়া যাচ্ছে না। আত্মীয় স্বজন,সাংবাদিক বিভিন্ন তথ্যের জন্য একে ওকে প্রশ্ন করছেন।তাদের উত্তর দিতে হচ্ছে।এত কিছুর পরও ডাক্তাররা কসাই সমাজের মানুষদের কাছে।এখন পর্যন্ত কত মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং কতজন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছে- এই তথ্যও তাদের প্রচার করা উচিত সেই সাথে ডাক্তারদের ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন না করে, সরকারি হাসপাতাল গুলোতে ডাক্তারদের যেসব অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে সেগুলো এড্রেস করা উচিত। ডেংগু নিয়ে সাংবাদিকরা প্রায় প্রতিটি হাসপাতাল থেকে লাইভ ভিডিও, টক শো গুলিতে শুধু ডেংগু বিষয়ক আলোচনা - এসব কিছুতে সাধারন মানুষের মাঝে চরম আতংক বিরাজ করছে । হাসপাতালে সাংবাদিকদের অবাধ বিচরনে চিকিৎসা সেবা প্রদানেও সমস্যা হচ্ছে ।তাই সঠিক খবর প্রচার করা উচিত।ডেংগু মানেই মৃত্যু ঝুঁকি নয়, সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিলে এবং ডাক্তার এর পরামর্শ অনুযায়ী চললে এবং সর্বোপরি এডিস মশার বিস্তার রোধে সবাই সচেতন হলে বর্তমানে ডেংগুর এই মহামারী মোকাবিলা করা সম্ভব ।
__________________________
ডা. ফাতেমা জোহরা
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ

আপনার মতামত দিন:


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়